আলফা ক্ষয়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
আলফা ক্ষয়ের দৃশ্যমান উপস্থাপনা

আলফা ক্ষয় বা α-ক্ষয় হল এক ধরণের তেজস্ক্রিয় ক্ষয় যেখানে একটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস একটি আলফা কণা (হিলিয়াম নিউক্লিয়াস) নির্গত করে এবং তার ফলে অন্য 'পারমাণবিক নিউক্লিয়াস'এ 'ক্ষয়প্রাপ্ত' বা রূপান্তরিত হয়, ক্ষয়ের পর আণবিক ভর সংখ্যা চার কমে যায় এবং পারমাণবিক সংখ্যা দুই কমে যায়। একটি আলফা কণা একটি হিলিয়াম-৪ পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সমান, যা দুটি প্রোটন এবং দুটি নিউট্রন নিয়ে গঠিত। এর বৈদ্যুতিক আধান দুটি ইলেকট্রনের বৈদ্যুতিক আধানের (২ই) সমান এবং ভর ৪ একক। উদাহরণস্বরূপ, ইউরেনিয়াম-২৩৮ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে থোরিয়াম-২৩৪এ পরিবর্তিত হয়। আলফা কণাগুলির আধান ২ই (2e)। কিন্তু পারমাণবিক সমীকরণগুলি, রীতি অনুযায়ী, শুধু পারমাণবিক বিক্রিয়া বর্ণনা করে, তাই আধান সাধারণত দেখানো হয় না।

আলফা কণার ক্ষয় সাধারণত ভারী নিউক্লাইডগুলিতেই ঘটে। তত্ত্বগতভাবে, নিকেল (উপাদান ২৮) এর চেয়ে কিছুটা ভারী নিউক্লিয়াসে এই ক্ষয় ঘটতে পারে। ভারি অস্থিতিশীল নিউক্লাইডগুলি স্বতঃস্ফূর্ত বিভাজন-প্রক্রিয়ার দিকে এগোয়। বাস্তবক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিকেলের চেয়ে বেশ ভারী নিউক্লাইড গুলিতেই শুধুমাত্র এই পদ্ধতিতে ক্ষয় হয়। সবচেয়ে হালকা আলফা নির্গমনকারী পদার্থটি হল টেলুরিয়াম (উপাদান ৫২) এর সমস্থানিক (ভর সংখ্যা ১০৪-১০৯)। ব্যতিক্রমীভাবে, বেরিলিয়াম-৮ দুটি আলফা কণা নির্গত করে।

আলফা কণার ক্ষয় এখন পর্যন্ত ঝাঁক বাঁধা ক্ষয়ের সবচেয়ে সাধারণ রূপ, যেখানে মূল পরমাণুটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় নিউক্লিয়নের কিছু কণা নির্গত করে, এরপর পড়ে থাকে আর একটি নির্দিষ্ট পদার্থ। আলফা কণার ভর তুলনামূলকভাবে কম এবং নিউক্লিয়ার বন্ধন শক্তি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এইভাবে ক্ষয় সবচেয়ে বেশি হয়। ঝাঁক বাঁধা ক্ষয়ের মত, আলফা ক্ষয় মূলত একটি কোয়ান্টাম টানেলিং প্রক্রিয়া। এটি নিউক্লিয়ার বল এবং তড়িচ্চুম্বকীয় বল উভয়ের পারস্পরিক ক্রিয়ায় ঘটে, যা বিটা ক্ষয় থেকে আলাদা।

আলফা কণার সাধারণ গতিশক্তি ৫এমইভি (মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট) (অথবা তাদের মোট শক্তির ≈০.১৩%, ১১০ টেরাজুলস/কেজি) এবং এর প্রায় ১৫,০০০,০০০ মি/সেকেন্ড গতিবেগ রয়েছে, যা আলোর গতিবেগের এর ৫%। বস্তুর অর্ধজীবন এই উৎপাদিত শক্তির উপর নির্ভর করে, তাই এই শক্তির খুব একটা পার্থক্য হয় না (গাইগার–নিউটাল সূত্রের সমীকরণ দেখুন)। বৈদ্যুতিক আধান ২ই এবং তুলনামূলকভাবে ভর বেশি ও গতিবেগ কম হওয়ার কারণে, আলফা কণাগুলি সহজেই অন্যান্য পরমাণুর সাথে বিক্রিয়া করে শক্তি ক্ষয় করে। তাদের সম্মুখ গতি কয়েক সেন্টিমিটার বায়ু দ্বারা থামিয়ে দেওয়া যায়। পৃথিবীতে উৎপাদিত হিলিয়ামের প্রায় ৯৯% ভূগর্ভস্থ খনিজ এর ইউরেনিয়াম বা থোরিয়ামের আলফা ক্ষয়ের ফল। প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের উপ-পণ্য হিসাবে হিলিয়াম পাওয়া যায়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৯৯ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড দ্বারা তেজস্ক্রিয়তার পরীক্ষার সময় প্রথম আলফা কণা সামনে আসে, ১৯০৭ সালের মধ্যে তাদের হিলিয়াম২+ (He2+) আয়ন বলে চিনতে পারা যায়।

