ইসলাম এবং পারিবারিক সহিংসতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বিচারিক বিষয়ে দেশ অনুযায়ী ইসলামী আইনের প্রয়োগ:
   ইসলামি শরীয়তের বিচারিক ক্ষমতায় গ্রহনীয় নয়

ইসলাম এবং পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। এমনকি মুসলমানদের মধ্যেও শরীয়তের সমন্নয় ও বিশ্লেষণ নিয়ে মতভেদ আছে। এটা ইসলামী আইন, নৈতিকতা ও ধর্মীয় বিষয়কে একত্রিত করে।

পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী ধারণা করা হয় যে, বৈবাহিক সম্পর্কে নারীদের মারধর করাকে বৈধ মনে করা হয়েছে এবং এটা গুরুতর কারণ নয়। যেমন মেসওয়াক দিয়ে আঘাত করলে যেমন ব্যথা লাগে এবং দেহে কোন প্রভাব পড়ে না, ঠিক সে রকম ভাবে স্ত্রীকে আঘাত করা যায়। তদ্রুপ এ আয়াত দ্বারা নারীকে তার ভুল সম্পর্কে অবহিত করা, তাকে অপরাধের বিষয়ে অবহিত করা, তাকে নির্যাতন করা এবং অপমান করাকে ইসলাম অস্বীকার করে এবং নিন্দা করে। এ আয়াত একজন মহিলাকে মারধর সমর্থন করে না বরং সে যেন তাকে একটু পরিত্যাগ করে। ব্যাখ্যার বৈচিত্র্য অনুযায়ী ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিভিন্ন মাযহাব, ঐতিহাসিক ঘটনা, ধর্মীয় নীতি, ফতোয়া এবং শিক্ষার কারণে তারতম্য হয়।[১]

মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা একটি জটিল মানবাধিকার বিষয়। এটি জাতিভেদে মহিলাদের জন্য বিভিন্ন আইনি বিষয় পার্থক্য করে। তারা তাদের স্বামীদের থেকে আলাদা হওয়ার সুযোগ কতটা পায় তা দেখার বিষয়। সাংস্কৃতিক প্রবণতা, লজ্জার অনুভূতির কারণে নারীরা আইনি সহযোগিতা থেকে দূরে থাকে। ফলে তারা সহিংস আচরণের স্বীকার হলেও প্রমাণ লুকিয়ে রাখে, সেটা পুলিশকে বলে না এবং বিচার ব্যবস্থার কাছে যায় না।

পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞা[সম্পাদনা]

  • মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধানের সংজ্ঞা অনুসারে, পারিবারিক সহিংসতা হল: “পরিবার বা পরিবারের অন্য সদস্যের শারীরিক আঘাতের প্রভাব। একইভাবে এটি এই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তিমূলক বা অভ্যাসগত কাজ বুঝায়। ”[২]
  • কুমারস্বামী পারিবারিক সহিংসতাকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন: "ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া সহিংসতা, সাধারণত দুই ব্যক্তির মধ্যে- যারা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বা রক্তের সম্পর্ক বা আইনি সম্পর্ক দ্বারা সম্পর্কিত হয় । এটি প্রায় সবসময় লিঙ্গ-সম্পর্কিত অপরাধ, পুরুষদের দ্বারা নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। " এই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং নিপীড়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়।[৩]
  • জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান, একটি রিপোর্টের উপর ২০০৬ সালে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলেন: নারী ও মেয়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা মহামারী আকার ধারণ করেছে। পৃথিবীতে প্রতি তিন জনের মধ্যে অন্তত একজন মহিলাকে আঘাত করা হচ্ছে, জোরপূর্বক যৌনমিলনে বাধ্য করা হচ্ছে, অথবা অন্যথায় তার জীবদ্দশায় একজন হামলাকারীর দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, যিনি প্রায়ই তার পরিচিত কেউ (মহিলাদের জন্য জাতিসংঘের উন্নয়ন তহবিলের, ওয়েবসাইট)।[৪]

ইসলামী প্রমাণ[সম্পাদনা]

সূরা নিসা, আয়াত চৌত্রিশ[সম্পাদনা]

