উদকমেহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস
প্রতিশব্দউদকমেহ, মূত্রমেহ
Arginine vasopressin3d.png
ভ্যাসোপ্রেসিন
উচ্চারণ
বিশেষত্বএন্ডোক্রাইনোলজি
লক্ষণপ্রচুর প্রস্রাব ও তৃষ্ণা। [১]
জটিলতাপানিশূন্যতা, খিঁচুনি[১]
রোগের সূত্রপাতযে-কোনো বয়স
প্রকারভেদকেন্দ্রীয়, বৃক্কজ, ডিপসোজেনিক বা তৃষ্ণাসৃষ্টিকারী, গর্ভকালীন[১]
কারণধরনের ওপর নির্ভর করে।[১]
রোগনির্ণয়ের পদ্ধতিমূত্র পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, তরল বঞ্চনা পরীক্ষা[১]
পার্থক্যমূলক রোগনির্ণয়ডায়াবেটিস মেলাইটাস[১]
চিকিৎসাপর্যাপ্ত তরল পান করা।[১]
ঔষধডেসমোপ্রেসিন, থায়াজাইড, অ্যাসপিরিন[১]
আরোগ্যসম্ভাবনাচিকিৎসা নিলে ভালো হয়।[১]
সংঘটনের হারপ্রতি বছর ১,০০,০০০ জনে ৩ জন।[২]

ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (ইংরেজি: Diabetes insipidus) রোগে প্রচুর পরিমাণ প্রস্রাব হয় এবং অত্যধিক তৃষ্ণা পায়।[১] বাংলায় এটি উদকমেহ বা মূত্রমেহ নামে পরিচিত।[৩] এই রোগে দৈনিক ২০ লিটার পর্যন্ত প্রস্রাব হতে পারে।[১]তরলের পরিমাণ কমিয়েও প্রস্রাবের ঘনত্বে তেমন প্রভাব পড়ে না।[১] জটিলতার মধ্যে অন্যতম হলো পানিশূন্যতাখিঁচুনি[১]

উদকমেহ চার ধরনের, প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে।[১] কেন্দ্রীয় উদকমেহ বা সেন্ট্রাল ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস ভ্যাসোপ্রেসিন নামক প্রতিমূত্রক হরমোনের অভাবে হয়।[১] হাইপোথ্যালামাস অথবা পিটুইটারি গ্রন্থিতে ক্ষত বা বংশীয় কারণে হতে পারে।[১] বৃক্কজ উদকমেহ বা নেফ্রজেনিক ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস হয় যখন বৃক্ক ভেজোপ্রেসিন নামক হরমোনের প্রতি যথাযথ সাড়া প্রদান করে না।[১] হাইপোথ্যালামাসের তৃষ্ণা কেন্দ্রে কোনো ক্ষতির কারণে তৃষ্ণাসৃষ্টিকারী উদকমেহ বা ডিপসোজেনিক ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস হয়।[১]কোনো মানসিক রোগ বা ওষুধের কারণে এই সমস্যা হতে পারে।[১] গর্ভকালীন উদকমেহ বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস কেবল গর্ভধারণের সময় হয়।[১] মূত্র পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষাতরল বঞ্চনা পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়।[১] উদকমেহ বা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাসের সাথে বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস মেলাইটাসের কোনো সম্পর্ক নেই এবং দুটি রোগের কারণ ও রোগপদ্ধতিও ভিন্ন যদিও উভয় রোগেই প্রচুর পরিমাণ প্রস্রাব হয়।[১]

এর চিকিৎসা পদ্ধতি হলো প্রচুর পরিমাণ পানি পান করা যেন পানিশূন্যতা না হয়।[১] অন্যান্য চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরনের ওপর।[১] কেন্দ্রীয় ও গর্ভকালীন উদকমেহতে ডেসমোপ্রেসিন ব্যবহার করা হয়।[১] বৃক্কজ উদকমেহের চিকিৎসায় অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে বের করে তার চিকিৎসা করা হয় অথবা থায়াজাইড, অ্যাসপিরিন বা আইবিউপ্রোফেন ব্যবহার করা হয়।[১] প্রত্যেক বছর প্রতি ১ লাখে ৩ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়।[২] কেন্দ্রীয় উদকমেহ ১০ থেকে ২০ বছর বয়সে শুরু হয় এবং নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে হয়।[৪] বৃক্কজ উদকমেহ যে-কোনো বয়সে শুরু হতে পারে।[৫] "diabetes" শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে যার অর্থ siphon বা U আকৃতির নল।[৬]

