উইকিপিডিয়া:উইকিপত্রিকা/বৈশাখ ১৪৩২/সাক্ষাৎকার
এক্সপ্রেশন ত্রুটি: অপরিচিত বিরামচিহ্ন অক্ষর "ত"।
অনেক বন্ধুকে আমি সরাসরি উইকিপিডিয়ায় যুক্ত করেছি
উইকিপত্রিকার প্রতি সংখ্যায় উইকিপিডিয়ার একজন অবদানকারীকে সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমাদের এবারের সাক্ষাৎকারে আছেন সৈয়দ মুহাম্মাদ ইশতিয়াক মাহফুজ আব্দুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহ-সম্পাদক মেহেদী আবেদীন।
সহ-সম্পাদক: আপনার উইকিমিডিয়া জগতে আসার গল্পটা বিশদে বলুন।
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি প্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে উইকিমিডিয়ার সান্নিধ্যে আসি। আমি তখন বিটিসিএল আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র। সে সময় আমাদের স্কুলে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। আমি সাধারণত কোন প্রতিযোগিতা মিস করি না। এ প্রতিযোগিতাতেও তাই অংশ নিলাম। উল্লেখ্য, এ অনুষ্ঠানের পুরস্কার বিতরণী হয় বিটিসিএল ভবনে। এ পুরস্কার স্বয়ং তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে প্রদান করতেন (সে সময় করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ছিল, তাই তিনি ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকতেন)।
যেহেতু অন্যান্য প্রতিযোগিতার তুলনায় এ প্রতিযোগিতার গুরুত্ব অনেক বেশি, তাই আমি বিস্তর তথ্যানুসন্ধান করে রচনা জমা দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। হাতে খুব বেশি দিন সময় ছিল না। এমতাবস্থায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার জন্য উইকিপিডিয়ার তুলনায় কোনো কিছুই আমার কাছে উত্তম বিকল্প মনে হলো না। তাই উইকিপিডিয়া হতে তথ্যানুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলাম।
যে ব্যক্তিকে নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, উইকিপিডিয়ায় সেই ব্যক্তির নিবন্ধ পড়ে বিস্মিত হলাম। কতটা সাজিয়ে-গুছিয়ে সবকিছু লেখা! (অভিজ্ঞ উইকিপিডিয়ান হিসেবে এখন জানি, এটা নির্বাচিত নিবন্ধ হওয়ায় এতটা সুন্দর, তথ্যবহুল এবং বিন্যস্ত। কিন্তু তখন তো আর জানতাম না!)
সে সময় আমি ভারতীয় টেলিভিশন ধারাবাহিক সিআইডির মারাত্মক ফ্যান ছিলাম। বলতে গেলে ডাইহার্ড ফ্যান (এখনো অবশ্য ডাইহার্ড ফ্যান, তবে কিছু ইস্যুর কারণে নিজ ইচ্ছায় আমি বাধ্য হয়েই সিআইডি দেখা ছেড়েছি আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে)।
যা বলছিলাম। সুলিখিত নিবন্ধটি দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। সিআইডি নিয়েও তাই ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম। সিআইডি নিয়ে নিবন্ধও পেলাম। সিআইডির তিন মুখ্য চরিত্র, সিনিয়র ইন্সপেক্টর অভিজিৎ, এসিপি প্রদ্যুমান ও সিনিয়র ইন্সপেক্টর দয়া চরিত্রে অভিনয়কারী তিন অভিনেতার নামে নিবন্ধ খুঁজি। শেষোক্ত দুই জন অর্থাৎ এসিপি প্রদ্যুমান চরিত্রে অভিনয়কারী শিবাজী সত্যম ও সিনিয়র ইন্সপেক্টর দয়া চরিত্রে অভিনয়কারী দয়ানন্দ শেঠির নামে নিবন্ধও খুঁজে পাই। কিন্তু সিআইডিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র অভিজিৎ-এর চরিত্রে অভিনয়কারী আদিত্য শ্রীবাস্তবের নিবন্ধ খুঁজে পেলাম না। এই দুই জন ব্যতীত সিআইডির