সূরা আন-নিসার ৩৪ তম আয়াত, এমন একটি আয়াত যা ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামী চিন্তাবিদ ও ফকিহদের মাঝে মতভেদ আছে। আয়াতটি হচ্ছে-

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حفظَ اللَّهُ ۚ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ۖ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا

অর্থ-“পুরুষরা নারীর ওপর ক্ষমতা রাখে। কেননা আল্লাহ পাক একজনকে আরেক জনের উপর মর্যাদা দান করেছেন। কেননা পুরুষরা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং সৎকর্মপরায়না নারী অনুগতা হয়, স্বামীর অবর্তমানে আল্লাহ যা হেফাজত করার দায়িত্ব দিয়েছেন তা হেফাজত করে। যাদের তোমরা অবাধ্য হওয়ার আশঙ্কা করো তাদের প্রথমে উপদেশ দাও। এতে সংশোধন না হলে বিছানা আলাদা করে দাও। এতেও সংশোধন না হলে প্রহার কর। তারা সংশোধন হলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ খোঁজ না।”

এমন তাফসির যা প্রহার সমর্থন করে[সম্পাদনা]

  1. অনেক গবেষক[৫][৬] দাবি করেন যে শরিয়া নারীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতাকে সমর্থন করে যখন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর অবাধ্যতা (অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা, বিদ্রোহ, বা তার সাথে দুর্ব্যবহার) সন্দেহ করে।[৭]
  1. অন্য গবেষকরা দাবি করেন যে, অবাধ্য স্ত্রীকে মারধর করা পবিত্র কোরআনের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।[৮]
  2. কিছু গবেষকের অনুবাদে দেখা যায় যে, মুসলিম স্বামীদের পক্ষে কঠিনের পরিবর্তে তাদের আস্তে আস্তে "পেটানো" জায়েজ এবং কখনও কখনও তার জন্য চড়, আঘাত, শাস্তি, এমনকি আরও জোরে আঘাত করাও সমানভাবে অনুমোদিত করে।[৯]
  1. কিছু ব্যাখ্যায়, যেমন ইবনে কাছীর এবং মুহাম্মাদ বিন জারির আল -তাবারির ব্যাখ্যায় দেখা যায় যে, সুরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলি - ক্রমানুসারে নেওয়া হয়েছে যা একটার পর একটা হবে। অর্থাৎ একটা দিয়ে সংশোধন না হলে আরেকটা শাস্তি দেবে।[১০][১১]
  2. কেহ কেহ বলেন, মৃদুভাবে বা প্রতীকীভাবে আঘাত করা জায়েয।[১২]
  1. সমসাময়িক মিশরীয় গবেষক আবদ-হালিম আবু শাক্কা আইনবিদ ইবনে হাজার আল-আসকালানি এবং আল- শাওকানির মতামতের উল্লেখ করে বলেন যে ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া মারধর হয় না।[১৩]
  1. ড মুহাম্মদ রতিব আল-নাবুলসী বলেন: "স্ত্রী হলো জীবনসঙ্গী, তাকে মারধর করা যায় না। মারধরের আইনগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে, এগুলি খুবই বিরল ঘটনা, এবং শর্তগুলি অসম্ভব, অর্থাৎ, যদি আমরা একটি মেয়েকে চাপিয়ে দেই যার কোন পরিবার নেই, তাকে থামানোর কেউ নেই, এবং সে একজন স্ত্রী এবং সে বিচ্যুত হয়ে যাবে। এ মৌলিক নীতির জন্য, মহিলাদের মারধর করা হয় না। ”[১৪]
  1. ২০০৭ সালে তাকি আল দীন আল-হিলালী এবং মুহসিন খান দ্বারা অনুবাদ করা এ আয়াতে পুরুষদেরকে নারীর রক্ষক, অভিভাবক এবং রোজগারী হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কারণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদের কাউকে কাউকে অন্যদের চেয়ে পছন্দ করতেন এবং তারা সমর্থ অনুযায়ী নিজ সম্পদ থেকে ব্যয় করতেন। যখন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর কাছ থেকে অশোভন আচরণ (অবাধ্যতা, বা বিদ্রোহ) দেখে, সে প্রথমে তাকে উপদেশ দিতে পারে, তারপর তার সাথে বিছানা ভাগ করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে মারধর করতে পারে। কিন্তু যদি সে আনুগত্যে ফিরে আসে, তাহলে অবশ্যই তার জন্য কোন উপায় খুঁজা যাবে না।[১৫]
  1. কিছু ইসলামী পণ্ডিত এবং ভাষ্যকার এই বিষয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন যে মারধর, এমনকি যেসব ক্ষেত্রে এটি অনুমোদিত, সেখানেও মারাত্মক হওয়া উচিত নয়।[১০][১৬]
  1. তাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করে যে, যেভাবেই হোক মারধর প্রতীকী হওয়া উচিত।[১৭]
  1. আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী এবং ইবনে কাথির যা বলেছেন সেটা হচ্ছে- মুসলিম পণ্ডিতদের ঐকমত্য হলো আয়াতটি হালকা এবং নরম প্রহারের বর্ণনা দিয়েছে।[১৮][১৯]
  1. আবু শাক্কা হানিফী মাযহাবের অনুসারী আল -জাসাসের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, একজন মহিলার শাস্তি হওয়া উচিত: "একটি আঘাত যাতে মেসওয়াক তথা দাঁত পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত একটি ছোট লাঠি দ্বারাও যেন এ সহিংসতা না হয়" বা অনুরূপ কিছু না হয়। এর মানে হল যে অন্য কোন উপায়ে প্রহার করা শরিয়া দ্বারা নিষিদ্ধ। ”[১৩]

