বিষয়বস্তুতে চলুন

আহমদ ইবনে কায়গালাগ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আহমদ ইবনে কায়গালাগ (আরবি: أحمد بن كيغلغ) ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত একজন আব্বাসীয় সামরিক কর্মকর্তা, যিনি সিরিয়া ও মিশরে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৯৩৫ সালে মুহাম্মদ ইবনে তুগজ তাকে মিশরের গভর্নর পদ থেকে উৎখাত করেন।

জীবনী

[সম্পাদনা]

৯০৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি তাঁর ভাই ইব্রাহিমের সঙ্গে হামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে তারা কারামাতিয়া আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। এই অভিযানটি মুহাম্মদ ইবন সুলায়মান আল-কাতিব পরিচালনা করেন।[] এই বিজয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের দুই ভাইসহ সেনাবাহিনীর অন্যান্য কর্মকর্তাদের ৯০৪ সালের ২২ মে খলিফা আল-মুকতাফি সম্মানসূচক পোশাক (খিলআত) প্রদান করেন।[]

৯০৪–৯০৫ সালে আব্বাসীয়রা যখন তুলুনীয় রাজবংশের কাছ থেকে সিরিয়া ও মিশর পুনরুদ্ধার করে, তখন ইবনে কায়গালাগকে দামেস্ক ও জর্ডান প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়।[][] কিন্তু সেখান থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে তুলুনীয়পন্থী বিদ্রোহী মুহাম্মদ ইবন আলী আল-খালানজির বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। আল-খালানজি ফুস্তাত দখল করে সেখানে তুলুনীয় শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় এবং স্থানীয় আব্বাসীয় সেনাপতি সরে গিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় আশ্রয় নেন।[]

৯০৫ সালের ডিসেম্বরে আল-আরিশের প্রথম সংঘর্ষে আল-খালানজি ইবনে কাইগালাগকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ৯০৬ সালের মে মাসে আল-খালানজি পরাজিত ও বন্দী হয় এবং তাকে বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হয়। [][][] এদিকে ইবনে কাইগালাগ অনুপস্থিত থাকাকালে কারমাতিয়ারা জর্ডানে আক্রমণ চালায় এবং তাঁর প্রতিনিধি ইউসুফ ইবন ইব্রাহিম ইবন বুগামারদীকে পরাজিত ও হত্যা করে। পরে বাগদাদ থেকে হুসাইন ইবন হামদানের নেতৃত্বে সাহায্যকারী বাহিনী আসার খবর পেয়ে তারা সরে যায়।[][]

৯০৬ সালের ২২ অক্টোবর তিনি তার্সুস থেকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বার্ষিক সীমান্ত অভিযান পরিচালনা করেন। তখন তাঁর সঙ্গে স্থানীয় গভর্নর রুস্তাম ইবন বারাদুও ছিলেন। ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, তারা সালান্দু নামক স্থানে বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করে এবং অগ্রসর হয়ে হালিস নদী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই অভিযানে তারা প্রায় ৪,০০০–৫,০০০ বন্দী ও বিপুল পরিমাণ ঘোড়া ও গবাদিপশু জব্দ করে। এমনকি বাইজেন্টাইনদের একজন সেনাপতি আত্মসমর্পণ করে ইসলাম গ্রহণ করে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।[]

৯১৪/৯১৫ সালে হুসাইন ইবনে হামদান নামের হামদানীয় নেতার বিদ্রোহের পর ইবনে কায়গালাগকে সেই বিদ্রোহ দমন ও জাজিরা অঞ্চলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অভিযানে পাঠানো হয়। কিন্তু হুসাইন আব্বাসীয় বাহিনীকে পরাজিত করে এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেনাপতি মুনিস আল-মুজাফ্ফর তাকে গ্রেপ্তার করেন।[১০]

৯২৩ সালের জুলাইয়ে ইবনে কায়গালাগকে আবার মিশরের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু সেখানে কিছু সৈন্যের বেতন বকেয়া থাকার কারণে অনেক সৈন্য বিদ্রোহ শুরু করে। এর ফলে ৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে তাকে অপসারণ করে তার জায়গায় নিয়োগ তাকিন আল-খাজারিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। চার বছর পরে কারামাতিয়ান কাসর ইবনে হুবায়রা শহরে আক্রমণ করলে তাকে সেখানে পাঠানো হয়, কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই কারমাতিয়ারা সরে যায় এবং সেনাবাহিনী যুদ্ধ ছাড়াই বাগদাদে ফিরে আসে।[১১]

