আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস (রাঃ) (মৃত্যু- ১৫ হিজরি) ইসলামের ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের চরম শত্রু থাকলেও তিনি মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ইসলাম গ্রহণ করেন ।এবং তিনি মুহাম্মদ(সঃ) এর একজন চাচাত ভাই ও সাহাবা ছিলেন, এমনকি দুধ ভাইও ছিলেন । তার চেহারার সাথে রাসুলের চেহারার বেশ মিল ছিল ।

নাম ও বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

ইবনুল মুবারকের মতে আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসের ছিল নাম মুগীরা এবং ডাকনাম ছিল আবু সুফিয়ান । এ নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন । [আল ইসাবা-৪/৯০, সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৪৭] । আবু সুফিয়ানের পিতা নাম আবদুল মুত্তালিব,যিনি রাসূল(সাঃ) এর বড় চাচা ছিলেন । [টীকাঃ সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৩]।

রাসূল (সাঃ) ও আবু সুফিয়ান পরষ্পর দুধ ভাই ছিলেন,তারা হালীমা আস-সাদিয়্যাহর দুধ পান করেন । রাসূল(সাঃ) নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত তাদের দু’জনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। দু’জনের চেহারার মধ্যেও যথেষ্ট মিল ছিল ।

ইসলামের বিরোধিতা[সম্পাদনা]

তিনি রাসুল(সঃ) পারিবারিক লোক হলেও ইসলাম প্রকাশ হওয়ার পরেই তিনি ইসলামের ঘোর বিরোধিতা শুরু করেন । রাসূল (সাঃ) যখন দাওয়াত দিতে শুরু করেন আবু সুফিয়ান তখন কুরাইশদের একজন নামযাদা অশ্বারোহী বীর এবং একজন শ্রেষ্ঠ কবি । তিনি ইসলামের বিরোধীতা করা শুরু করেন । ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতায় তিনি তার সকল শক্তি একীভূত করেন। রাসূল(সাঃ) বিরুদ্ধে কুরাইশরা যত যুদ্ধের পরিকল্পনা করে আবু সুফিয়ান তাতে ইন্ধন যোগায়।

কুরাইশদের হাতে মুসলমানরা যত রকমের কষ্টভোগ করে তাতে তার বিরাট অবদান ছিল। তিনি তার কাব্য শক্তি রাসূল(সাঃ) নিন্দার কাজে ব্যবহার করেন । রাসূল(সাঃ) বিরুদ্ধে তিনি একটি অশালীন কবিতাও রচনা করেন ।[১] ইসলামের সাথে আবু সুফিয়ানের এ শত্রুতা দীর্ঘ ২০ বছর চলে । এ দীর্ঘ সময়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যতরকম ষড়যন্ত্র করা যেতে পারে সবই তিনি করেন ।

ইসলাম গ্রহন[সম্পাদনা]

অবশেষে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ইসলামের ‍সাথে আবু সুফিয়ানের শত্রুতার সমাপ্তি ঘটে । যখন চারিদিকে শোনা গেলো মুহাম্মদ(সঃ) তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন তখন তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পরলেন । কেননা তিনি ইসলামের যত বিরোধিতা করেছেন তাতে মুসলিম বাহিনী তাকে হত্যা করে ফেলতে পারে,এই ভয় তার মনে ঢুকে গেলো ।

তার স্ত্রী,পুত্র কন্যারাও তাকে বলতে লাগলো আপনার আরো আগেই ইসলাম গ্রহণ করে আপনার চাচাত ভাই মুহাম্মদকে সাহায্য করার দরকার ছিল । ধীরে ধীরে আবু সুফিয়ান ইসলামের প্রতি দুর্বল হয়ে পরেন ।

