ইলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বৈবস্বত মনুর প্রথম সন্তান ইল। তিনি ইক্ষ্বাকুকুলের মহাপরাক্রমশালী রাজা এবং কুরুবংশের আদিপুরুষ পুরূরবা-র মাতা।

পুরাণের বিবরণ[সম্পাদনা]

জন্ম-বৃত্তান্ত[সম্পাদনা]

বৈবস্বত মনুর কোনো সন্তান না হওয়ায়, মহর্ষি বশিষ্ঠকে পুরোহিত নিযুক্ত করে, সন্তান কামনা করে দেবতা মিত্র-বরুণের যজ্ঞ করছিলেন। বৈবস্বত মনুর পুত্রসন্তান লাভ করবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু মনুপত্নী শ্রদ্ধা কন্যা সন্তান কামনা করে যজ্ঞের হোতার কাছে তাঁর মনের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। হোতাগণ 'কন্যা সন্তান' এর সংকল্প করে 'বষট-কার' উচ্চারণ করে যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞের ফলে মনুর 'ইলা' নামে এক কন্যার জন্ম হলো।পুত্রের বদলে কন্যা পেয়ে মনু ক্ষুণ্ণ হলেন। তিনি ক্ষুব্ধচিত্তে গুরু বশিষ্ঠের নিকট অনুযোগ করলেন। বশিষ্ঠ বললেন, যজ্ঞের হোতা প্রথমে পুত্র সন্তান এবং পরে কন্যা সন্তান কামনা করায় সংকল্পিত কার্যে বিপর্যয় ঘটেছে। যাহোক, আমার তপস্যা বলে তোমার সন্তান পুত্রই হবে।

অতঃপর তিনি ভগবান বিষ্ণুর স্তব করলেন। বিষ্ণুর আশির্বাদে কন্যা পুত্রে পরিনত হলো। তার নাম হলো সুদ্যুম্ন(ইল)। বৈবস্বত মনু পরবর্তীকালে ইলকে রাজ্যে অভিষিক্ত করে বানপ্রস্থ গিয়েছিলেন।[১][২]

বুধ ও ইলা[সম্পাদনা]

সুদ্যুম্ন একদা দিগ্বিজয়ের জন্য সঙ্গী-সাথী নিয়ে সপ্তদ্বীপা পৃথিবী পরিভ্রমণ করতে বেরোলেন। ঘুরতে ঘুরতে একদিন সুদ্যুম্ন শিব-পার্বতীর অতি প্রিয় স্থান উমাবনে এসে পড়লেন। উমাবনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ইল নারীতে পরিনত হলেন। সুদ্যুম্নের ঘোড়াটিও ঘুড়ী হয়ে গেল।

এই উমাবনের নিয়ম ছিল, যে পুরুষ এই বনে প্রবেশ করবে সে সঙ্গে সঙ্গে নারী হয়ে যাবে। কোনো কালে কয়েকজন মহাতাপস ঋষি উমা-মহেশ্বর কে দর্শন করবার জন্য উমাবনে এসেছিলেন। পার্বতী-মহাদেব তখন রতি ক্রিয়ায় মত্ত ছিলেন। ঋষিগণ দেবী পার্বতীকে বিবস্ত্রা দেখে ফেললেন। পার্বতী লজ্জা পেলেন এবং বস্ত্রদ্বারা শরীর আচ্ছাদন করে লজ্জা নিবারণ করলেন। ঋষিগণ হর-পার্বতীকে রতি-ক্রিয়ায় মত্ত দেখে নর-নারায়ণ আশ্রমের দিকে চলে গেলেন। এরকম বিষম অবস্থায় দেবী নারী স্বভাবোচিত কারণে অত্যন্ত বিচলিত হলেন। তখন মহাদেব পার্বতীর প্রীতির জন্য এই নিয়ম বাঁধলেন- যে পুরুষ এই বনে প্রবেশ করবে সে নারীত্ব প্রাপ্ত হবে। সেই থেকে আর কোনো পুরুষ উমাবনে(মৎস্যপুরাণ মতে 'শরবন') প্রবেশ করে না।

