বিষয়বস্তুতে চলুন

আলেকজান্ডারের তোরণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জুলকারনাইন জ্বীনদের সহায়তায় ইয়াজুজ মাজুজ প্রতিহত করার জন্য একটি প্রাচীর নির্মাণ করছেন। এটি ফালনামা গ্রন্থের একটি ফার্সি ক্ষুদ্র শিল্পকর্ম, যা সাফাভীয় শাহ প্রথম তাহমাস্প (রাজত্বকাল ১৫২৪–১৫৭৬)-এর জন্য অনুলিপি করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি ডাবলিনের চেস্টার বেটি গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে।

আলেকজান্ডারের তোরণ, যা কাস্পিয়ান তোরণ নামেও পরিচিত, হলো পূর্ব আনাতোলিয়া, ককেশাস এবং পারস্যের কয়েকটি গিরিপথের মধ্যে একটি। এটিকে প্রায়শই একটি প্রকৃত দুর্গ অথবা সভ্য জগৎকে অসভ্য জগৎ থেকে পৃথককারী একটি প্রতীকী সীমানা হিসেবে কল্পনা করা হয়।[] মূল আলেকজান্ডারের তোরণ ছিল কাস্পিয়ান সাগরের ঠিক দক্ষিণে, রাগায়ে নামক স্থানে, যেখানে আলেকজান্ডার মহামতি রাজা তৃতীয় দারিয়ুসকে তাড়া করতে গিয়ে অতিক্রম করেছিলেন।[] পরবর্তীকালে, আলেকজান্ডার সম্পর্কিত আরও কল্পনাপ্রবণ ঐতিহাসিকরা এই নামটি কাস্পিয়ান সাগরের অপর প্রান্তে অবস্থিত ককেশাস পর্বতমালার গিরিপথগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেন।

অন্তত খ্রিস্টীয় ১ম শতক থেকে ককেশাস ও আনাতোলিয়ার বিভিন্ন গিরিপথকে "আলেকজান্ডারের তোরণ" নামে অভিহিত করা হয়।[] পরবর্তীকালে, কাস্পিয়ান তোরণকে কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত দারবান্দ গিরিপথের (আধুনিক দাগেস্তান) সাথে; অথবা জর্জিয়া এবং উত্তর ওশেটিয়া আলানিয়ার মধ্যবর্তী দারিয়েল গিরিখাতের সাথেও চিহ্নিত করা হতো। প্রচলিত ধারণা অনুসারে এটিকে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত গোরগানের মহাপ্রাচীরের সাথেও সংযুক্ত করা হয়, যা 'লাল সাপ' নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সাসানীয় ইরানিদের দ্বারা নির্মিত প্রতিরক্ষা লাইনের অংশ ছিল, অপরদিকে গোরগানের মহাপ্রাচীরটি সম্ভবত পার্থিয়ানরা নির্মাণ করেন।

"আলেকজান্ডারের শিং" -এর মতো অন্যান্য মোটিফগুলোর পাশাপাশি "আলেকজান্ডারের তোরণ" আলেকজান্ডারের কিংবদন্তিগুলোর সাথে সাধারণভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে, যেমনটি "আলেকজান্ডার রোমান্স", "সিরিয়াক আলেকজান্ডার রোমান্স" এবং "কিসসাত জুলকারনাইন"-এ দেখা যায়।

সাহিত্যিক ঐতিহ্য

[সম্পাদনা]
আলেকজান্ডারের তোরণ সাধারণত দারবান্দের দুর্গপ্রাচীরের সঙ্গে অভিন্ন বলে বিবেচিত হয়।

প্লিনি দ্য এল্ডার

[সম্পাদনা]

প্লিনি দ্য এল্ডার (২৩ খ্রিস্টাব্দ – ২৫ আগস্ট ৭৯ খ্রিস্টাব্দ) তার 'ন্যাচারাল হিস্ট্রি' গ্রন্থে বলেন যে, আলেকজান্ডার কাস্পিয়ান তোরণ অতিক্রম করেছিলেন। তিনি এটিকে ককেশাস তোরণ থেকে পৃথক বলে উল্লেখ করেন, যা একটি দ্বিধাবিভক্ত পর্বতশৃঙ্খলের মধ্যে অবস্থিত এক বিশাল প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, এখানে একটি ভয়ানক দুর্গন্ধযুক্ত নদীর উপরে লোহা-আচ্ছাদিত কড়িকাঠযুক্ত তোরণ স্থাপন করা হয়, সাথে অসংখ্য উপজাতির যাতায়াত রোধ করার জন্য একটি দুর্গও রয়েছে। এই তোরণ পৃথিবীকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছে।[]

