বিষয়বস্তুতে চলুন

আব্দুল হামিদ কিশক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আব্দুল হামিদ কিশক
عبد الحميد كشك
জন্ম(১৯৩৩-০৩-১০)১০ মার্চ ১৯৩৩
মৃত্যু৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬(1996-12-06) (বয়স ৬৩)
মাতৃশিক্ষায়তনআল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়
উপাধিশেখ

আব্দুল হামিদ কিশক[] (১০ মার্চ ১৯৩৩ – ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬) একজন মিশরীয় ধর্মোপদেশক, ইসলামি পণ্ডিত, সক্রিয়কর্মী ও লেখক ছিলেন। তিনি কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তিনি তার রসবোধ, জনপ্রিয় খুতবা, ধর্মীয় বই এবং বিশ্বজুড়ে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।[]

জীবনী

[সম্পাদনা]

আব্দুল হামিদ কিশক ১৯৩৩ সালে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার নিকটবর্তী একটি ছোট গ্রাম শুবরা খিতে জন্মগ্রহণ করেন। আব্দুল হামিদের স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তার পিতা মারা যান। তিনি আল-আজহারের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং মাত্র ৮ বছর বয়সেই সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেন। এই সময়েই তিনি একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে তার দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে দৃষ্টিশক্তি হারানো তাকে দমিত করার পরিবর্তে আরও বেশি জ্ঞান অর্জন এবং অধ্যবসায় করতে উৎসাহিত করেছিল। তিনি আল-আজহারের উসুল আল-দিন অনুষদ থেকে পণ্ডিত হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং একজন ইমাম হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর তিনি সমগ্র মিশর জুড়ে খুতবা প্রদান করতে থাকেন।[][]

১৯৬৪ সালের দিকে তিনি কায়রোর 'আইন আল-হায়াত মসজিদের মিম্বরকে তার প্রচারের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন। মিশরীয় সরকারের একজন কট্টর সমালোচক হিসেবে তিনি ১৯৬৫ সালে আড়াই বছরের জন্য কারাবরণ করেন। বলা হয়ে থাকে যে, "১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ছিল"; তখন কায়রোর কোবরি আল কোবা জেলার একটি মসজিদে তার জুমার খুতবা শোনার জন্য নিয়মিত ১০,০০০ মানুষের ভিড় হতো। একজন ফরাসি পণ্ডিত উল্লেখ করেছেন:

সাদাতের রাষ্ট্রপতিত্বের শেষ বছরগুলোতে কায়রোর রাস্তায় কিশকের বজ্রকণ্ঠ না শুনে হাঁটা অসম্ভব ছিল। যদি কোনো গণ-ট্যাক্সিতে উঠতেন, তবে দেখতেন চালক শেখ কিশকের রেকর্ড করা কোনো একটি খুতবা শুনছেন... তারা কায়রোতে, কাসাব্লাঙ্কায় এবং মার্সেইয়ের উত্তর আফ্রিকান জেলাগুলোতেও কিশকের কথা শুনত। সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত একটি সাময়িকী তাকে 'ইসলামি প্রচারের তারকা' উপাধি দিয়েছিল... তার অতুলনীয় কণ্ঠস্বর, ব্যাপক মুসলিম সংস্কৃতি, উপস্থিত বক্তৃতার অসাধারণ ক্ষমতা এবং কাফের শাসনব্যবস্থা, সামরিক একনায়কতন্ত্র, ইসরায়েলের সাথে শান্তি চুক্তি বা আল-আজহারের যোগসাজশের সমালোচনায় তার তীক্ষ্ণ রসবোধের সাথে কেউ পাল্লা দিতে পারত না... তার খ্যাতি এতটাই ছিল যে ওয়াকফ মন্ত্রণালয়কে জুমার ভিড় সামলাতে মসজিদের সাথে বেশ কয়েকটি সংযুক্তি তৈরি করতে হয়েছিল। তবে ১৯৮১ সালে নিয়মিত উপস্থিত হওয়া প্রায় ১০,০০০ মানুষকে জায়গা দেওয়ার জন্য সেগুলোও অপর্যাপ্ত ছিল।[]

অডিও ক্যাসেটে তার ২,০০০-এরও বেশি খুতবা বিতরণের মাধ্যমে সমগ্র আরব বিশ্বে কিশকের শ্রোতা সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।[]

১৯৮১ সালে সাদাত হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালে মিশরীয় রাষ্ট্রপতি হোসনি মুবারক তাকে এই শর্তে মুক্তি দেন যে, তিনি আর জনসমক্ষে সক্রিয় প্রচার কাজ চালাবেন না। এর পরেও তার ক্যাসেট টেপগুলো ব্যাপকভাবে সহজলভ্য ছিল, কিন্তু কায়রোর যে মসজিদে তিনি খুতবা দিতেন সেটিকে একটি জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়।[]

বিশ্বাস ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড

[সম্পাদনা]

'আইন আল-হায়াত মসজিদের প্রচারক হিসেবে তিনি মিশরের সামাজিক অবস্থা এবং ইসলামি আন্দোলনের দমনের নিন্দা জানান। এটি তাকে জীবনের প্রতি একটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা থেকে বিরত করতে পারেনি, যা তার বক্তৃতায় প্রতিফলিত হয়। তিনি নাসের শাসনামলে একজন ভিন্নমতাবলম্বী ছিলেন এবং সাইয়িদ কুতুবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সরকারি সমর্থন দিতে অস্বীকার করেন কিংবা ইসলামসমাজতন্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্যতা নিশ্চিত করতে রাজি হননি। আনোয়ার সাদাত শাসনামলে (১৯৭০-১৯৮১) সরকারি গণমাধ্যম তাকে বয়কট করলেও তার খুতবার ক্যাসেট টেপগুলো পুরো মিশর এবং আরব বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কিশক আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরোধী রাজনৈতিক মত পোষণ করতেন এবং তার বক্তৃতায় ব্যক্তিগত তাকওয়া বা ধার্মিকতার ওপর জোর দিতেন।[]