১৯২৮ সালের মধ্যে, জর্জ গ্যামফ আলফা ক্ষয়ের তত্ত্বটি টানেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করেছিলেন। আলফা কণা নিউক্লিয়াস দ্বারা একটি বিভব কূপের মধ্যে আটকা পড়ে। তত্ত্বগতভাবে, এটি থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন, তবে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের নতুন (তখন) আবিষ্কৃত নীতি অনুসারে, বাধা অতিক্রম করে "টানেলিং" এর মাধ্যমে এর নিউক্লিয়াস থেকে মুক্ত হয়ে অন্য দিকে চলে আসার স্বল্প (তবে শূন্য নয়) সম্ভাবনা থেকে যায়। গ্যামফ নিউক্লিয়াসের জন্য একটি মডেল বিভবের সমাধান করেন এবং প্রথম নীতি থেকে ক্ষয়ের অর্ধজীবন এবং নির্গমন শক্তির মধ্যে একটি সম্পর্ক উদ্ভাবন করেন। সেটি আগে প্রায়োগিকভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং এটি গাইগার–নিউটাল সূত্র নামে পরিচিত।[১]

পদ্ধতি[সম্পাদনা]

পারমাণবিক নিউক্লিয়াসকে একসাথে ধরে রাখা নিউক্লিয়ার বলটি খুব শক্তিশালী হয়, প্রোটনগুলির মধ্যে বিকর্ষণকারী তড়িচ্চুম্বকীয় বলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তবে নিউক্লিয়ার বল খুব স্বল্প পরিসরে কাজ করে, প্রায় ১ ফেমটোমিটারের বাইরে দ্রুত এর শক্তি হ্রাস পায়, কিন্তু তড়িচ্চুম্বকীয় বল বহুদূর পর্যন্ত কাজ করে। অর্থাৎ নিউক্লিয়াসকে একসাথে ধরে রাখার আকর্ষণকারী নিউক্লিয়ার বলের শক্তি নিউক্লিয়নের সংখ্যার সাথে সমানুপাতিক, তবে যে তড়িচ্চুম্বকীয় বল নিউক্লিয়াসকে পৃথক করে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে, মোটামুটিভাবে সেটি তার পারমাণবিক সংখ্যার বর্গের সমানুপাতিক। ২১০ বা তারও বেশি নিউক্লিয়ন সহ একটি নিউক্লিয়াস এত বড় যে এদের একত্রে ধরে রাখার জন্য শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বলটি এর মধ্যের প্রোটনগুলির মধ্যে বিকর্ষণকারী তড়িচ্চুম্বকীয় বলের সমবল মাত্র হতে পারে। এই সব নিউক্লিয়াস গুলিতে আকার কমিয়ে স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য আলফা ক্ষয় ঘটে।[২]

এখন প্রশ্ন হল একক প্রোটন বা নিউট্রন বা অন্যান্য পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের বদলে আলফা কণা, হিলিয়াম নিউক্লিয়াসকেই কেন পছন্দ করা হবে নিঃসরণ করার জন্য।[টীকা ১] এর কিছুটা উত্তর পাওয়া যায় ওয়েভ ফাংশন প্রতিসাম্য সংরক্ষণ থেকে, যা একটি কণাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিবর্তিত হয়ে বোস–আইনস্টাইন পরিসংখ্যান (যদি এর নিউক্লিয়নগুলি যুগ্ম সংখ্যায় থাকে) থেকে ফার্মি–ডিরাক পরিসংখ্যান (যদি এর নিউক্লিয়নগুলি বিজোড় সংখ্যায় থাকে) প্রদর্শন করতে বাধা দেয় অথবা তদ্বিপরীত। একক প্রোটন নিঃসরণ, বা বিজোড় স্ংখ্যার নিউক্লিয়নের কোনও কণার নির্গমন হলে সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘিত হয়। উত্তরের বাকি অংশটি পাওয়া যায় আলফা কণার খুব উচ্চ বন্ধন শক্তি থেকে। সমীকরণের দ্বারা মোট বিভাজন শক্তি গণনা করে পাওয়া যায়:

এখানে হল নিউক্লিয়াসের প্রাথমিক ভর, হল কণা নিঃসরণের পরে নিউক্লিয়াসের ভর, এবং হল নির্গত কণার ভর। এটা থেকে বোঝা যায় যে, আলফা কণা নির্গমন নিউক্লিয়াসের নিজস্ব শক্তি দ্বারাই সম্ভব, অন্যান্য ক্ষয়কারী নিঃসরণের জন্য অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োজন। উদাহরণ স্বরূপ, ইউরেনিয়াম-২৩২ এর জন্য গণনা সম্পাদন করে দেখা যায় যে আলফা কণা নিঃসরণে মাত্র ৫.৪ মেগা ইলেকট্রন ভোল্টের প্রয়োজন হবে, যখন কোনও একক প্রোটন নিঃসরণে লাগবে ৬.১ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট। এই বিভাজন শক্তির বেশিরভাগই আলফা কণার নিজের গতিশক্তি হয়ে যায়, যদিও ভরবেগ বজায় রাখার জন্য এই শক্তির কিছু অংশ নিউক্লিয়াসেই ফিরে আসে। তবে, যেহেতু বেশিরভাগ আলফা নির্গমনকারী তেজস্ক্রিয় সমস্থানিকের ভর সংখ্যা ২১০ এর বেশি হয়, যা আলফা কণার ভর সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়(৪), নিউক্লিয়াসে পুনরুদ্ধার হওয়া শক্তির অংশটি সাধারণত খুব কম হয়।[২]

এই বিভাজন শক্তিগুলি নিউক্লিয়ার বলের দ্বারা সরবরাহিত বিভব বাধা, যা আলফা কণা নির্গমনে বাধা দেয়, তার থেকে যথেষ্ট কম। তড়িচ্চুম্বকীয় বিকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে গিয়ে অসীম থেকে একটি আলফা কণাকে নিউক্লিয়াসের কাছে নিউক্লিয়ার বলের প্রভাবের সীমার ঠিক বাইরে আনতে যে পরিমাণ কাজ করতে হবে, তা হল প্রায় ২৫ এমইভি। মনে করা যেতে পারে আলফা কণা ২৫ এমইভি বিভব বাধার মধ্যে রয়েছে। তবে আলফা কণাগুলিতে কেবল ৪ এমইভি থেকে প্রায় ৯ এমইভি গতিশক্তি থাকে, যা প্রয়োজনীয় মুক্তি গতিশক্তির চেয়ে অনেক কম।

তবে, কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানে এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ১৯২৮ সালে আলফা ক্ষয়ের কোয়ান্টাম টানেলিং তত্ত্বটি স্বাধীনভাবে জর্জ গ্যামফ,[৩]রোনাল্ড উইলফ্রেড গার্নি এবং এডওয়ার্ড কন্ডন প্রকাশ করেছিলেন।[৪] এটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের খুব উল্লেখযোগ্য নিশ্চিতকরণ হিসাবে প্রশংসিত হয়েছিল। মূলত, আলফা কণা নিউক্লিয়াস থেকে কোয়ান্টাম টানেল দিয়ে বেরিয়ে যায়। গার্নি এবং কন্ডন তাঁদের গবেষণাপত্রে নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণ করেছেন:

এযাবৎ নিউক্লিয়াসের কিছু বিশেষ অবাধ ‘অস্থিরতা’র মৌলিক নীতি নির্ধারণ করা দরকার ছিল; তবে নীচের টীকায় এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে এই বিভাজন কোনও বিশেষ অনুমান ছাড়াই কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান সূত্রের স্বাভাবিক ফল... যে বিস্ফোরণ নিয়ে α কণা নিউক্লিয়াসে তার জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে তাই নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। কিন্তু উপরের চিত্র থেকে যে প্রক্রিয়াটি পাওয়া যায়, কেউ বরং বলবেন যে α কণা প্রায় অদৃশ্য ভাবে বেরিয়ে যায়।[৪]

