আল্লোপনিষদ্

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আল্লাহ্‌ উপনিষৎ বা আল্লোপনিষদ্‌ হল ১০ শ্লোকের একটি "অর্বাচীন গ্রন্থ"।।

এটি সম্ভবত মুঘল যুগে আকবরের শাসনকালে রচিত হয়েছিল। কোন মূর্খ যে এই উপনিষদ লিখেছে কে জানে।

♠ সনাতন ধর্মে উপনিষদের মর্যাদা দেওয়া হয় বেদের পরের স্থানে। সনাতন ধর্মে ১২ টি মূখ্য "উপনিষদ" রয়েছে যেগুলো বেদের কোনো না কোনো শাখার সাথে যুক্ত। এগুলো প্রামাণ্য ও বৈদিক ভিত্তি সম্পন্ন।

কিন্তু দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের স্বার্থের জন্য বিভিন্ন বই রচনা করে সেগুলোকে "উপনিষদ" নামে চালিয়ে দেয়। এসব তথাকথিত(নামেমাত্র) ও বানোয়াট উপনিষদের মধ্যে একটি হচ্ছে--- "অল্লোপনিষদ"। যা একটি অর্বাচীন মাত্র ১০ শ্লোকের বই এবং উপনিষদ নামের সবচেয়ে হাস্যকর একটি বই।

♣ নিম্নে এই সম্পর্কে আলোচনা করা হলো---

★★ "অল্লোপনিষদ" হলো- আল্লা + উপনিষদ।

এখানে "আল্লা" হলো আরবি শব্দ এবং "উপনিষদ" হলো সংস্কৃত শব্দ। যে উপনিষদের নাম "আরবি শব্দ" ও "সংস্কৃত শব্দ" মিলে তৈরি হয় সে উপনিষদ কী করে কোনো হিন্দু ধর্মগ্রন্থ হতে পারে।। হিন্দুদের অন্য সব "উপনিষদ" শুধুমাত্র সংস্কৃত শব্দেই লেখা। সেখানে কোনো অন্য ধরনের শব্দ নেই। ঠিক যেরকম "পবিত্র বেদ" শুধুমাত্র সংস্কৃত শব্দে লেখা এবং "পবিত্র কোরআন" শুধুমাত্র আরবি শব্দতেই লেখা।

[ হিন্দুদের অন্যান্য সব ধর্মগ্রন্থ বহু প্রাচীন। যেমন:

( বেদ ও গীতা ঈশ্বর প্রদত্ত। ) রামায়ণ, মহাভারত, বারোটি মূখ্য উপনিষদ ইত্যাদি সবই বহু যুগ পুরোনো আর এইসব গ্রন্থ লিখে গেছেন এক একজন মহান মুনি-ঋষি।। ]


♠ প্রথম কথাঃ ♠

♣ অল্লোপনিষদের ১ম শ্লোকে বলা হয়েছে--- "অস্মাল্লাং ইল্লে মিত্রাবরুণা দিব্যনি ধত্তে।।"

এই শ্লোকে "অস্মাল্লাং" ও "ইল্লে" ইহা "আরবী শব্দ" এবং "মিত্রাবরুণা দিব্যনি ধত্তে" ইহা "সংস্কৃত শব্দ"।

উপরের শ্লোকটি বিচার করলে দেখা যাবে--- এটি বেদ ও ব্যাকরণ বিরুদ্ধ।।


♠ দ্বিতীয় কথাঃ ♠

♣ অল্লোপনিষদের ৩য় শ্লোকে বলা হয়েছে--- "অল্লোরসূল মহামদরকবরস্য অল্লো অল্লাম্।।"

মহামদরকবরস্য = মহামদ + আকবর + অস্য।

অল্লোরসূল মহামদরকবরস্য = ( মহামদ আকবর হচ্ছে আল্লাহর রাসুল।)

উল্লেখ্য, এখানে "আকবর" পদটি হচ্ছে NOUN (বিশেষ্য)। যদি এটি PRONOUN (বিশেষণ) হয় তবে তার দ্বারা "হযরত মুহাম্মদ" বুঝায় না। "হযরত" একটি আরবি সম্মানসূচক উপাধি। এর অর্থ হলো-- মহামান্য, সম্মানীয়।

[[ এছাড়াও এখানে "আকবর" পদটি কোনো বিশেষণ হতে পারে না। তার কারণ হলো-- "আকবর" একটি ইসলামিক শব্দ। এর আসল অর্থ হলো-- সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক। যা শুধু আল্লাহর উপর প্রযোজ্য। ]]