এমন ব্যাখ্যা যা প্রহার সমর্থন করে না[সম্পাদনা]

বিভিন্ন অনুবাদ, বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মতামতের প্রভাব কী দেখায়, এ সম্পর্কে কিছু তাফসির বা ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো-

  1. আহমাদ আলী " ফা আদরেবু বা অতপর প্রহার কর" শব্দের অর্থ হলো ত্যাগ কর। যে মহিলাদের মধ্যে অবাধতা দেখা যায় তাদের সাথে মসৃণভাবে কথা বলো, তারপর তাদের বিছানায় ছেড়ে দাও (তাদের বিরক্ত করো না), এবং তাদের সাথে ঘুমান (যখন তারা চান) (এই বিষয়ের উপর জোর দিন)। "[৯]
  1. বখতিয়ার এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন উনিশ শতকে আরবি -ইংরেজী অভিধানের ৩০৬৪ পৃষ্টা পড়ে বলেছেন যে - "দরব" শব্দের অর্থ "তাকে যেতে দিন"।[২০] এই অনুবাদটি প্রমাণ পাওয়া যায় এ সুরার ৯৪ নং আয়াতে-

يا أيها الذين ءامنوا إذا ضربتم في سبيل الله فتبينوا.

অর্থ-হে ঈমানদারগণ যখন তোমরা আল্লাহর রাস্তায় চলো।[২১] অর্থাৎ তিনি বলতে চাচ্ছেন যে, স্ত্রীর অবাধ্যতা দেখা দিলে প্রহার না করে তাকে ছেড়ে দাও।

ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং বাস্তবতা[সম্পাদনা]

সুরা নিসার ৩৪তম আয়াত মেনে, অনেক দেশ যারা শরিয়া দ্বারা শাসনের দাবি করে তারা পারিবারিক সহিংসতার মামলা বিবেচনা করতে বা মামলা করতে অস্বীকার করে।[২২][২৩][২৪][২৫] যেমন