আবু সুফিয়ান রাসুল(সঃ) মক্কায় বিজয়ের জন্য মক্কার দিকে রওনা দিলে আবু সুফিয়ান তার পুত্র জাফরকে সঙ্গে নিয়ে রাসুল(সঃ) এর কাফেলার উদ্দেশ্যে বের হলেন । তারা খুব দ্রুত মক্কা মদীনার মাঝখানে ‘আবওয়া’র দিকে রওনা দিলো ।তাঁরা আগেই শুনেছিলো মুহাম্মাদ(সঃ) সেখানে পৌঁছেছেন ।আবু সুফিয়ান খুভ ভয়ে ভয়ে কাফেলা হতে নিরাপদ দুরুতবে থেকে রাসুল(সঃ) কে খুজতে লাগলেন । কেননা রাসুল এর নিকট পৌঁছানোর আগেই তাকে শত্রু ভেবে কেও হত্যা করতে পারে । তাই তাকে যেন কেও না চিনতে পারে সেজন্য আগেই ছদ্দবেশ ধারণ করেছিলেন । রাসুল(সঃ) কে পাওয়ার পরে দ্রুত তাঁর নিকট পৌঁছালে রাসুল তাঁর দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নেন । তারপর আবু সুফিয়ান বিভিন্ন সাহাবা আবু বকর,উমর,তাঁর চাচাত ভাই আলীর নকট আকুতি-মিনতি করে ইসলাম গ্রহন ও রাসুল(সঃ) এর নমনীয়তার জন্য । কিন্তু সবাইকে তাকে ভতসর্না করতে থাকে । কেও তাঁর জন্য সুপারিশ করতে রাজি হয়না । নুয়াইমান ইবনুল হারিস তাকে রীতিমত অপমান ও ভৎসনা করতে থাকে । পরে আবু সুফিয়ানের চাচা আব্বাসের অনুরোধে তিনি থেকে যান ।

পরে আবু সুফিয়ানের বিশেষ কাকুতি-মিনতিতে রাসুল(সঃ) তাকে ও আবদুল্লাহ ইবন আবী উমাইয়্যাকে ‘নীকুল উকাব’ নামক স্থানে(মক্কা-মদীনার মাঝামাঝি একটি স্থান) ইসলাম কবুল করান ।[২]

ইসলাম গ্রহনের পর[সম্পাদনা]

ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় বিজয়ের পরবর্তী প্রথম যুদ্ধ হুনাইনের যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন । আবু সুফিয়ান এই যুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখে রাসুল(সঃ) কে সন্তুষ্ট করতে চাইলেন । এই যুদ্ধে মুসলমানরা কিছুটা পিছপা হলে আবু সুফিয়ান প্রচণ্ড বেগে যুদ্ধ করতে শুরু করে । আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস এই ‍হুনাইনের ময়দান থেকে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সন্তুষ্টি অর্জন করতে সমর্থ হন ।

অনুতপ্ত জীবন[সম্পাদনা]

ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফিয়ান তার অতীত জীবনের কাজ ও আচরণ এবং ইসলাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা চিন্তা করে অনুশোচনায় জর্জরিত হয়েছেন। পরবর্তী জীবনে রাত দিন শুধু কুরআন তিলাওয়াত, কুরআনের বিধি বিধান ও উপদেশাবলী অনুধাবনে অতিবাহিত করতেন। তিনি নিজেকে দুনিয়ার সকল সুখ সম্পদ হতে দূরে রেখে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হয়ে পড়েন । তিনি সবার আগে মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং সবার শেষে বের হতেন । হযরত রাসূল(সঃ) ইনতিকালের পর আবু সুফিয়ান খুব কান্না করেছিলেন যা আরবি একটি কবিতায় অতি চমৎকার রূপে ফুটিয়ে উঠেছে । [২]

হিশাম ইবন উরওয়াহ্‌ পিতা উরওয়াহ্‌ থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেনঃ “আবু সুফিয়ান জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা ।[১]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

হযরত উমারের খিলাফতকালে আবু সুফিয়ান অনুভব করেন, তার জীবন─সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে । তিনি একদিন নিজ হাতে একটি কবর খোঁড়েন। এর ৩ দিন পরেই তিনি ইন্তিকাল করেন । খলীফা উমার (রাঃ) তার জানাযার ‍নামায পড়ান। তার মৃত্যুসন হিজরী ১৫ মতান্তরে হিজরী ২০।

  1. [আল ইসাবা-৪/৯০] 
  2. [সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০-৪০১]