জোসেফাস

[সম্পাদনা]

১ম শতাব্দীর একজন ইহুদি ঐতিহাসিক জোসেফাস, আলেকজান্ডারের নির্মিত তোরণের প্রথম বিদ্যমান তথ্যসূত্র প্রদান করেন, যা সিথিয়ানদের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক হিসেবে তৈরি করা হয়।[] এই ঐতিহাসিকের মতে, গ্রিকরা যাদের সিথিয়ান বলত, তারা মাজুজাইটস নামে পরিচিত ছিল, যারা হিব্রু বাইবেলে উল্লিখিত মাজুজ নামক গোষ্ঠীর বংশধর। জোসেফাস তার দুটি গ্রন্থে এই উল্লেখগুলো করেন। 'দ্য জিউইশ ওয়ার' গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, আলেকজান্ডারের নির্মিত লোহার তোরণ হাইরকানিয়ার (কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত) রাজা নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং অ্যালানদের (যাদের জোসেফাস একটি সিথিয়ান উপজাতি বলে মনে করতেন) সেই তোরণ অতিক্রম করার অনুমতি দেওয়ার ফলেই মিডিয়া লুণ্ঠিত হয়েছিল। জোসেফাসের 'অ্যান্টিকুইটিস অফ দ্য জিউস' গ্রন্থে দুটি প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদ রয়েছে; একটিতে সিথিয়ানদের বংশপরিচয় ইয়াফেসের পুত্র মাজুজের বংশধর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং অন্যটিতে আর্মেনীয় যুদ্ধের সময় টাইবেরিয়াসের সহযোগী সিথিয়ানদের দ্বারা কাস্পিয়ান তোরণ লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে।[][]

সিউডো-হেগিসিপ্পাস

[সম্পাদনা]

সিউডো-হেগিসিপ্পাস অ্যালানদের বর্ণনায় জোসেফাসকে অনুসরণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আলেকজান্ডার এই বর্বর গোষ্ঠীটিকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য একটি লৌহ তোরণ নির্মাণ করেন। এই তোরণটির দুটি উল্লেখের মধ্যে প্রথমটিতে, সিউডো-হেগিসিপ্পাস এর অবস্থান তোরোস পর্বতমালায় বলে উল্লেখ করেন। এই বিষয়টি অরোন্তেসের তীরে আন্তাখ্যা শহর প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলেকজান্ডারের আলোচনার প্রসঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে এবং এটি আলেকজান্ডারকে কেবল সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই নয়, বরং এর রক্ষাকর্তা হিসেবেও চিত্রিত করে। দ্বিতীয় উল্লেখটিতে জানানো হয় যে, আলেকজান্ডার অ্যালানদের অন্যান্য অসভ্য জাতিগুলির সাথে আবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু হয় ঘুষের কারণে অথবা রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে, তারা হাইরকানিয়ার রাজাকে তাদের সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে দিতে প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়েছিল। সিউডো-হেগিসিপ্পাস মূলত আলেকজান্ডারের প্রাচীরের পেছনে ইয়াজুজ মাজুজ সম্পর্কিত মহাপ্রলয়মূলক বর্ণনার বিকাশের পূর্বাভাস দেন; কেননা তিনিই প্রথম তার লেখায় এই ধারণাটি উপস্থাপন করেন যে, প্রাচীরের ওপারে অবস্থিত সেই জাতিগোষ্ঠী বাস্তবিকই ঐ প্রাচীরের পেছনে আবদ্ধ বা বন্দি করে রাখা হয়েছে।[]

জেরোম

[সম্পাদনা]

চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে জেরোম তার ৭৭তম পত্রে উল্লেখ করেন যে, "আলেকজান্ডারের তোরণ ককেশাসের ওপারের বন্য জাতিদের আটকে রাখে।" সিউডো-হেগিসিপ্পাসের মতোই, এবং সিরীয় গির্জার পরবর্তী ঐতিহ্যগুলোর বিপরীতে, জেরোম মহাপ্রলয়ের পরিবর্তে সভ্যতা ও বর্বরতা বিষয়ক গ্রিক-রোমান আলোচনা নিয়েই বেশি মনোযোগী ছিলেন।[]

জর্ডানেস

[সম্পাদনা]

জর্ডানেস ছিলেন ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন বাইজেন্টাইন লেখক। তার লেখা ‘গেটিকা' নামক লাতিন গ্রন্থে আমাজনদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় তিনি লেখেন যে, আলেকজান্ডার একজোড়া তোরণ নির্মাণ করেন এবং সেগুলোর নাম দেন কাস্পিয়ান তোরণ। তিনি আরও বলেন, এই তোরণগুলো রোমান জর্জিয়ার লাজ জনগোষ্ঠী পাহারা দিতো।[]

রব্বানিক সাহিত্য

[সম্পাদনা]
১৯০৬ সালের পূর্বে দারিয়াল গিরিখাত

ইয়াজুজ মাজুজকে বন্দি ও আবদ্ধ করার জন্য আলেকজান্ডারের প্রাচীর নির্মাণের কাহিনীটি রব্বানিক সাহিত্যে (ইহুদি ধর্মীয় সাহিত্যে) অনুপস্থিত।[]

টিবুর্তাইন সিবিল

[সম্পাদনা]

আরও পরোক্ষভাবে, টিবুর্তাইন সিবিল উল্লেখ করেন যে, আলেকজান্ডার উত্তর দিক থেকে তাদের আক্রমণ ঠেকাতে ইয়াজুজ মাজুজ জাতিকে “আবদ্ধ” করেছিলেন; এই বিষয়টি এই ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে ভবিষ্যতে কোনো এক সময় তারা আবার জেগে উঠবে এবং সেই অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে।[]

কুরআন

[সম্পাদনা]

ঘটনাটি কুরআনের সূরা কাহফে (আয়াত ৮৩ থেকে ৯৮ পর্যন্ত) উল্লেখ করা হয়েছে:

৮৩. আর তারা আপনাকে জুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে। বলুন, আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করব।
৮৪. আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পন্থা নির্দেশ করেছিলাম।
৮৫. অতঃপর সে একটি পথ অবলম্বন করলো।
৮৬. অবশেষে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছালো, তখন সে সূর্যকে একটি কর্দমাক্ত পানির ঝর্ণায় ডুবতে দেখতে পেল এবং সে এর কাছে একটি জাতির দেখা পেল। আমি বললাম, ‘হে জুলকারনাইন, তুমি তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারো অথবা তাদের ব্যাপারে সদাচরণও করতে পারো’।
৮৭. সে বললো, ‘যে ব্যক্তি অন্যায় করবে আমি তাকে শাস্তি দিব। অতঃপর সে তার রবের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন আযাব দেবেন’।
৮৮. ‘আর যে ব্যক্তি ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার। আর আমি আমার ব্যবহারে তার সাথে নরম কথা বলব’।
৮৯. অতঃপর সে আরেক পথ অবলম্বন করলো।
৯০. অবশেষে সে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
৯১. প্রকৃত ঘটনা এটাই। আর তার নিকট যা ছিল, আমি সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত।
৯২. অতঃপর সে আরেকটি পথ অনুসরণ করল।
৯৩. অবশেষে যখন সে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছল, তখন সেখানে সে এমন এক জাতিকে পেল, যারা তার কথা তেমন একটা বুঝতে পারছিল না।
৯৪. তারা বলল, ‘হে জুলকারনাইন! নিশ্চয়ই ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে, তাই আমরা কি আপনাকে এ জন্য কিছু খরচ দেব যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটা প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন’?
৯৫. সে বলল, ‘আমার রব আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, সেটাই উত্তম। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করো। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব’।
৯৬. ‘তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও’। অবশেষে যখন সে দু’পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গা সমান করে দিল, তখন সে বলল, ‘তোমরা ফুঁক দিতে থাক’। অতঃপর যখন সে তা আগুনে পরিণত করল, তখন বলল, ‘তোমরা আমাকে কিছু তামা দাও, আমি তা এর উপর ঢেলে দেই’।
৯৭. এরপর ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীর অতিক্রম করতে পারলো না এবং তাতে কোনো ছিদ্রও করতে পারল না।
৯৮. সে [জুলকারনাইন] বলল, ‘এটা আমার রবের অনুগ্রহ। অতঃপর যখন আমার রবের ওয়াদাকৃত সময় আসবে তখন তিনি তা মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন। আর আমার রবের ওয়াদা সত্য’।

