ইবন ক্বুদামাহ্

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ইমাম ইবন ক্বুদামাহ্(Imam ibn Qudamah) মুতাওয়াসসিতুন(Mutawassitun) বা মধ্যবর্তী হাম্বলী(Hanbali) আলিমদের মধ্যে অন্যতম। মাযহাবে তিনি আল মুয়াফফাক্ আদ-দীন নামে পরিচিত। তিনি আল শাইখাইন দের একজন(অন্যজন আবুল বারাকাত মজদ উদ্দীন ইবন্ তাইমিয়্যাহ্{Imam Majd-uddin Ibn Taymiyyah)

ইমাম তাকিউদ্দীন ইবন্ তাইমিয়্যাহ্ এর পূর্বে তাকে শাইখুল ইসলাম হিসেবে অবহিত করা হতো।

তার বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

তিনি ছিলেন আবু মুহাম্মদ ‘আবদুল্লাহ্ ইবন আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন ক্বুদামাহ্ ইবন মিক্বদাম ইবন নাসির ইবন ‘আবদুল্লাহ্ ইবন হুদাইফা ইবন মুহাম্মদ ইবন ইয়া‘কুব ইবন আল ক্বাসিম ইবন ইবরাহীম ইবন ইসমাঈল ইবন ইয়াহইয়া ইবন মুহাম্মদ ইবন সালিম ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন ‘উমর ইবন আল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা।

জন্ম[সম্পাদনা]

তিনি ৫৪১ হিজরীর শা’বান মাসে জাম্মাঈল শহরে জন্মগ্রহন করেন। তিনি অত্যন্ত ধর্মনিষ্ট, জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত উচুঁবংশীয় পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।

তাঁর বাবা আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন ক্বুদামাহ্ রহিমাহুল্লাহ্ (জন্ম ৪৯১হি.) ছিলেন মসজিদে জাম্মাঈলের খতিব।তিনি তার জ্ঞান, যুহদ ইত্যাদির জন্য প্রসিদ্ধ একজন বিদগ্ধ জ্ঞানী ছিলেন।

৫৫৮ হিজরীতে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর(যখন শাইখুল ইসলামের বয়স ১৭) তাঁর দেখাশোনা এবং পড়ালেখার ভার তুলে নেন তাঁর বড় ভাই আবু ‘উমর মুহাম্মদ ইবন আহমদ আল মাকদীসি।

প্রাথমিক শিক্ষা,জ্ঞান অর্জন এবং এর জন্য বিভিন্ন স্থানে গমন[সম্পাদনা]

জীবনের প্রথম দশ বৎসর তিনি তার পরিবারের সাথে ছিলেন এবং ক্বুরআন হিফজ্ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তার পরিবারের সাথে দামেস্কে হিজরত করেন। এখানে তিনি ক্বুরআনের হিফজ সমাপ্ত করেন এবং বহু হাদীস মুখস্ত করেন।এরপর তিনি “মুখতাসার আল খিরাকী” মুখস্ত করেন। দামেস্কে ১০ বছর থাকার পর তিনি জ্ঞানের জন্য বিভিন্ন স্থানে গমন করেন।

৫৬১ হিজরীতে তিনি বাগদাদ গমন করেন, যা তখনকার জ্ঞানের শ্রেষ্ট শহর ছিলো।সেখানে তিনি তার মামাতো ভাই ‘আবদুল-গণী আল মাকদীসি রহিমাহুল্লাহ্ এর সঙ্গ দেন,তাঁর আগ্রহ ছিলো ফিকহ্-এ এবং তাঁর ভাইয়ের হাদীসে।

এরপর শাইখ ‘আবদুল ক্বাদীর আল জিলানী রহিমাহুল্লাহ্ (মৃ. ৫৬১হি.) ইবনুল বাত্তি রহিমাহুল্লাহ্,ইবনুল মানিয়্যি রহিমাহুল্লাহ্-এর অধীনে পড়াশোনা করেন।তিনি চার বছর বাগদাদ অবস্থান করেন।

পরবর্তীতে দামেস্কে এসে ৫৬৭ হিজরীতে পুনরায় বাগদাদে গমন করেন।সেখানে তিনি একবছর অবস্থান করেন।

৫৭৩ হিজরীতে তিনি হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমব করেন।সেখানে তিনি আল মুবারাক ইবন আল তাব্বাকাহ্ সহ আরও অনেক জ্ঞানীর সাক্ষাৎ লাভ করেন। এরপর ৫৭৪ হিজরীতে হজ্ব পালনের পর তিনি বাগদাদ ফেরৎ আসেন, পরবর্তীতে দামেস্কে চলে আসেন।

শাইখুল ইসলাম সম্বন্ধে বিভিন্ন জ্ঞানীর উক্তি[সম্পাদনা]

শাইখুল হাদীস আবু ‘আমর ইবন সালেহ্ রহিমাহুল্লাহ্ বলেন, “আমি আল-মুওয়াফ্ফাক-এর মতো কাউকে দেখিনি”

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ্ রহিমাহুল্লাহ্ বলেন,

“আল-আওযা’য়ী-এর পর আল মুওয়াফ্ফাক ব্যাতীত শামে ফিকহে অধিক জ্ঞান সম্পন্ন আর দ্বীনে অধিক জ্ঞান সম্পন্ন আর কেউ শামে প্রবেশ করেননি”

