ইবরাহীম তশ্না

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
শাহ মোহাম্মদ ইবরাহীম আলী
জন্ম১৮৭২
মৃত্যু১৯৩৩
বাটইআইল (নিজবাড়ী)
প্রতিষ্ঠানদারুল উলুম দেওবন্দ
আন্দোলনভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন

শাহ মোহাম্মদ ইবরাহীম আলী তশ্না (১৮৭২-১৯৩৩) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাবান একজন মুসলিম চিন্তাবিদ, সমাজ-সংস্কারক, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক, খিলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা এবং বাঙলা-উর্দু-ফারসি সহ বহু বহুসংখ্যক মরমি সঙ্গীতের রচয়িতা। তিনি ‘তশ্না’ (পিপাসী) উপাধিতে ব্যাপক পরিচিত হন। তার ‘অগ্নিকুণ্ড’ সঙ্গীতগ্রন্থ বাংলা মরমি-সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।[১]

জন্ম ও পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

১২৮৯ হিজরি, মোতাবেক ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাটইআইল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এক মুসলিম পরিবারে তার জন্ম । [২] পিতা কাদরিয়া তরিকার পীর মাওলানা শাহ্ আবদুর রহমান কাদরী এবং বড় ভাই ‘বাংলার তুতা’-খ্যাত মাওলানা ইসমাঈল আলম আলম ছিলেন বাঙলাভাষী উর্দু কবিদের মধ্যে অন্যতম । [৩] ইবরাহীম তশ্না-র পূর্বপুরুষ শাহ তকিউদ্দীন (রাহঃ) ছিলেন সিলেট-বিজয়ী কিংবদন্তি হযরত শাহজালাল (রাহঃ)-এর অন্যতম সফর-সঙ্গী। তকিউদ্দীনের মাজার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুরের শেখপাড়ায় অবস্থিত । [৪]

“তশ্না সাহেব মধ্যম গড়ন ও শ্যামলা বর্ণের ছিলেন । চেহারায় ছিল উজ্জ্বল বসন্তের দাগ । চক্ষের পুতলি ছিল গাঢ় কালো এবং মাথায় বাবরি চুল রাখতেন । আওয়াজ ছিল ভারি, কথা বলতেন নরম তবিয়তে । ঘন-কালো দাড়িতে খুবই সুন্দর দেখাত । তুর্কি টুপি পরিধান করতেন, পাগড়ি মাথায় জলসায় যেতেন এবং বক্তব্যের সময় প্রায়ই পাগড়ি খুলে রাখতেন । লম্বা কুরতা, শেরওয়ানি, আরবি-কোট ও পায়জামা পরতেন । লাঠি হাতে থাকত, চশমা ব্যবহার করতেন । স্বাভাবিক খানা নিজে খেতেন এবং অন্যকে খাওয়াতেন । কখনও নিজ হাতে রান্না করে মেহমানদারি করতেন । হাদিয়া-তোহফা পেয়ে কখনও বণ্টন করতেন আবার কখনও কেতাব ছাপানোর কাজে ব্যবহার করতেন । চা পানে ছিলেন খুবই অভ্যস্ত ।”[৫]

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

প্রাথমিক শিক্ষা পিতার একান্ত তত্ত্বাবধানে, তারপর তদানীন্তন আসাম প্রদেশের খ্যাতনামা ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ি আজিরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন ইবরাহীম তশ্না । [৬] সেখানে মাওলানা আব্দুল ওহাব চৌধুরী-র সাহচর্যে ইসলামি শিক্ষার পাঠ শুরু করেন । ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তশ্না চলে যান ভারতীয় মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ-এ । সেখানে তিনি হাদিস-শাস্ত্রে ১ম স্থান অধিকার করেন । দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষা সমাপ্তির পরও তশ্না-র জ্ঞানপিপাসা মেটেনি, তিনি চলে যান দিল্লি । দেওবন্দ ও দিল্লির একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটানা নয় বছর অধ্যয়ন করে ইলমে-হাদিস, উর্দু এবং ফারসি ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন । [৭], [৮], [৯]

শিক্ষা আন্দোলন[সম্পাদনা]