সূরা কাহফ, আয়াত: ৮৩–৯৮

ধারণা করা হয় যে, জুলকারনাইন হলেন মহান আলেকজান্ডার (ইস্কান্দার আল-মাকদুনি), যদিও অন্য অনেকে মনে করেন তিনি ছিলেন ফার্সি রাজা খসরু (কিসরা)।[১০]

পরবর্তী মধ্যযুগীয় সাহিত্য

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগে, আলেকজান্ডারের তোরণের কাহিনী মার্কো পোলোর ভ্রমণ এবং স্যার জন ম্যান্ডেভিলের ভ্রমণের মতো ভ্রমণ-সাহিত্যসমূহে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে, প্রাচীরের আড়ালে আটকে থাকা জাতিগুলির পরিচিতি সর্বদা একরকম ছিল না; ম্যান্ডেভিল দাবি করেন যে ইয়াজুজ মাজুজ মূলত ইসরায়েলের দশ নিখোঁজ বংশ, যারা শেষ সময়ে তাদের কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে তাদের সহযোগী ইহুদিদের সাথে একত্রিত হয়ে খ্রিস্টানদের আক্রমণ করবে। পোলো আলেকজান্ডারের লৌহ তোরণের কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি বলেন যে কোমানিয়ানরা হলো সেই জাতি যারা এর আড়ালে আটকে আছে। তবে, তিনি ইয়াজুজ মাজুজের কথাও উল্লেখ করেন, যাদেরকে তিনি ক্যাথের উত্তরে স্থান দেন। কিছু পণ্ডিত এটিকে চীনের মহাপ্রাচীরের একটি অস্পষ্ট এবং বিভ্রান্তিকর উল্লেখ বলে মনে করেন, যা তিনি অন্যভাবে কোথাও উল্লেখ করেননি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] আলেকজান্ডারের তোরণ পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে একজন মহান রাজার একটি বিশাল প্রাচীর নির্মাণের চীনা গল্পসমূহকে ব্যাখ্যা করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। কম্পাস এবং দক্ষিণ-নির্দেশক রথের মতো চীনা উদ্ভাবনের জ্ঞান ইউরেশীয় বাণিজ্য পথ ধরে ছড়িয়ে যায় (এবং এর ফলে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি হয়েছিল)।

অন্যান্য মধ্যযুগীয় সাহিত্য, যেমন সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে রচিত লাতিন ফ্রাঙ্কিশ ক্রনিকল অফ ফ্রেডেগার এবং দশম শতাব্দীর আর্মেনিয়ান হিস্টোরি অফ মোভসেস ডাসখুরান্সি, আলেকজান্ডারের তোরণকে বিশেষ করে হিরাক্লিয়াসের রাজত্বকালের ঘটনার সাথে সংযুক্ত করে। এই হিরাক্লিয়াস ছিলেন সেই বাইজেন্টাইন সম্রাট যিনি ৭ম শতাব্দীর প্রথম দশকে তাদের মহাযুদ্ধে সাসানীয় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন।[১১]

মধ্যযুগীয় জার্মান কিংবদন্তি “লাল ইহুদি” আংশিকভাবে আলেকজান্ডারের তোরণ সম্পর্কিত কাহিনির উপর ভিত্তি করে গঠিত ছিল। এই কিংবদন্তিটি সপ্তদশ শতাব্দীর আগেই বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ভৌগোলিক সনাক্তকরণ