  1. ২০১০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুপ্রিম কোর্ট (ফেডারেল সুপ্রিম কোর্ট) একটি ছোট আদালতের রায় বিবেচনা করে, স্বামী এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের শারীরিক সহিংসতার শাস্তি দেওয়ার বিতর্কিত বিষয়টি সমর্থন করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দণ্ডবিধির ৫ অনুচ্ছেদে স্বামীর দ্বারা তার স্ত্রীর শাস্তি এবং নাবালক শিশুদের শাস্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, যতক্ষণ না আঘাত শরীয়া দ্বারা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে।[২৬]
  1. লেবাননে, কাফা সংগঠন যা নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায় এবং অনুমান করে যে, লেবাননের তিন -চতুর্থাংশ নারী তাদের স্বামী বা পুরুষ আত্মীয়ের হাতে জীবনের কোন না কোন সময়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতার মামলা শরিয়া নেতৃত্বাধীন আদালত থেকে দেওয়ানি দণ্ডবিধি-পরিচালিত আদালতে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।[২৭][২৮]
  1. সমাজকর্মীদের দাবি, সিরিয়া, পাকিস্তান, মিশর, ফিলিস্তিন, মরক্কো, ইরান, ইয়েমেন এবং সৌদি আরবে শরিয়া আদালত অনেক পারিবারিক নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটা বিশ্বাস করা হয় যে কারণটি শরিয়তের মধ্যে নয়, বরং তাদের মধ্যে যারা বুঝতে পারে না এবং এটি ভালভাবে প্রয়োগ করে।[২৯]

অনাকাঙ্ক্ষিত প্রহার কি বৈধ[সম্পাদনা]

এ ক্ষেত্রেও গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়-

  1. কোন কোন গবেষক এবং ভাষ্যকারগণ বলেন যে, পুরুষরা নারীর মুখে প্রহার করবে না।[৩০] আবার এমনভাবে আঘাত করবেন না যাতে তাদের শরীরে কোন চিহ্ন থাকে,[৩০] বা তাদের মারাত্মকভাবে আঘাত না করা, যাতে ব্যথা সৃষ্টি হয়।[১৭]
  1. সিরিয়ান আইনশাস্ত্রের পণ্ডিত ইবনে আবিদিনের মতো অন্যদের সাথে মারধর ও বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে একমত হয়েছেন যে, খারাপ পত্নীদের বিরুদ্ধে তারা শাস্তির সুপারিশ করেছেন।[৩১]

পারিবাকি সহিংসতা নিরোশোনে হাদিসের বাণী[সম্পাদনা]

অনেক হাদিসে স্ত্রীকে মারধর করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন

  • হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া আল-কুশায়রি, তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, "আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, স্ত্রীর উপর আমাদের অধিকার কি?" তিনি বলেছিলেন: "যখন তুমি খাবে তখন তাকে খাওয়াবে, তুমি যে মানের কাপড় পরবে তাকেও সেরকম কাপড় পরাবে এবং মুখে আঘাত করবেন না, তার নিন্দা করবে না এবং বাড়িতে ছাড়া তাকে পরিত্যাগ কবে না।" (আহমাদ, আবু দাউদ এবং ইবনে মাজাহ)।[৩২] এ হাদিসে স্ত্রীর কয়েকটি মৌলিক অধিকার যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের উপর সহিংসতা প্রমাণ করে না।
  • কিছু ফকীহগণ মনে করেন যে, পবিত্র কোরআনের উক্ত আয়াতে মারধর গ্রহণযোগ্য হলেও, এটি এখন সম্পূর্ণরূপে অনুমোদিত নয়। ইবনে কাছির পুরুষদের তাদের স্ত্রীদের মারধর না করার উপদেশের ব্যাখ্যার শেষ বলেছেন, আল্লাহর গজব এবং শান্তি তার প্রতি হোক যারা তার স্ত্রীকে প্রহার করে। সুতরাং মহিলা ও দাসদের আঘাত করবে না।"

ওমর ইবন খাত্তাব আল্লাহর রাসূলকে “ নারীদের শাস্তি “ দেয়া ব্যপারে প্রশ্ন করলে রাসুল বলেন,

  • "যারা স্বামীদের উপর হিংস্রতা এবং ক্ষমতা দেখায়, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে, আদব শিক্ষার জন্য তাদের মারধর করা যেতে পারে।" এ হাদিস প্রমাণ করে যে স্ত্রীরা স্বামীর উপর বাহাদুরি করে, ক্ষমতা দেখায়, তাদেরকে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। তবে সব স্ত্রীর ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য নয়। কেননা
  • আল্লাহর রসূলের কাছে অনেক নারী তাদের স্বামীদের যারা তাদের মারধর করে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। তখন নবী বলেন, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বা শাস্তি বর্ষিত হোক যারা তার স্ত্রীকে প্রহার করে।
  • রাসুল আরও বলেন: "মুহাম্মদের পরিবারে অনেক নারী তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অথচ তারা ভালো নয়।"[৩৩] এরা ঐ পুরুষ যারা সব সময় পরিবারে বিশৃংখলা, অশান্তি সৃষ্টি করে এবং স্ত্রীদের শাসনে রাখে। সুতরাং হাদিসের বাণী খারাপ স্বামী ও খারাপ স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রে আছে। কেননা পরিবারে পুরুষ ভালো হয় বা খারাপ হয় কিংবা স্ত্রী ভালো হয় বা খারাপ হয়।

