বিষয়বস্তুতে চলুন

ইদ্রিস ইমাদ আল-দীন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ইদ্রিস ইমাদ আল-দীন
إدريس عماد الدين
২০১১ সালে শিবামে ইদ্রিস ইমাদ আল-দীনের মাজার
দাঈ আল-মুতলাক
অফিসে
১৪২৮–১৪৬৮
পূর্বসূরীআলি শামস আল-দীন দ্বিতীয়
উত্তরসূরীআল-হাসান বদর আল-দীন দ্বিতীয়
ব্যক্তিগত তথ্য
জন্ম১৩৯২
মৃত্যু১০ জুন ১৪৬৮
সমাধিস্থলশিবাম, ইয়েমেন
ধর্মশিয়া ইসলাম
পিতামাতা
সম্প্রদায়তাইয়িবি ইসমাইলি ধর্ম

ইদ্রিস ইমাদ আল-দীন ইবনে আল-হাসান আল-কুরাশি (আরবি: إدريس عماد الدين بن الحسن القرشي; ১৩৯২ – ১০ জুন ১৪৬৮) ছিলেন ১৪২৮ থেকে ১৪৬৮ সাল পর্যন্ত তাইয়িবি ইসমাইলিদের ১৯তম দাঈ আল-মুতলাক। ১৫শ শতাব্দীর ইয়েমেনের একজন প্রধান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার পাশাপাশি একজন বিশিষ্ট ধর্মতত্ত্ববিদ হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। ইদ্রিস ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যযুগীয় ইসমাইলি ইতিহাসবিদ, যার কাজ ফাতেমীয় খিলাফত এবং ইয়েমেনের ইসমাইলি সম্প্রদায়ের ইতিহাসের জন্য মৌলিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৩৯২ সালে উত্তর ইয়েমেনের শিবামে জন্মগ্রহণকারী ইদ্রিস ছিলেন কুরাইশ গোত্রের বানু আল-ওয়ালিদ আল-আনফ পরিবারের বংশধর। এই পরিবারটি ১৩শ শতাব্দীর শুরু থেকে ইয়েমেনে তাইয়িবি ইসমাইলিদের প্রধান ধর্মপ্রচারক বা দাঈ আল-মুতলাক সরবরাহ করে আসছিল।[][] দাঈ আল-মুতলাক (অবাধ ধর্মপ্রচারক) উপাধিটি গুপ্ত ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে তাইয়িবি সম্প্রদায়ের কার্যত নেতার অবস্থান নির্দেশ করত।[][] এই কর্তৃত্ব কেবল ইয়েমেনে নয়, ভারতের তাইয়িবি সম্প্রদায়ের ওপরও বিস্তৃত ছিল।[] ইদ্রিসের দাদা আবদুল্লাহ ফখর আল-দীন ছিলেন ষোড়শ দাঈ আল-মুতলাক, যার স্থলাভিষিক্ত হন ইদ্রিসের পিতা আল-হাসান বদর আল-দীন প্রথম এবং ১৪১৮ সালে তার মৃত্যুর পর তার চাচা আলি শামস আল-দীন দ্বিতীয় স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি ১৪২৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।[]

যৌবনে ইদ্রিস পুঙ্খানুপুঙ্খ শিক্ষা লাভ করেন এবং তাইয়িবি সম্প্রদায়ের পরিচালনায় সক্রিয় ছিলেন। ১৪২৮ সালে যখন তার চাচা মারা যান, তখন তিনি ১৯তম দাঈ আল-মুতলাক হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং আমৃত্যু এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।[] তার প্রথম বাসস্থান ছিল হারাজ দুর্গ।[] তার পূর্বসূরিদের মতো তিনিও সানার জাইদি ইমামদের বিরুদ্ধে জাবিদের রাসুলি রাজবংশের সাথে মৈত্রী করেন। রাসুলি সুলতান আল-মালিক আল-জাহিরের সাথে মিলে তিনি বারবার জাইদি ইমাম আল-মানসুর আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং জাইদিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে অসংখ্য দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন।[] ১৪৫৪ সালে যখন রাসুলি রাজবংশের স্থলাভিষিক্ত হয় তাহিরি রাজবংশ, তখন ইদ্রিস জাবিদের নতুন তাহিরি শাসকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন।[] ১৪৩৬/৭ সালে একটি ভয়াবহ প্লেগ মহামারীতে বেশ কয়েকজন আত্মীয়কে হারানোর পর ইদ্রিস তার জন্মস্থান শিবামে ফিরে আসেন। ইদ্রিসের নেতৃত্বের সময়ই সুন্নি বোহরা সম্প্রদায় দাউদি বোহরা থেকে আলাদা হয়ে যায়।[]

