আলী ইবনে তাউস আল-হিল্লি
সাইয়্যেদ রাদিউদ্দিন আলী ইবনে মুসা ইবনে তাউস আল হাসানী ওয়াল হুসাইনি (১১৯৩-১২৬৬ খ্রিস্টাব্দ) বা সাইয়েদ ইবনে তাউস ( আরবি: سید بن طاووس বলা হয় ) একজন শিয়া আইনজ্ঞ, ধর্মতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ এবং জ্যোতিষী ছিলেন। [১] তিনি তার পিতার মাধ্যমে হাসান ইবনে আলীর বংশধর এবং তার মাতার মাধ্যমে হোসেন ইবনে আলীর বংশধর ছিলেন। কথিত আছে যে তিনি দ্বাদশ শিয়া ইমাম মুহাম্মদ আল-মাহদীর সাথে দেখা করেছিলেন। শিয়াদের মতে মাহদী গোপনে বসবাস করছেন।[২] তিনি তার গ্রন্থাগার এবং তার অসংখ্য রচনার জন্য পরিচিত। এখনও তার লেখা অনেক বই মূল আকারে পাওয়া যায় এবং আব্বাসীয় যুগের শেষের দিকে মুসলিম পণ্ডিতদের আগ্রহ সম্পর্কে আমাদের জানতে সাহায্য করে।[৩]
জন্ম এবং পারিবারিক জীবন
[সম্পাদনা]ইবনে তাউস ১৫ মহররম ৫৮৯ (২১ জানুয়ারী ১১৯৩) হিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তার নাম রাখা হয়েছিল তাউস (ময়ূর)। তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন সুদর্শন পুরুষ ছিলেন যার পা ছিল কুৎসিত। তাই তার বংশধররাও তার কাছ থেকে এই উপাধিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন।[২][৩][৪] জীবনের প্রথম ১৪ বছর তিনি তার বাবা এবং দাদা সহ অনেক শিক্ষকের অধীনে লালিত-পালিত এবং শিক্ষা লাভ করেছিলেন।[৩] পরবর্তীতে তিনি নাসির বিন জায়েদীর শিয়া উজিরের কন্যা জাহরা খাতুনকে বিয়ে করেন এবং বাগদাদে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি তাঁর সময়ের খলিফা মুনতানসিরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তবে তিনি কোনও রাজনৈতিক বিষয়ে জড়িত থাকতে অস্বীকার করেছিলেন।[২] তার পরিবার এবং সন্তানদের সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই। তার সন্তানরা তাদের মায়ের নামে পরিচিত ছিল। কথিত আছে যে তিনি ৬৪১ সালে হিল্লায় ফিরে আসেন। ৬৪৫ সালে নাজাফ এবং তারপর ৬৪৯ সালে কারবালা এবং ৬৫২ সালে সামারায় যান। পরে বাগদাদে পৌঁছে মঙ্গোলরা শহর দখল না করা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।[৪]
মঙ্গোলদের রাজত্বকালে
[সম্পাদনা]যখন হুলাকু খান বাগদাদ জয় করেন, তখন তিনি শহরের পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসা করেন : "কে ভালো, একজন অত্যাচারী মুসলিম শাসক না একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন কাফির (কাফের) শাসক?" এই প্রশ্নের উত্তর আর কেউ দেননি। কেবল ইবনে তাউসই বলেছিলেন: "একজন কাফির বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন উত্তম।" এবং অন্যান্য পণ্ডিতরা একই উত্তর দেন। এই উত্তর শহরের অনেক মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল। এরপর হালাকু খান ইবনে তাউসকে হিল্লায় ফিরে যেতে দেন।[২] তবে, হুলাকু খান আলবীয়দের নেতৃত্ব দেন এবং তারপর বাগদাদের মতো কিছু শহরের নেতৃত্ব তাকে দেন। কিন্তু ইবনে তাউস দায়িত্ব মেনে নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। নাসিরুদ্দীন তুসী তাকে দায়িত্ব গ্রহণ করে তার জীবন বাঁচানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং তিনি তা করেছিলেন।[২]
কাজ
[সম্পাদনা]ইবনে তাউস উত্তরাধিকারসূত্রে একটি বিশাল গ্রন্থাগার পেয়েছিলেন। তিনি নিজে ধর্মতত্ত্ব ও নীতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে আইনশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য বই লিখেছেন। যার মধ্যে কিছু বই ফারসি, উর্দু এবং ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। তাঁর বইগুলিতে তিনি পাঠকদের মুহাম্মদ এবং আহলে বাইত সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করতেন। কারণ তিনি মনে করতেন "ধর্মের মূল উৎস সম্পর্কে জ্ঞানই হল ধর্মের প্রকৃত উপলব্ধি"। তার কিছু রচনা নিম্নরূপ তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে:[২]
- কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা বর্ণনা করে লেখা তাঁর রচনাগুলির মধ্যে একটি হল "লোহুফ" (দুঃখের দীর্ঘশ্বাস) এবং এটি ইংরেজিতে অনূদিত। [২]
- "আল-মুহাজ্জল সামারাতাল মুহাজ্জা" যা নীতিশাস্ত্রে পরিপূর্ণ এবং তার সন্তানদের প্রতি তার ইচ্ছা এবং তার জীবনের বিভিন্ন স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করে, তার নিজের ভাষায়। [৪]
- আল-মুহিম্মাত ওয়া আল-তাতিম্মাত ১০টি খণ্ড আছে। এবং প্রতিটি খণ্ড একটি স্বাধীন বিষয় রয়েছে:যেমন, ফালাহ আল-সায়িল, যুহরাত আল-রাবী', জামাল আল-উসবু', ইকবাল আল-আমল। ইবনে তাউস এই বইটি আল-শাইখ আল-তুসীর লেখা মিসবাহ আল-মুতাহাজ্জিদের পরিপূরক হিসেবে লিখেছেন।
- আল-ইকবাল লি সালিহ আল-আ'মাল
- আমান আল-আখতার ফী ওয়াজাইফ আল-আসফার
- জামাল আল-উসবু' ফি বি-কামাল আল-আমাল আল-মাশরু'
- আল-দুরু আল-ওয়াকিয়া মিন আল-আখতার ফিমা ইয়ামাল কুল শাহর আলা আল-তিকরর
- সা'দ আল-নুফুস লি আল-সু'উদ
- আল-তার'ইফ ফি মা'রিফাত মাযহাব আল-তাওয়ায়েফ
- আল-মুজতানা ফি দু'আ আল-মুজতাবা
- মুহাসিবাত আল-নাফস
- মিসবাহ আল-শরিয়া
- মিদমার আল-সাবাক
- আল-মালাহিম ওয়া আল-ফিতান
- আল-লুহুফ 'আলা কাতলায় আল-তুফুফ
- মুহাজ আল-দাওয়াত ওয়া মানহাজ আল-ইবাদাত
- আল-ইয়াকিন বি-ইখতিসাস মাওলানা আলী (আ) বি-ইমরাত আল-মুমিনীন
- কিয়াথ সুলতান আল-ওয়ারা লি সুক্কান আল-থারা
- ফারাজ আল-মাহমুন ফী তারিখ 'উলামা' আল-নুজুম
- ফাতহুল আবওয়াব বায়েন ধাওয়া ল-আলবাব ওয়া বাইন রব আল-আরবাব
পাণ্ডুলিপির কাজ
[সম্পাদনা]- রাবি' আল-শিয়া
- মিসবাহ আল-জাইর
- ইলজাম আল-নওয়াসিব দ্বি-ইমামত আলী খ. আবি তালিব
- আল-হুজ্জা
- মুন্তাখাবাত আসরার আল-সালাত
- তুরাফ মিন আল-আনবা ওয়া আল-মানাকিব
- আল-ইবানা ফি মারিফাত আল-কুতুব আল-খাজানা
- আসরার আল-সালাত
- আল-সা'আদাত আল-ইবাদাত
- ফারহাত আল-নাজির ওয়া বাহজাত আল-খাওয়াতির
- নাহজ আল-বালাঘার একটি তাফসীর
- আল-মাসরা আল-শিন ফি কাতল আল-হুসাইন
- আল-মাজার
মৃত্যু
[সম্পাদনা]ইবনে তাউস ১২৬৬ সালের ৮ আগস্ট বাগদাদে মারা যান এবং সম্ভবত একই শহরে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। ইবনে তাউসের মুহাম্মদ আল-মাহদীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল এবং তাকে ইসমে আজম দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটা নিজের সন্তানদের শেখানোর অনুমতি পাননি।[২] তাকে ইরাকের হিল্লায় সমাহিত করা হয়েছিল। এখানে তার সমাধি শিয়া অনুসারীদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Matar, Zeina (২০০৮)। "Ibn Ṭāwūs"। Encyclopaedia of the History of Science, Technology, and Medicine in Non-Western Cultures (ইংরেজি ভাষায়)। Springer, Dordrecht। পৃ. ১১২১–১১২২। ডিওআই:10.1007/978-1-4020-4425-0_9244। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪০২০-৪৫৫৯-২।
- 1 2 3 4 5 6 7 8 Seyed Ibn Tâwûs (২০০৬)। Lohoof (Sighs of Sorrow)। Naba Cultural Organization। পৃ. ১১–১২, ১৯৯–২০৪।
- 1 2 3 Kohlberg, Etan (১৯৯২)। Medieval Muslim Scholar at Work: Ibn Tawus and His Library (Islamic Philosophy, Theology and Science)। Brill Academic Pub। পৃ. ১–৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০০৪০৯৫৪৯৬।
- 1 2 3 Davani, Ali (২০১২)। "Razi al-Din Ibn Tawus": ৫১–৫৬।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য)