অন্যান্য কিছু অভিনেতার নামেও নিবন্ধ খুঁজে পেলাম। কিন্তু অভিজিৎ চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিনি, তার নামে নিবন্ধ পেলাম না। তখন একটু রাগ হলাম, উইকিপিডিয়ায় অভিজিৎ-এর তুলনায় তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অভিনেতাদের নামে নিবন্ধ আছে, অথচ অভিজিৎ-এর চরিত্রাভিনেতার নামে নিবন্ধ নেই! উইকিপিডিয়ার সাথে প্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে পরিচয় সেদিনই।
এরপর সিআইডি নিয়ে উইকিপিডিয়ায় আরো ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করি। অনেক সময়ই ভুল দেখলে সংশোধন করতে চাইতাম, তাই সম্পাদনা আইকনে ক্লিক করতাম। কিন্তু অ্যাকাউন্ট না থাকায় সম্পাদনা আইকনে ক্লিক করার পর অ্যাকাউন্ট খুলতে বলতো এবং বলতো, অ্যাকাউন্ট না দিলে আইপি অ্যাড্রেস প্রদর্শিত হবে। আইপি অ্যাড্রেস প্রদর্শিত হয়ে যাবে - এই ভয়ে আর সম্পাদনা করতাম না, বের হয়ে আসতাম। আবার অ্যাকাউন্ট খুলতেও ইচ্ছে করতো না। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখেও এরকম একটি ভুল আমার দৃষ্টিগোচর হয়। বিরক্ত হয়ে এবার ভাবলাম, অ্যাকাউন্ট খুললেই ফেলি এবার। সম্পাদনা না করলে আর চলছে না! আমার প্রিয় সিরিয়ালের নিবন্ধে এসব ভুল থাকা মানা যাচ্ছে না। সেই থেকে শুরু।
আমার প্রথম নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ৪ জুনে আমার প্রিয় অভিনেতা আদিত্য শ্রীবাস্তবের নামে যে নিবন্ধ নেই, তা কিন্তু আমি ভুলে যাইনি! ২০২১ সালের ৩০ মার্চ থেকেই নিবন্ধটি লেখা শুরু করি। দীর্ঘ দুই মাস পরিশ্রম করে ইংরেজি হতে বাংলায় অনুবাদ করে নিবন্ধটি প্রকাশে সক্ষম হই। আমার নিবন্ধটি উল্লেখযোগ্য ছিল, তাই ডিলিট হয়নি। (এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, সাড়ে ছয়শোর বেশি নিবন্ধ লিখলেও আমার একটি মাত্র নিবন্ধ অপসারিত হয়েছে এখন পর্যন্ত। সেটি হলো উজ্জয়িনী মুখোপাধ্যায়ের নিবন্ধ, যা যান্ত্রিকতার জন্য অপসারিত হয়। আমি ঐ নিবন্ধ কিছুদিনের মধ্যেই সঠিক পর্যায়ে আনার চিন্তা করছিলাম, কিন্তু {{কাজ চলছে}} ট্যাগ যোগ করতে ভুলে যাই। ফলে নিবন্ধটি অপসারণ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়, এবং তা মুছে দেয়া হয়। আরেকটি নিবন্ধ ডিলিট করা হয়েছিল, কিন্তু সেটিকে আসলে আমি পুনঃনির্দেশনা পাতা হিসেবে তৈরি করেছিলাম। ফলে প্রশাসকের কাছে নিবন্ধটি ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করলে তা ফিরিয়ে দেয়া হয়, ফলে আমি সেটিকে পুনঃনির্দেশিত করে রাখি।) আমার দ্বিতীয় নিবন্ধও ছিল সিআইডি নিয়েই। সিনিয়র ইন্সপেক্টর অভিজিৎ চরিত্রটি নিয়ে আমি নিবন্ধ তৈরি করি। এভাবে আমার উইকিপিডিয়ার সাথে পথচলা শুরু হয়।
তবে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখা শুরু করি ২০২২-এ অনুষ্ঠিত অমর একুশে নিবন্ধ প্রতিযোগিতার পর। মো. সাদমান ছাকিব ভাই আমাকে সে সময় অনেক সহযোগিতা করেছিলেন (এবং আমার নিবন্ধগুলো গ্রহণের আগে অনেক প্যারা দিয়েছেন, যেই প্যারা আজও মনে পড়ে!) এবং আমাকে উইকি কমিউনিটিতে যুক্ত করেন। ফলে আমি উইকিপিডিয়ায় এর পর থেকে একের পর এক নিবন্ধ সৃষ্টি ও সম্পাদনা চালিয়ে যেতে থাকি। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমি ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ নামে অ্যাকাউন্ট খুলি। তিন বছরেরও বেশি সময় এই অ্যাকাউন্ট দিয়ে সম্পাদনার পর ব্যক্তিগত কারণে এ অ্যাকাউন্ট বাদ দিয়ে দেই এবং Ishtiak Abdullah নামে অ্যাকাউন্ট খুলি। এখনো প্রধানত সেই অ্যাকাউন্ট দিয়ে সম্পাদনা করছি)।
