বিষয়বস্তুতে চলুন

আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আবু সাঈদ আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি ইবনে হাসসান ইবনে আব্দুর রহমান আম্বারি ( আরবি: أَبُو سَعِيدٍ عَبْدُ الرَّحْمَٰنِ بْنُ مَهْدِيِّ بْنِ حَسَّانَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَٰنِ الْعَنْبَرِيُّ ; ১৩৫ হি./৭৫২ খ্রি–১৯৮ হি./৮১৪ খ্রি.) ছিলেন একজন ইসলামি পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ, আইনবিদ, মুহাদ্দিসমালিকি ফকিহ। তিনি সাধারণত ইবনে মাহদি নামে অধিক পরিচিত। ইবনে মাহদি ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে বসরায় মৃত্যুবরণ করেন। []

জ্ঞান অন্বেষণ

[সম্পাদনা]

আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি ১০ বছর বয়সে হাদিসের জ্ঞান অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করেন। আবু আমির আকদি বলেন, আমি-ই ছিলাম সেই ব্যক্তি, যার কথায় আবদুর রহমান হাদিস চর্চায় মনোযোগী হয়। এর পূর্বে সে কাসসাসদের (গল্পকারদের) অনুসরণ করত। আমি তাকে বললাম যে, এসকল লোকের থেকে কিছুই পাবে না। তার কথাতেই ইবনে মাহদি হাদিসের জ্ঞান অর্জন শুরু করেন।

ইবনে মাহদি তাবেঈ ও মুহাদ্দিস সুফিয়ান সাওরির নিকট থেকেও হাদীস শুনেছেন। তিনি ১৫২, ১৫৩, ১৫৪, ১৫৫ ও ১৫৬ হিজরি সালে তাঁর থেকে হাদীস শুনেছেন। ইবনে মাহদি ছোটবেলাতেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি নিজেই বর্ণনা করেন: “আমরা একবার একটি জানাযার অনুষ্ঠানে ছিলাম, সেখানে উপস্থিত ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনুল হাসান আম্বারী, যিনি তখন বসরার কাজী ছিলেন। তখন উপস্থিত জনসমাগমের উদ্দেশ্য তিনি কিছু বলছিলেন, যা মূলত ভুল ছিল। আমি তখন একজন কিশোর এবং সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি বললাম: এটা সঠিক নয়; বরং আপনার হাদিস অনুযায়ী কথা বলা উচিত ছিল। এ কথা শুনে উপস্থিত লোকেরা আমার ওপর চটে যায়। কিন্তু কাজী আম্বারি বললেন, ‘ওকে ছেড়ে দাও, দেখি ছেলেটি কী বলছে?’ এরপর আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলে আমি সঠিক কথাটি বললাম। তা শুনে তিনি বললেন, তুমিই ঠিক বলেছ। আমি তোমার কথা মেনে নিয়ে অনুতপ্ত হচ্ছি। []

ইবনে মাহদি ১৫৯ হিজরিতে নিজের শিক্ষক সুফিয়ান সাওরির সান্নিধ্যে হজ্বে যান। তারপর ১৬০ হিজরিতে উভয় একসাথে বসরায় ফিরে আসেন। এর কিছুদিন পর সুফিয়ান সাওরি ইবনে মাহদির বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। []

হাদিসশাস্ত্রে প্রাজ্ঞতা

হাদিসের মর্ম উপলব্ধি এবং যথাযথভাবে হাদিস শ্রবণ করার ক্ষেত্রে ইবনে মাহদি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে বাশশার বন্দার বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে মাহদিকে বলতে শুনেছি, 'যদি আমার জীবনের অতীত অংশে ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে আমি প্রতিটি হাদিসের পাশেই তার শরাহ বা ব্যাখ্যা লিখে রাখতাম এবং মদিনায় গিয়ে যে সকল ব্যক্তির নিকট থেকে হাদিস শুনেছি, তাদের বই-পত্র দেখে তা নিরীক্ষা করতাম'। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, 'ছয় জন এমন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁরা হাদিসের মুজাকারার (আলোচনার) সময় এতটাই তীব্র আকর্ষিত হতেন যে, তারা প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন'। তাঁরা হলেন: ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ, আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, ওয়াকি ইবনুল জাররাহ, আবু দাউদ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহআবদুর রাজ্জাক সান’আনি[][][]

হাদিস সংরক্ষণ

ইমাম আবু হাতিম আব্দুর রহমান আল-রাজি তাঁর গ্রন্থ আল-জরহ ওয়াত তাদীলের প্রথম খণ্ডে যে সকল বড় বড় মুহাদ্দিসের জীবনী এনেছেন, তাঁদের মধ্যে আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি অন্যতম। তিনি হাদিস সংরক্ষণে ইবনে মাহদির দক্ষতার একটি গল্প উল্লেখ করেন:

আবু যুরয়া বলেন, আমি নুহ ইবনে হাবিবকে বলতে শুনেছি, আমরা একবার আব্দুর রহমান ইবনে মাহদির কাছে বসে ছিলাম। তিনি আমাদের কাছে কিছু হাদিস বর্ণনা করলেন, যার সনদ এরূপ ছিল যে, সুফিয়ান→ মানসুর→আবুদ-দোহা। তখন একজন ব্যক্তি বললেন, “হে আবু সাঈদ (ইবনে মাহদি) আমাদেরকে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান এই হাদিসটি অন্যভাবে বলেছেন, যার সনদ হল: সুফিয়ান → তাঁর পিতা → আবুদ-দোহা। অর্থাৎ ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের মতে, মানসুরের পরিবর্তে বর্ণনাকারী হলেন সুফিয়ানের পিতা। এরপর আরেকজন বললেন, ইমাম ওয়াকিও একইভাবে বলেছেন: সুফিয়ান→তাঁর পিতা→আবুদ-দোহা। তখন আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি চুপ থাকেন এবং বলেন, তাঁরা তো হাদিসের হাফেজ। এরপর তিনি বললেন: এই হাদিসটি রেখে দাও। এরপর ঐ ছাত্ররা গিয়ে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের কাছে ঘটনাটি বলেন যে, আবদুর রহমান এই হাদিস এইভাবে বলেছেন, যা তোমাদের বর্ণনা থেকে ভিন্ন। ইয়াহইয়া বলেন, তিনিও তো হাদিসের হাফেজ। এরপর তিনি নিজ হাতে তাঁর কিতাবে খুঁজে দেখ বললেন: আসলে আব্দুর রহমান যা বলেছেন, সেটাই সঠিক; সনদটি এমনই: সুফিয়ান → মানসুর → আবুদ-দোহা। এরপর যখন ওয়াকির কাছে ঘটনাটি পৌঁছায়, তখন তিনি বলেন যে: আল্লাহ আবু সাঈদকে রহম করুন। কিন্তু আমাদের উপর মিথ্যার অপবাদ দেওয়া উচিত নয়। এরপর নিজের কিতাব দেখে তিনিও নিশ্চিত হন যে, আসল সনদটি হল—সুফিয়ান→ মানসুর →আবুদ-দোহা। []

মাযহাব

[সম্পাদনা]

ইবনে মাহদি মালিকি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তিনি ইমাম মালিকের একজন শিষ্য ছিলেন এবং তাঁর ‘মুয়াত্তা’ নামক বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থের একজন রাবি বা বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি মূলত ইরাকে মালিকি ফিকহ বা মালিক মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর সম্পর্কে বলেন: তিনি ফিকহে অনেক বেশি গভীর জ্ঞান রাখতেন এবং তিনি এই বিষয়ে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তানের চেয়েও অধিক জ্ঞানী ছিলেন। ইয়াহইয়া সাধারণত কুফাবাসীদের মতের প্রতি ঝুঁকতেন; কিন্তু ইবনে মাহদি রহমান মদীনাবাসীদের রায় অনুসরণ করতেন। []

মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

ইবনে মাহদি সম্পর্কে বিখ্যাত মুফাসসির, মুহাদ্দিসফকিহদের মতামত হল:

  • আবু রাবি' জাহরানী বলেন: আমি তাঁর মত আর কাউকে দেখিনি।
  • ইবনে বাশকুয়াল বলেন: তিনি বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন।
  • ইমাম বায়হাকি বলেন: তিনি একজন ‘ইমাম’ এবং (হাদিসের) ‘হাফিজ’ ছিলেন।
  • আবু হাতিম রাযি বলেন: তিনি একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম ছিলেন।
  • ইবনে হিব্বান বলেন: তিনি পরহেযগার ছিলেন এবং সংরক্ষণ করেছেন; জ্ঞান আহরণ করেছেন; গ্রন্থ রচনা করেছেন; হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তিনি শুধু বিশ্বস্তদের থেকেই বর্ণনা করতেন।
  • আবু ইয়ালা খলিলী বলেন: তিনি এমন একজন ইমাম, যাঁর মর্যাদায় কোন প্রতিযোগিতা নেই।
  • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: তিনি বিশ্বস্ত, সত্যবাদী, নেককার মুসলিম, হাফিজ।
  • ইবনে হাজার আসকালানি বলেন: তিনি ছিলেন একজন ‘বিশ্বস্ত, দৃঢ়, হাফিজ ও রিজালের (হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনী ও বিশ্বাসযোগ্যতা) ব্যাপারে অভিজ্ঞ আলেম।
  • ইমাম যাহাবি তাঁকে হাফিজ, ইমাম ও আলেম হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
  • আলি ইবনুল মাদিনী বলেন: “তিনি ছিলেন সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সুফিয়ান সাওরির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিষ্য।
  • ইমাম শাফিয়ী বলেন: আমি দুনিয়ায় তাঁর সমকক্ষ কাউকে চিনি না।
  • ইয়াহইয়া ইবনে মা‘ইন বলেন: তিনি বসরার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শায়খদের একজন ছিলেন। [][][]

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

আবদুর রহমান ইবনে মাহদি ১৯৮ হিজরির জমাদিউস সানি মাসে বসরায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। []

আরো দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. আসকালানি, ইবনে হাজার। আল-তাহযিব। পৃ. ইবনে মাহদির জীবনী।
  2. "إسلام ويب - سير أعلام النبلاء - الطبقة التاسعة - عبد الرحمن بن مهدي- الجزء رقم9"www.islamweb.net (আরবি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৫
  3. Plessner, M. (২০১২-০৪-২৪)। "Sufyān al-T̲h̲awrī"। Encyclopaedia of Islam, First Edition (1913–1936) (ইংরেজি ভাষায়)
  4. "المذاكرة عند المحدثين (3 / 5)"www.alukah.net (আরবি ভাষায়)। ২৩ অক্টোবর ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৫
  5. "ص80 - كتاب العلل لابن أبي حاتم ت الحميد - مقدمة التحقيق - المكتبة الشاملة"shamela.ws। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৫
  6. "ص63 - كتاب الجرح والتعديل اللاحم - الثانية المذاكرة - المكتبة الشاملة"shamela.ws। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৫
  7. 1 2 3 الرازي, ابن أبي حاتم। الجرح والتعديل। পৃ. ترجمة ابن مهدي।
  8. 1 2 যাহাবি, শামসুদ্দীন। সিয়ারু আলামিন নুবালা। পৃ. ইবনে মাহদির জীবনী।
  9. الاسقلاني, ابن حجر। التهذيب। পৃ. ترجمة ابن مهدي।