১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তশ্না দেশে ফিরেন । [১০] নয় বছরের অর্জিত জ্ঞান তিনি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হন । এ উদ্দেশ্যে একদিন পার্শ্ববর্তী সাত গ্রামের জনসাধারণকে নিয়ে স্থানীয় উমরগঞ্জ বাজারে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন । সভায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর বক্তব্য দিয়ে শেষ পর্যায়ে হঠাৎ বলেন, ‘আমি দীর্ঘ নয় বছর বিদেশে থেকে আপনাদের জন্য সামান্য খেজুর নিয়ে এসেছি । আমার ইচ্ছা আজকের সভায় খেজুরগুলো বণ্টন করে দিই ।’ জনতার অনেকেই খেজুরের আশায় এদিকওদিক তাকালো ! তিনি তখন বললেন, ‘এ খেজুর ইলমে দ্বীনের খেজুর । আজ আমি এ মাটিতে ইলমে দ্বীনের একটি বীজ রোপণ করতে চাই, ইলমে দ্বীনের এ বীজের বদৌলতে ইসলামের আলো চিরদিন জ্বলতে থাকবে ।’ এ কথা বলে উপস্থিত জনতার মতামত জানতে চান । উপস্থিতি তার কথায় সম্মতি প্রদান করলে ১৩১৭হিজরি; ১৮৯৮খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় বৃহত্তর জৈন্তা অঞ্চলের দ্বিতীয় প্রাচীন ইসলামীক প্রতিষ্ঠান ‘মাদ্রাসায়ে ইমদাদুল উলুম- উমরগঞ্জ’। [১১] তখনকার সময়ে জৈন্তা-অঞ্চলে কোরআনের সঠিক শিক্ষাপদ্ধতি তথা তাজবিদের কোন উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছিল না । তার প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে জৈন্তা অঞ্চলে তাজবিদের মাধ্যমে কোরআন শিক্ষার প্রচলন হয় । [১২] লোকমুখে প্রচলিত হয় একটি ইসলামি গান,

বাটইআইলের মাদ্রাসাতে উড়িল দীনের নিশান

মিসরী এলহান ও লেজহায় শিখাইন কোরআন ।” [১৩]

তশ্না উপাধি[সম্পাদনা]

ইবরাহীম তশ্না মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর কিছুদিন নিজেই শিক্ষকতা করেন । কিন্তু তার জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণা তখনো মেটেনি । কয়েকজন ছাত্রসহ ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আবার দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন । দিল্লী ছাতারি স্টেট-এ ওস্তাদ শায়খুল হাদিস মাওলানা নাজির হুছাইন মদনী (রাহঃ)-র খেদমতে আরও দু’বছর থেকে হাদিস-শাস্ত্রে উচ্চতর সনদপ্রাপ্ত হন । ওস্তাদ জ্ঞানের তীব্র পিপাসা দেখেই তাঁকে ‘তশ্না’ অর্থাৎ ‘পিপাসু’ উপাধি প্রদান করেন ।[১৪] তখন থেকে শাহ মোহাম্মদ ইবরাহীম আলী ‘ইবরাহীম তশ্না’ নামে অধিক পরিচিত হন । প্রাতিষ্ঠানিক-শিক্ষা সমাপ্তি পর তশ্না কিছুদিন হাকিমুল উম্মত হজরত মাওলানা আশরফ আলী থানবী (রাহঃ)-এর খেদমতে থেকে তার মুরিদ হন এবং ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে দেশে ফিরে মারিফাতের কঠোর সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন । [১৫]

ইসলামি জলসার প্রচলন[সম্পাদনা]

তশ্না ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন আসাম অঞ্চলের প্রথম ইসলামি জলসার আয়োজন করেন ‘ইমদাদুল উলুম, উমরগঞ্জ’ মাদ্রাসা ময়দান-এ । জলসার মাহফিল আয়োজন ছিল তশ্না-র এক বিরল ও ঐতিহাসিক সংস্কার আন্দোলন । [১৬] [১৭] এ জলসার প্রভাব ছিল ব্যাপক । সেসময় বৃহত্তর সিলেট ও আসাম অঞ্চলে ইসলামি জলসার কোন প্রচলন ছিল না, বিভিন্ন স্থানে পুঁথিভিত্তিক মাহফিল এবং বিভিন্ন মসজিদ ও খানকাহ্ কেন্দ্রিক ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হতো ।[১৮]