সহ-সম্পাদক: প্রথমে কি কি সমস্যা আর বাধার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সেগুলো কিভাবে সমাধান করেছেন? এসব ক্ষেত্রে মেন্টরদের ভূমিকা কেমন ছিল?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: দেখুন, প্রথম প্রথম অন্যান্য নবাগত ব্যবহারকারীরা অনেক রকম সমস্যার সম্মুখীন হলেও আমি কোন সমস্যার সম্মুখীন হইনি। তাই আমার কোন সমস্যাই সে সময় সমাধান করা লাগেনি। তাই সে সময় কোন ক্ষেত্রে মেন্টরদের কোন ভূমিকাই রাখা লাগেনি (আমার কোন মেন্টরের সাথেই তখন পরিচয় ছিল না, যতটা মনে পড়ে ২০২২-এর আগে উইকিপিডিয়া বা এর সহ-প্রকল্পে সম্পাদনা করেন এমন কাউকেই আমি তখন অন-উইকি বা অফ-উইকি কোন ভাবেই চিনতাম না)। তবে আমি যখন আমার প্রথম নিবন্ধ লিখছিলাম তখন আমি আইপি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম, যা আমার নিবন্ধ লেখার কাজকে অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। আমার মেন্টরদের কথা যদি বলি, উইকিপিডিয়ার এই দীর্ঘ পথচলায় আমার মেন্টর হিসেবে আছেন তিনজন। আমার প্রধান মেন্টর ছিলেন মো. সাদমান ছাকিব ভাই। অন্যান্য মেন্টর দুজন হলেন মুহাম্মদ ইয়াহিয়া ভাই এবং শাকিল হোসেন ভাই। প্রধানত তারাই আমাকে এই দীর্ঘ পথ চলায় সহায়তা করেছেন, যদিও শুরু থেকে আমি তাদের সাহায্য পাইনি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস হতে আমি মো. সাদমান সাকিবের সংস্পর্শে আসি এবং তারও অনেক পরে মুহাম্মদ ইয়াহিয়া ভাই এবং শাকিল হোসেন ভাইদের সংস্পর্শে আসি। ২০২১ সালের শুরু হতে ২০২২ সালে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত পথচলাটা আমি একাই চলেছি। মো. সাদমান ছাকিব ভাইয়ের ক্রেডিট মূলত এখানে যে, তিনি আমাকে উইকি কমিউনিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং নিবন্ধের মানের সাথে কোনরকম আপস না করতে শিখিয়েছিলেন। কিন্তু উইকির বেসিক শেখা থেকে শুরু করে ২০২২ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমি একাই পথ চলেছি। মুহাম্মদ ইয়াহিয়া ভাই এবং শাকিল হোসেন ভাইয়ের সংস্পর্শে আসি আরো পরে। নিবন্ধ সম্পাদনা করতে গিয়ে যে কোন সময় কোন রকম সমস্যার সম্মুখীন হলে আমি তাদের দ্বারস্থ হতাম। এ কারণে আমি এই তিনজনকে আমার মেন্টর হিসেবে মান্য করি। এখনো আমি কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে এই তিনজনের একজনকে জিজ্ঞেস করি বা সমাধান চাই। মজার ব্যাপার হলো এটা যে, আমার মেন্টর তিনজনই উইকিপিডিয়ার প্রশাসক। আমার প্রধান মেন্টর একজন প্রশাসক এবং আমার বাকি দুজন মেন্টর শুধুমাত্র বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকই নন, বরং তারা উইকিমিডিয়ার স্টুয়ার্ড! এরকম অভিজ্ঞ ও দক্ষ মেন্টরদের সান্নিধ্যে আমি উইকিমিডিয়ার সহ-প্রকল্পগুলোয় সম্পাদনা করেছি এবং করছি।