উপসর্গ[সম্পাদনা]

প্রচুর পরিমাণ প্রস্রাব হওয়া ও অত্যধিক তৃষ্ণা (বিশেষত ঠান্ডা পানি ও মাঝে মাঝে বরফ বা বরফ পানি) হলো উদকমেহের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।[৭] এই বৈশিষ্ট্যগুলো ডায়াবেটিস মেলাইটাসের সাথে মিলে যায়, তবে পার্থক্য হলো উদকমেহতে প্রস্রাবে গ্লুকোজ থাকে না। সারা দিন ও রাত ঘনঘন প্রস্রাব চলতে থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে, উদকমেহ ক্ষুধা, আহার, ওজন বৃদ্ধি ও দৈহিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। তারা জ্বর, বমি, অথবা উদরাময় নিয়ে আসতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক উদকমেহের রোগীরা পর্যাপ্ত পানি পান করে বছরের পর বছর সুস্থ থাকতে পারে। তবে পানিশূন্যতা ও পটাশিয়াম স্বল্পতার ঝুঁকি থেকে যায়।[৮]

কারণ[সম্পাদনা]

উদকমেহের কয়েকটি ধরন নিম্নরূপ:

কেন্দ্রীয়[সম্পাদনা]

কেন্দ্রীয় উদকমেহের অনেক সম্ভাব্য কারণ রয়েছে, নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো:

  • অজানা কারণ – ৩০%
  • মস্তিষ্ক বা পিটুইটারির সংহারক অথবা নির্দোষ অর্বুদ – ২৫%
  • করোটিক শল্যচিকিৎসা – ২০%
  • মস্তিষ্কে আঘাত – ১৬%

বৃক্কজ[সম্পাদনা]

বৃক্কজ উদকমেহ হয় ভ্যাসোপ্রেসিনের প্রতি বৃক্কের স্বাভাবিক সাড়াদানের অক্ষমতার ফলে।[৯]

তৃষ্ণাসৃষ্টিকারী[সম্পাদনা]

হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত তৃষ্ণাকেন্দ্রের ত্রুটির ফলে,[১০] অথবা মানসিক সমস্যার কারণে প্রচুর পানি পান করার ফলে ডিপসোজেনিক ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস হয়। ডেসমোপ্রেসিন দিয়ে চিকিৎসায় জল বিষণ হতে পারে।[১১]

গর্ভকালীন[সম্পাদনা]

গর্ভকালীন উদকমেহ কেবল গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে হয়। গর্ভাবস্থায় অমরায় ভেজোপ্রেসিনেজ নামক উৎসেচক নিঃসৃত হয়, যা প্রতিমূত্রক হরমোনকে (ADH) ভেঙে দেয়। ভেজোপ্রেসিন উৎসেচক বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হলে বা পরিষ্করণ বাধাগ্রস্ত হলে গর্ভকালীন উদকমেহ হয় বলে ধারণা করা হয়।[১২] অধিকাংশ গর্ভকালীন উদকমেহ ডেসমোপ্রেসিন (DDAVP) দিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে, তবে ভেজোপ্রেসিন ব্যবহার করা যায় না।

ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

"diabetes" (/ˌd.əˈbtz/ or /ˌd.əˈbtɪs/) শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার শব্দ diabētēs থেকে, যেটি আবার এসেছে প্রাচীন গ্রিক διαβήτης (diabētēs) থেকে যার শাব্দিক অর্থ siphon বা U আকৃতির নল।[১৩] প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক Aretaeus of Cappadocia (fl. প্রথম শতাব্দীতে CE) রোগের নাম হিসেবে অত্যধিক মূত্র নির্গমন অর্থে এই শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।[১৪][১৫] মূলত এই শব্দটি এসেছে গ্রিক διαβαίνειν (diabainein), থেকে যার অর্থ কোনো কিছুর মধ্য দিয়ে যাওয়া,[১৩] উক্ত শব্দটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত, প্রথম অংশ δια- (dia-), অর্থ "মধ্য দিয়ে" এবং দ্বিতীয় অংশ βαίνειν (bainein), অর্থ "যাওয়া"।[১৪] "diabetes" শব্দটি ১৪২৫ সালে ইংরেজি ভাষার চিকিৎসা প্রবন্ধে প্রথম লিপিবদ্ধ হয় "diabete" রূপে।

