আস্তিকীয় সম্ভাবনার বর্ণালী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রিচার্ড ডকিন্স তার দ্য গড ডিলিউশন গ্রন্থের মাধ্যমে আস্তিকীয় সম্ভাবনা বর্ণালী (ইংরেজি: spectrum of theistic probability) পদবাচ্যকে সর্বপ্রথম লোকপ্রিয় করে তোলেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই ব্যক্তির এরূপ বিশ্বাসের নানা স্তরকে ডকিন্স এ পদবাচ্যের মাধ্যমে শ্রেণীবিভক্ত করেন।

নাস্তিক্যবাদ, আস্তিক্যবাদ এবং অজ্ঞেয়বাদ[সম্পাদনা]

জে. জে. সি. স্মার্ট বলেন, নাস্তিক্যবাদঅজ্ঞেয়বাদ এর মধ্যকার পার্থক্যটা পরিষ্কার নয়, এবং অনেক ব্যক্তি যারা নিজেদেরকে অজ্ঞেয়বাদী বলে দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে তারা আসলে নাস্তিক্যবাদী। তিনি লেখেন, এই ভ্রান্ত সনাক্তকরণটি একরকম অযৌক্তিক দার্শনিক সন্দেহবাদের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যা আমাদেরকে এই জগৎ সম্পর্কে কোন জ্ঞানকে চূড়ান্ত বলে দাবি করতে অনুমোদন দেয় না।[১] তিনি এর বদলে নিম্নোক্ত বিশ্লেষণকে প্রস্তাব করেন:

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি (ধরলাম, তার নাম রহিম) নিজেকে আস্তিক্যবাদী, নাস্তিক্যবাদী নাকি অজ্ঞেয়বাদী দাবি করবেন তা নির্ণয় করতে হবে। আমি প্রস্তাব করব যে, যদি রহিম; ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিভিন্ন প্রমাণ বিচার করে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে ১ এর কাছাকাছি মনে করে তবে সে আস্তিক্যবাদী (সম্ভাবনা ১ অর্থ ১০০%, কোন ঘটনা ঘটবার সম্ভাবনা ০ থেকে ১ পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে সম্ভাবনা ১ হবার অর্থ হচ্ছে ঘটনাটি অবশ্যই ঘটবে আর ০ হবার অর্থ ঘটনাটি কখনই ঘটবে না। সম্ভাবনা ১ থেকে ০ এর মধ্যে যেকোন বাস্তব বাস্তব সংখ্যা হতে পারে)। যদি রহিমের কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা ০ এর কাছাকাছি হয় তবে সে নাস্তিক্যবাদী হবে। আর যদি তার কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা ১ ও ০ এর মাঝামাঝি কোথাও থাকে তাহলে সে অজ্ঞেয়বাদী হবে। এই শ্রেণীবিভাগ নিয়ে কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, কারণ এর সীমারেখাগুলো অস্পষ্ট। ঠিক যেমন কোন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি নিজের মাথাকে "টাক মাথা" বলবেন, নাকি "টাক মাথা নয়" বলবেন সেসম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না, তাকে আরও খুটিনাটি সহ নিজের চুলের অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে হয়।[২]

ডকিন্স এর প্রস্তাব[সম্পাদনা]

"দ্য গড ডিলিউশন" গ্রন্থে রিচার্ড ডকিন্স বলেন, "অন্যান্য বৈজ্ঞানিক অনুকল্পের মতই ঈশ্বরের অস্তিত্ব একটি অনুকল্প "। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস এর অবস্থান নিয়ে দুটো বিপরীতমুখী দর্শনের (আস্তিক্যবাদ ও নাস্তিক্যবাদ) দিকে না গিয়ে এই দুই সুনির্দিষ্ট দর্শনের মাঝে একটি অনবরত বর্ণালি কল্পনা করেন; যাকে ৭টি মাইলফলকের দ্বারা প্রকাশ করা যেতে পারে। তিনি এই বর্ণালীকে বলেছেন "সম্ভাবনার বর্ণালী" (ইংরেজি: Spectrum of probability)। ডকিন্সের প্রস্তাবনা মতে, একজন মানুষের যে বিশ্বাস সে বিশ্বাসের অবস্থান এই ৭টি মাইলফলকের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে দেখানো যাবে। এই মাইলফলকগুলো হলঃ[১]:

মাত্রা শিরোনাম বর্ণনা
সবল আস্তিক্যবাদ (Strong theism) ব্যক্তি সন্দেহমুক্ত হয়ে জানেন যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে, তিনি তাতে শতভাগ নিশ্চিত। সি. জি. ইয়াং এর ভাষায়, "আমি বিশ্বাস করি না, আমি জানি"।
কার্যত আস্তিক্যবাদ (De facto theism) ব্যক্তি একশভাগ নিশ্চিন্ত নন যে ঈশ্বর আছেন, কিন্তু মনে করেন তার অস্তিত্বের সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে ভেবেই তিনি জীবন অতিবাহিত করেন।
দুর্বল আস্তিক্যবাদ (Weak theism) ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা ৫০% এর বেশি, কিন্তু খুব একটা বেশি নয়। ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত নন কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে থাকেন।
পরিপূর্ণ অজ্ঞেয়বাদ (Pure agnosticism) অথবা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা (Compleat impartiality) ঈশ্বর থাকার সম্ভাবনা ৫০%। ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা, তার সত্য হবার সম্ভাবনা ও মিথ্যা হবার সম্ভাবনা ব্যক্তির কাছে সমান।
দুর্বল নাস্তিক্যবাদ (Weak atheism) ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা ৫০% এর কম, কিন্তু খুব একটা কম নয়। ব্যক্তি ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নন কিন্তু সন্দেহবাদের (Skepticism) দিকে তিনি ঝুঁকে থাকেন।
কার্যত নাস্তিক্যবাদ (De facto atheism) ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা খুবই কম, কিন্তু ০% এর উপরে। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই এব্যাপারে ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে ইতিবাচক নন কিন্তু তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা অনেক কম বলে মনে করেন এবং ঈশ্বর বলে কিছু নেই ভেবেই জীবন অতিবাহিত করেন।
সবল নাস্তিক্যবাদ (Strong atheism) ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা শূন্য। ব্যক্তি শতভাগ নিশ্চিন্ত যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই।

ডকিন্স যুক্তি দিয়ে বলেন, বেশিরভাগ আস্তিক মানুষ তাদের সন্দেহের বিরুদ্ধে গিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসকে শক্তভাবে আকড়ে থাকেন, এবং তাই নিজেদেরকে ১ নং অবস্থানেই ফেলেন। পক্ষান্তরে বেশিরভাগ নাস্তিক নিজেদেরকে ৭ নং অবস্থানে ফেলেন না, কারণ নাস্তিক্যবাদের উদ্ভব হয় প্রমাণের অভাবে এবং প্রমাণের উপস্থিতি সবসময়ই চিন্তাশীল মানুষের চিন্তাকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। মুদ্রিত কাগজে ডকিন্স নিজেকে ৬ নং অবস্থানে বলে স্বীকার করলেও বিল মার[৩] এবং এনথোনি কেনির[৪] নেয়া সাক্ষাতকারে ডকিন্স প্রস্তাব করেন "৬.৯" নং অবস্থানই বেশি নিখুত হবে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Dawkins, Richard (২০০৬)। The God Delusion। Bantam Books। পৃষ্ঠা 50। আইএসবিএন 0-618-68000-4 
  2. Smart, Jack (২০০৪)। "Atheism and Agnosticism"Stanford Encyclopedia of Philosophy। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৪-২৮ 
  3. "Richard Dawkins on Bill Maher"। YouTube। ২০০৮-০৪-১১। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-০৬-১৫ 
  4. Bingham, John (ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১২)। "Richard Dawkins: I can't be sure God does not exist"The Telegraph। সংগ্রহের তারিখ ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১২