সুতরাং, আল্লাহর রাসুল কোনো দিন নারীর সহিংসতা মেনে নেননি। কোনোদিন স্ত্রীকে প্রহার করেননি। তিনি নিজ স্ত্রীদের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিলেন। রাসুলের জীবনে একবার তার স্ত্রীদের সাথে মনমালিন্য হয়। রাসুল এক মাস আলাদা থাকেন। এহেন অবস্থায় কারো বিরুদ্ধে তিনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। ওমর ইবন খাত্তাব নিজ মেয়ে হাফসার ক্ষেত্রেও কোন ব্যবস্থা নেননি। তিনি বললেন: "আমি কেন তোমার এবং তোমার মেয়ে হাফসার কাছে এবং অন্য স্ত্রীদের কাছে ফিরে যাব না?" তাই ওমর হাফসার কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন: "তুমি কি আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে যেতে চাও?" তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন নবীর সমস্ত স্ত্রীগণ আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে যান।” রাসুলের পরিবারে শান্তি ফিরে আসে।

রাসূলের জীবনী আরও প্রমাণ করে যে, তিনি তার স্ত্রীদের সাথে ভালভাবে বসবাস করতেন, ভাল আচরণ করতেন। তিনি বলতেন:

  • "খোদার কসম, আমি নারীদের সম্মান করি বরং আমি তাদের প্রতি উদার। আমি তাদের অপমান করি না।" (ইবনে আসাকির)।
  • তিনি আরও বলতেন: "আপনারা কেউ কি তার মাকে আঘাত করতে লজ্জা করেন না? তোমরা দিনের এক সময় তাদেরকে প্রহর করো, আবার রাতে তাদের সাথে ঘুমাও। (আয়েশা কর্তৃক আবদুল রাজিক হতে বর্ণিত)
  • আল্লাহর রাসুল বলতেন: "মহিলাদের সম্মান করুন, কারণ তারা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।" (উকবা ইবনে আমেরের কর্তৃত্বে আল-তাবারানী কর্তৃক বর্ণনা করা হয়েছে)[১৪]
  • আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেন, “ কোন মুমিন যেন অন্য মুমেনাকে না মারে। কেননা তার এক আচরণ খারাপ লাগলে অন্য আচরণে সে সন্তুস্ট হবে।” তার মানে তিনি তার নৈতিকতার জন্য তাকে ঘৃণা করেন না। যদি সে তার একটি চরিত্রকে অপছন্দ করে, তাহলে সে অন্য চরিত্রের সাথে খুশি হবে। সে তোমার ভালো কাজ করেছে, সে খারাপ কাজ করেছে। এইভাবে, স্ত্রীর অপব্যবহারের দিকে তাকাবেন না, বরং অতীতের দিকে তাকান এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকান এবং ন্যায়বিচারের সাথে বিচার করুন।[৩৪] এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আল-নাবেলী বলেছেন: যদি কোন পুরুষ তার স্ত্রীর মধ্যে এমন কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে, তাহলে তার উচিত তার যোগ্যতার কথা চিন্তা করা॥[৩৫]
  • আরেক হাদিসে আছে রাসুল বলেছেন, "একজন পুরুষকে জিজ্ঞাসা করা উচিত নয় যে সে কেন তার স্ত্রীকে মারধর করে।" (আবু দাউদের সুনানে উল্লেখিত একটি দুর্বল হাদিস)।[৩৬]

উল্লেখিত হাদিসগুলো প্রমাণ করে ইসলাম পারিবারিক সহিংসতা সমর্থন করে না।

ইসলামে নারী[সম্পাদনা]

পোশাক[সম্পাদনা]