ইদ্রিস পশ্চিম ভারতের ধর্মপ্রচার কার্যক্রমের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং গুজরাটে তাইয়িবি ধর্মপ্রচারকদের সাফল্যে অবদান রেখেছিলেন।[] পরবর্তীকালের ভারতীয় তাইয়িবি পণ্ডিতদের মতে, ইদ্রিসই প্রথম তাইয়িবি ধর্মপ্রচার আন্দোলনের কেন্দ্র ইয়েমেন থেকে ভারতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেছিলেন, যদিও তার মৃত্যুর এক শতাব্দী পর এই স্থানান্তর বাস্তবায়িত হয়েছিল।[] তার মৃত্যুর পর তার পুত্র এবং নাতিরা ধারাবাহিকভাবে দাঈ আল-মুতলাক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৩তম দাঈ আল-মুতলাক মুহাম্মদ ইজ্জ আল-দীন প্রথম ছিলেন তার বংশের শেষ প্রতিনিধি এবং তার মৃত্যুর পর প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইউসুফ ইবনে সুলায়মান তার স্থলাভিষিক্ত হন।[][]

২০১০ সালে দাউদি বোহরা শাখার ৫২তম দাঈ আল-মুতলাক শিবামে ইদ্রিসের মাজারটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং এটি ইয়েমেন ও ভারতের বোহরাদের জন্য একটি জনপ্রিয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।[]

টেমপ্লেট:Ismailism ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তব্যের পাশাপাশি ইদ্রিস একজন নিবেদিতপ্রাণ পণ্ডিত এবং প্রখ্যাত লেখক ছিলেন। তার বইগুলো তাইয়িবি দাওয়াহর মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।[] ১৬শ শতাব্দীর তাইয়িবি পণ্ডিত হাসান ইবনে নুহ ইদ্রিসের এগারোটি গ্রন্থের তালিকা দিয়েছেন। আধুনিক ইতিহাসবিদ আয়মান ফুয়াদ সাইয়্যিদ এগারোটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলোর লেখক ইদ্রিস বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।[]

ঐতিহাসিক কাজ

[সম্পাদনা]

তার প্রধান কাজ হলো সাত খণ্ডের উয়ুন আল-আখবার ("ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের প্রবহমান ঝরনা"), যা মুহাম্মদ থেকে শুরু করে ২১ জন ইসমাইলি ইমাম এবং ফাতেমীয় খিলাফতের সমাপ্তি ও ইয়েমেনে সুলায়হিদ রাজবংশের অধীনে তাইয়িবি দাওয়াহর শুরু পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাস।[][] এতে ইদ্রিস বিপুল সংখ্যক ইসমাইলি ও অ-ইসমাইলি উৎস ব্যবহার করেছেন, যার কিছু এখন বিলুপ্ত।[] মধ্যযুগে একজন ইসমাইলি লেখকের লেখা একমাত্র সাধারণ ইসমাইলি ইতিহাস হিসেবে এই কাজ তাকে "সবচেয়ে বিখ্যাত ইসমাইলি ইতিহাসবিদ" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।[]

উয়ুন আল-আখবার বেশ কয়েকটি সমালোচনামূলক সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে:

  • ফাতেমীয়দের ওপর আলোকপাত করা ৫ম খণ্ড, ১৯৮৫ সালে বৈরুত থেকে প্রকাশিত।
  • সাতটি খণ্ডই ২০০৭-২০১০ সালে লন্ডন ও দামেস্ক থেকে প্রকাশিত।