ইবরাহীম তশ্না কোরআন-হাদিস আমজনতার মধ্যে প্রচারের উদ্দেশে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩২৪ হিজরি সনে ইসলামি জলসার প্রবর্তনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন । এ আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলামি জ্ঞানের প্রচার-প্রসার হয় এবং এ আন্দোলন পরবর্তীকালে জৈন্তা অঞ্চলের সাধারণ জনতাকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হতে অনন্য ভূমিকা পালন করে । জলসায় উপস্থিতি ছিল ব্যাপক, লোকমুখে প্রচলিত একটি গানে আমরা এর একটি পরিসংখ্যান পাই; পঁচিশ-ত্রিশ হাজার লোক হয় এই মহফিলের মাঝে ইসলামের ডঙ্কা বাজে- হায় হায় রঙ্গে ঢঙ্গের ওয়াজ করে কত রঙ্গের উলামায় ॥ [১৯] তশ্না যখন মাহফিলে বক্তব্য দিতেন তখন লোকেরা তন্ময় হয়ে তার কথা শুনত| বক্তব্যের সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন, উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে বক্তব্য দিতেন এবং কোরআন হাদিস থেকে প্রাসঙ্গিক দলিল নিখুঁতভাবে পেশ করতেন, জলসায় স্বরচিত কবিতার মাধ্যমে জনগণকে ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদের দিকে আহ্বান করতেন । [২০]

খেলাফত আন্দোলন[সম্পাদনা]

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ‘খেলাফত আন্দোলন’ । এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা মুহাম্মদ আলী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখ সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ । [২১] এ সময় খেলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী এবং শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রাহঃ)-এর নির্দেশে ইবরাহীম তশ্না সিলেট ও আসামের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন । তার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় গ্রামেগঞ্জে অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি হয় । এসময় তার রচিত অনেক গান গ্রামেগঞ্জে মানুষের মুখে মুখে ছিল । [২২] ইবরাহীম তশ্না-র সাহস ও রাজনৈতিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে অল-ইন্ডিয়া খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হলে তার দিল্লি-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত হয় । [২৩] তশ্না যখন গ্রামেগঞ্জে অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছেন, তখন ব্রিটিশ সরকার তার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে এবং গ্রেফতার করে । সিলেট কেন্দীয় কারাগারে বন্দিবস্থায় তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হলে তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দেন- ‘বন্দী অবস্থায়ও আমরা স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি । এটা কখনও মনে করবেন না যে আমরা এখানে বৃথা সময় নষ্ট করছি । আমরা কখনও খ্রিস্টান সরকারের ভয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম ত্যাগ করতে পারি না । রূহ জগৎে আমরা করুণাময় আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছি যে, আমরা দ্বীনের জন্য ও ন্যায় বিচারের জন্য সংগ্রাম করবই করব ।”[২৪] দৈনিক সিলেটের ডাক-এর নির্বাহী সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিক বলেন, ‘ইবরাহীম তশ্না (রাহঃ) যখন সিলেট কারাগারে বন্দি তখন নামাজের সময় নামায ও আজানের কোন ব্যবস্থা ছিল না । ইবরাহীম তশ্না ও ড. মর্তুজা চৌধুরী-র আন্দোলনের ফলেই তখনকার জেল কর্তৃপক্ষ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় আজান ও নামাজের জন্য মসজিদের বন্দোবস্ত করতে বাধ্য হয় ।’[২৫] কারাগারে তার সাথে ছিলেন মাওলানা আবদুল মুছব্বির, বিপ্লবী ও অনলবর্ষী বক্তা ফজলুল হক সেলবর্ষী, ড. মর্তুজা চৌধুরী, মাওলানা সাখাওয়াতুল আম্বিয়া প্রমুখ নেতৃবৃন্দ । [২৬] ভারত উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি জামে মসজিদে উর্দু ভাষায় তার এক বক্তব্যে উপস্থিতিরা চমকে যান । তারা জানতে চায়, মাওলানা কোন এলাকার লোক । যখন জানলো তিনি বাংলার অধিবাসী, তখন ‘বাংলাদেশে এমন উর্দু বক্তা আছে?’- বলে বিস্ময় প্রকাশ করে ।[২৭] ‘কল্লোল’ পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে মাওলানা আবদুল আওয়াল লিখেন, খিলাফত আন্দোলনের লক্ষ্ণৌ সম্মেলনে সব নেতাই ব্রিটিশ পণ্য এবং ইংরেজি শিক্ষা বর্জনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখলেও দুরদর্শী তশ্না তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে-হারে ইংরেজি শিক্ষা বর্জন শুরু হয়েছে তাতে ইংরেজি শিক্ষিতরাই লাভবান হবে । তাই তিনি লক্ষ্ণৌ সম্মেলনে ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা আরবি, ফারসি, উর্দু এবং অন্যান্য ভাষায় শিক্ষা অর্জন করে থাকি । তদ্রূপ ইংরেজি একটি ভাষা মাত্র । ইংরেজদের সাথে আদর্শিক ভিন্নতা থাকতে পারে, তাই বলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা অপরাধ নয় । ইংরেজদের আচরণ অণুকরণ করাই অপরাধ ।’ এ বক্তব্যে তিনি দৃঢ় থাকায় সমকালীন অনেক আলেমের কাছে যদিও সমালোচিত হয়েছিলেন, তবু এতে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় । বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ করেন তার ভাতিজা পীর মাওলানা শফিকুল হক (রাহঃ)-কে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে । যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দু’শ বছরের গোলামির জিঞ্জির ভেঙে স্বাধীনতার সূর্য ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশে উদিত হয়েছিল ইবরাহীম তশ্না (রাহঃ) ছিলেন তাঁদের অগ্রসৈনিক ।[২৮]