তত্ত্বটি বলে যে আলফা কণাকে নিউক্লিয়াসের মধ্যে একটি স্বাধীন কণা হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে যা সর্বক্ষণ গতিমান থাকে, কিন্তু নিউক্লিয়ার বলের দ্বারা নিউক্লিয়াসের মধ্যে আটকে থাকে। নিউক্লিয়ার বলের বিভব বাধার সাথে প্রতিটি সংঘর্ষে, একটি ছোট, কিন্তু শূণ্য নয়, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয় যাতে এটি টানেলিং করে বেরিয়ে যেতে পারে। ১.৫ x ১০ মি./সে. গতি সহ একটি আলফা কণা, যেটি প্রায় ১০ −১৪ মি. পারমাণবিক ব্যাসের মধ্যে থাকে, সেটি প্রতি সেকেন্ডে ১০২১ বারের বেশি বিভব বাধার সাথে ধাক্কা খাবে। তবে, প্রতিটি সংঘর্ষে মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা যদি খুব সামান্য হয়, তবে তেজস্ক্রিয় সমস্থানিকের অর্ধেক জীবন খুব দীর্ঘ হবে, যেহেতু মুক্তির মোট সম্ভাব্যতা ৫০% এ পৌঁছানোর জন্য এটি প্রয়োজনীয় সময়। চরম উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বিসমাথ-২০৯ আইসোটোপের অর্ধ-জীবন হল ১.৯ x ১০ ১৯ বছর।

বিটা-ক্ষয় স্থিতিশীল আইসোবার এর মধ্যে = ৫, = ৮, ১৪৩ ≤ ≤ ১৫৫, ১৬০≤ ≤১৬২ এবং ≥ ১৬৫ আণবিক ভর সংখ্যা যুক্ত সমস্থানিকগুলি, যে গুলি দ্বিগুণ বিটা ক্ষয়ের সাথেও স্থিতিশীল, তত্ত্বগতভাবে তাদের আলফা ক্ষয় হওয়ার কথা (ক্ষয় "৫" হলে একটি হিলিয়াম-৪ এবং একটি প্রোটন বা একটি নিউট্রন, ক্ষয় "৮" হলে দুটি হিলিয়াম-৪)। এদের অর্ধ-জীবন (হিলিয়াম-৫, লিথিয়াম-৫, এবং বেরিলিয়াম৮) খুব ছোট। যেখানে ≤২০৯ এর নিউক্লাইডগুলির অর্ধজীবন খুব দীর্ঘ হয়। ≤২০৯ এর অন্তর্গত সমস্ত নিউক্লাইডগুলি অপরির্তনীয় নিউক্লাইড (=১৪৬ ছাড়া)। তবে কেবল = ৫, ৮, ১৪৪, ১৪৬, ১৪৭, ১৪৮, ১৫১, ১৮৬ এবং ≥২০৯ নিউক্লাইডগুলির আলফা ক্ষয় লক্ষ্য করা গেছে ( = ১৪৫, ১৪৯, ১৮২, ১৮৩, ১৮৪, ১৯২, ২০৪, এবং ২০৮ যুক্ত নিউক্লাইডগুলির জন্যও ক্ষয়ের অনুসন্ধান করা হয়েছে)। তত্ত্বগতভাবে অন্যান্য সমস্ত ভরসংখ্যার (সমস্থানিক গুলির ঠিক একটি স্থিতিশীল নিউক্লাইড) রয়েছে।

তত্ত্বটি নিয়ে বিশদ ভাবে কাজ করে রেডিওসমস্থানিকের অর্ধ-জীবন এবং আলফা কণাগুলির ক্ষয় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সমীকরণ পাওয়া গেছে। সেটি গবেষণামূলক গাইগার–নিউটাল সূত্রের একটি প্রয়োগগত উদ্ভাবন।

ব্যবহার[সম্পাদনা]