ইবন রজব হাম্বলী রহিমাহুল্লাহ্ বলেন,

“ফকিহ্,যাহিদ,ইমাম,শাইখুল ইসলাম…”

আল হাফিয ইবন কাসীর রহিমাহুল্লাহ্ বলেন,

“শাইখুল ইসলাম, ইমাম,বিদগ্ধ জ্ঞানী তার সময়ে এবং এরপরের বহু সময় ফিকহ্-এ তার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ ছিলো না”

ইবন রজব রহিমাহুল্লাহ্ বলেন,

“তিনি নস সাব্যস্ত করার আদেশ দিতেন আর আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ-এ যা এসেছে তার উপর ছেড়ে দিতে বলতেন,যেমন তিনি তাঁর বই “আস সিফাতে” বলেছেন, তা পরিবর্তন না করে, কাইফিয়্যাত(ধরণ প্রকৃতি বর্ণনা) না করে, অর্থ সরিয়ে না ফেলে;তাউয়িল দ্বারা অপব্যাখ্যা না করে, এবং তাদের অস্বীকার না করে।”

মৃত্যু[সম্পাদনা]

তিনি ৬২০ হিজরীর ঈদুল ফিতর্(শনিবার) এর দিন তার রবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।এসময় তার বয়স ছিল ৭৯।

তাঁর জনাযায় বহুসংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করেন। মৃত্যুর পরদিন তাকে ক্বাসিয়্যুনের পাহাড়ে দাফন করা হয়।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ[সম্পাদনা]

তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন:

১- আহমদ বিন ক্বুদামা আল মাক্বদীসি রহিমাহুল্লাহ্(৪৯১-৫৫৮হি.)(শাইখুল ইসলামের বাবা)

২- আবু ‘উমর মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবন ক্বুদামা আল মাক্বদীসি রহিমাহুল্লাহ্(৫২৮-৬০৭হি.)(শাইখুল ইসলামের ভাই)

৩- শাইখ ‘আবদুল ক্বাদির আল জীলানী রহিমাহুল্লাহ্(৪৭১-৫৬১হি.)

৪- ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ্

৫- আবুল ফাতহ্ ইবন ফিতইয়ান ইবন মাতর্ ইবনুল মানী রহিমাহুল্লাহ্(৫০১-৫৮৩হি.)

৬- আবুল ফাতহ্ ইবনুল বাত্তি রহিমাহুল্লাহ্ (৪৭৭-৫৬৪হি.)

৭- ফাখরুন নিসা শুহদাহ্ রহিমাহুল্লাহ্ (মুহাদ্দিস আবু নাসর আহমদ ইবন আল ফারাজ আদ-দীনাওয়ারী(মৃ. ৫৬৪হি.)

শাইখ বদর ইবন ‘আবদিল্লাহ্ আল বদর হাফিযাহুল্লাহ্ ইবন ক্বুদামাহ্-এর ঈসবাত সিফাত ‘উলু’ বইয়ের ভূমিকায় শাইখুল ইসলামের ৬৭ জন শিক্ষকের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, “এছাড়াও আরো অনেকেই ছিলেন”

ছাত্রবৃন্দ[সম্পাদনা]

তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন,

১- আল উদ্দাহ্ শরহ্ আল উমদাহ্ এর লিখক আল বাহ উল মাক্বদীসি রহিমাহুল্লাহ্(মৃ. ৬২৪);

২- দিয়া উদ দীন আল মাক্বদীসি রহিমাহুল্লাহ্(মৃ. ৬৪৩হি.);

৩- তাঁর ভাতুষ্পুত্র শামসউদ্দীন ইবন ক্বুদামাহ্ রহিমাহুল্লাহ্(মৃ. ৬৫৬হি.);

৪- আল মুখতাসার সহীহ মুসলিম মুখতাসার সুনান আবি দাঊদ,আত তারগীব ওয়াত্ তাহরীব-সহ অসংখ্য বইয়ের লিখক আল হাফিয আল মুনদীরী রহিমাহুল্লাহ্(মৃ. ৬৫৬হি.);

শাইখ বাদরুল বদর্ শাইখুল ইসলামের ৪৪ জন ছাত্রের কথা উল্লেখ করেন,এবং বলেন, “এছাড়া আরো অনেকে ছিলেন”।

শাইখের বইসমূহ[সম্পাদনা]

ড. ‘আলী ইবন সাঈদ আল ঘামিদী হাফিযাহুল্লাহ্ ৩৮টি বইয়ের নাম একত্র করেন। তন্মধ্যে রয়েছে,

- লুমা‘তুল ই‘তিক্বাদ আল হাদী ইলা সাবীল আর-রাশীদ

- দম্মাতুত তাওয়ীল

- ইসবাত সিফাতওল ঊলু’

- উমদাতুল ফিকহ্ ফি মাযহাবিল হাম্বলীয়্যাহ্

- আল মুক্বনি

- আল কাফি

- আল মুগনি

- রাউদাতুন নাযির(উসুল আল ফিকহ্)

- কিতাবুত তাওওয়াবীন প্রভৃতি

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]