বিষয়বস্তুতে চলুন

আহমেদ বিন খলিল আল-খুঈ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শামসুদ্দীন আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে খালিল ইবনে সা‘দাহ আল-মাহলাবি আল-খুই [] (১১৮৭ - ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন খ্যাতিমান মুসলিম পণ্ডিত, যুক্তিবিদ (কালামবিদ), দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ ও ইসলামী বিচারক। তিনি ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি মধ্যযুগের সেলজুক শাসনামলে আজারবাইজানের খুই শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং খুই ও খোরাসানে প্রথাগত ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়েছে। তিনি বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসির ফখরুদ্দীন আল-রাজির ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসির রচনা করেন, যার নাম হল তাতিম্মাহ তাফসির আল-কুরআন (আরবি: تتمة تفسير القرآن,কুরআনের তাফসিরের পরিশিষ্ট)। এটি তাঁর শাইখের রচনার পরিপূরক ছিল। কারণ ইমাম রাজি তাঁর লিখিত তাফসিরগ্রন্থ পরিপূর্ণ করতে পারেননি। এছাড়াও তিনি দর্শন, ফিকহ, উসূলুল ফিকহ, ব্যাকরণ, ছন্দশাস্ত্র ও আত্মার প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেছেন। [][]

জীবন ও শিক্ষা

[সম্পাদনা]

তার জন্ম নাম ছিল আহমদ ইবনে খালিল ইবনে সা‘দা ইবনে জাফর ইবনে ঈসা। তবে তিনি শামসুদ্দীন আল-মাহলাবি আল-খুঈ নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি ৫৮৩ হিজরি মোতাবেক ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৃহত্তর খোরাসান অঞ্চলের অন্তর্গত বর্তমান পশ্চিম আজারবাইজানের খুই প্রদেশে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা নিজ শহর খুইতে সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি খোরাসান ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি অনেক খ্যাতিমান আলেমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বিশেষত তিনি যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন অধ্যয়ন করেন তৎকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত ফখরুদ্দীন আল-রাজির নিকট। বিতর্কবিদ্যা (জাদল) শেখেন আত-তাউসির নিকট এবং হাদীস শোনেন মুয়াইয়্যাদ আত-তুসির কাছ থেকে। পরে তিনি শামে (বর্তমান সিরীয় অঞ্চল) কাযিউল-কুযাত বা প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান এবং বহু বছর সে পদে দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ৬৩৭ হিজরি ৭ই শা‘বান (২ মার্চ, ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ) তিনি সিরিয়ার দামেশকে মৃত্যু বরণ করেন। শামসুদ্দীন আয-যাহাবি তাঁর জীবনী গ্রন্থ সিয়ারু আলামিন নুবালাতে তাঁকে উল্লেখ করে বলেন,

“তিনি ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একজন কালামবিদ ও চিন্তাবিদ। তাঁর ধর্মীয় একনিষ্ঠতা, জ্ঞান ও সাধনার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি যুক্তি, দর্শন, ভাষা, উসূল ও চিকিৎসা বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন। []

রচনাবলি

[সম্পাদনা]

তাঁর অনেক মূল্যবান রচনা আজও বিভিন্ন গ্রন্থাগারে পাণ্ডুলিপি আকারে সংরক্ষিত আছে। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য রচনা হল:

  • তাতিম্মাহ তাফসির আল কুরআন— এটি মূলত ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাজির অসমাপ্ত কুরআন তাফসিরের পরিশিষ্ট, যেখানে তিনি নিজে ব্যাখ্যা যোগ করেছেন।
  • উসূলুল ফিকহ— এটি ইসলামী আইনের মূলনীতি বিষয়ে একটি গ্রন্থ, যাতে যুক্তির প্রয়োগ ও কুরআন-সুন্নাহর নির্যাস সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
  • আস-সাফিনাহ আন-নূহিয়া ফি আস-সাকিনাহ আর-রূহিয়া —এটি আত্মা ও অন্তরচিন্তা নিয়ে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক রচনা। এতে লেখক জানান, তিনি মূলত ফখরুদ্দীন রাজির একটি বই ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিজেই একটি সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে আর দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন না পড়ে। এই পাণ্ডুলিপি দামেশকে সংরক্ষিত একটি দুর্লভ সংগ্রহের অংশ হিসেবে রয়েছে, যা ৮৬৮ হিজরিতে লিখিত মোট ৩১ পাতার একটি সঙ্কলন।
  • তাঁর আরেকটি দার্শনিক গ্রন্থ রয়েছে, যা তিনি সেই সময়ের সুলতান আল মালিকুল-মু‘আয্জাম ঈসা ইবনে আবু বকর আইয়ুবির উদ্দেশ্যে রচনা করেন, যাতে বিভিন্ন দার্শনিক সংকেত ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • আবু শামা নামে একজন ইতিহাসবিদ জানান যে, শামসুদ্দীন আল-খুঈর লেখা একটি ছন্দবিদ্যার (আরূজ) বই তাঁর কাছে লেখকের নিজ হাতে লেখা কপি হিসেবে সংরক্ষিত ছিল। []

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Adel Nuwayhed (১৯৮৮), مُعجم المُفسِّرين (আরবি ভাষায়) (3rd সংস্করণ), বৈরুত: مؤسسة نويهض الثقافية للتأليف والترجمة والنشر, ওসিএলসি 235971276, Wikidata Q122197128
  2. عادل النويهض (১৯৮৩)। معجم المفسرين من صدر الإسلام حتى العصر الحاضر (الثالثة সংস্করণ)। مؤسسة نويهض الثقافية للتأليف والترجمة والنشر। পৃ. ৩৫।
  3. خير الدين الزركلي (২০০২)। الأعلام। دار العلم للملايين। পৃ. ১২১।
  4. خير الدين الزركلي (2002). الأعلام. لبنان: دار العلم للملايين. ج. الجزء الأول. ص. 121.
  5. عادل نويهض (1988)، مُعجم المُفسِّرين: من صدر الإسلام وحتَّى العصر الحاضر (ط. 3)، بيروت: مؤسسة نويهض الثقافية للتأليف والترجمة، ص. 50 {{বই উদ্ধৃতি}}: |শিরোনাম= এর 19 নং অবস্থানে no-break space character রয়েছে (সাহায্য)