সুদ্যুম্ন এই নিয়মের কথা জানতেন না। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে এই বনে প্রবেশ করামাত্র নারীত্ব প্রাপ্ত হলেন। নারীত্ব প্রাপ্ত হবার পর তিনি পুর্বের অবস্থা বিস্মৃত হলেন। ইলা বন থেকে বনান্তরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।

এরকম এক সময় চন্দ্রদেবের পুত্র বুধ ইলাকে দেখতে পেলেন। নারীত্ব প্রাপ্ত হয়ে ইলা অত্যন্ত সুন্দরী হয়েছিলেন। বুধ তাঁকে দেখে মোহিত হয়ে পড়লেন। বুধ, ইলার অবস্থা বিপর্যয়ের কথা জানতেন।এও জানতেন যে ইলা আত্মবিস্মৃত হয়েছেন।

বুধ ইলাকে পাবার জন্য ব্রাহ্মণের বেশ ধরলেন। দণ্ড, কমণ্ডলু, বই হাতে নিয়ে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে বুধ ইলার কাছে গিয়ে তাঁকে ডেকে বললেন, 'তুমি আমার গৃহচর্যা রেখে কোথায় গিয়েছিলে? তোমার-আমার এই মধুর সন্ধ্যা-যাপন সময় কেন নষ্ট করছো? এস, আমরা এই গৃহপ্রাঙ্গন ফুল দিয়ে সাজাই।' বুধ এরকম কথা বললেন, 'হে আর্য, আমি সব ভূলে গিয়েছি। আমি-ই বা কে, আপনিই বা কে, আমার পরিচয় কি?' বুধ বললেন, 'তুমি ইলা। আমি বুধ নামক বিদ্বান ব্রাহ্মণ। আমার জন্ম শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণকুলে। তুমি আমার প্রনয়ীনী।' এই কথা শুনে ইলা বুধের সঙ্গে তাঁর গৃহে চললেন। সেখানে তাঁরা এক বছর কাল অত্যন্ত সুখে কাটালেন। তখনই তাঁদের সন্তান পুরূরুবা-র জন্ম হলো।[৩][৪][৫]

[ব্রহ্ম ও বায়ুপুরাণে পুরূরবা-র জন্ম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ইলা যজ্ঞবেদী থেকে নারী হয়ে জন্মানোর পর মনুর অনুমতি নিয়ে মিত্র-বরুণের কাছে গিয়েছিলেন। মিত্র-বরুণ ইলাকে পুরুষ হয়ে যাবার আশির্বাদ দিয়ে পিতার কাছে ফিরে যেতে বলেন। ইলা মনুর কাছে ফিরে আসবার সময় পথের মধ্যে বুধ তাঁকে প্রেম নিবেদন করে। তখন তাঁদের মিলনে পুরূরবা'র জন্ম হয়।][৬][৭]

ইলার কিম্পুরুষ দশা[সম্পাদনা]

এদিকে ইলার অনুপস্থিতিতে তাঁর অমাত্য-মন্ত্রীরা ইলার অন্যান্য ভ্রাতাদের সঙ্গে করে ইলার খোঁজে বেরোলেন। উমাবনের নিকট এসে তাঁরা সেই ঘোড়াকে দেখতে পেলেন। সিন্ধুদেশীয় সেই ঘোড়াটিকে তাঁরা চিনতে পারলেন এবং এর স্ত্রীদশা দেখে তাঁরা বিস্মিত হলেন। কুলপুরোহিত বশিষ্ঠ ধ্যানযোগে সবটা জানতে পারলেন। তিনি অন্যান্যদের সমস্ত ব্যাপার অবগত করে বললেন, 'আমাদের পরমতেজস্বী রাজা যেন পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে, আমাদের সেই চেষ্টা করতে হবে।' এই বলে তিনি শিবের স্তব করতে শুরু করলেন। স্তবে খুশি হয়ে মহাদেব দর্শন দিলে, বশিষ্ঠ পুনরায় ইলার পুরুষত্ব ফিরিয়ে দেবার প্রার্থনা জানালেন। মহেশ্বর বললেন, তাঁর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অলঙ্ঘ্য। তবে ইক্ষ্বাকু যদি অশ্বমেধ যজ্ঞ করে, তবে সেই যজ্ঞের ফলে ইলা কিম্পুরুষ হবে[অর্থাৎ কিছুকাল নারী কিছুকাল পুরুষ]। তখন সূর্যবংশীয়রা অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেন। সেই যজ্ঞের ফলে ইলা কিছুকাল নারী হতেন, কিছুকাল পুরুষ।

