বিষয়বস্তুতে চলুন

আল-মুস্তারশিদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আল-মুস্তারশিদ বিল্লাহ
المسترشد بالله
খলিফা
আমিরুল মুমিনিন
আল-মুস্তারশিদ বিল্লাহর পারসিক ক্ষুদ্রাকৃতির চিত্রকর্মের ছাঁটা অংশ।
২৯তম আব্বাসীয় খলিফা
বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা
রাজত্ব৬ আগস্ট, ১১১৮ – ২৯ আগস্ট, ১১৩৫
পূর্বসূরিআল-মুস্তাযহির
উত্তরসূরিআল-রাশিদ
জন্মএপ্রিল/মে, ১০৯২
বাগদাদ, আব্বাসীয় খিলাফত
মৃত্যু২৯ আগস্ট, ১১৩৫ (বয়স ৪৩)
বাগদাদ, আব্বাসীয় খিলাফত
উপপত্নী
  • আমিরা খাতুন
  • খুশফ
বংশধর
পূর্ণ নাম
আবু মনসুর আল-ফাদল ইবনে আহমদ আল-মুস্তাযহির
যুগ নাম এবং সময়কাল
পরবর্তী আব্বাসীয় যুগ: ১২ শতাব্দী
পিতাআল-মুস্তাযহির
মাতালুবাবা
ধর্মসুন্নি ইসলাম

আবু মনসুর আল-ফাদল ইবনে আহমদ আল-মুস্তাযহির (আরবি: أبو منصور الفضل بن أحمد المستظهر; ১০৯২ – ২৯ আগস্ট, ১১৩৫) ছিলেন ১১১৮ থেকে ১১৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ছিলেন তার পূর্বসূরী খলিফা আল-মুস্তাজহিরের পুত্র। তিনি ১১১৮ সালে তার পিতার উত্তরসূরী হিসেবে আব্বাসীয় খিলাফতের ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

জীবনী

[সম্পাদনা]

তিনি ১০৯২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খলিফা আল-মুস্তাজহিরের পুত্র ছিলেন। তাঁর মাতা লুবানা ছিলেন স্লাভীয় বংশোদ্ভূত একজন উপপত্নী। তাঁর পিতা তাঁর নাম “আল-ফাদল” রাখেন। তাঁর পূর্ণনাম ছিল আল-ফাদল বিন আহমদ আল-মুস্তাযহির এবং তাঁর কুনিয়া ছিল আবু মানসুর।[]

১১১৮ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর খলিফা হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর শাসনামলে তিনি তুলনামূলকভাবে অধিক স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হন, বিশেষত যখন সেলজুক সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি খিলাফতের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন এবং শাসক হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। ১১২২ সালে তিনি তাঁর উজিরে আজম আমিদুদ্দাওলা জালালুদ্দীন হাসান বিন আলীকে অপসারণ করেন এবং তাকে কারারুদ্ধ করেন। এরপর সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ আল-মুস্তারশিদের উজিরে আজম হিসেবে আহমদ ইবনে নিজাম উল-মুলককে নিয়োগ দেন। এরপর আহমদ মাজেদীয় প্রধান দুবাইস ইবন সাদাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। আহমদ বাগদাদের চারপাশের প্রাচীরও মজবুত করেন।[]

এক বছর পর দ্বিতীয় মাহমুদ শামস উল-মুলক উসমানকে তার উজিরে আজমের পদ থেকে অপসারণ করেন এবং পরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তখন আল-মুস্তারশিদ এই সুযোগে আহমদকেও উজিরে আজমের পদ থেকে সরিয়ে দেন।[] এরপর আহমদ বাগদাদে তার পিতার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান নিজামিয়াতে অবসর গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি জীবনের শেষ ২৫ বছর অতিবাহিত করেন এবং ১১৪৯/৫০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।[]

১১২৩ খ্রিষ্টাব্দে বানু মাজেদ গোত্রের প্রধান দুবাইস ইবনে সাদাকা ক্ষমতা দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি প্রথমে বসরা লুণ্ঠন করেন এবং পরবর্তীতে সুলতানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা গিয়াস উদ্দীন মাসউদকে ( যিনি মাসউদ নামেও পরিচিত) সঙ্গে নিয়ে বাগদাদের ওপর আক্রমণ চালান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ইমাদুদ্দিন জেনগি ও আহমদ ইবনে নিজাম উল-মুলকের নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনীর কাছে পরাজিত ও চূর্ণবিচূর্ণ হন। একই বছরে খলিফা তাঁর উজিরের পদ থেকে আহমদ ইবনে নিজাম আল-মুলককে অপসারণ করেন। ১১২৫ সালে আল-মুস্তারশিদ সেলজুকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ইচ্ছা করেন। তিনি ওয়াসিত দখলের উদ্দেশ্যে একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু বাগদাদের নিকটেই তিনি পরাজিত হন এবং পরের বছর তাঁকে তাঁর নিজ প্রাসাদে বন্দি করে রাখা হয়।[]