একটি আলফা বিকিরণকারী আমেরিকায়াম-২৪১কে ধোঁয়া সনাক্তকারী যন্ত্রের মধ্যে ব্যবহার করা হয়। আলফা কণা আয়ন কক্ষের খোলা বায়ুকে আয়নিত করে এবং অল্প মাত্রায় তড়িৎ আয়নযুক্ত বায়ুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। কক্ষে প্রবেশ করা আগুনের ধোঁয়ার কণাগুলি তড়িৎ প্রবাহকে কমিয়ে দেয়, এর ফলে ধোঁয়া সনাক্তকারী যন্ত্রে বিপদ সংকেত বেজে ওঠে।

মহাকাশ গবেষণার জন্য ব্যবহৃত রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেক্ট্রিক জেনারেটর এর নিরাপদ শক্তি উৎস হতে পারে আলফা ক্ষয় [৫] এবং অতীতে কৃত্রিম হার্ট পেসমেকারের জন্য এর ব্যবহার হয়েছিল।[৬] অন্যান্য যেকোন তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের তুলনায় আলফা ক্ষয়কে সহজেই আবৃত করে রাখা যায়।

বায়ুকে আয়নিত করতে, স্ট্যাটিক এলিমিনেটরএ একটি আলফা বিকিরণকারী পোলোনিয়াম-২১০ ব্যবহার করা হয় 'স্থির আঁকড়ে থাকা' পদার্থকে সহজে ছড়িয়ে দিতে।

বিষ মাত্রা[সম্পাদনা]

উচ্চ চার্জযুক্ত ভারী আলফা কণাগুলি তাদের খুব সংক্ষিপ্ত গড় সংঘাতবিহীন পথ বরাবর অল্প আয়তনে অনেকটা ইলেক্ট্রন-ভোল্ট শক্তি মুক্ত করে। এই তেজষ্ক্রিয়তা যদি পাকস্থলিতে চলে যায় বা শ্বাসগ্রহণ, ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে বা ত্বকে প্রবেশ করে, তাহলে আভ্যন্তরীণ দূষণের ক্ষেত্রে ডিএনএ এর উভয় সূত্র বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অন্যথায়, একটি আলফা উৎস স্পর্শ সাধারণত ক্ষতিকারক নয়, কারণ আলফা কণাগুলিকে কার্যকরভাবে কয়েক সেন্টিমিটার বায়ু, এক টুকরা কাগজ বা মৃত ত্বকের কোষগুলির পাতলা স্তর (বহিঃত্বক) দ্বারা আবৃত করে রাখা যায়; তবে, অনেক আলফা উৎসের সাথে বিটা-নির্গমনকারী অবশিষ্ট নিউক্লাইড (রেডিও ডটার) উপস্থিত থাকে এবং উভয়ের সঙ্গেই গামা ফোটন নিঃসরণও হতে পারে।

আরবিই, সমতুল্য বিকিরণের মুখোমুখি হবার ফলে আপেক্ষিক জৈবিক কার্যকারিতা পরিমাপ করে, বিকিরণের ক্ষমতার কি জৈবিক প্রভাব তৈরি হয়, বিশেষত ক্যান্সার বা কোষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে। আলফা বিকিরণের উচ্চ রৈখিক শক্তি স্থানান্তর (এলইটি) সহগ রয়েছে। সেটি মোটামুটি আলফা কণা দিয়ে প্রতি অ্যাংস্ট্রম দূরত্ব যেতে গিয়ে একটি অণু বা পরমাণুর আয়নিত হওয়া। বিভিন্ন সরকারি বিধি দ্বারা আলফা বিকিরণের জন্য আরবিই ২০র মান নির্ধারণ করা হয়েছে। আরবিই এর মান নিউট্রন উদ্ভাসের জন্য ১০ এবং বিটা বিকিরণ এবং আয়নিত ফোটনের জন্য ১ রাখা হয়েছে।

মূল নিউক্লিয়াসের প্রত্যাগতি (আলফা প্রত্যাগতি) এটিকে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি দেয়, যার ফলে আয়নীকরণ ক্ষতি হয় (দেখুন আয়নিত বিকিরণ)। একটি আলফা কণার ওজন (৪ ইউ) ভাজিত মূল পরমাণুর ওজন (সাধারণত প্রায় ২০০ ইউ) যত হয়, আলফা কণার মোট শক্তির তত গুণ হল এই শক্তি। কিছু অনুমান অনুযায়ী, বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ বিকিরণের ক্ষতির কারণ এটিই হতে পারে, কারণ প্রত্যাগত নিউক্লিয়াসটি যে পরমাণুর অংশ তা একটি আলফা কণার চেয়ে অনেক বড়, এবং সেইজন্য খুব ঘণীভূত আয়নীভবন করতে পারে। সাধারণত পরমাণুটি একটি ভারী ধাতুর হয়, যা ক্রোমোজোম গুলিতে জমা হয়ে যায়। কিছু গবেষণা অনুযায়ী,[৭] এর ফলে আরবিই ১০০০ এ পৌঁছে যায়, যা সরকারী বিধিবিধানে ব্যবহৃত মানের থেকে অনেক বেশি।

