ইবনে আল-রাওয়ান্দি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ইবনে আল-রাওয়ান্দি
জন্ম৮২৭ সিই, তাহিরিদ রাজবংশ
মৃত্যু৯১১ সিউ (বয়স ৮৪), সাফফারিদ রাজবংশ
পেশালেখক

ইবনে আল-রাওয়ান্দি (৮২৭ খ্রি.-৯১১খ্রি.) একজন বিখ্যাত নাস্তিক দার্শনিক। তার পুরো নাম: আবু আল-হাসান আহমদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে ইসহাক আল-রাওয়ান্দি। তিনি ইসলামের প্রারম্ভিক দিকের সংশয়বাদী ও ধর্মসমালোচক। শুরুর দিকে তিনি ছিলেন একজন মুতাযিলা পণ্ডিত, কিন্তু পরে মুতাযিলা মতবাদ বর্জন করেন। ইসলাম ও প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম [১] পরিত্যাগ করে মুক্তচিন্তক হওয়ার আগে তিনি কিছু সময়ের জন্য শিয়া ইসলামের সংস্পর্শে আসেন। মৃত্যুর পর তার কোনো বই টিকে না থাকলেও সমালোচক ও সমর্থক মুসলিম লেখকদের লেখনিতে তার চিন্তা-ভাবনার কথাবার্তা লিপিবদ্ধ রয়েছে।

জীবন[সম্পাদনা]

ইবনে আল-রাওয়ান্দি ৮১৫ হিজরিতে কাশানের রাওয়ান্দে (বর্তমানে এটি কেন্দ্রীয় ইরানে অবস্থিত) জন্ম গ্রহণ করেন। কেউ-কেউ বলেন, ইবনে আল-রাওয়ান্দি বৃহত্তর খোরাসানের মার্ভ-রুদে (বর্তমানে এটি আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত) জন্মগ্রহণ করেন। মিশরি পণ্ডিত আবদুর রহমান বাদাঈ’র মতে, আল-রাওয়ান্দি আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের সময়ে[২] বসরায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন ইহুদি পণ্ডিত, পরে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন এবং কীভাবে তালমুদ[৩] খণ্ডন করতে হয় মুসলমানদের তা শিক্ষা দিয়েছেন। আল-রাওয়ান্দি নাস্তিকতার কারণে ইসলাম পরিত্যাগ করেন এবং পিতার কাছ থেকে লব্ধ ইসলামি জ্ঞান ব্যবহার করে কুরআনের ভ্রান্তি খুঁজে বেড়িয়েছেন।

তিনি বাগদাদের মুতাযিলা সম্প্রদায়ের সাথে যোগ দেন। সেখানে দিনে-দিনে প্রসিদ্ধি লাভ করলে তাকে মুতাযিলা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। তিনি শিয়া-মুসলিম ও অমুসলিমদের (মেনিকিয়, ইহুদি ও খ্রিস্টান) সাথে ঘনিষ্ঠ আঁতাত গড়ে তুলেছেন। তিনি মেনিকিয় যিনদিকের অণুসারী হয়ে পড়েন এবং প্রত্যাদিষ্ট ধর্মকে সমালোচনা করে কিছু গ্রন্থ লিখেছেন।

দর্শন[সম্পাদনা]

