আল-জাহশায়ারি
আল-জাহশায়ারি الجَهْشَيَاري | |
|---|---|
| জন্ম | |
| মৃত্যু | ৯৪২ |
| অন্যান্য নাম | মুহাম্মাদ আবু আবদুল্লাহ |
| পেশা | ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক, আব্বাসীয় কর্মকর্তা |
| কর্মজীবন | ৯০৮– ৯৪০ এর দশক |
| পরিচিতির কারণ | "কিতাব আল-উজারা ওয়াল-কুত্তাব" এর লেখক |
| পিতা-মাতা |
|
আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুস ইবনে আবদুল্লাহ আল-জাহশায়ারি (মৃত্যু ৯৪২) ছিলেন একজন আব্বাসীয় আমলা, ইতিাহাসবিদ ও সাহিত্যিক। তিনি "কিতাব আল-উজারা ওয়াল-কুত্তাব" (উজির ও লেখকদের বই) গ্রন্থ রচনা করেন।
জীবনী
[সম্পাদনা]আল-জাহশায়ারি তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানের কেন্দ্র কুফায় জন্মগ্রহণ করেন।[১] কুফা তখন ইসলামি শিক্ষা, ভাষাতত্ত্ব ও ফিকহের জন্য বিখ্যাত ছিল। তিনি “আল-জাহশায়ারি” নামে পরিচিত হন তাঁর পিতা আবদুসের একজন নিয়োগকর্তার নাম অনুসারে। তিনি ছিলেন আব্বাসীয় রাজপুত্র ও প্রধান সেনাপতি মুয়াফ্ফাকের (শা. ৮৭০–৮৯১) হাজিব (প্রধান দরবারি কর্মকর্তা) আবুল হাসান আলি ইবনে জাহশায়ারি। [২]
পেশাগত জীবনে আল-জাহশায়ারি ছিলেন একজন কাতিব (প্রশাসনিক লেখক/ সচিব)।[৩] ধীরে ধীরে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও দরবারি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আব্বাসীয় দরবারের অন্যতম শীর্ষ আমলায় পরিণত হন।[৪] তাঁর পিতা আবদুস আগে যে দায়িত্ব পালন করতেন, পরে তিনি সেই দায়িত্বই গ্রহণ করেন। তিনি খলিফা আল-মুক্তাদিরের (শাসন. ৯০৮–৯২৯; দ্বিতীয়বার ৯২৯–৯৩২) বিখ্যাত উজির আলি ইবনে ঈসা ইবনুল জাররাহের হাজিব হিসেবে ৯১৩ থেকে ৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ৯১৮ সালে তিনি আলি ইবনে ঈসার হুররাসের (ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনী) নেতৃত্ব দেন। পরে তিনি আরেক উজির হামিদ ইবনুল আব্বাসের হাজিব হিসেবে কাজ করেন।[৫] হামিদ ৯১৮ থেকে ৯২৩ সাল পর্যন্ত উজির পদে ছিলেন; যদিও বাস্তবে ক্ষমতার তখনো আলি ইবন ঈসার হাতেই ছিল। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। আল-জাহশায়ারি হামিদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইবনে মুকলাকে সমর্থন করতেন, যিনি উজির পদ লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করছিলেন। তাঁর এই সমর্থনের কারণে হামিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং সম্ভবত এ কারণেই তিনি পরে হামিদের অধীনে কাজ করা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে ইবনে মুকলা ৯২৮–৯৩০, ৯৩২ ও ৯৩৪–৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে একাধিকবার উজির হন। তখন আল-জাহশায়ারি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে ইবনে মুকলা যখন রাজনৈতিকভাবে অপমানের স্বীকার হন, তখন তিনি তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।[১]
৯৩০ সালে ইবনে মুকলা আল-জাহশায়ারিকে একটি বিশেষ সম্মান প্রদান করেন। সেই বছর ইরাক থেকে হজের মৌসুমে মক্কায় কাবার ছাদ ঢাকার জন্য ব্যবহৃত কিসওয়া (কালো কাপড়) বহনের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ইবনুল আসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, ইবনে মুকলা তাঁকে উপহার হিসেবে ২০০,০০০ দিনার প্রদান করেন।[৬]
তৎকালীন দরবারি রাজনীতি অত্যন্ত অস্থির ও ষড়যন্ত্রপূর্ণ ছিল। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার কারণে আল-জাহশায়ারিকে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয় এবং তাঁর প্রতি শত্রুভাবাপন্ন উজির ও আমিরুল উমারারা; যেমন ইবনে রাঈক (শা. ৯৩৬–৯৩৮, ৯৪১–৯৪২) ও বাজকাম (শা. ৯৩৮–৯৪১) তাঁর উপর জরিমানাও আরোপ করেন।[১]