যেমন: আল্লাহু আকবর।

এর মানে হলো "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ"। ফলে এটি যদি হযরত মুহাম্মদের উপরে প্রযোজ্য হয় তবে এটি বলতে হবে যে-- মুহাম্মদ আকবর বা মহামদ আকবর। তাহলে এর মানে দাঁড়ায় -- "মুহাম্মদ সর্বশ্রেষ্ঠ"।

{{ ফলে আল্লাহর সাথে "হযরত মুহাম্মদ" এর সমতুল্লতা সৃষ্টি হবে। যা ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায় হবে। কারণ--- হযরত মুহাম্মদ হলেন শুধুমাত্র "আল্লাহর দূত"। হযরত মুহাম্মদ "সর্বশ্রেষ্ঠ নন"। এই সব কারণেই হিন্দু ও মুসলমান কাররই এই অল্লোপনিষদের উপর বিশ্বাস করা উচিত নয়। }}

{ যে সব মানুষ "অল্লোপনিষদ" নিয়ে নাচানাচি করে তারা মূলত সম্রাট আকবরকে "রাসুল" মেনে নিচ্ছে। যা ইসলামের মৌলিক সিদ্ধান্তের বিপরীতে যাচ্ছে।।

★ "স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী" তার "সত্যার্থ প্রকাশ" গ্রন্থে বলেছেন যে--- অল্লোপনিষদ "উপনিষদ" শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনকি এটি অথর্ববেদের সঙ্গেও যুক্ত নয়। এটি মুঘল যুগে সম্রাট আকবরের শাসনকালে রচিত হয়েছিল।। }

রচয়িতা ও প্রামাণ্যতা সম্পর্কে মতামত[সম্পাদনা]

ধর্মতত্ত্ববিদ আর. অনন্তকৃষ্ণ শাস্ত্রী লিখেছেন ভারতে মুসলমানদের শাসনামলে "আর্য পণ্ডিতরা শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে" এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। তিনি আরও বলেছেন যে, এই গ্রন্থটি "সাধারণ উপনিষদ্‌গুলির রচনাভঙ্গি অনুসরণ করে লেখা হয়নি" এবং এই গ্রন্থে ব্যবহৃত শব্দগুলি "শুনতে অনেকটা আরবির মতো।"[১] ভট্টাচার্য ও সরকার আল্লোপনিষদ্‌কে "ইসলামি রচনা" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, আকবরের কোনো হিন্দু সভাসদ এটিকে "অথর্ববেদের একটি অপ্রামাণিক অধ্যায়" হিসেবে রচনা করেন। চার্লস এলিয়টের মতে, এই গ্রন্থটি সম্ভবত দীন-ই-ইলাহি ধর্মীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং "এবং একটি অণুকরণ মাত্র।"[২] স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছেন যে, আল্লোপনিষদ্‌ যে অনেক পরবর্তীকালের রচনা তার প্রমাণ রয়েছে। তিনি শুনেছিলেন আকবরের রাজত্বকালে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে এই উপনিষদ্‌টি রচিত হয়েছিল।[৩] সদাশিবন লিখেছেন, আকবর যখন নতুন ধর্ম নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন, তখন ব্রাহ্মণেরা তার জন্য এই গ্রন্থটি রচনা করেন।[৪] দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আকবরের রাজত্বকালে হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে এই গ্রন্থটি রচিত হয়।[৫] বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে, আল্লোপনিষদ্‌ ছিল "ভারতের মুসলমান শাসকদের কিছু তোষামোদকারীর নির্লজ্জ রচনা।"[৬] আব্রাহাম ইর‍্যালি লিখেছেন যে, মুঘল যুগে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে কিছু আন্তঃসাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের উদ্যোগ। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি সম্প্রদায়কে কাছাকাছি আনা।[৭]