দ্বিতীয় মাহমুদের মৃত্যুর পরে সেলজুকদের পশ্চিমাঞ্চলীয় ভূখণ্ডে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। এমন অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কয়েকজন প্রভাবশালী বিদ্রোহীর প্ররোচনায় খলিফা ও দুবাইস ইবনে সাদাকার উৎসাহে ইমাদুদ্দিন জেনগিকে পূর্বাঞ্চলে আসার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু পরিস্থিতি তার অনুকূলে যায়নি; যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন এবং পিছু হটতে বাধ্য হন। এরপর খলিফা নিজেই তাকে অনুসরণ করে মসুল নগর পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং সেখানে তাকে অবরুদ্ধ করেন। প্রায় তিন মাস ধরে এই অবরোধ চলতে থাকে; তবে শেষ পর্যন্ত তা কোনো নির্ণায়ক সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। তবুও এই ঘটনাটি খিলাফতের সামরিক শক্তির পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর জেনগি আবার সিরিয়ায় সামরিক অভিযান শুরু করেন। ১১৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দামেস্ক নগরী অবরোধ করেন। তবে এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একদিকে শত্রুপক্ষের অসাধারণ সাহস ও প্রতিরোধ, অন্যদিকে খলিফার অনুরোধ, এই দুই কারণে শেষ পর্যন্ত জেনগি অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এরপর পূর্বাঞ্চলে নতুন করে সৃষ্ট সমস্যার কারণে জেনগিকে সেদিকে ফিরে যেতে হয়। ফলে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তেমন বড় কোনো অভিযান চালাতে পারেননি। বিশেষ করে খলিফা আল-মুস্তারশিদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।[]

আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তারশিদ বিল্লাহের মৃত্যু; ১১৩৫ সালে তাকে হত্যা করা হয়।

দামেস্ক অবরোধের কিছুদিন পর আল-মুস্তারশিদ সেলজুক সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান শুরু করেন। এতে উভয় বাহিনী হামাদান নিকটে মুখোমুখি হলে খলিফার সৈন্যরা তাকে ত্যাগ করে। ফলে বন্দি হন এবং এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুক্তি পান যে, তিনি আর কখনো প্রাসাদ ত্যাগ করবেন না। তবে সুলতান মাসউদের অনুপস্থিতিতে তিনি নিজের তাঁবুর মধ্যে কুরআন পাঠরত অবস্থায় নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। তার হত্যার পিছনে ছিল হাশাশিন গোষ্ঠীর কিছু সদস্য জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু গবেষক সন্দেহ করেন যে, হয়তো মাসউদ এই হত্যাকাণ্ডকে প্ররোচিত করেছিলেন; যদিও তৎকালীন দুই প্রধান ইতিহাসবিদ ইবনুল আসির ও ইবনে জাওজি এই বিষয়ে কোনো অনুমান পেশ করেননি। শারীরিকভাবে আল-মুস্তারশিদ লালচুল ও নীলচোখের অধিকারী ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আল-রাশিদ তার স্থলাভিষিক্ত হন।[]

পরিবার

[সম্পাদনা]

আমিরা খাতুন আল-মুস্তারশিদের একমাত্র স্ত্রী ছিলেন, যিনি সেলজুক সম্রাট আহমদ সঞ্জারের কন্যা ছিলেন।[][] তারা ১১২৪ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।[] তাঁর খুশফ নামক একজন উপপত্নী ছিলেন। তিনি ইরাকি বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং আল-মুস্তারশিদের পুত্র খলিফা আল-রাশিদ বিল্লাহর মা ছিলেন।[] তাঁর আরেকজন পুত্রও ছিলেন, যিনি ১১৩১ সালে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।[১০]

উত্তরাধিকার

[সম্পাদনা]

তাঁর পুত্র আল-রাশিদ বিল্লাহ ১১৩৫ সালের তাঁর উত্তরসূরি হন। তিনি ১১৩৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত মাত্র এক বছর শাসন করেছিলেন। এরপর বাগদাদের জনগণ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তাঁর পরে ১১৩৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর সৎভাই আল-মুকতাফি তাঁর উত্তরসূরি হন।

আল-মুকতাফিও আল-মুস্তাযহিরের পুত্র ছিলেন, যিনি তাঁর উপপত্নী আশিনের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। আশিন সিরীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন।[]

আরো দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

সূত্র

  1. Kuzenkov, P. V. (২০২১)। "Глава 1. Иностранные матери халифов" [Chapter 1. Foreign mothers of the chaliph]। Mishin, D. E. (সম্পাদক)। Арабский и исламский мир в Средние века : от Иберийского полуострова до Средней Азии (রুশ ভাষায়)। Moskov: Institute of Oriental Studies। পৃ. ১৮।
  2. Bosworth 1968, পৃ. 127।
  3. Bosworth 1968, পৃ. 122।
  4. Bosworth 1984, পৃ. 642–643।
  5. 1 2 3 Amin Maalouf (১৫ জুলাই ২০১২)। The Crusades Through Arab Eyes। Saqi। পৃ. ৮১। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৬৩৫৬-৮৪৮-০
  6. Güney, Alime Okumuş (২৯ ডিসেম্বর ২০২০)। Orta Asya Türk-İslâm devletlerinde evlilikler ve evlilik gelenekleri (masterThesis)। Sosyal Bilimler Enstitüsü। পৃ. ৪৯। ১৩ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২৪
  7. Lambton, A.K.S. (১৯৮৮)। Continuity and Change in Medieval Persia। Bibliotheca Persica। Bibliotheca Persica। পৃ. ২৬৮আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৮৭০৬-১৩৩-২
  8. "SENCER"TDV İslam Ansiklopedisi (তুর্কি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩১ আগস্ট ২০২১
  9. 1 2 الدكتور, عبد القادر بوباية ،الأستاذ (২০০৯)। الاكتفاء في اخبار الخلفاء 1-2 ج2। Dar Al Kotob Al Ilmiyah دار الكتب العلمية। পৃ. ৪৮৯।
  10. Richards, D.S. (২০১০)। The Chronicle of Ibn Al-Athir for the Crusading Period from Al-Kamil Fi'L-Ta'Rikh.: The Years 491-541/1097-1146 the Coming of the Franks and the Muslim Response। Crusade texts in translation। Ashgate। পৃ. ২৮৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৫৪৬-৬৯৫০-০

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]