বিষয়বস্তুতে চলুন

আল-খাসাকি মসজিদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আল-খাসাকি মসজিদ

جامع الخاصكي

সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ধারণকৃত আল-খাসাকি মসজিদের প্রবেশদ্বার

অবস্থান বাগদাদ / রুসাফা
স্থাপত্য তথ্য
ধরন ইসলামি
ভবনের উপকরণ ইট

আল-খাসাকি মসজিদ (আরবি: جامع الخاصكي) হলো ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক মসজিদ। এটি বাগদাদের রুসাফা অঞ্চলের মুস্তানসির স্ট্রিট এবং আল-রশিদ স্ট্রিটের মধ্যবর্তী 'রাস আল-কুরিয়া' নামক মহল্লায় অবস্থিত। মসজিদটি তার অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য পরিচিত। ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় আমলে নির্মিত এই মসজিদটি দীর্ঘকাল ধরে বাগদাদের ধর্মীয় ও শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।[]

ইতিহাস ও নির্মাণ

[সম্পাদনা]

আল-খাসাকি মসজিদটি ১০৯৪ হিজরি মোতাবেক ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের তৎকালীন উসমানীয় ওয়ালি (গভর্নর) মুহাম্মদ পাশা আল-খাসাকি কর্তৃক নির্মিত হয়। মুহাম্মদ পাশা আল-খাসাকি ছিলেন একজন শিল্পানুরাগী শাসক, যিনি বাগদাদের নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মসজিদটি নির্মাণের পর থেকে এটি বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে গেছে।

১৩০৯ হিজরি (১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে) মসজিদটির প্রথম বড় ধরনের সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে সময়ের বিবর্তনে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে ১৩৪৩ হিজরি (১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে) পুনরায় এর সংস্কার করা হয়। মসজিদের বর্তমান কাঠামোটি মূলত ১৩৯৩ হিজরি (১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে) ইরাকি ওয়াকফ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত ব্যাপক সংস্কারের ফসল। এই সংস্কারের সময় মসজিদের মূল প্রার্থনা কক্ষ (হারাম) এবং সম্মুখভাগের ব্যাপক পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন করা হয়।[]

স্থাপত্যশৈলী ও বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

আল-খাসাকি মসজিদের স্থাপত্যে উসমানীয় এবং স্থানীয় বাগদাদি নির্মাণশৈলীর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের প্রধান আকর্ষণ হলো এর সুদৃঢ় মিনার এবং একটি বিশাল গম্বুজ। মসজিদের নির্মাণে প্রধানত ঐতিহ্যবাহী 'তবুক' বা পোড়ামাটির ইট ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাগদাদের গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় মসজিদটিকে শীতল রাখতে সাহায্য করে।

ঐতিহাসিক মিহরাব

[সম্পাদনা]

এই মসজিদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ছিল এর প্রাচীন মিহরাবটি। এটি মার্বেল পাথরের তৈরি একটি অনন্য শিল্পকর্ম ছিল, যা ইসলামি চারুকলা ও ক্যালিগ্রাফির এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মিহরাবটি আব্বাসীয় আমলের স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব বহন করত। তবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরবর্তীতে এটিকে মসজিদ থেকে সরিয়ে ইরাক জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি আধুনিক মিহরাব স্থাপন করা হয়েছে।

আল-খাসাকি মাদ্রাসা

[সম্পাদনা]

মসজিদ সংলগ্ন ডান পাশে একটি ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ছিল, যা 'আল-খাসাকি মাদ্রাসা' নামে পরিচিত। এই মাদ্রাসাটি কয়েক শতাব্দী ধরে বাগদাদের উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। এখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ (ইসলামি আইন) এবং যুক্তিশাস্ত্র (মানতিক) পড়ানো হতো।

এই মাদ্রাসায় বাগদাদের প্রথিতযশা আলেম ও পণ্ডিতগণ শিক্ষকতা করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শেখ তাহের ইসমাইল আল-বারজানজি। এই মাদ্রাসার সর্বশেষ প্রধান শিক্ষক ছিলেন শেখ আব্দুল মাজিদ বিন আব্দুল মালিক (যিনি 'মালুকি' নামে পরিচিত ছিলেন)। তার মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ আব্দুল ওয়াহাব মালুকি শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ইরাক সরকারের এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাগদাদসহ সারা দেশের ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলে এই মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

মুহাম্মদ আল-আজহারীর মাজার

[সম্পাদনা]

মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রখ্যাত সুফি সাধক ও আলেম শেখ মুহাম্মদ আল-আজহারীর সমাধি অবস্থিত। শেখ ঈসা আল-বানদানিজি তার 'জামে আল-আনওয়ার' গ্রন্থে শেখ আজহারী সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি ছিলেন তার সময়ের একজন অনন্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং ওলি। তার পিতা ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক শেখ আবদুল কাদের জিলানীর অন্যতম সহচর। শেখ মুহাম্মদ আল-আজহারী বাগদাদেই মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে এই আল-খাসাকি মসজিদে সমাহিত করা হয়। যদিও তার সঠিক মৃত্যু তারিখ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই, তবে তার মাজারটি আজও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার স্থান।[]

বর্তমান অবস্থা

[সম্পাদনা]

বর্তমানে আল-খাসাকি মসজিদটি ইরাকের সুন্নি ওয়াকফ দিওয়ানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। যদিও আধুনিক সংস্কারের ফলে এর প্রাচীন অবয়বের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, তবুও এর মিনার এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামো আজও উসমানীয় যুগের স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। বাগদাদের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় এটি পথচারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ইবাদতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. كتاب مساجد بغداد - تأليف الدكتور يونس السامرائي - مساجد الرصافة القديمة، جامع الخاصكي - صفحة 270.
  2. دليل الجوامع والمساجد التراثية والأثرية - ديوان الوقف السني في العراق - صفحة 70.
  3. البغداديون أخبارهم ومجالسهم - إبراهيم عبد الغني الدروبي - مطبعة الرابطة - بغداد 1958م - صفحة 292.