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগ

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগীয় বিশ্বের মানচিত্রসমূহে, ইয়াজুজ মাজুজের ভূমি সাধারণত এশিয়ার সুদূর উত্তর, উত্তর-পূর্ব অথবা পূর্বাঞ্চলে এমন একটি এলাকা হিসেবে প্রদর্শিত হতো, যা পর্বতমালা বা দুর্গ দ্বারা বেষ্টিত এবং যেখানে প্রায়শই একটি তোরণ চিত্রিত থাকত। ১০ম শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া আরব বিশ্বের মানচিত্রসমূহে এটি এইভাবেই চিত্রিত হয়েছে, এবং সিসিলির দ্বিতীয় রজারের জন্য ১১৪৪ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ আল-ইদ্রিসি কর্তৃক অঙ্কিত অত্যন্ত প্রভাবশালী মানচিত্র 'তাবুলা রোজারিয়ানা'-তেও একইভাবে প্রদর্শিত।[১২]

আধুনিক

[সম্পাদনা]
কাস্পিয়ান তোরণ: দারিয়াল গিরিখাত, দারবান্দ, রায়েগে, গোর্গনের প্রাচীর।
( আইবেরিয়া; হাইরকানিয়া)[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

জোসেফাস যখন কাস্পিয়ান তোরণের বর্ণনা করেন, তখন তিনি ঠিক কোন স্থানটিকে বুঝিয়েছিলেন তা স্পষ্ট নয়। এটি হয়তো দারবান্দ তোরণ হতে পারে (যা ঠিক পূর্বে, পারস্যের কাছাকাছি অবস্থিত), অথবা এটি দারিয়াল গিরিখাত হতে পারে, যা পশ্চিমে ইবেরিয়ার সীমান্তে, বর্তমান ইঙ্গুশেতিয়া এবং জর্জিয়ার মধ্যে অবস্থিত।

তবে, এই দুটির কোনোটিই হাইরকানিয়ার মধ্যে ছিল না, বরং এর সীমানার উত্তর ও পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। আরেকটি মত হলো, এটি হাইরকানিয়ার কেন্দ্রস্থলে, ইরানের রেগার কাছাকাছি, জগ্রোস পর্বতমালার কোনো এক গিরিপথ।[১৩]

দারবান্দ

[সম্পাদনা]

আলেকজান্ডারের তোরণ দারবান্দের কাস্পিয়ান তোরণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যার উত্তরমুখী ৩০টি মিনার একসময় কাস্পিয়ান সাগর এবং ককেশাস পর্বতমালা জুড়ে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং কার্যকরভাবে ককেশাসের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে দিত।

দারবান্দ একটি সাসানীয় পারস্য দুর্গকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল, যা গোকতুর্কদের আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার একটি কৌশলগত অবস্থান হিসাবে কাজ করত। ঐতিহাসিক কাস্পিয়ান তোরণ সম্ভবত আলেকজান্ডারের সময়ের অনেক পরে, ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রথম খসরুর রাজত্বকাল পর্যন্ত নির্মিত হয়নি, কিন্তু পরবর্তী শতকগুলোতে এর কৃতিত্ব তাকেই দেওয়া হতে থাকে। ব্যবহারের সময় এই বিশাল প্রাচীরের উচ্চতা ২০ মিটার পর্যন্ত এবং পুরুত্ব প্রায় ১০ ফুট (৩ মিটার) ছিল।

দারিয়াল

[সম্পাদনা]

দারিয়াল গিরিখাত অথবা দারিয়াল, আলেকজান্ডারের তোরণ নামেও পরিচিত এবং কাস্পিয়ান তোরণের পরিচয় নির্ধারণের জন্য এটি একটি জোরালো সম্ভাব্য স্থান।[১৪]

গোর্গনের প্রাচীর

[সম্পাদনা]

একটি বিকল্প মতানুসারে, কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত তথাকথিত "আলেকজান্ডারের তোরণ" গোর্গনের মহাপ্রাচীরের সাথে সংযুক্ত করে, যার প্রায় ১৮০ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে।[১৫]

গোর্গনের মহাপ্রাচীর পার্থিয়ান রাজবংশের সময়কালে চীনের মহাপ্রাচীরের নির্মাণের সাথে একই সময়ে তৈরি হয় এবং পরবর্তীকালে এটি সাসানীয় যুগে (৩য় থেকে ৭ম শতক পর্যন্ত) পুনর্নির্মাণ করা হয়।[১৬]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. যোসেফাস, ইহুদিদের প্রাচীন ইতিহাস ১.১২৩ এবং ১৮.৯৭; ইহুদি যুদ্ধ ৭.২৪৪–৫১

