বিষয়বস্তুতে চলুন

আহমদ ওয়াহিদ মুজদা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আহমদ ওয়াহিদ মুজদা
আহমদ ওয়াহিদ মুজদা
জন্ম১৯৫৩
মৃত্যু২০ নভেম্বর ২০১৯(2019-11-20) (বয়স ৬৫–৬৬)
মাতৃশিক্ষায়তনকাবুল বিশ্ববিদ্যালয়
পেশারাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক এবং শান্তিকর্মী

আহমদ ওয়াহিদ মুজদা (১৯৫৩ – ২০ নভেম্বর ২০১৯) ছিলেন একজন জ্যেষ্ঠ আফগান রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক এবং শান্তিকর্মী।[] তিনি একজন কবিও ছিলেন এবং সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েতবিরোধী বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন।[] আফগান সংঘাত নিয়ে তাঁর মতামতের কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে তাঁকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করা হতো। কর্মজীবনে মুজদা তালেবান এবং আফগান সরকার—উভয়েরই সমালোচনা করেছিলেন। অনেক সাংবাদিক ও গবেষক তাঁকে অনুসন্ধিৎসু বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রশংসা করেছেন।[]

২০ নভেম্বর ২০১৯ তিনি কাবুলে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। কয়েকজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভিন্ন মতের মানুষদের চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাঁর মতামতের কারণে তাঁকে হত্যা করেছে।[] এর আগে আফগান গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট অব সিকিউরিটি (এনডিএস) তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।[]

তাঁর মৃত্যুতে আফগানিস্তানের বিশিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যাপক নিন্দা জানান এবং অনেকেই এটিকে আফগান জাতির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন।[] আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই তাঁর মৃত্যুকে আফগানিস্তানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেন।[]

প্রাথমিক জীবন

[সম্পাদনা]

মুজদার জন্ম ১৯৫৩ সালে বাগলান প্রদেশে। তিনি কাবুলের হাবিবিয়া হাই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।[]

সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ

[সম্পাদনা]

সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ চলাকালে মুজদা আফগান মুজাহিদিন-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সোভিয়েতবিরোধী বেশ কিছু কবিতা লিখেছিলেন।[] ১৯৮৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন জানায়, মুজদা আবদুল্লাহ আজ্জাম-এর জন্য অনুবাদক হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি ছিলেন আফগান আরবদের একজন নেতা—যারা বিদেশি যোদ্ধা হিসেবে আফগানিস্তানে এসে মুসলিমদের সাহায্য করতেন এবং সোভিয়েত দখলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেন।[]

তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মুজদা তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন।[] তবে তিনি কখনোই তালেবানের কোনো ধর্মীয় মিলিশিয়ার সদস্য ছিলেন না।[] ২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পরও মুজদা কাবুলে অবস্থান করেন এবং নতুন আফগান সরকারের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।

পরবর্তী কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

২০১৩ সালে জার্মান সংবাদপত্র ডি প্রেসে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুজদা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে তালেবান ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে এবং ইউরোপীয় ও মার্কিন গণমাধ্যম এই বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। তিনি জানান, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি দূর করার উদ্দেশ্যে ইরান তালেবানকে সমর্থন দিচ্ছে।[]

ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর মুজদা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে বলেন, তালেবানের জন্য এটি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার একটি সুযোগ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিন লাদেনের মৃত্যুর আগেই তালেবান ও তাঁর মধ্যকার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছিল।[]

২০১২ সালের ৯ এপ্রিল আল জাজিরা মুজদাকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যখন তাঁর সাবেক সহকর্মী আব্দুল সালাম জায়েফ নিরাপত্তার কারণে আফগানিস্তান ছেড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যান।[]

জায়েফ, মুজদার মতোই, তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছিলেন এবং পাকিস্তানে তালেবানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁকে বিতর্কিত গুয়ান্তানামো বে আটক শিবিরে, কিউবায় আটক রাখা হয়েছিল। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তালেবানের সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে আমেরিকান শান্তি আলোচকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর বাড়িতে একাধিকবার নাইট রেইড চালানো হয়েছিল। মুজদা ব্যাখ্যা করেন, গুয়ান্তানামো থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক সাবেক বন্দি এমন অভিযানের সময় গ্রেপ্তার না হয়ে নিহত হয়েছিলেন। তাই জায়েফ আশঙ্কা করেছিলেন যে তিনি আফগানিস্তান ছেড়ে না গেলে ভবিষ্যতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে পারে।[]