এদিকে পুরূরবা-র জন্মের কিছুকাল পরেই বুধ স্বর্গে চলে গেলেন। কিম্পুরুষ হবার লজ্জায় ইলা সিংহাসন ত্যাগ করলেন। তাঁর জায়গায় রাজা হলেন ইক্ষ্বাকু। ইনিই সূর্যবংশের মূল ধারার বাহক। কুলগুরু বশিষ্ঠের নির্দেশে ইলা প্রতিষ্ঠানপুর[টীকা ১] রাজ্যে পুরূরবাকে অভিষিক্ত করলেন। পুরূরবা থেকেই পরে কুরু-পাণ্ডব, যাদব প্রভৃতি বংশধারার সৃষ্টি হয়। ইলা আরও তিন সন্তান ছিল- উৎকল, গয়, বিনতাশ্ব। প্রতিষ্ঠানপুরে পুরূরবাকে রাজপদে অভিষিক্ত করে ইলা তপস্যার জন্য অন্যত্র চলে গেলেন। সেই যেখানে তিনি বুধের সঙ্গে সংসার করেছেন, যেখানে পুরূরবা-র জন্ম হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইলার নামানুসারে সেই জায়গার নাম হলো ইলাবৃতবর্ষ।[৮][৯][১০][১১]

রামায়ণের বিবরণ[সম্পাদনা]

রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে ইলা-বুধের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। সেখানে অন্যান্য পুরাণের সঙ্গে রামায়ণের তথ্য ও ঘটনাগত বিভিন্নতা রয়েছে। রামায়ণে বলা হয়েছে, ইলা ছিলেন প্রজাপতি কর্দমের পুত্র। কর্দম রাজত্ব করতেন বাহ্লীক দেশে। মহাদেবের নিয়মে ইলা নারীত্ব প্রাপ্ত হলে শোকাকুল ইলা দেবী উমার স্তব শুরু করেন।

প্রণিপত্য উমাং দেবীং সর্বেণৈবান্তরাত্মনা।

ঈশে বরানাং বরদে লোকানামসি ভামিনি।
অমোঘদর্শনে দেবী ভজ সৌম্যেন চক্ষুষা।

-দেবী, আপনি সমস্ত লোকের বাঞ্ছাকল্পলতা। আপনি সকলকেই অভীষ্ট বরদান করেন। আপনার দর্শন কখোনো বৃথা যায় না। ভামিনি! প্রসন্ন নয়নে দৃষ্টিপাত করে এ দাসকে অনুগৃহীত করুন।

স্তবে প্রসন্না দেবীর বরে ইলা তখনই কিম্পুরুষত্ব প্রাপ্ত হলেন। ইলাকে নারীরূপে দেখে বুধ অতি মুগ্ধ হলেন। যেসব সঙ্গীসাথী ইলের সাথে এসে কিম্পুরুষত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন বুধ তাদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে ইলাকে নিয়ে সংসার শুরু করলেন। কিম্পুরুষ দশায় ইলা যখন পুরুষ হলেন, তখন তাঁর পূর্বের কথা[অর্থাৎ তাঁর রাজ্য, পিতামাতা, স্ত্রী-সন্তান দের কথা। নারী হবার কথা তাঁর মনে থাকত না] মনে পড়ল। ফিরে যেতে চাইলে বুধ তাঁকে এক বছর থেকে যেতে বললেন। ইলা সম্মত হলো। একবছরের মধ্যেই ইলা পুরূরবা-র জন্ম দিলেন।

