বিষয়বস্তুতে চলুন

ইবন আল-বাওয়াব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ইবনে আল-বাওয়াব
ইবনে আল-বাওয়াবের এই লিপিটি হস্তাক্ষর লিপিতে লেখা কুরআনের সবচেয়ে প্রাচীন বিদ্যমান উদাহরণ, চেস্টার বিটি লাইব্রেরি
জন্ম৯৭৫ বা ১০০০
মৃত্যু১০২২ বা ১০৩১
পরিচিতির কারণইসলামি ক্যালিগ্রাফি
আন্দোলননাসখ, থুলুথ, মুহাক্কাক

ইবনে আল-বাওয়াব (আরবি: إِبْن ٱلْبَوَّاب), যিনি আলি ইবনে-হিলাল, আবুল-হাসান এবং ইবনে আল-সিতরি নামেও পরিচিত, ছিলেন বাগদাদে বসবাসকারী একজন আরবি ক্যালিগ্রাফার এবং পাণ্ডুলিপি অলঙ্করণকারী[] কুরআন প্রতিলিপিতে গোলাকার লিপি ব্যবহারের প্রবর্তক হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত।[] তিনি সম্ভবত ১০২২ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন।[]

ইবনে আল-বাওয়াব এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামের আক্ষরিক অর্থ হলো "দ্বাররক্ষীর পুত্র"। তিনি আইন ও ধর্মতত্ত্বে শিক্ষালাভ করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং বলা হয় যে তিনি মুখস্থ কুরআন তেলাওয়াত করতে পারতেন।[] তার জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণের অভাব রয়েছে, তবে এটি জানা যায় যে তিনি পাণ্ডুলিপি অলঙ্করণ শুরু করার আগে গৃহসজ্জার কাজ করতেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্যালিগ্রাফিতে মনোনিবেশ করেন। এছাড়া এটিও জানা যায় যে, ১০২২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পর তাকে বাগদাদে আহমদ ইবনে-হাম্বলের সমাধির কাছে সমাহিত করা হয়।[]

তিনি ছয়টি লিপিতেই পারদর্শী ছিলেন এবং সেগুলোকে আরও উন্নত করেন। তিনি জীবদ্দশাতেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং তার দীর্ঘ দাড়ির কারণে তাকে সহজেই চেনা যেত। তার ছাত্ররা ক্যালিগ্রাফির এই উন্নত শৈলীকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন।[]

ইবনে আল-বাওয়াব কুরআনের অলঙ্কৃত প্রারম্ভিক অংশ

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ইবনে আল-বাওয়াব কুরআনের মোট ৬৪টি প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে এমন ছয়টি পাণ্ডুলিপি টিকে আছে যেগুলোতে ক্যালিগ্রাফার হিসেবে ইবনে আল-বাওয়াবের নাম সম্বলিত কলোফন (পুস্তকের অন্তলিপি) রয়েছে। তার নামযুক্ত একমাত্র টিকে থাকা কুরআনটি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের চেস্টার বিটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে, যা অটোমান সুলতান প্রথম সেলিমের (১৪৭০–১৫১২) একটি উপহার ছিল। তার কাজের আরেকটি নিদর্শন হলো প্রাক-ইসলামি কবি সালামা ইবনে-জন্দালের কবিতা সংবলিত একটি বিলাসবহুল পাণ্ডুলিপি।[] ইবনে আল-বাওয়াব তার নিজ সময়ের একজন ওস্তাদ হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন; তার প্রতিষ্ঠিত ক্যালিগ্রাফি স্কুলটি তার মৃত্যুর দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর বাগদাদের মোঙ্গল পতন পর্যন্ত টিকে ছিল।[] তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল ইসলামি ক্যালিগ্রাফির 'আল-খত আল-মনসুব' (সুসামঞ্জস্যপূর্ণ লিপি) শৈলীর নিখুঁত রূপদান। তিনি রায়হানি, নাসখ, তাওকি এবং মুহাক্কাক সহ প্রাথমিক যুগের ক্যালিগ্রাফি শৈলীগুলোর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।[]

চেস্টার বিটি লাইব্রেরি কুরআন

[সম্পাদনা]
ইবনে আল-বাওয়াবের কুরআন; সূরা আল-ফাতিহা এবং সূরা আল-বাকারার শিরোনাম

চেস্টার বিটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ইবনে আল-বাওয়াবের হাতে লেখা একমাত্র টিকে থাকা কুরআনটি কাগজে তৈরি কুরআনের পাণ্ডুলিপির প্রাচীনতম উদাহরণ। পার্চমেন্ট বা ভেলুমের ওপর লেখা কুফিক বা আধা-কুফিক কুরআনের বদলে চেস্টার বিটির এই পাণ্ডুলিপিটি সম্পূর্ণ কাগজে এবং গোলাকার প্রবহমান লিপিতে লেখা হয়েছে।[] যদিও রেশম পথের মাধ্যমে নবম শতাব্দীতেই বাগদাদে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি পৌঁছেছিল, তবে ইবনে আল-বাওয়াবের পাণ্ডুলিপির সূক্ষ্ম ও মসৃণ গঠন নির্দেশ করে যে, আল্লাহর বাণী লিপিবদ্ধ করার উপযোগী উন্নতমানের কাগজের উদ্ভাবনই পার্চমেন্ট থেকে কাগজে উত্তরণের অন্যতম কারণ ছিল।[]