মুসলমানরা সাধারণত একমত যে, রাওয়ান্দি ছিলেন বস্তুত একজন স্বধর্মত্যাগী, কিন্তু তার এই স্বধর্মত্যাগের প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো মতৈক্য নেই। কেউ-কেউ শিয়াবাদের সাথে সংশ্রবের মধ্যে তার স্বধর্মত্যাগের মূল কারণ খুঁজে পান এবং তাকে মুতাযিলাচ্যুত একজন বিশৃঙ্খল লোক মনে করেন। কেউ-কেউ তাকে একজন আরিস্ততলিয় দার্শনিক হিসেবে বিবেচনা করেন। আবার কেউ-কেউ তাকে একজন কট্টর নাস্তিক হিসেবে দেখেন এবং কেউ-কেউ বলছেন, রাওয়ান্দি ইসলামি রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার প্রতি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। একই সময়ে, পণ্ডিতরা কিছু মুসলিম উৎসে ইবনে আল রাওয়ান্দির অধিক ইতিবাচক দৃষ্টিভাঙির হিসাব দিতে চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে জোসেফ ভ্যান এশ (Josef van Ess) সকল বিরুদ্ধ তথ্যকে সমন্বয় করা যায় এমন একটা মৌলিক ব্যাখ্যার প্রস্তাব রেখেছেন। ভ্যান এশ মন্তব্য করেন যে, যে উৎসগুলো ইবনে আল-রাওয়ান্দিকে স্বধর্মত্যাগী হিসেবে বর্ণনা করে, সেগুলো ইরাকের, প্রধানত মুতাযিলা ও এ-সম্প্রদায়ের শাখা হতে প্রাপ্ত, যেখানে প্রতীচ্য পাঠগুলোতে তাকে ইতিবাচক আলো হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ-পার্থক্যের ব্যাখ্যা হিসেবে ভ্যান এশ ইরান ও ইরাকের “দুই পৃথক বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সংঘর্ষ” (a collision of two different intellectual traditions)-এর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, বাগদাদ ছাড়ার পরেই রাওয়ান্দির বদনাম রটেছে। “তার অণুপস্থিতিতে বাগদাদে সহকর্মীরা ফায়দা লোটার স্বার্থে তাকে কালো মিথ হিসেবে হাজির করলো” (his colleagues in Baghdad ... profiting from his absence ... could create a black legend.)। অন্য কথায়, ভ্যান এশ বিশ্বাস করেন যে, যদিও ইবনে আল-রাওয়ান্দি স্বীকৃতভাবে অদ্ভুত ও বিসংবাদিত ছিলেন, তিনি মোটেই ধর্মত্যাগী নন। তিনি যেকোনো আধ্যাত্মিক বা প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ‘কিতাব আল-যুমুরুদ’ ও ‘আবাথ আল-হিকমা’ (স্বর্গীয় প্রজ্ঞার অপ্রয়োজনীয়তা)গ্রন্থের পাশাপাশি অন্যান্য লেখার উদ্ধৃতিও এটি প্রমাণ করে।

কিতাব আল-যুমুরুদ[সম্পাদনা]

বুদ্ধিমত্তার প্রাধান্য[সম্পাদনা]

খোদা বা ঈশ্বর মানুষকে বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন, যার দ্বারা তারা ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে। নবিরা যা প্রচার করেছেন তা যদি বুদ্ধিমত্তাকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তারা (নবিরা) অনাবশ্যক হয়ে পড়েন। যদি এটি বুদ্ধিমত্তার বিরোধী হয়, তবে তাদের কথা শোনা কারো উচিত নয়। এই বুদ্ধিমত্তার বিবিধ প্রকাশের আলোচনাটি মানব-বুদ্ধিমত্তার যাথার্থ্যের দাবির সাথে সম্পর্কিত। মানব-শিশু পিতা-মাতার কাছ থেকে বলতে শিখে- ব্যাপারটি প্রজন্ম-প্রজন্ম চলছে। এখানেই আসল ব্যাপারটি নিহিত। ইবনে আল-রাওয়ান্দি এখানে সম্ভবত মানুষের কথা (Human speech) স্বাভাবিক (প্রাকৃতিক) নাকি রক্ষণশীল (রীতিসিদ্ধ)- এই প্রশ্নটি করতে চেয়েছেন। মনে হচ্ছে তিনি ‘ইলহাম’-এর (বিশেষ করে প্রাকৃতিক-সহজাত জ্ঞান) সমাধানের পক্ষে রয়েছেন, যদিও ইলহাম শব্দটি বইটিতে অণুল্লেখিত। বিজ্ঞানগুলোকেও বুদ্ধিমত্তার যাথার্থ্যের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। তার মতে, লোকজন আকাশ পরিদর্শন করে জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশ ঘটিয়েছে। কিভাবে আকাশ পরিদর্শন করতে হয় তা শেখার জন্যে তাদের কোনো নবির প্রয়োজন হয়নি। এমনকি কিভাবে বীণাজাতিয় বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে হয় তা শেখার জন্যও তাদের নবির প্রয়োজন হয়নি। ধারণা করা অযৌক্তিক যে, ভেড়ার অন্ত্র (যখন এটি একখণ্ড কাঠের উপর শুকানো হতো এবং প্রসারিত করা হতো) আনন্দদায়ক সুর তৈরি করতে পারে- ব্যাপারটি নবির প্রত্যাদেশ (Prophetic revelation) ছাড়া লোকজনের শেখা হতো না। এইসব দক্ষতা মানুষের সহজাত বুদ্ধিমত্তা, বিবেচনা ও পর্যবেক্ষণক্ষমতার পরিশ্রমলব্ধ প্রয়োগ দ্বারা অর্জিত হয়।

