আসামের মুখোশ শিল্প

আসামের মুখোশ শিল্প হলো আসামের একটি প্রাচীন লোককলা। আসামের মুখোশ তৈরির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এটি ১৫ শতকে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব প্রবর্তিত নব্য-বৈষ্ণবধর্ম আন্দোলনের সময় থেকে বিকশিত হয় এবং প্রধানত ঐতিহ্যবাহী নাটকে (ভাওনা) ব্যবহারের জন্য এই মুখোশগুলি তৈরি করা হয়। মুখোশ তৈরির শিল্প কয়েক শতাব্দী ধরে সাতরায় প্রচলিত ছিল। বর্তমানে সমগুড়ি সাতরা তার মুখোশ কারুশিল্পের জন্য বিশ্ব বিখ্যাত।[১] অসমীয়ায় মুখা শব্দের অভিধানিক অর্থ হলো নিজেকে ছদ্মবেশে ঢেকে রাখা। মুখোশ নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য পরা হয়। সময়ের সাথে সাথে এটি একটি শিল্পরূপ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।[২]
মুখোশের প্রকারভেদ ও উপকরণ
[সম্পাদনা]
গঠন বা কাঠামোগত ভাবে আসামের মুখোশ তিন প্রকারের হয়। যেমন— মুখ মুখা বা মুর মুখা হলো এমন একটি ধরণ যা শুধুমাত্র অভিনেতার মুখ ঢেকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়। বোর মুখা বা সু মুখা হলো আরেক ধরণের মুখোশ ও পোশাক যা একত্রে অভিনেতার প্রায় পুরো শরীর জুড়ে থাকে। বোর মুখার মাথার অংশটিকে বলে মুখা আর শরীরের অংশটিকে বলে সু। তৃতীয় প্রকারটি লুতুকাই বা লুতুকোরি নামে পরিচিত।। এটি বোর মুখার চেয়ে আকারে ছোট দেখতে হয়। মুখোশ সাধারণত বাঁশ, বেত, কুমোরের মাটি, গোবর, পাটের তন্তু, কাগজ, কাপড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক জৈব উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়।[৩]
মুখোশ তৈরি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে স্থানীয় বাঁশকে সরু করে কেটে সেই বাঁশের সরু ফালি দিয়ে একটি ষড়ভুজাকার কাঠামো বোনা হয়। তারপর এই কাঠামোর উপর কাদামাটি ও গোবরের মিশ্রণে ভেজানো কাপড়ের টুকরা দিয়ে একাধিক স্তর তৈরি করা হয়। কাঁচা মুখোশটিকে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত স্তর যুক্ত করা হয়। শুকানোর পর মুখোশের উপর রং করা হয় এবং বিভিন্ন ধরনের উপাকরণ যোগ করে এর চোখ, চুল ও অন্যান্য অংশকে জীবন্ত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।[৩]
একটি মুখোশ তৈরি করতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। আগে মুখোশ রঙ করার জন্য ঐতিহ্যগতভাবে হেঙ্গুল এবং হাইতাল ব্যবহার করা হতো, কিন্তু বর্তমানে এই উপকরণগুলির অভাবের ফলে জল-রঙ এবং রাসায়নিক রঞ্জকও ব্যবহার করা হয়।[৪][৫]
বিগত দশকগুলিতে মুখোশগুলি শক্ত ছিল এবং এতে অভিনেতার কোনও মুখের অভিব্যক্তি চিত্রিত করার সুযোগ ছিল না। পদ্মশ্রী পুরষ্কারপ্রাপ্ত হেমচন্দ্র গোস্বামীর আনা উদ্ভাবন মুখোশ শিল্পে বদলে এনেছে। এই শিল্পটি শুধুমাত্র উচ্চ আসামে, বিশেষ করে মাজুলি দ্বীপে প্রচলিত। মুখোশ শিল্প তার ঐতিহ্য নিয়ে সাতরা অঞ্চলে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। হেমচন্দ্র গোস্বামী ১৯৮০ সালে মাজুলির সমাগুড়ি সত্রে সুকুমার কলা পীঠ নামে একটি মুখোশ তৈরির প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রতিশ্রুতিবান শিল্পপ্রেমী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল এই শিল্পের প্রচারের জন্যই কাজ করে না, একই সাথে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের উপায় হিসেবে মুখোশ তৈরির শিল্প তুলে ধরে।[৬]
ভৌগোলিক নির্দেশক
[সম্পাদনা]আন্তর্জাতিকভাবে আসামের মুখোশ শিল্পের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ, ভারত সরকার ২০২৪ সালের ৪ঠা মার্চ আসামের মাজুলি অঞ্চলের মুখোশ তৈরির সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পকে একটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) ট্যাগ প্রদান করে।[৭]
চিত্রশালা
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Mask Making Tradition of Assam"। blog.mygov.in। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০২৩।
- ↑ "Mask Making of Majuli- A Positive Economic Approach"। nezine.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১২ নভেম্বর ২০২৫।
- 1 2 "Traditional Mask Making Culture of Majuli"। INDIAN CULTURE (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০২৩।
- ↑ "Colourful masks of Assam"। Deccan Herald (ইংরেজি ভাষায়)। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০২৩।
- ↑ "A world of masks in Assam's Majuli island"। The Tribune।
- ↑ "The Mask-Making Tradition of Assam"। Sahapedia (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০২৩।
- ↑ "GI tag for Majuli masks of Assam: History, cultural significance of the centuries-old art form"। The Indian Express (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ মার্চ ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৭ মার্চ ২০২৪।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- Bordoloi, Saswati D। "'Mukha': The Mask Tradition of Assam-with Special Reference to Samaguri Sattra"। Cultural Syndrome: ২০–৩৪। (ইংরেজি ভাষায়)
- Vaidhya, Ranjan Kumar (২০০৯)। Art Approaches Of Majuli An Analytical Study of Illustrated Manuscripts, Mask Making and Wood Carvings। পৃ. ১৭৩–১৯২। (ইংরেজি ভাষায়)