আয়নিতকারক বিকিরণ

আয়নিতকারক বিকিরণ বলতে এমন অতিপারমাণবিক কণা বা তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গকে বোঝায়, যার প্রতিটি পৃথক ফোটন বা কণার শক্তি এতই বেশি যে তা কোনও পরমাণু বা অণু থেকে ইলেকট্রন বিচ্ছিন্ন করে সেটিকে আয়নিত করতে পারে।[১] কিছু কণা আলোর বেগের ৯৯% পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে। এদের সাথে সংশ্লিষ্ট তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গগুলি তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন অংশে অবস্থিত।
গামা রশ্মি, রঞ্জনরশ্মি এবং তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালির শূন্যস্থান-অতিবেগুনি অংশের উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন অঞ্চল আয়নিতকারক বিকিরণ; অন্যদিকে নিম্ন-শক্তিসম্পন্ন অতিবেগুনি, দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত বিকিরণ, অণুতরঙ্গ এবং বেতার তরঙ্গ হলো অনায়নিতকারক বিকিরণ। প্রায় সব ধরনের লেজার রশ্মিই অনায়নিতকারক বিকিরণ। অতিবেগুনি অঞ্চলে আয়নিতকারক ও অনায়নিতকারক বিকিরণের মধ্যবর্তী সীমারেখা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায় না, কারণ বিভিন্ন অণু ও পরমাণু ভিন্ন ভিন্ন শক্তিতে আয়নিত হয়। আয়নিতকারক বিকিরণের শক্তি প্রায় ১০ ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV) থেকে শুরু হয়।[২]
আয়নিতকারক অতিপারমাণবিক কণার মধ্যে রয়েছে আলফা কণা, বিটা কণা এবং নিউট্রন। এসব কণা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়, এবং এদের প্রায় সবই আয়নিতকরণ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট শক্তিসম্পন্ন। এছাড়া মহাজাগতিক কণার একটি গৌণ শ্রেণী মহাজাগতিক রশ্মি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করার পর উৎপন্ন হয়; এর মধ্যে মিউন, মেসন এবং পজিট্রন উল্লেখযোগ্য।[৩][৪] মহাজাগতিক রশ্মি পৃথিবীতে তেজস্ক্রিয় সমস্থানিক (যেমন কার্বন-১৪) উৎপন্ন করতে পারে, যা পরবর্তীতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে আয়নিতকারক বিকিরণ নির্গত করে। মহাজাগতিক রশ্মি এবং তেজস্ক্রিয় সমস্থানিকের ক্ষয় পৃথিবীতে প্রাকৃতিক আয়নিতকারক বিকিরণের প্রধান উৎস এবং এগুলো পটভূমি বিকিরণেঅবদান রাখে। এছাড়া রঞ্জনরশ্মি নল, কণা ত্বরক এবং পরমাণু-কেন্দ্রীণ বিভাজনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবেও আয়নিতকারক বিকিরণ উৎপন্ন করা হয়।
আয়নিতকারক বিকিরণ মানব-ইন্দ্রিয় দ্বারা সরাসরি শনাক্তযোগ্য নয়; তাই এটির শনাক্তকরণ ও পরিমাপের জন্য গাইগার গণকের মতো যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। তবে অত্যন্ত উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন কণা জৈব ও অজৈব উভয় পদার্থের ওপর দৃশ্যমান প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে (যেমন চেরেংকভ বিকিরণে পানির দীপ্তি), কিংবা মানুষের ক্ষেত্রে প্রকট বিকিরণ সংলক্ষণ ঘটাতে পারে।[৫]
চিকিৎসাবিজ্ঞান, পারমাণবিক শক্তি, গবেষণা এবং শিল্প উৎপাদনসহ বহু ক্ষেত্রে আয়নিতকারক বিকিরণ ব্যবহৃত হয়; তবে অতিরিক্ত বিকিরণের সংস্পর্শে আসার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। আয়নিতকারক বিকিরণের সংস্পর্শে জীবন্ত কলার কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অঙ্গহানি ঘটতে পারে। উচ্চমাত্রার তীব্র বিকিরণ বিকিরণজনিত দগ্ধতা এবং বিকিরণজনিত অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে; অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষাকৃত নিম্নমাত্রার বিকিরণ গ্রহণ ক্যান্সার ঘটাতে পারে।[৬][৭] আন্তর্জাতিক বিকিরণ সুরক্ষা কমিশন (ICRP) আয়নিতকারক বিকিরণ থেকে সুরক্ষা এবং বিকিরণমাত্রা গ্রহণের মানবস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব সম্পর্কিত নির্দেশিকা প্রকাশ করে।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Ionizing radiation, health effects and protective measures"। World Health Organization। ২৯ এপ্রিল ২০১৬। ২৯ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ জানুয়ারি ২০২০।
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়; "FCC" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Woodside, Gayle (১৯৯৭)। Environmental, Safety, and Health Engineering। US: John Wiley & Sons। পৃ. ৪৭৬। আইএসবিএন ৯৭৮-০৪৭১১০৯৩২৭। ১৯ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ Stallcup, James G. (২০০৬)। OSHA: Stallcup's High-voltage Telecommunications Regulations Simplified। US: Jones & Bartlett Learning। পৃ. ১৩৩। আইএসবিএন ৯৭৮-০৭৬৩৭৪৩৪৭৫। ১৭ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Ionizing Radiation - Health Effects | Occupational Safety and Health Administration"। [www.osha.gov](http://www.osha.gov)। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুন ২০২২।
- ↑ Ryan, Julie (৫ জানুয়ারি ২০১২)। "Ionizing Radiation: The Good, the Bad, and the Ugly"। The Journal of Investigative Dermatology। ১৩২ (3 0 2): ৯৮৫–৯৯৩। ডিওআই:10.1038/jid.2011.411। পিএমসি 3779131। পিএমআইডি 22217743।
- ↑ Herrera Ortiz, Andrés Felipe; Fernández Beaujon, Lorena Josefina; García Villamizar, Sandra Yulitza; Fonseca López, Freddy Fernando (২০২১)। "Magnetic resonance versus computed tomography for the detection of retroperitoneal lymph node metastasis due to testicular cancer: A systematic literature review"। European Journal of Radiology Open। ৮ 100372। ডিওআই:10.1016/j.ejro.2021.100372। পিএমসি 8377546। পিএমআইডি 34458506।