তার ঐতিহাসিক কাজের মধ্যে আরও রয়েছে দুই খণ্ডের নুজহাত আল-আফকার এবং এর ধারাবাহিকতা রাওদাত আল-আখবার, যা মূলত সুলায়হিদ রাজবংশের পতনের পর থেকে ইদ্রিসের নিজ সময় পর্যন্ত ইয়েমেনের তাইয়িবি সম্প্রদায়ের ওপর আলোকপাত করে।[][]

ধর্মতাত্ত্বিক কাজ

[সম্পাদনা]

তার ধর্মতাত্ত্বিক কাজের মধ্যে জাহর আল-মানি অন্যতম, যা তাইয়িবি গূঢ় তত্ত্বের (হাকায়িক) ওপর একটি গ্রন্থ। ১১শ শতাব্দীর দাঈ হামিদ আল-দীন আল-কিরমানির আধিভৌতিক ধারণাগুলো ইদ্রিসকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।[] এছাড়াও তিনি ছয়টি ছোট ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে রমজানের পূর্ণ রোজা পালন এবং জাইদি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ খণ্ডন সংক্রান্ত কাজ রয়েছে।[][]

সবশেষে, তিনি একটি দিওয়ানের রচয়িতা ছিলেন, যেখানে তিনি ফাতেমীয় যুগের কবি আল-মুয়াইয়্যাদ আল-শিরাজির অনুকরণ করেছেন। তার কবিতার বিষয়বস্তু ছিল প্রধানত ধর্মীয় এবং তাতে মুহাম্মদ, আলি ও তার পরিবারের প্রশংসা এবং ইসমাইলি ইমামদের বন্দনা করা হয়েছে।[]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 Qutbuddin 2018
  2. 1 2 3 4 5 6 Daftary 2015, পৃ. 235।
  3. Daftary 2007, পৃ. 238–239, 264।
  4. 1 2 3 Daftary 2007, পৃ. 268।
  5. Daftary 2007, পৃ. 268–269।
  6. Daftary 2007, পৃ. 5।
  • টেমপ্লেট:Daftary-The Ismailis
  • Daftary, Farhad (২০১৫)। "Idris 'Imad al-Din, Sayyid"। Leaman, Oliver (সম্পাদক)। The Biographical Encyclopedia of Islamic Philosophy। Bloomsbury Academic। পৃ. ২৩৪–২৩৬। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৭২৫-৬৯৪৪-৮
  • Jiwa, Shainool (২০১৩)। The Founder of Cairo: The Fatimid Imam-Caliph al-Mu'izz and his Era। London and New York: I.B. Tauris। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৫৭৭-২২২৩-২
  • Qutbuddin, Tahera (২০১৮)। "Idrīs ʿImād al-Dīn"। Fleet, Kate; Krämer, Gudrun; Matringe, Denis; Nawas, John; Rowson, Everett (সম্পাদকগণ)। Encyclopaedia of Islam, THREE। Brill Online। ডিওআই:10.1163/1573-3912_ei3_COM_32368আইএসএসএন 1873-9830
  • Sayyid, Ayman Fuʾād; Walker, Paul E.; Pomerantz, Maurice A. (২০০২)। The Fatimids and their Successors in Yaman: The History of an Islamic Community। London and New York: I.B. Tauris। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৫৭৭-১২৫৮-৫
শিয়া ইসলামী পদবীসমূহ
ইদ্রিস ইমাদ আল-দীন
জন্ম: ১৩৯২ মৃত্যু: ১০ জুন ১৪৬৮
পূর্বসূরী
আলি শামস আল-দীন দ্বিতীয়
দাঈ আল-মুতলাক (তাইয়িবি ইসমাইলি ধর্ম)
১৪২৮–১৪৬৮
উত্তরসূরী
আল-হাসান বদর আল-দীন দ্বিতীয়

টেমপ্লেট:Dā'ī al-Mutlaq টেমপ্লেট:Islamic theology