মুসলিম মহিলাদের মাথায় স্কার্ফ ও বোরকা পরতে হয়। বিভিন্ন জাতির মধ্যে নিয়মগুলি অত্যন্ত লক্ষণীয়ভাবে পরিবর্তিত হয় বিনয়ের কঠোরতা পালন এবং নারীকে পর্দায় রাখার জন্য।[৩৭] কারেন আস্ক এবং মেরিট গামসল্যান্ড লিখেছেন যে "উপনিবেশবাদী বা সমসাময়িক পশ্চিমা রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৃষ্টিতে, পর্দা মুসলিম সমাজে 'পার্থক্য' সৃষ্টি করে এবং 'হীনমন্যতার' সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন।" এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এই দৃষ্টিভঙ্গি এমন একটি বিষয়ের জন্য বিদ্যমান যা অনেক মুসলমানের কাছে পর্দা গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক পোশাক। এই দৃষ্টিভঙ্গি অন্যের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার স্পষ্টতার অভাব দেখায়।[৩৮] যা আদৌ ঠিক নয়।

সমতার ব্যাপ্তি[সম্পাদনা]

তার বই দ্য আইডেন্টিটি অফ উইমেন অ্যান্ড এ উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে, নারী -পুরুষ সমান। ফজলুর রহমান মালিক (ইসলামিক স্কলার) দাবি করেন, জেন্ডার সমতা মহান কোরানে একটি ভিত্তি, (সুরা নিসা (আয়াত: ১ এবং ৭), সুরা আল-মুমতাহিনা (আয়াত: ১২), সুরাত আল-হুজুরাত (আয়াত: ১০), সুরা আল-আলাক (আয়াত) : ১-৪) العدل আদল বা ন্যায় বিচার এবং القسط কিসত বা সমতা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ইসলামি পরিবারে পাওয়া যায়।[৩৯] কুরআনের গবেষক আয়েশা আবদেল রহমান ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইসলাম নারী -পুরুষের পার্থক্যকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি; সুতরাং, লিঙ্গ সমস্যা বিবেচনা করা উচিত নয়।[৪০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hajjar, Lisa. (2004) Religion, State Power, and Domestic Violence in Muslim Societies: A Framework for Comparative Analysis. Law and Social Inquiry. 29(1):1-38.
  2. violence Domestic Violence. Merriam Webster. Retrieved 14 Nov. 2011. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। Archived from the original on ২৮ জুন ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ 
  3. Coomaraswamy, Radhika. Further Promotion and Encouragement of Human Rights and Fundamental Freedoms. United Nations. Economic and Social Council. 5 Feb. 1996. Retrieved 19 Oct. 2011. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৩-০৪ তারিখে
  4. Moradian, Azad. Domestic Violence against Single and Married Women in Iranian Society. Tolerancy International. September 2009. Retrieved 16 Nov. 2011. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৩-০৪ তারিখে
  5. Hajjar, Lisa. "Religion, state power, and domestic violence in Muslim societies: A framework for comparative analysis." Law & Social Inquiry 29.1 (2004); see pages 1-38
  6. Treacher, Amal. "Reading the Other Women, Feminism, and Islam." Studies in Gender and Sexuality 4.1 (2003); pages 59-71
  7. John C. Raines & Daniel C. Maguire (Ed), Farid Esack, What Men Owe to Women: Men's Voices from World Religions، State University of New York (2001), see pages 201-203
  8. Jackson, Nicky Ali, ed. Encyclopedia of domestic violence. CRC Press, 2007. (see chapter on Qur'anic perspectives on wife abuse)
  9. Ahmed, Ali S. V.; Jibouri, Yasin T. (2004). The Koran: Translation. Elmhurst, NY: Tahrike Tarsile Qurʼān. Print.
  10. Grand Ayatullah Nasir Makarem Shirazi: Fatwas and viewpoints. Al-Ijtihaad Foundation. Retrieved 14 Nov. 2011.
  11. Roald (2001) p. 166.
  12. Ibn Kathir, "Tafsir of Ibn Kathir", Al-Firdous Ltd.، London, 2000, 50-53
  13. Roald (2001) p. 169.
  14. موسوعة النابلسي للعلوم الاسلامية ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৩-০৪ তারিখে