মুজদা আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায়ও কাজ করছিলেন এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। আফগান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ধর্মীয় পণ্ডিত কাজি হাফিজুর রহমান নাকি বলেন, আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুজদার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মন্তব্য করেন, মুজদার হত্যা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার আঘাত।[]

হত্যাকাণ্ড

[সম্পাদনা]

২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর ওয়াহিদ মুজদা কাবুলে মোটরসাইকেলে আসা দুই বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন। সে সময় তিনি রাশিয়ার দূতাবাসের কাছাকাছি একটি মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন।[][]

কোনো গোষ্ঠী তাঁর হত্যার দায় স্বীকার করেনি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তাঁদের মতে, তাঁর মতামতের কারণেই তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।[]

প্রতিক্রিয়া

[সম্পাদনা]

তাঁর হত্যাকাণ্ডে আফগানিস্তানের বিশিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যাপক নিন্দা জানান[] এবং অনেকে এটিকে “আফগান জাতির জন্য বড় ক্ষতি” বলে উল্লেখ করেন।[]

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই মুজদার হত্যার নিন্দা জানান এবং এটিকে আফগানিস্তানে নাগরিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেন।[][১০]

পাকিস্তানে আফগানিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ওমর জাখিলওয়ালও এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, শান্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার যে উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, মুজদার হত্যা তারই একটি অংশ।[][১১]

আফগানিস্তানে জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার প্রুগেলও এই লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ভিন্নমত ও মতামতকে শোনা উচিত এবং তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত, দমন করা নয়।[]

রাজনৈতিক কর্মী খাইরুল্লাহ শিনওয়ারি বলেন, আফগানিস্তান পণ্ডিতদের জন্য ভালো জায়গা নয়, এখানে কেউ সত্য কথা বললে তাকে হত্যা করা হয়। তাঁর মতে, আফগানিস্তানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল একটি স্লোগানে পরিণত হয়েছে।[]

আফগান প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের আর্গ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান আবদুল করিম কুরাম বলেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে গণতন্ত্রেরও জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং এর প্রধান দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তাবে।[]

তালেবানও মুজদার হত্যার নিন্দা জানায় এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আফগান গোয়েন্দা সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তা অধিদপ্তর (এনডিএস)-কে দায়ী করে।[]

মুজদার জানাজা ২১ নভেম্বর ২০১৯ অনুষ্ঠিত হয়[] এবং সেখানে বিভিন্ন পটভূমির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।[]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 4 5 6 7 8 "Wahid Muzhda, Political Analyst, Assassinated In Kabul"Tolo News। ২০ নভেম্বর ২০১৯।
  2. 1 2 3 4 "'Muzhda's murder an attack on civil liberties, freedom of speech'"MenaFN। ২৩ নভেম্বর ২০১৯।
  3. 1 2 3 4 5 6 7 Pamela Constable (২৫ ডিসেম্বর ২০১৯)। "The mysterious assassination of an Afghan analyst with close ties to the Taliban"Washington Post
  4. Aryn Baker (১৮ জুন ২০০৯)। "Who Killed Abdullah Azzam"Time। ১০ জুন ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ এপ্রিল ২০১২
  5. 1 2 "Afghan Taliban likely to rethink ties to al-Qaida"Kyiv Post। ১১ মে ২০১১। ৭ মে ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ এপ্রিল ২০১২'I think now is an opportunity for the Taliban to end their relations with al-Qaida,' said Waheed Muzhda, a Kabul-based analyst and former foreign ministry official under the Taliban regime that was toppled in late ২০০১.
  6. "'Iran wants to get rid of US presence in Afghanistan'"Die Presse (German ভাষায়)। ১৯ জুন ২০১৩।{{সংবাদ উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক)
  7. 1 2 Qais Azimy, Mujib Mashal (৯ এপ্রিল ২০১২)। "Former Taliban leader flees for safety"Al Jazeera। ১৮ এপ্রিল ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ এপ্রিল ২০১২Muzhda said Zaeef feared for his life in the wake of the attempted raids on his home. Many of the Taliban prisoners freed from Guantanamo had been killed in night raids and that made Zaeef more nervous.
  8. 1 2 3 4 5 6 "Funeral Held for Muzhda, Writer, Analyst and 'Dissenting Voice'"Tolo News। ২১ নভেম্বর ২০১৯।
  9. "Political expert Wahid Muzhda killed in Kabul"Pajhwok Afghan News। ২০ নভেম্বর ২০১৯।
  10. "Hamid Karzai on Twitter"। ২১ নভেম্বর ২০১৯।
  11. "Dr. Omar Zakhilwal on Twitter"। ২০ নভেম্বর ২০১৯।