সহ-সম্পাদক: তাহলে কি বলা যায় যে অভিজ্ঞ মেন্টর দক্ষ সম্পাদক সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে? সেক্ষেত্রে কি নতুন সম্পাদক সৃষ্টি করতে অভিজ্ঞ মেন্টরদের মূল্যবান সময় দেওয়ার ভূমিকা প্রয়োজন?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: অবশ্যই। কোয়ালিটি মেন্টর অবশ্যই একজন ব্যবহারকারীকে দক্ষ ব্যবহারকারী হতে সাহায্য করবে। আমি নিজেও এই ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে উইকিপিডিয়ার মেন্টরশিপ প্রোগ্রামকে আমি স্বাগত জানাই। তবে এখনো কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমতি আছে। আশা করি মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা এই কমতির জায়গাগুলি কাটিয়ে উঠবেন।
সহ-সম্পাদক: আচ্ছা। আপনি তো মাসখানেক আগে টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে ভাইরাল হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা বলুন। ওই সাক্ষাৎকার ভাইরাল হওয়ার পরে কি কেউ আপনার থেকে উইকিপিডিয়ায় কাজ করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: হ্যাঁ, আসলে সংখ্যাটা বরং বলা যায় প্রচুর এবং সংখ্যাটা আরো বাড়বে। এখনো আমার অনেক বন্ধুরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে কিভাবে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখব বা কিভাবে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখা শুরু করব? আমার অনেক বন্ধুকে আমি সরাসরি উইকিপিডিয়ায় যুক্ত করেছি।
সহ-সম্পাদক: কাজের ক্ষেত্রে আপনি অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইন কার্যক্রমকে কতটা গুরুত্ব দেন?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: আমি নিজে অন উইকিতে যতটা সক্রিয়, অফ উইকিতেও ততটাই সক্রিয়। আমি মনে করি, এই মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে অন-উইকি কার্যক্রম এবং উইকিমিডিয়া আন্দোলনকে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখে অফ-উইকি কার্যক্রম। আপনি যদি উইকিমিডিয়াকে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চান, তা হলে অফ-উইকি কার্যক্রমের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সম্পাদনাসভা ও মিটআপগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উইকিমিডিয়া আন্দোলনকে পুরো বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দিতে আমি কাজ করছি। আপনি যদি পুরো পৃথিবীর দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন শিক্ষার্থীরা তাদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় উইকিপিডিয়া বা এর সহ-প্রকল্পে সম্পাদনা করা শুরু করে। অনেক কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে উইকিপিডিয়া বা এর সহ-প্রকল্প সম্পাদনা করার উপর কোর্স ক্রেডিট থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম সংস্কৃতি এখনো প্রচলিত হয়নি। অবশ্য বুয়েটে এর আগে একবার এরকম কার্যক্রম হয়েছিল কিন্তু সেটার উপর কোনো কোর্স ক্রেডিট ছিল না। আমি যদি ভুল না করি, তাহলে পুরো বিশ্বে হাজারের উপর উইকি ক্লাব আছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোন উইকি ক্লাব চালু নেই। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ব্যাপার। বাংলাদেশ অনেক দিক দিয়ে পুরো দুনিয়া থেকে পিছিয়ে আছে, এটাও তার অন্যতম। আর এই জিনিসটা আমি কখনোই মেনে নিতে পারিনি যে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরনো দিনের ধ্যান-ধারণা নিয়ে চলছে। নতুন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রতিষ্ঠানে উইকি ক্লাব চালু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোর্সের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক উইকিমিডিয়া সম্পাদনার উপর ভিত্তি করে কোর্স ক্রেডিট দেয়া হচ্ছে। আর বাংলাদেশ এখনো পুরাতন দিনেই পড়ে আছে। আমি মনে করি ছাত্র অবস্থায় উইকিমিডিয়া আন্দোলনের সাথে জড়িত হওয়া উত্তম। একজন ছাত্র যেভাবে পড়াশোনা সামলে তার অবসর সময়ে উইকিপিডিয়া বা এর সহ-প্রকল্প গুলোতে অবদান রাখতে পারে, একজন পেশাজীবী কখনোই তার পেশা সামলে সেভাবে উইকিপিডিয়া বা এর সহ-প্রকল্পগুলোতে অবদান রাখতে পারবেন না। ছাত্রদের কাছে উইকিমিডিয়া আন্দোলন পৌঁছে দিতে অফ-উইকিতে কাজ করাটা বেশি জরুরী। তাই আমি সেদিকেই এখন মনোযোগ দিচ্ছি।
সহ-সম্পাদক: বাস্তব জীবনের সাথে উইকি জীবনের সময় ম্যানেজ করে নিতে অসুবিধা হয়না?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: আমি উইকিপিডিয়াকেও বাস্তব জীবনের অংশ হিসেবে মনে করি। তবে যদি নন-উইকি জীবনের কথা বলেন, তাহলে বলি উইকিমিডিয়া সামলে নন-উইকি জীবনে সময় দিতে এখন পর্যন্ত বড় কোন অসুবিধা হয়নি। অফ-উইকির ক্ষেত্রে যদি বলি, আমি জীবনে শুধুমাত্র একবারই উইকিমিডিয়ার ইভেন্টের চেয়ে নন-উইকি কাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম। ২০২৪ সালে নটরডেম গণিত ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত নটরডেম গণিত উৎসবের একজন আয়োজক ছিলাম। নটরডেম গণিত উৎসবের দ্বিতীয় দিনই উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত অমর একুশে নিবন্ধ প্রতিযোগিতা ২০২৪-এর পুরস্কার বিতরণী চলছিল। যেহেতু আমি ঐ গণিত উৎসবের একজন আয়োজক ছিলাম, তাই আমি সেদিন পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারিনি।
সহ-সম্পাদক: সামনেই তো পহেলা বৈশাখ। উইকিপিডিয়া বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কিত তথ্য প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আপনার মতে বাংলা উইকিপিডিয়া আরো কিভাবে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বড় পরিসরে মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে পারে?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতির, বিভিন্ন সংস্কৃতির লোক বাস করে। তাদের সংস্কৃতি, জীবন আচার ইত্যাদি সম্বন্ধে সহজে জ্ঞান অর্জন করতে হলে উইকিপিডিয়ার মত প্লাটফর্মের বিকল্প নেই। শুধু উইকিপিডিয়া নয়, এর সহ-প্রকল্পগুলোও এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলোর ইংরেজি সংস্করণগুলোতে প্রায় প্রত্যেক দেশের উইকিমিডিয়া অবদানকারীরাই তাদের নিজ দেশ, নিজ জাতি, নিজ সংস্কৃতি, নিজ ঐতিহ্য ইত্যাদি বিষয়ে অবদান রাখে। উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলোর ইংরেজি সংস্করণগুলো থেকে সেগুলো বাংলায় অনুবাদ করা প্রয়োজন এবং যেগুলো এখন হালনাগাদ করা নেই সেগুলো হালনাগাদ করা প্রয়োজন। এভাবে বাংলা উইকিপিডিয়া বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আরো বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
সহ-সম্পাদক: উইকিপত্রিকার কথা তো জানেন। কেমন লাগে উইকিপত্রিকা?