কানাইঘাটের লড়াই[সম্পাদনা]

১৯২২ খ্রিস্টাব্দ । ব্রিটিশ-ভারতজুড়ে দুর্বার গতিতে চলছে খেলাফত আন্দোলন । আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে মার্চ কানাইঘাট মানসুরিয়া মাদ্রাসা-র জলসা উপলক্ষে জনসভা আহবান করা হয় । ইবরাহীম তশ্না-র সভাপতিত্বে জলসার কার্যক্রম শুরু হলে ব্রিটিশ প্রশাসন জলসা নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে । সুরমা ভেলির কমিশনার জে. ই. ওয়েবস্টার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন । ঘটনার প্রেক্ষাপটে জনতার মাঝে প্রচণ্ড উত্তেজনার সৃষ্টি করে । কমিশনার গুর্খা ও পুলিশবাহিনীকে গুলি বর্ষণের আদেশ প্রদান করলে ঘটনাস্থলেই শহিদ হন স্থানীয়: মৌলভী আব্দুস সালাম (গ্রাম: বায়মপুর), মো. মুসা মিয়া (গ্রাম: দুর্লভপুর), আব্দুল মজিদ (গ্রাম: নিজ বাউরবাগ), হাজী আজিজুর রহমান (গ্রাম: সরদারিপাড়া), ইয়াসিন মিয়া (গ্রাম: চটিগ্রাম)। এ ঘটনার জের ধরে কানাইঘাটের জনগণের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় । কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় নেতৃত্বে থাকা ইবরাহীম তশ্না (রহ.) সহ অনেককে ।[২৯]

তশ্নার গান ও ‘অগ্নিকুণ্ড’[সম্পাদনা]

অগ্নিকুণ্ড কাব্য মাওলানা ইবরাহীম আলী তশ্না-র অমর রচনা। এসব রচনায় উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক প্রকাশ ঘটেছে। [৩০] প্রখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক আব্দুল জলীল বিসমিল ইবরাহীম তশ্নার উর্দু ও ফারসিতে দু’শোরও বেশি শের এবং বাংলায় ৩৬০টি সংগীতের উল্লেখ করেছেন। অগ্নিকুণ্ড গ্রন্থের ৩৬০টি গানের থেকে ২৯৬ টি নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন’। [৩১]