'বেদাচার্য' 'বেদবিশারদ' দূর্গাদাস লাহিড়ীর পৃথিবীর ইতিহাস প্রথম খণ্ড ৬৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন যে"পরবর্ত্তীকালে উপনিষৎ-সম্বন্ধে অনেক ব্যভিচার ঘটিয়াছিল;-এমন কি,তখন যে কোনও ব্যক্তি আপন মত-প্রতিষ্ঠার জন্য উপনিষদ নামে গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন।অল্লোপনিষৎ প্রভৃতিই ইহার প্রমাণ। কথিত হয় হিজরি ৯৮৩ সালে (১৫৭৫) খ্রিঃ সম্রাট আকবর বাদায়ুনী নামক জনৈক মুসলমানকে অর্থববেদের অনুবাদ করিতে বলেন। ইসলাম ধর্মের সহিত অথর্ববেদের কতকগুলি ধর্মোপদেশের ঐক্য আছে-শুনিতে পাইয়া বাদশাহ সেই আদেশ প্রদান করিয়াছিলেন।অনুবাদকালে বাদায়ুনী অথর্ববেদের অর্থ উপলব্ধি করিতে পারেন না।তখন ফৈজি ও ইব্রাহিমের উপর সেই অনুবাদের ভার ন্যস্ত হয়।কিন্তু তাঁহারাই বা কি করিবেন? ইতিমধ্যে ভাবন নামক জনৈক দক্ষিণ-দেশীয় ব্রাহ্মণ,মুসলমান ধর্ম্ম অবলম্বন করেন।তখন তাঁহারই সাহায্যে পারস্য ভাষায় অথর্ব্ববেদের অনুবাদ আরম্ভ হয়। বাদায়ুনী এবং ইব্রাহিমকে শেখ ভাবন যেরুপভাবে বুঝাইয়া দিতেন,তাঁহারা সেই ভাবেই অনুবাদ কার্য্য সম্পন্ন করিয়া যাইতেন। সেই অনুবাদের সময় বেদের এক স্থানে কোরাণের 'লা ইল্লাহ্' বচনের মত কোনও অংশ দেখিতে পাইয়া, শেখ ভাবন তাহার রুপান্তর সংঘটিত করেন।অনেকে,ভাবনের  কৌশল বুঝিতে না পারিয়া,সত্য সত্যই বেদে 'আল্লার' কথা আছে মনে করিয়া,ভ্রমে পতিত হয়;এবং তদনুসারে মুসলমান ধর্ম্ম গ্রহণ করে।অর্থবব্বেদের যে দুইটি মন্ত্রের উপর নির্ভর করিয়া শেখ ভাবন আপনার উদ্দেশ্য-সিদ্ধি করিয়াছিলেন,সে দুইটি মন্ত্র এইঃ"আদলাবুক-মেককং। অলাবুক নিখাতং"। এই হইতে প্রথমে "আদল্লাবুকমেককং। অল্লাং বুকং"ইত্যাদি বাক্যের সৃষ্টি হয়; এবং পরিশেষে 'অল্লোপনিষৎ' রচিত হইয়া থাকে। অল্লোপনিষদের উপসংহারে পরিবর্ত্তনের মাত্রা চরম পন্থা পরিগ্রহ করে। তাহাতে লিখিত হয়,-"ইল্লাকবর ইল্লাকবর ইল্লল্লেতি ইল্লাল্লাঃ ইল্লা ইল্লাল্লা অনাদিস্বরুপা অথর্ব্বনী শাখাং হ্রং হ্রীং জনান্ পশূন্ সিদ্ধান্ জলচরান্ অদৃষ্টং কুরু কুরু ফট।"অর্থাৎ আকবর বাদশাহ পর্য্যন্ত উপনিষদে স্থান লাভ করেন।ইহার অধিক শাস্ত্রের দুর্দশা আর কি হইতে পারে?"

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sastri, R Ananthakrishna (১৮৯৮)। "Allopanishad or Mahomed Upanishad"The Theosophist। Madras, India: Theosophical Publishing House। XIX: 177। সংগ্রহের তারিখ মে ১, ২০১২ 
  2. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; eliotp270 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  3. Vivekananda, Swami (১৯০৮)। Lectures from Columbo to Almora: Issue 16 of Himalayan series। Madras, India: Prabuddha Bharata Press। পৃষ্ঠা 123। সংগ্রহের তারিখ মে ১, ২০১২ 
  4. Sadasivan, S. N. (২০০০)। A Social History Of India (Illustrated সংস্করণ)। New Delhi, India: APH Publishing। পৃষ্ঠা 178। আইএসবিএন 978-81-7648-170-0 
  5. Tagore, Satyendranath; Devi, Indira (২০০৬)। The Autobiography Of Devendranath Tagore (Reprint সংস্করণ)। Whitefish, Montana, USA: Kessinger Publishing। পৃষ্ঠা 74। আইএসবিএন 978-1-4286-1497-0 
  6. Bijlert, Viktor A. van (১৯৯৬)। "Sanskrit and Hindu National Identity in Nineteenth Century Bengal"। Houben, Jan E. M.। Ideology and Status of Sanskrit: Contributions to the History of the Sanskrit Language: Volume 13 of Brill's Indological Library (Illustrated সংস্করণ)। Leiden, The Netherlands: E. J. Brill। পৃষ্ঠা 358আইএসবিএন 978-90-04-10613-0 
  7. Abraham Eraly, The Mughal World: Life in India's Last Golden Age, Penguin Books India 2007