  15. Khan, Muhammad Muhsin; Hilālī، Taqī Al-Dīn. (1993) Interpretation of the Meanings of the Noble Qur'an in the English Language: a Summarized Version of At-Tabari, Al-Qurtubi and Ibn Kathir with Comments from Sahih Al-Bukhari. Riyadh, Saudi Arabia: Maktaba Dar-us-Salam. Print.
  16. Classic Manual of Islamic Sacred Law, Al-Nawawi, section m10.12, "Dealing with a Rebellious Wife", page 540; may hit her as long as it doesn't draw blood, leave a bruise, or break bones.
  17. Muhammad Asad, The Message of the Qur'an (his translation of the Qur'an).
  18. Ali, Abdullah Yusuf, (1989) The Holy Qur'an: Text, Translation and Commentary. Brentwood, MD: Amana Corporation. ISBN 0-915957-03-5.
  19. Kathir, Ibn, "Tafsir of Ibn Kathir", Al-Firdous Ltd.، London, 2000, 50-53.
  20. Bakhtiar, Laleh. Verse in Koran on beating wife gets a new translation. NYTimes.com
  21. Unknown author. Systematic comparison with 4:94 Islamawareness.net
  22. Fluehr-Lobban, Carolyn, and Lois Bardsley-Sirois. "Obedience (Ta'a) in Muslim Marriage: Religious Interpretation and Applied Law in Egypt." Journal of Comparative Family Studies 21.1 (1990): 39-53.
  23. Maghraoui, Abdeslam. "Political authority in crisis: Mohammed VI's Morocco."Middle East Report 218 (2001): 12-17.
  24. Critelli, Filomena M. "Women's rights= Human rights: Pakistani women against gender violence." J. Soc. & Soc. Welfare 37 (2010), pages 135-142
  25. Oweis, Arwa, et al. "Violence Against Women Unveiling the Suffering of Women with a Low Income in Jordan." Journal of Transcultural Nursing 20.1 (2009): 69-76.
  26. UAE: Spousal Abuse never a Right, Human Rights Watch (2010)
  27. Lebanon - IRIN, United Nations Office of Humanitarian Affairs (2009)
  28. Lebanon: Enact Family Violence Bill to Protect Women, Human Rights Watch (2011)
  29. Moha Ennaji and Fatima Sadiq, Gender and Violence in the Middle East, Routledge (2011), ISBN 978-0-415-59411-0; see pages 162-247
  30. "Towards Understanding the Qur'an" Translation by Zafar I. Ansari from "Tafheem Al-Qur'an" by Syed Abul-A'ala Mawdudi, Islamic Foundation, Leicester, England. Passage was quoted from commentary on 4:34.
  31. Encyclopedia of Women and Islamic cultures, p. 122
  32. الكتب - مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح - كتاب النكاح - باب عشرة النساء وما لكل واحدة من الحقوق- الجزء رقم5 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৪-০৫ তারিখে
  33. الكتب - سنن أبي داود - كتاب النكاح - باب في ضرب النساء- الجزء رقم6 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৪-০৫ তারিখে
  34. zawjan.com - zawjan Resources and Information ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৪-০৯-১৬ তারিখে
  35. موسوعة النابلسي للعلوم الاسلامية ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৭-০৮-০৩ তারিখে
  36. لا يُسأل الرجل فيم ضرب امرأته حديث ضعيف - إسلام ويب - مركز الفتوى ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৩-০৫ তারিখে
  37. Ask, Karin; Marit Tjomsland. (1998) Women and Islamization: contemporary dimensions of discourse on gender relations. Oxford: Berg. ISBN 1-85973-250-X.
  38. Ask, Karin; Marit Tjomsland. (1998) Women and Islamization: contemporary dimensions of discourse on gender relations. Oxford: Berg. Page 48. ISBN 1-85973-250-X.
  39. Barazangi, Nimat Hafez. (2004) Woman's identity and the Qur'an: a new reading. Gainesville: University Press of Florida. Page 71. ISBN 0-8130-3032-3.
  40. Barazangi, Nimat Hafez. (2004) Woman's identity and the Qur'an: a new reading. Gainesville: University Press of Florida. ISBN 0-8130-3032-3.