বিভিন্ন সময় সংক্ষিপ্তাকারে তাঁর জীবনী ও কিছু সংখ্যক গান প্রকাশিত হয়েছিল। ইবরাহীম তশ্নার জীবনী ও অগ্নিকুুণ্ড গ্রন্থের কয়েকটি গান নিয়ে তাঁর ১ম ছেলে মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান (রহ.) ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ‘ইবরাহীম তশ্নার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও অগ্নিকুণ্ড বাউল’ শিরোনামে নামে ৩৪টি গানসহ একটি ছোট্ট সংকলন প্রকাশ করেন। তার ২য় ছেলে মাওলানা ওলিউর রহমান (রহ.) ‘অগ্নিকুন্ড বাউল ও শাহ শীতালং রচিত কতিপয় রাগ’ শিরোনামে ১৩৯৮ বাংলা, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে একটি বইয়ে তশ্না ও শীতালং শাহের ওপর তথ্যপূর্ণ আলোচনা করেন। [৩২]

মাওলানা ইবরাহীম তশ্না উর্দু ও ফার্সি ভাষায় গভীর পা-িত্য অর্জন করেন। লেখাপড়া তাঁর স্বভাবজাত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর রচনাতে উর্দু ফারসি শব্দের বিরল সমাহার ঘটে। বাংলা সাহিত্যের আধ্যাত্মিক রচয়িতাদের মধ্যে মাওলানা ইবরাহীম তশ্না (রহ.) ছিলেন অন্যতম সর্বোচ্চ একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁর রচনাবলি বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ এবং এতে রূপকের ব্যবহার অত্যধিক। [৩৩]

সঙ্গীত বৈচিত্র[সম্পাদনা]

ইবরাহীম তশ্না ইসলামী শিক্ষায় সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত, সুপরিচিত এক আলেম । তার সঙ্গীতও চমৎকারভাবে ইসলামী ভাব নিয়ন্ত্রিত । লোক গবেষক প্রফেসর নন্দলাল শর্মা তার গীতিগুচ্ছকে বিষয় বস্তু অনুযায়ী ১১টি ভাগে ভাগ করেছেনঃ

  1. আল্লাহ স্মরণ
  2. নবী স্মরণ
  3. ওলি স্মরণ
  4. মুর্শিদ স্মরণ
  5. ভক্তিমূলক
  6. ফকিরি তত্ত্ব
  7. নিগূঢ় তত্ত্ব
  8. মন:শিক্ষা
  9. দেহতত্ত্ব
  10. কামতত্ত্ব
  11. বিচ্ছেদ

মরমি কবি ইবরাহীম তশ্না বিচ্ছেদ পর্যায়ের গানই বেশি রচনা করেছেন[৩৪]

পরিবার[সম্পাদনা]

পারিবারিক জীবনে ছিলেন ছয় সন্তানের জনক । করেছেন চার বিয়ে । প্রথম ছেলে হলেন মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান, ২য় ছেলে মাওলানা ওলিউর রহমান, ৩য়া- মেয়ে আতিকা বেগম, ৪র্থ ছেলে ক্বারী আতিকুর রহমান, ৫ম ছেলে ক্বারী জমিলুর রহমান, ৬ষ্ঠ মেয়ের নাম জানা যায়নি ।[৩৫]

শেষ জীবন[সম্পাদনা]

এ মহান মনীষী ২সেপ্টেম্বর ১৯৩১খ্রিষ্টাব্দ, ১৩৩৮ বাংলা, ভাদ্র মাসের শেষ শুক্রবার ৬৩ বছর বয়সে কলেরা রোগে ইন্তেকাল করেন ।[৩৬] তশ্নার মৃত্যুতে বড়ভাই ইসমাঈল আলম আহত হৃদয়ের আহাজারি লিখেছেন একটি উর্দু কবিতার মাধ্যমে,

আফসোস! তোমার চিন্তায়—

হৃদয় আমার বিগলিত হলো— কী করি উপায়!

তোমার মৃত্যু—

ভাগ্য আর জীবনের ক্রন্দন— একাকার করে দিল!