এদিকে কর্দম ঋষি সমস্ত টা জানতে পেরে ঋষিদের পরামর্শে মহাদেবের উদ্দেশ্যে অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞের ফলে প্রসন্ন মহাদেবের বরে ইলা সম্পূর্ণ ভাবেই পুরুষ হয়ে গেলেন। ইল পূর্বে পুরুষাবস্থায় বাহ্লীকদেশে এক পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন, তাঁর নাম শশবিন্দু। শশবিন্দুকে বাহ্লীকদেশের সিংহাসনে বসিয়ে এবং পুরূরবাকে প্রতিষ্ঠানপুরের সিংহাসনে বসিয়ে ইলা সংসার ত্যাগ করে তপস্যায় কাল কাটালেন। অতঃপর তপস্যার ফলে ইলা ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হলেন।[১২][১১]


টীকা[সম্পাদনা]

  1. এলাহাবাদে প্রয়াগ থেকে পূর্বদিকে গঙ্গার তীরে 'ঝুঁসি' জায়গাটিই প্রাচীনকালে প্রতিষ্ঠানপুর নামে ছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, বিষ্ণুপুরাণম্। মনু পুত্রোৎপত্তির পুর্বে পুত্র কামনায়...। চতুর্থাংশ, অধ্যায়_১, শ্লোক_৫-৮ 
  2. শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বিরচিত, শ্রীমদ্ভাগবতম্। প্রথমে মনু অপুত্রক ছিলেন, তাঁহার পুত্রের নিমিত্ত...। নবম স্কন্ধ, অধ্যায়_১, শ্লোক_১৩-২২ 
  3. শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বিরচিত, শ্রীমদ্ভাগবতম্। হে মহারাজ! সেই বীর সুদ্যুম্ন একদা কতিপয় অমত্য....। নবম স্কন্ধ, অধ্যায়_১, শ্লোক_২৩-৩৫ 
  4. শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, বিষ্ণুপুরাণম্। পুনর্বার ঈশ্বরকোপে ঐ সুদ্যুম্ন কন্যা হইয়া...। চতুর্থাংশ, অধ্যায়_১, শ্লোক_৯-১৩ 
  5. শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, মৎস্যপুরাণম্। ধার্মিক মনু জ্যেষ্ঠপুত্র ইলকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া...। অধ্যায়_১১, শ্লোক_৪২-৬৬ 
  6. শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, ব্রহ্মপুরাণম্। লোমহর্ষণ কহিলেন,- হে মুনিবর বৈবস্বত মনুর আত্মসম নয়টি পুত্র....। অধ্যায়_৭, শ্লোক_১-২৩ 
  7. পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, বায়ুপুরাণম্। সুত কহিলেন, - দেবগণ সহ চাক্ষুষ মন্বন্তর অতীত হইলে....। অধ্যায়_৮৫, শ্লোক_১-১৫ 
  8. আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, মৎস্যপুরাণম্। সুত বলিলেন,- অনন্তর মনুর ইক্ষ্বাকু প্রমুখ অন্যান্য পুত্রগণ...। অধ্যায়_১২, শ্লোক_১-১৮ 
  9. শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বিরচিত, শ্রীমদ্ভাগবতম্। আমরা শুনিয়াছি মনুর বংশোদ্ভব রাজা সুদ্যুম্ন...। নবম স্কন্ধ, অধ্যায়_১, শ্লোক_৩৬-৪২ 
  10. শ্রী হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য অনুদিত, মহাভারতম্। তাহার পর ইলার গর্ভে পুরূরবা জন্মগ্রহণ করেন । এক ইলাই পুরূরবার মাতা ও পিতা ছিলেন , ইহাও আমাদের শুনা আছে ৷ আদিপর্ব, অধ্যায়_৬৩, শ্লোক_১৬ 
  11. শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী সম্পাদিত, পুরাণকোষ [অ-ঔ]। [ইলা] পৃষ্ঠা-৬২৯-৬৩১। সাহিত্য সংসদ। 
  12. আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন বঙ্গানুবাদিত, রামায়ণম্। মহাতেজা বাক্যবিশারদ রামচন্দ্র, লক্ষণের সেই কথা শুনিয়া...। উত্তরকাণ্ড, সর্গ_১০০-১০৩