বিষয়বস্তুতে চলুন

আহনাফ বিন কায়েস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আবু বাহর [] আহনাফ বিন কাইস ( আরবি: الأحنف بن قيس) ছিলেন একজন তাবেয়ী, সেনাপতি ও গোত্রীয় প্রধান। তিনি নবি মুহাম্মাদের যুগে ইসলাম গ্রহণ করলেও কখনো নবির সাথে সাক্ষাৎ করেননি। তিনি বনু তামিম নামক একটি প্রসিদ্ধ আরব গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। শুরুতে তার বাবা তার দাহহাক রাখেন। কিন্তু লোকেরা তাকে আহনাফ বলে ডাকত, ধ্রুপদী আরবিতে যার অর্থ হলো ‘খুনি-পাওয়ালা’। তবে আল বালাজুরি উল্লেখ করেন যে, তাকে আবদুল্লাহ ইবনে খাজিম নামেও ডাকা হতো। []

প্রাথমিক জীবন

[সম্পাদনা]

ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবি মুহাম্মাদ বনু তামিম গোত্রের কাছে একজন দাঈ পাঠান। গোত্রের সদস্যরা সেই দাঈকে জানান যে, আহনাফ তার নিজস্ব মতামত জানানো ব্যতীত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। আহনাফ সেই দাঈর কথা শোনেন এবং নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন। দাঈ সাহাবি যুক্তি দিয়ে আহনাফ ও তাঁর পুরো গোত্রকে ইসলাম গ্রহণের জন্য রাজি করাতে সক্ষম হন। তবে আহনাফ নিজের জীবদ্দশায় নবির সাথে সাক্ষাৎ করেননি। ৬৩২ সালে নবির মৃত্যুর পর বিভিন্ন কারণে অনেক গোত্র বিদ্রোহ করে; তবে আহনাফ ও তার গোত্রীয় লোকেরা মুসলমান হিসেবে অবিচল থাকেন। যখন তিনি মুসাইলিমার নবুয়ত দাবির কথা শোনেন, তখন তিনি তার চাচার সঙ্গে মুসাইলিমার সঙ্গে দেখা করতে যান। মুসাইলিমার কথা শুনে তিনি গোত্রের কাছে ফিরে এলেন এবং তাদের মুসাইলিমার দাবিতে বিশ্বাস না করার জন্য পরামর্শ দেন। []

খলিফা উমরের শাসনামলে

[সম্পাদনা]

৬৩৪ সালে যখন উমর ইবনুল খাত্তাব খলিফা নির্বাচিত হন, তখন আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামি বিজয়াভিযান দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আহনাফ তার লোকদের অভিযানে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতেন। যখন ইরাকে আলা ইবনুল হাদরামি নেতৃত্বে পারসিকরা একটি মুসলিম দলকে ঘেরাও করে, তখন উমর উতবা ইবনুল গজওয়ানকে তাদের উদ্ধার করার জন্য পাঠান। উতবা প্রায় ১২,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন, যাদের অধিকাংশ বনু তামিম গোত্রের সদস্য ছিল এবং তাদের মধ্যে আহনাফও ছিলেন। আহনাফ ঘেরাও ভেঙে দেওয়া এবং সৈন্যদের রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[]

৬৩৯ সালে আহনাফ তুসতার বিজয়ের খবর নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন এবং পারস্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উমরকে জানান। উমর তাকে শোনার পর বলেন:

উত্তরে আহনাফ বলেন:

উমর তাকে পার্সিক সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদিগার্দকে অনুসরণ করার অনুমতি দেন। তিনি আহনাফকে মুসলিম বাহিনীর প্রধান করে খোরাসান বিজয়ের শেষ পর্যায় সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব দেন। আহনাফ তৃতীয় ইয়াজদগির্দকে অনুসরণ করতে থাকেন। এভাবে আত্মরক্ষার জন্য তিনি মার্ভ শহরে গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। তৃতীয় ইয়াজদগির্দ আশেপাশের তুর্কি ও চীনা শাসকদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন, কিন্তু কোনো ফল পাননি। তবে কুফা থেকে সাহায্য প্রাপ্তির পর আহনাফ অবশেষে মার্ভ দখল করেন এবং খুরাসান বিজয় সম্পূর্ণ করেন। খুরাসানের বাইরের শহরগুলো আহনাফের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। তিনি বিজয়ের কথা জানাতে উমরকে একটি চিঠি পাঠান। উমর তাকে পারস্যের গভীরে যেতে নিষেধ করেন; তবে বিজয়ী অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন। আহনাফ সেই আদেশ মেনে চলেন; কিন্তু তিনি ইয়াজদগির্দের চলাফেরার প্রতি নজর রাখতেন। পরে জানতে পারেন যে, তুর্কিরা পারসিক বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে এবং তারা এগিয়ে আসছে। তখন তিনি তার বাহিনী নিয়ে শত্রুর শহরের বাইরে শিবির গঠন করেন।

শত্রুর সংখ্যা তার বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমু দরিয়ার যুদ্ধে পারসিকদের পরাজিত করেন। এরপর তৃতীয় ইয়াজদগির্দ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পালিয়ে বেড়ান। অবশেষে ৬৫১ সালে তুর্কমেনিস্তানের মার্ভে একজন স্থানীয় চাকি পাউরুটি চুরির অভিযোগে তাকে হত্যা করেন।[]

প্রথম ফিতনার সময়

[সম্পাদনা]

আহনাফ পারস্যে অভিযান শেষ করে বসরায় ফিরে আসেন এবং ইসলামের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। তাঁর এই অবস্থা খলিফা আলি ইবনে আবি তালিবের (মৃ. ৬৬০) শাসনকাল পর্যন্ত চলতে থাকে। এরপর মুসলিম সমাজ দুটি শত্রু পক্ষের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। আহনাফ এই দাঙ্গার ফিতনা থেকে নিজেকে আলাদা রাখেন এবং খলিফা আলিকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি বলেন: “আমি তোমার বিরুদ্ধে লড়াই থেকে দশ হাজার তলোয়ারকে (সেন্য) বিরত রাখব।” ৬৬১ সালে মুয়াবিয়া খলিফা হবার পর আহনাফ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। সাক্ষাৎ শেষে খলিফার বোন রুষ্টভাবে প্রশ্ন করেন: “এই মানুষটি কে, যে তোমাকে সতর্কতা ও হুঁশিয়ারি দিল?” খলিফা উত্তর দেন: “তিনি সেই ব্যক্তি, যে রেগে গেলে বনু তামিমের এক লক্ষ মানুষ রাগের কারণ না জানলেও তার পক্ষে রেগে যায়।”[]

দ্বিতীয় ফিতনার সময় আহনাফ মাজার ও হারুরার যুদ্ধে তামিম গোত্রের নেতৃত্ব দেন।[] পরবর্তীতে তিনি কুফায় বসবাস করেন এবং ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Bayat ও Umar 2008
  2. Potts, Daniel (২০১৪)। Nomadism in Iran: From Antiquity to the Modern Era। Oxford University Press। পৃ. ১৬৯
  3. خير الدين الزركلي. الأعلام المجلد الأول। পৃ. ১/২৭৬।
  4. ابن حجر العسقلاني. تهذيب التهذيب الجزء الأول। পৃ. ১৯১।
  5. أبو بكر محمد بن الحسن ابن دريد. الاشتقاق الجزء الأ। পৃ. ১৫৩।
  6. شمس الدين الذهبي (1990)، تاريخ الإسلام ووفيات المشاهير والأعلام، تحقيق: عمر عبد السلام تدمري। পৃ. ৫/২৫৪।
  7. Fishbein 1990, পৃ. 87।

সূত্র

[সম্পাদনা]