তোমার বিচ্যুত আত্মার সাথে—

সাক্ষাৎ হবে জান্নাতে।[৩৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

উদ্ধৃতি[সম্পাদনা]

  1. জালালাবাদের শত মনীষা, রাগিব হোসেন চৌধুরী, দৈনিক সিলেটের ডাক, ১৮ই ফাল্গুন, ১৪০০ বাংলা
  2. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  3. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  4. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  5. সিলহেট মে উর্দু, আবদুল জলীল বিসমিল, করাচি, পাকিস্তান
  6. উদাসী তশনা, মাওলানা ওলিউর রহমান, প্রকাশ: ১৯৯২, সিলেট
  7. উদাসী তশনা, মাওলানা ওলিউর রহমান, প্রকাশ: ১৯৯২, সিলেট
  8. সিলেটের একশত এককজন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান
  9. সিলহেট মে উর্দু, আবদুল জলিল বিসলিম
  10. তশনা কাব্যে ইসলামী চেতনা, আবদুল মুকিত চৌধুরী, সিনিয়র এডিটর: দ্য নিউ নেশন
  11. উদাসী তশনা, মাওলানা ওলিউর রহমান, প্রকাশ: ১৯৯২, সিলেট
  12. জালালাবাদের ইতিকথা, দেওয়ান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, প্রকাশ: বাংলা একাডেমী, ঢাকা
  13. সিলেটের মাটি ও মানুষ, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান
  14. উদাসী তশনা, মাওলানা ওলিউর রহমান, প্রকাশ: ১৯৯২, সিলেট
  15. উদাসী তশনা, মাওলানা ওলিউর রহমান, প্রকাশ: ১৯৯২, সিলেট
  16. জালালাবাদের শত মনীষা, দৈনিক সিলেটের ডাক, ১৮ই ফাল্গুন ১৪০০ বাংলা, রাগিব হোসেন চৌধুরী
  17. সুফি সাধক ইবরাহীম তশনা, দৈনিক সিলেটের ডাক, সৈয়দ মোস্তফা কামাল
  18. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  19. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  20. সিলহেট মে উর্দু, আবদুল জলিল বিসমিল, করাচী, পাকিস্তান
  21. জালালাবাদের ইতিকথা, দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩
  22. উদাসী তশনা, মাওলানা ওলিউর রহমান, প্রকাশ: ১৯৯২, সিলেট
  23. স্মৃতির পাতায় জালালাবাদ- শহীদ চৌধুরী
  24. স্মৃতির পাতায় জালালাবাদ- শহীদ চৌধুরী
  25. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  26. সিলেটের একশত এককজন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান
  27. উদাসী তশ্না- মাওলানা ওলিউর রহমান
  28. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  29. সিলেটের একশত এককজন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান
  30. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  31. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  32. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  33. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  34. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  35. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  36. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯
  37. মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯

১ সিলেটের একশত এককজন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান ২ মরমি কবি ইবরাহীম আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, প্রকাশক : মদিনা পাবলিকিশান্স, একুশে বইমেলা ২০০৯

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]

  • উদাসী তশ্না- মাওলানা ওলিউর রহমান
  • স্মৃতির পাতায় জালালাবাদ- শহীদ চৌধুরী
  • ইসলামি বিশ্বকোষ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৭০০, ২য় সংস্করণ, জুন-২০০৬খ্রিঃ
  • সিলহেট মে উর্দু- আব্দুল জলীল বিসমিল
  • আযাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা- যুলফিকার আহমদ কিশমতী
  • মরমি কবি ইবরাহী আলী তশ্না ও অগ্নিকুণ্ড গানের সংকলন, সরওয়ার ফারুকী, মদিনা পাবলিকেশান্স ।
  • আশরাফ সিদ্দিকী: লোক সাহিত্য হয় খণ্ড, ঢাকা ১৯৯৫
  • গুরুসদয় দত্ত ও নির্মলেন্দু ভৌমিক সম্পাদিত : শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত, কলিকাতা ১৯৬৬
  • নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত: বাঁশির সুরে অঙ্গ জ্বলে, সিলেট ২০০৭, : মরমী কবি শিতালং শাহ, ঢাকা ২০০৫
  • মুহম্মদ এনামুল হক : সূফী প্রভাব, ঢাকা ২০০৬
  • সৈয়দ মোস্তফা কামাল : সিলেটের মরমী সাহিত্য, লন্ডন ১৯৯৮
  • হরেন্দ্র চন্দ্র পাল : পারস্য সাহিত্যের ইতিহাস, কলিকাতা ১৩৬০
  • সিলেটের একশত এককজন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]