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: বাংলা উইকিপিডিয়া সম্প্রদায়ের একটি অসাধারণ উদ্যোগ হল উইকিপত্রিকা। এটা ভাবতেই ভালো লাগে যে আমি এ পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায়ই প্রদায়ক হিসেবে অবদান রেখেছিলাম। আরো ভালো লাগার বিষয় হল যে বাংলা উইকিসম্মেলন ২০২৪ থেকে এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার পরিকল্পনায় আমার খুব কম হলেও অংশ ছিল। একদম শুরু থেকেই প্রদায়ক হিসেবে যুক্ত আছি, যুক্ত আছি পাঠক হিসেবেও। উইকিপত্রিকায় প্রকাশিত এখন পর্যন্ত অনেক লেখাই অসাধারণ। বিশেষ করে সম্পাদক খাত্তাব হাসান ভাই কর্তৃক প্রথম সংখ্যায় লিখিত 'উইকি তারকা সম্মেলন' শীর্ষক ভ্রমণ নিবন্ধটি আমি যে কতবার পড়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। উইকিপত্রিকার সবচেয়ে ভালো লাগে যেদিকটা, সেটা হচ্ছে খাত্তাব ভাইয়ের হিউমার সেন্সযুক্ত সম্পাদনা। আমি নিজে হিউমার খুব বেশি পরিমাণেই পছন্দ করি। এছাড়াও উইকিমিডিয়া পরিসংখ্যান, সংবাদ ইত্যাদি খুব ভালো লাগে।
সহ-সম্পাদক: বাংলা উইকিপিডিয়ায় আপনার বর্তমান কাজগুলো নিয়ে কিছু জানান।
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: বাংলা উইকিপিডিয়ায় বর্তমানে আমি রমজান এডিটাথনে কাজ করছি। এখন আপাতত স্পেসিফিক কোন লক্ষ্য নেই। তবে যদি উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলোর কথা বলেন, তাহলে বলবো আমার লক্ষ্য ছিল যে উইকিসংবাদকে জুন মাসের মধ্যে ইনকিউবেটর থেকে বের করা। আলহামদুলিল্লাহ সেই কাজে আমি মোটামুটি সফল এখন পর্যন্ত এবং এখন কার্যক্রম এমন পর্যায়ে আছে যে, যদি আমি নাও থাকি বা আমি যদি এই কার্যক্রমে বাধাও দিতে চাই তাও থামানো সম্ভব না। কেননা উইকিসংবাদে আমার সাথে একগুচ্ছ উদ্যমী উইকিসাংবাদিক যোগ দিয়েছেন। তারা উইকিসংবাদকে এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং আমার ধারণা জুন মাস নয়, এপ্রিল বা মে মাসের মধ্যেই উইকিসংবাদ ইনকিউবেটর থেকে বের হবে।
সহ-সম্পাদক: উইকিমিডিয়ানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ: উইকিমিডিয়া অবদানকারীদের উদ্দেশ্যে বলবো, আমাদের ভাষা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। কিন্তু আমাদের বাংলা উইকিপিডিয়া ও এর সহ-প্রকল্পগুলো এখনো অনেক ভাষা থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে আছে। বাংলা উইকিপিডিয়ার অবস্থান আরো ঊর্ধ্বে উন্নীত করতে হবে। তবে সব সময়ই মানসম্পন্ন অবদান রাখতে হবে, কোয়ালিটির সাথে কোন আপোষ নয়। এছাড়াও আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় উইকি ক্লাব নেই। আপনারা যারা অভিজ্ঞ উইকিমিডিয়ান আছেন, তারা তাদের নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও উইকি ক্লাবের কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। যে সকল দেশে উইকিমিডিয়া প্রকল্পসমূহ আমাদের থেকে অনেক উন্নত, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের দেশে উইকি ক্লাবের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই দেশে বেশি বেশি উইকিমিডিয়া ক্লাব চালু করার বিকল্প নেই। এভাবে মুক্ত জ্ঞান ছড়ানোর ধারাবাহিকতা আপনি প্রজন্ম হতে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে পারেন। আপনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুজরা যখন আপনাকে দেখে উইকিমিডিয়ার সম্পাদনায় অনুপ্রাণিত হবে, আশা করি সেটি আপনার জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয় হবে। বিশ্বব্যাপী মুক্ত জ্ঞানের সম্প্রসারণে আপনি সক্রিয়ভাবে অবদানের ধারা বজায় রাখবেন, এটাই কাম্য। আশা করি, আমরা সম্মিলিতভাবে সারা বিশ্বের মানুষের জন্য জ্ঞানভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিতে সক্ষম হবো।
সহ-সম্পাদক: ধন্যবাদ সাক্ষাৎকারের জন্য।



আলোচনা করুন