বিবাহ আইন

[সম্পাদনা]

"ব্যক্তিগত আইন" (আল-আহওয়াল আল-শখসিয়া) বাতিল করার প্রচেষ্টার জন্য কিশক মিশরের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের সমালোচনা করেন। এটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ওপর একটি আইন (৪৪/১৯৭৯) পাসের কথা নির্দেশ করে, যেখানে পুরুষদের অন্য কোনো মহিলাকে বিয়ে করলে তাদের স্ত্রীদের অবহিত করার প্রয়োজন ছিল। "নতুন আইনের অধীনে, যদি প্রথম স্ত্রী আপত্তি করেন, তবে তিনি অবিলম্বে বিবাহবিচ্ছেদ পেতে পারতেন এবং সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত স্বামীর বাড়িতে থাকার অধিকার পেতেন। এই আইনটি সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় এবং আল-আজহারের পণ্ডিতদের একটি কমিশন দ্বারা খসড়া করা হয়েছিল, যা কিশক এবং অন্যান্য শেখদের ক্ষুব্ধ করেছিল। তারা মনে করতেন এটি শরিয়াহ বিরোধী।"[]

জিহাদ আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ

[সম্পাদনা]

কিশকের মতে, 'জিহাদ আকবর' বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো নিজের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করা এবং নিজেকে আল্লাহর নৈতিক আদর্শের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য একটি নিরন্তর সংগ্রাম। এটি ব্যক্তিগত নৈতিক বিকাশের ভিত্তি, যা ধার্মিক ও পরোপকারী কর্মকাণ্ড তৈরি করে, সমাজে ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধি প্রচার করে এবং অজ্ঞতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিশক বলেন, এই শ্রেষ্ঠ জিহাদের ফলে ইসলাম "সেইসব সমাজকে নিরাময় করে যা এর নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং এমন বিবেকের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যা জাগ্রত হয়েছে এবং বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত হৃদয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত।"[]

নাগিব মাহফুজ

[সম্পাদনা]

মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজের বিতর্কিত উপন্যাস "আওলাদু হারাতিনা" এর সমালোচনা করে কিশক "আওয়ার রেসপন্স টু চিলড্রেন অফ দ্য অ্যালি" শিরোনামে একটি বই লেখেন। এতে তিনি উপন্যাসটির বিরুদ্ধে "মুসলিমদের পবিত্র বিশ্বাস লঙ্ঘনের" এবং "একশ্বরবাদকে কমিউনিজম ও বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের" অভিযোগ করেন।[] মাহফুজ ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন,[] (তিনিই একমাত্র আরব যিনি এই পুরস্কার পেয়েছেন)[১০] কিন্তু তার অন্যতম পরিচিত রচনা (চিলড্রেন অফ গেবেলায়ি) এর জন্য অনেক পুনর্জাগরণবাদী প্রচারক (যেমন ওমর আব্দুল রহমান) তাকে ব্যাপকভাবে ঘৃণা করতেন।[১০]

বইসমূহ

[সম্পাদনা]

বাগ্মিতার জন্য জনপ্রিয়তার বাইরেও তিনি ইসলামি সংস্কৃতির ওপর প্রায় ৩০টি বইয়ের লেখক ছিলেন।[১১]

  1. আরবি: عبد الحميد كشك

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 "Kishk Biography قصة حياة الشيخ كشك"। ২৮ আগস্ট ১৯৯৯। ২৮ আগস্ট ১৯৯৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০১৭
  2. "عبد الحميد كشك - الدروس - طريق الإسلام"islamway.com
  3. Kepel, Gilles, Le Prophete et Pharaon, English translation published in 1986, University of California Press. Original French edition published in 1984, Le Prophete et Pharaon, Editions Le Decouverte, pp. 172, 175
  4. "الشيخ كشك.. فارس المنابر ونزيل السجون"। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০১৮
  5. John Esposito, The Oxford Dictionary of Islam, Oxford University Press 2003
  6. Kepel, Le Prophete et Pharaon (1986), p.181
  7. ‘Abd al-Hamid Kishk, Dealing With Lust and Greed According to Islam (London: Dar Al Taqwa, 1995) pp. 2–9
  8. Shoair, Mohamed; Selim (trans.), Samah (১৪ অক্টোবর ২০১৯)। "A Look Back: Naguib Mahfouz on October 14, 1994"Arab Lit। পৃ. (note ৩০)। সংগ্রহের তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ২০২০
  9. Ed. Mohit K. Ray (সেপ্টেম্বর ২০০৭)। The Atlantic Companion to Literature in English। Atlantic Publishers & Dist। পৃ. ৩৩৬। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬৯-০৮৩২-৫
  10. 1 2 Smith, Lee (৩০ আগস্ট ২০০৬)। "Naguib Mahfouz Remembering one of Egypt's first great novelists."Slate। সংগ্রহের তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ২০২০
  11. Ellen Anne McLarney, Soft Force: Women in Egypt's Islamic Awakening, Princeton University Press (2015), p. 76

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]

উইকিমিডিয়া কমন্সে আব্দুল হামিদ কিশক সম্পর্কিত মিডিয়া দেখুন।