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর ৯৪২ সালে তিনি রাজধানী বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন।[২]
অবদান
[সম্পাদনা]আল-জাহশায়ারি 'কিতাব আল-উজারা ওয়াল কুত্তাব' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যা মূলত প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আমলাতন্ত্র ও খিলাফতের প্রশাসনিক ইতিহাস নিয়ে রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ। এই বইটি ৯০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে লেখা হয়। তবে বর্তমানে যে সংস্করণটি টিকে আছে, তাতে আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদির শাসনামল (৭৪৫–৭৮৫ ) পর্যম্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।এছাড়া আল-জাহশায়ারি খলিফা আল-মুকতাদিরের (শা. ৯০৮–৯৩২) শাসনকাল সম্পর্কেও একটি ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত সেই গ্রন্থটি বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।[৭]
“কিতাব আল-উযারা ওয়াল-কুত্তাব” গ্রন্থে আল-জাহশায়ারি বিশেষভাবে খিলাফতের আমলা ব্যক্তিত্বদের সম্মান জানান এবং তাদের অবদান তুলে ধরেন। তিনি বার্মাকি পরিবারের বিশেষ প্রশংসা করেন, যারা আব্বাসীয় খলিফাদের সময়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও খ্যাতিমান উজিরের পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে তিনি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বনু আল-ফুরাত পরিবারের ব্যাপারে বেশ কঠোর সমালোচনা করেন। ইতিহাসবিদ হাগ ক্যানেডির মতে, আব্বাসীয় শাসনের প্রথম শতাব্দী (৭৫০–৮৫০) সম্পর্কে আল-জাহশায়ারির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত দরবারের ষড়যন্ত্র, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। তাঁর বর্ণনায় কেবল তৎকালীন দরবারি রাজনীতিতে বন্ধুত্ব, ঘৃণা ও ঈর্ষার মতো বিষয়াদি দেখা যায়। [৪]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 Stasolla 2012, পৃ. 223।
- 1 2 Stasolla 2012, পৃ. 226।
- ↑ Osti 2013, পৃ. 197।
- 1 2 Kennedy 2016, পৃ. 217।
- ↑ Stasolla 2012, পৃ. 223–224।
- ↑ Stasolla 2012, পৃ. 225।
- ↑ Bray 2019, পৃ. 286।
গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- Bray, Julia (২০১৯)। Stories of Piety and Prayer, Deliverance Follows Adversity: Al-Muḥassin ibn ʿAlī al-Tanūkhī। New York: New York University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৭৯৮৫৫-৯৬-৪।
- Kennedy, Hugh (২০১৬) [1981]। The Early Abbasid Caliphate: A Political History (Reprint সংস্করণ)। Abingdon, Oxon: Routledge (original publisher: Croom Helm)। আইএসবিএন ৯৭৮-১-১৩৮-৯৫৩২১-৫।
- Osti, Letizia (২০১৩)। "Culture, Education and the Court"। van Berkel, Maaike; El Cheikh, Nadia Maria; Kennedy, Hugh; Osti, Letizia (সম্পাদকগণ)। Crisis and Continuity at the Abbasid Court: Formal and Informal Politics in the Caliphate of al-Muqtadir (295-320/908-32)। Leiden: Brill। পৃ. ১৮৭–২১৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০-০৪-২৫২৭১-৪।
- Stasolla, Maria Giovanna (২০১২)। "How a Tenth-Century Learned Man Reads History: Al-Jahshiyari and the Barmakids"। Eurasian Studies। ১০ (1–2): ২২১–২৩।