পাণ্ডুলিপিটিতে ২৮৬টি ফোলিও বা পৃষ্ঠা রয়েছে এবং এর মূল মাপ ছিল ১৪x১৯ সেমি। এর পাঠ্যগুলো স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ উভয় ক্ষেত্রেই একই রঙের কালিতে হরকতযুক্ত ছিল। এর চমৎকার অলঙ্করণের জন্য এটি বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে মূল পাতায় প্রথাগত নীল, সোনালি এবং কালচে বাদামী রঙ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রারম্ভিক ও শেষ পৃষ্ঠাগুলোতে বাদামী, সাদা, লাল ও সবুজ রঙের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। ইবনে আল-বাওয়াবের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে এটি আশ্চর্যজনক নয় যে, অলঙ্করণের কাজটি তিনি নিজেই করেছিলেন। কিছু অংশে ব্রাশের পরিবর্তে রিড পেন (খাগের কলম) এবং লেখার কালির একই রকম ব্যবহার থেকে এটি স্পষ্ট হয়।[]

কাগজ ব্যবহারের পাশাপাশি চেস্টার বিটির পাণ্ডুলিপিটি কুরআনের ক্যালিগ্রাফিতে এমন কিছু উদ্ভাবনের জন্য উল্লেখযোগ্য যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই শিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আগের পার্চমেন্ট বা ভেলুম পাণ্ডুলিপিগুলোর মতো এটি আনুভূমিক নয়, বরং লম্বালম্বিভাবে তৈরি করা হয়েছিল।[১০] প্রথা ভেঙে ইবনে আল-বাওয়াব এখানে কুফিক লিপির পরিবর্তে অনেক বেশি পাঠযোগ্য প্রবহমান লিপি ব্যবহার করেছেন। মূল পাঠ্যে নাসখ লিপি ব্যবহৃত হলেও প্রারম্ভিক পৃষ্ঠা, সূরার শিরোনাম এবং আয়াত গণনার পরিসংখ্যান সংবলিত পৃষ্ঠাগুলোতে থুলুথ লিপি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান পৃষ্ঠাগুলোতে প্রতিটি সূরার মোট শব্দ ও অক্ষর সংখ্যা, পুরো পাণ্ডুলিপির শব্দ সংখ্যা, এমনকি নকতাযুক্ত ও নকতাবিহীন অক্ষরের সংখ্যার মতো অতিরিক্ত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।[১১]

ইবনে আল-বাওয়াব ফাঁকা স্থান বা স্পেসিং ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দুটি নতুন শৈলী গ্রহণ করেছিলেন। যেখানে আগের ক্যালিগ্রাফাররা বিসমিল্লাহতে সমান্তরাল ফাঁকা স্থান রাখতেন, সেখানে ইবনে আল-বাওয়াব অপ্রতিসাম্য ব্যবহার করেছেন; তিনি একটি অক্ষরকে দীর্ঘায়িত করে শব্দের মাঝে বড় ফাঁক তৈরি করেছেন যা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং একটি নতুন অংশকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে। আয়াতের ক্ষেত্রে তিনি দুটি আয়াতের মাঝে কোনো ফাঁকা স্থান রাখেননি, বরং নীল বিন্দুর ছোট ত্রিভুজাকার গুচ্ছ দিয়ে সেগুলো চিহ্নিত করেছেন। তবে প্রতি পঞ্চম ও দশম আয়াতের ক্ষেত্রে ফাঁকা স্থান রাখা হয়েছে যা প্রথাগত সোনালি চিহ্ন দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছে।[১২]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Yasser Tabbaa's The Transformation of Islamic Art During the Sunni Revival, Taylor & Francis, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আইএসবিএন ৯৭৮০৪২৯৯৩৯৮৯১
  2. Blair, Sheila. (২০০৬)। Islamic calligraphy। Edinburgh: Edinburgh University Press। পৃ. ১৬০। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৪৮৬-১২১২-৩ওসিএলসি 56651142
  3. "Ibn al-Bawwāb brief bio"। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১২
  4. 1 2 3 "Ibn al-Bawwab" [Biography], Encyclopedia Britannica, Online:
  5. 1 2 Blair, Sheila. (২০০৬)। Islamic calligraphy। Edinburgh: Edinburgh University Press। পৃ. ১৬০–১৬১। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৪৮৬-১২১২-৩ওসিএলসি 56651142
  6. Blair, Sheila. (২০০৬)। Islamic calligraphy। Edinburgh: Edinburgh University Press। পৃ. ১৬২–১৬৮। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৪৮৬-১২১২-৩ওসিএলসি 56651142
  7. Tabbaa, Yasser (১৯৯১)। "The Transformation of Arabic Writing: Part I, Qur'anic Calligraphy"। Ars Orientalis২১: ১২৭।
  8. Bloom, Jonathan (Jonathan M.) (২০০১)। Paper before print : the history and impact of paper in the Islamic world। New Haven: Yale University Press। পৃ. ৫১আইএসবিএন ০-৩০০-০৮৯৫৫-৪ওসিএলসি 46472021
  9. Blair, Sheila. (২০০৬)। Islamic calligraphy। Edinburgh: Edinburgh University Press। পৃ. ১৬২–১৬৫। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৪৮৬-১২১২-৩ওসিএলসি 56651142
  10. Blair, Sheila S. (২০০৮)। "Transcribing God's Word: Qur'an Codices in Context"Journal of Qur'anic Studies১০ (1): ৮২। ডিওআই:10.3366/e1465359109000242আইএসএসএন 1465-3591
  11. Tabbaa, Yasser (১৯৯১)। "The Transformation of Arabic Writing: Part I, Qur'anic Calligraphy"। Ars Orientalis২১: ১৩০–১৩৮।
  12. Blair, Sheila. (২০০৬)। Islamic calligraphy। Edinburgh: Edinburgh University Press। পৃ. ১৬৪। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৪৮৬-১২১২-৩ওসিএলসি 56651142