"Insipidus" শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার শব্দ insipidus (স্বাদহীন), লাতিন: in- "না" + sapidus "সুস্বাদু", এটা এসেছে sapere ক্রিয়া থেকে যার অর্থ "স্বাদ পাওয়া" — পূর্ণ অর্থ হলো "স্বাদ নেই এমন; স্বাদহীন"। ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস শর্করামেহ বা গ্লাইকোসুরিয়া (প্রস্রাবের সাথে গ্লুকোজ বের হওয়া) করে না তাই এমন নামকরণ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Diabetes Insipidus"National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases। অক্টোবর ২০১৫। ১৩ মে ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মে ২০১৭ 
  2. Saborio P, Tipton GA, Chan JC (২০০০)। "Diabetes Insipidus"। Pediatrics in Review21 (4): 122–129। ডিওআই:10.1542/pir.21-4-122পিএমআইডি 10756175 
  3. ভৌমিক, নৃপেন (২০১৪)। চিকিৎসা পরিভাষা অভিধান (দ্বিতীয় সংস্করণ)। ৪৫, বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা, ৭০০০০০৯: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। পৃষ্ঠা ১৩৬। আইএসবিএন 81-7756-108-1 
  4. "Central Diabetes Insipidus"NORD (National Organization for Rare Disorders)। ২০১৫। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মে ২০১৭ 
  5. "Nephrogenic Diabetes Insipidus"NORD (National Organization for Rare Disorders)। ২০১৬। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মে ২০১৭ 
  6. Rubin AL (২০১১)। Diabetes For Dummies (ইংরেজি ভাষায়) (3 সংস্করণ)। John Wiley & Sons। পৃষ্ঠা 19। আইএসবিএন 9781118052488। ২০১৭-০৯-০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  7. USE। "Diabetes insipidus - PubMed Health"। Ncbi.nlm.nih.gov। ২০১২-০৮-২৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-০৫-২৮ 
  8. "Diabetes Insipidus vs. Diabetes Mellitus" 
  9. Bichet DG (এপ্রিল ২০০৬)। "Nephrogenic Diabetes Insipidus"। Advances in Chronic Kidney Disease (ইংরেজি ভাষায়)। 13 (2): 96–104। ডিওআই:10.1053/j.ackd.2006.01.006 – PubMed-এর মাধ্যমে। 
  10. Perkins RM, Yuan CM, Welch PG (মার্চ ২০০৬)। "Dipsogenic diabetes insipidus: report of a novel treatment strategy and literature review"। Clin. Exp. Nephrol.10 (1): 63–7। এসটুসিআইডি 6874287ডিওআই:10.1007/s10157-005-0397-0পিএমআইডি 16544179 
  11. "Diabetes insipidus" 
  12. Kalelioglu I, Kubat Uzum A, Yildirim A, Ozkan T, Gungor F, Has R (২০০৭)। "Transient gestational diabetes insipidus diagnosed in successive pregnancies: review of pathophysiology, diagnosis, treatment, and management of delivery"। Pituitary10 (1): 87–93। এসটুসিআইডি 9493532ডিওআই:10.1007/s11102-007-0006-1পিএমআইডি 17308961 
  13. Oxford English Dictionary. diabetes. Retrieved 2011-06-10.
  14. Harper D (২০০১–২০১০)। "Online Etymology Dictionary. diabetes."। ২০১২-০১-১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০৬-১০ 
  15. Dallas J (২০১১)। "Royal College of Physicians of Edinburgh. Diabetes, Doctors and Dogs: An exhibition on Diabetes and Endocrinology by the College Library for the 43rd St. Andrew's Day Festival Symposium"। ২০১১-০৯-২৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০১-১৪ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

শ্রেণীবিন্যাস
বহিঃস্থ তথ্যসংস্থান

টেমপ্লেট:Pituitary disease টেমপ্লেট:Nephrology টেমপ্লেট:X-linked disorders