মুসলিম ঐতিহ্য[সম্পাদনা]

যুমুরুদ অণুসারে, অলৌকিক ঘটনা সংশ্লিষ্ট ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে প্রশ্নাকুল। একটা কল্পিত অলৌকিক ঘটনা সংঘটনের সময় নবির কর্মকাণ্ড দেখার জন্য কেবল কিছু সংখ্যক লোকই তার কাছে আসতে পারতো। এই কিছু সংখ্যক লোকের দেয়া তথ্য বিশ্বাস করা যায় না, কেননা তারা মিথ্যা বলার ষড়যন্ত্রও করতে পারে। মুসলিম ঐতিহ্য এভাবে বহু কর্তৃত্বের (খবর মুতাওয়াতির) থোড়াই কেয়ার করে একক কর্তৃত্বের (খবর আল-আহাদ) উপর ভিত্তিশীল দুর্বল ঐতিহ্যের শ্রেণিতে নেমে এসেছে। এই ধর্মীয় ঐতিহ্যকে ষড়যন্ত্র দ্বারা কর্তৃত্বায়িত মিথ্যা বলা যায়। যুমুরুদে আছে, মুহম্মদের নিজস্ব পূর্বানুমান (wad) ও নিয়মই (qanun) ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে হাজির করে। ইহুদি ও খ্রিস্টানরা যিশু সত্যিই মৃত্যুবরণ করেছেন বলে দাবি করে, কিন্তু কুরআন তাদের বিরোধিতা করছে।

ইবনে আল রাওয়ান্দি সুনির্দিষ্ট মুসলিম ঐতিহ্যের কথাও বলেছেন এবং দেখান যে, এগুলোও হাস্যকর। মুহম্মদকে সাহায্য করতে চতুর্দিক থেকে ঘিরে থাকা যে ফেরেস্তার কথা প্রচলিত রয়েছে, তা অযৌক্তিক। কারণ, এটা দ্বারা বুঝানো হয়, বদরযুদ্ধের ফেরেস্তারা দুর্বল-জীব ছিলেন, তারা নবির কেবল ১৭ জন শত্রুকে বধ করতে সক্ষম হয়েছেন। যদি ফেরেস্তারা বদরযুদ্ধে মুহম্মদকে সাহায্য করেই থাকেন, উহুদের যুদ্ধে তারা কোথায় ছিলেন, কখন তাদের সাহায্য খুবই প্রয়োজন?

মুসলিম রীতিনীতি[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. A History of Natural Philosophy By Edward Grant
  2. Min Tareekh Al-Ilhad Fi Al-Islam, From the History of Atheism in Islam by Abd-El Rahman Badawi pages: 87-206, Second edition 1991, Sinaa Lil Nasher Egypt (Arabic)
  3. Routledge Encyclopedia of Philosophy: Genealogy to Iqbal Page 636

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]