উদ্ধৃতি

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 স্টোনম্যান, রিচার্ড; নাওওটকা, ক্রিজস্টোফ; ভইচেখোভস্কা, আগ্নিয়েস্কা (২০১৮)। "প্রাচীন বর্ণনা"। দ্য আলেকজান্ডার রোমান্স: ইতিহাস ও সাহিত্য। গ্রোনিংগেন: বার্কহুইস ও গ্রোনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার। পৃ. ২০৫–২০৬। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৪-৯২৪৪৪-৭১-৪
  2. অ্যান্ডারসন, অ্যান্ড্রু রাননি (১৯২৮)। "কাস্পিয়ান গেটে আলেকজান্ডার"আমেরিকান ফিলোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের লেনদেন ও কার্যবিবরণী৫৯: ১৩০–১৬৩। ডিওআই:10.2307/282983জেস্টোর 282983
  3. মেসার্ভ, মার্গারেট (২০০৯)। পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক চিন্তায় ইসলামের সাম্রাজ্যসমূহ। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। পৃ. ২৫২–২৫৩। আইএসবিএন ৯৭৮০৬৭৪০৪০৯৫৩
  4. প্রাচীন লেখক প্লিনি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি গ্রন্থের ৬.১২ ও ৬.১৫ অধ্যায়; উদ্ধৃত হয়েছে মেসার্ভ, মার্গারেট (২০০৮)। Empires of Islam in Renaissance historical thought। যুক্তরাষ্ট্র: হার্ভার্ড হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজ। পৃ. ২৪৯–২৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৭৪-০২৬৫৬-৮
  5. মেসার্ভ, মার্গারেট। Empires of Islam in Renaissance historical thought। যুক্তরাষ্ট্র: হার্ভার্ড হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজ। পৃ. ২৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৭৪-০২৬৫৬-৮
  6. বাইটেনহলৎস ১৯৯৪, পৃ. ১২২।
  7. 1 2 স্টোনম্যান, রিচার্ড; নাওওটকা, ক্রিশতোফ; ভইচেখোভস্কা, অগ্নিয়েস্কা (২০১৮)। "প্রাচীন বর্ণনা"। আলেকজান্ডার রোমান্স: ইতিহাস ও সাহিত্য। গ্রোনিঙ্গেন: বার্কহাউস ও গ্রোনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার। পৃ. ২০৮–২১২। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৪-৯২৪৪৪-৭১-৪
  8. Dickens, Mark (২০২৩)। "Gog and Magog in Syriac Literature II: Literature Connected to the Alexander Legend Prior to Michael the Syrian"। Tamer, Georges; Mein, Andrew; Greisiger, Lutz (সম্পাদকগণ)। Gog and Magog: contributions toward a world history of an apocalyptic motif। বার্লিন বোস্টন: De Gruyter। পৃ. ১৫৬, নং ৯। আইএসবিএন ৯৭৮৩১১০৭২০১৫০
  9. Tesei, Tommaso (২০২৩)। The Syriac Legend of Alexander's Gate। Oxford University Press। পৃ. ১১৯।
  10. Dathorne, O. R. (১৯৯৪)। Imagining the World: Mythical Belief Versus Reality in Global Encounters। Greenwood। পৃ. ৪৫–৪৬। আইএসবিএন ০৮৯৭৮৯৩৬৪৬। ১৭ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
  11. Tesei, Tommaso (২০২৩)। The Syriac Legend of Alexander's Gate। Oxford University Press। পৃ. ২৮।
  12. Gow 1998, পৃ. 68–70.
  13. Van Donzel ও Schmidt 2010, পৃ. 11।
  14. Anderson (1932), পৃ. 15-20।
  15. Kleiber 2006
  16. Omrani Rekavandi, H.; Sauer, E.; Wilkinson, T. ও Nokandeh, J. (২০০৮)। “রেড স্নেকের রহস্য: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সীমান্ত প্রাচীর উন্মোচন”কারেন্ট ওয়ার্ল্ড আর্কিয়োলজি, নং ২৭, ফেব্রুয়ারি/মার্চ ২০০৮, পৃষ্ঠা ১২–২২। পিডিএফ ৫.৩ এমবি ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে। পৃ. ১৩।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]