সার্বজনীন বিকিরণের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক অবদানকারী হল রেডন। এটি একটি তেজস্ক্রিয় গ্যাস যা প্রাকৃতিকভাবে মাটি এবং শিলাতে পাওয়া যায়। [৮] যদি গ্যাসটি শ্বাসের সাথে শরীরে ঢোকে, কিছু রেডন কণা ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ আস্তরণের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। এই কণাগুলি ক্ষয় চালিয়ে যেতে থাকে, যার ফলে আলফা কণা নির্গত হতে থাকে, যা ফুসফুসের কলাকোষগুলির ক্ষতি করে।[৯] ৬৬ বছর বয়সে মারি ক্যুরির অবর্ধক রক্তশূন্যতায় মৃত্যুর কারণ সম্ভবত আয়নিত তেজস্ক্রিয়তার উচ্চ মাত্রায় দীর্ঘায়িত প্রকাশের কারণে ঘটেছিল। তবে এটি স্পষ্ট নয় যে এটি আলফা বিকিরণ না রঞ্জন রশ্মির কারণে হয়েছিল। ক্যুরি রেডিয়াম এবং অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে প্রচুর কাজ করেছিলেন, যেগুলি বিটা এবং গামা রশ্মি নির্গত করে। এর মধ্যে রেডিয়াম রেডনে পরিণত হয়।[১০] । তবে, ক্যুরি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অরক্ষিত রঞ্জন রশ্মি টিউব নিয়েও কাজ করেছিলেন, এবং পুনর্বার সমাধি দেওয়ার সময় তাঁর শরীরের হাড় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছিল তুলনামূলকভাবে নিম্ন মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা।

২০০৬ সালে, রাশিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী, আলেকজান্ডার লিটভিনেনকোকে তেজস্ক্রিয় বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল পোলোনিয়াম-২১০ দিয়ে, যেটি আলফা বিকিরণকারী।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Gamow theory of alpha decay"। ৬ নভেম্বর ১৯৯৬। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  2. Arthur Beiser (২০০৩)। "Chapter 12: Nuclear Transformations"। Concepts of Modern Physics (PDF) (6th সংস্করণ)। McGraw-Hill। পৃষ্ঠা 432–434। আইএসবিএন 0-07-244848-2। ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ আগস্ট ২০১৯ 
  3. G. Gamow (১৯২৮)। "Zur Quantentheorie des Atomkernes (On the quantum theory of the atomic nucleus)"। Zeitschrift für Physik51 (3): 204–212। doi:10.1007/BF01343196বিবকোড:1928ZPhy...51..204G 
  4. Ronald W. Gurney & Edw. U. Condon (১৯২৮)। "Wave Mechanics and Radioactive Disintegration"। Nature122: 439। doi:10.1038/122439a0বিবকোড:1928Natur.122..439G 
  5. "Radioisotope Thermoelectric Generator"Solar System ExplorationNASA। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মার্চ ২০১৩ 
  6. "Nuclear-Powered Cardiac Pacemakers"Off-Site Source Recovery ProjectLANL। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মার্চ ২০১৩ 
  7. Winters TH, Franza JR (১৯৮২)। "Radioactivity in Cigarette Smoke"। New England Journal of Medicine306 (6): 364–365। doi:10.1056/NEJM198202113060613 
  8. ANS : Public Information : Resources : Radiation Dose Chart
  9. EPA Radiation Information: Radon. October 6, 2006, [১], Accessed December 6, 2006
  10. Health Physics Society, "Did Marie Curie die of a radiation overexposure?" [২] ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০০৭-১০-১৯ তারিখে

টীকা[সম্পাদনা]

  1. এই অন্যান্য ক্ষয় মোডগুলি, যদিও সম্ভব, কিন্তু আলফা ক্ষয়ের তুলনায় অত্যন্ত বিরল।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]