৯৩১ সালে তিনি ইস্পাহানের গভর্নর ছিলেন, তখন দাইলামি নেতা লাশকারি শহরটি আক্রমণ করে তাকে পরাজিত করে দখল করে। তবে পরে ইবনে কায়গালাগ একক দ্বন্দ্বযুদ্ধে লাশকারিকে হত্যা করতে সক্ষম হন। পরে তার অনুসারীরা পালিয়ে যায় এবং শহরটি পুনরুদ্ধার করা হয়।[১২]

৯৩৩ সালের মার্চে মিশরের গভর্নর তাকিন মারা গেলে তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবন তাকিন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন। তখন মুহাম্মদ ইবন তুঘজকে নতুন গভর্নর করা হয়, যদিও পরে সেই নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং ইবন কায়গালাগকে পুনরায় গভর্নর করা হয়। একই সময়ে বুশরি নামের এক খোজাকে ইবনে তুঘজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দামেস্কে পাঠানো হয়। কিন্তু ইবনে তুঘজ প্রতিরোধ করে বুশরিকে বন্দী করেন। এরপর খলিফা ইবনে কায়গালাগকে ইবনে তুঘজকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার নির্দেশ দেন। তবে উভয় পক্ষ সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে আলোচনা করে পারস্পরিক সমর্থনের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।[১৩]

কিন্তু মিশরে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা দমন করতে তিনি দ্রুতই অক্ষম প্রমাণিত হন। ৯৩৫ সালে সৈন্যরা বেতন না পাওয়ায় বিদ্রোহ শুরু করে এবং বেদুইনদের লুটতরাজও বাড়তে থাকে। একই সময়ে মুহাম্মদ ইবন তাকিন ও রাজস্ব প্রশাসক আবু বকর মুহাম্মদ ইবন আলি আল-মাজারাই তাঁর অবস্থান দুর্বল করতে থাকে। সেনাবাহিনীর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় তুর্কি সৈন্যরা ইবনে তাকিনকে সমর্থন করে এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় বারবার ও কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকীয় সৈন্যরা ইবনে কায়গালাগকে সমর্থন করে।[১৪][১৫]

অবশেষে বাগদাদের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থনে আবারও মুহাম্মদ ইবনে তুঘজকে মিশরের গভর্নর করা হয়। তিনি স্থল ও নৌপথে মিশর আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। যদিও ইবনে কায়গালাগ তাঁর অগ্রযাত্রা কিছুটা বিলম্বিত করতে সক্ষম হন, তবুও ইবনে তুঘজের নৌবহর তিন্নিস ও নাইল ব-দ্বীপ দখল করে রাজধানী ফুস্তাতের দিকে অগ্রসর হয়। এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইবনে কায়গালাগ অবশেষে ফাতিমীয়দের অঞ্চলে পালিয়ে যান। বিজয়ী মুহাম্মদ ইবনে তুঘজ ৯৩৫ সালের ২৬ আগস্ট ফুস্তাতে প্রবেশ করেন।[১৬]

এরপর ৯৩৬ সালে সংক্ষিপ্ত একটি উল্লেখ ছাড়া ইবনে কায়গালাগ সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।[১৭]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Rosenthal 1985, পৃ. 138–140।
  2. Rosenthal 1985, পৃ. 146।
  3. Rosenthal 1985, পৃ. 158।
  4. 1 2 Gil 1997, পৃ. 313।
  5. 1 2 Gil 1997, পৃ. 314।
  6. Rosenthal 1985, পৃ. 156, 169–170।
  7. Bianquis 1998, পৃ. 110।
  8. Rosenthal 1985, পৃ. 158–159।
  9. Rosenthal 1985, পৃ. 172, 180।
  10. Margoliouth 1921, পৃ. 40-42।
  11. Margoliouth 1921, পৃ. 206।
  12. Margoliouth 1921, পৃ. 239-240।
  13. Bacharach 1975, পৃ. 591–592।
  14. Bacharach 1975, পৃ. 592–593।
  15. Brett 2001, পৃ. 161।
  16. Bacharach 1975, পৃ. 592–594।
  17. Rosenthal 1985, পৃ. 139 (note 677)।

সূত্র

[সম্পাদনা]