বিষয়বস্তুতে চলুন

আবুল ফজল বায়হাকি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আবুল ফজল মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন বায়হাকি
ابوالفضل بیهقی
জন্মআনু. ৯৯৫
মৃত্যু২১ সেপ্টেম্বর, ১০৭৭ (বয়স আনুমানিক ৮১–৮২)
পেশাসচিব, ইতিহাসবিদ
উল্লেখযোগ্য কর্ম
তারিখ-ই বায়হাকি
পিতা-মাতা
  • হুসাইন (পিতা)

আবুল ফজল মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন বায়হাকি (ফার্সি: ابوالفضل محمد بن حسین بیهقی; মৃত্যু ২১ সেপ্টেম্বর, ১০৭৭), যিনি অধিক পরিচিত আবুল ফজল বায়হাকী (ابوالفضل بیهقی) নামে, ছিলেন একজন সচিব, ইতিহাসবিদ এবং লেখক।[]

নিশাপুরের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে শিক্ষিত এবং বিখ্যাত গজনভি সুলতান মাহমুদ গজনভির দরবারে নিযুক্ত বায়হাকী ছিলেন একজন উচ্চ সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি। তার ম্যাগনাম ওপাস বা শ্রেষ্ঠ কাজ হলো—তারিখ-ই বায়হাকী। এটি গজনভি যুগের বৈধ তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত। এটি একটি চমৎকার এবং প্রাণবন্ত ফার্সি গদ্যে লেখা হয়েছিল, যা পরবর্তী কয়েক যুগের জন্য একটি আদর্শ মডেলে পরিণত হয়।[]

আধুনিক পণ্ডিতরা বায়হাকীর স্পষ্টবাদিতা, নির্ভুলতা এবং মার্জিত শৈলীর প্রশংসা করেন। তিনি তার বইটি লিখতে ২২ বছর সময় ব্যয় করেছিলেন এবং এটি ৩০টি খণ্ডে সমাপ্ত করেছিলেন। তবে বর্তমানে এর মাত্র পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ খণ্ড এবং ষষ্ঠ খণ্ডের অর্ধেক অংশ টিকে আছে। জুলি স্কট মেসামি বায়হাকীকে ইসলামি স্বর্ণযুগের ইতিহাসবিদদের মধ্যে স্থান দিয়েছেন।[]

যৌবন ও কর্মজীবনের শুরু

[সম্পাদনা]

বায়হাকী খোরাসান প্রদেশের বায়হাক জেলার হারেতসাবাদ গ্রামে একটি পারসিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।[] যৌবনে বায়হাকী নিশাপুরের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে ১০২০/১ সালে সুলতান মাহমুদের সচিবালয়ে (দিওয়ান-ই রিসালাত) যোগদান করেন। সেখানে তিনি ১৯ বছর প্রধান সচিব আবু নাসর মুসকানের অধীনে সহকারী ও ছাত্র হিসেবে কাজ করেন।[]

১০৩৯/৪০ সালে মুসকানের মৃত্যুর পর, সুলতান প্রথম মাসউদ (রাজত্ব ১০৩০-১০৪০) বায়হাকীকে আবু সাহল জাওজানির মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন, যিনি মুসকানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। মুসকান সুলতানকে দৃঢ়ভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন বায়হাকী তার উত্তরসূরি হন। পারস্যের উজির আহমদ শিরাজি-ও সুলতানের উপস্থিতিতে বায়হাকীর প্রশংসা করেছিলেন। তবে ৪৬ বছর বয়সী বায়হাকীকে মাসউদ সম্ভবত বলেছিলেন যে, তিনি প্রধান সচিব হওয়ার জন্য বেশ তরুণ।[]

পরবর্তী কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

জাওজানি তার পূর্বসূরি মুসকানের মতো সচিবালয় ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী ছিলেন না এবং তার কাজের পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তদুপরি, বায়হাকী প্রায়ই জাওজানির বদমেজাজের শিকার হতেন। এর ফলে বায়হাকী সুলতানকে গোপনে পদত্যাগের একটি চিঠি পাঠান। তবে সুলতান বায়হাকীকে তার পদে অব্যাহত থাকার জন্য উৎসাহিত করেন এবং তার উজিরকে নির্দেশ দেন যেন তিনি জাওজানিকে বায়হাকীর সাথে সঠিক আচরণ করার আদেশ দেন।[] তবে শীঘ্রই সুলতান মাসউদ দান্দানাকানের যুদ্ধে সেলজুক তুর্কিদের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মাসউদের মৃত্যু জাওজানিকে আবারও বায়হাকীর ওপর দুর্ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়। মাসউদের মৃত্যুর পর বায়হাকী বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হন, যার জন্য আংশিকভাবে তিনি নিজের ভুলকেও দায়ী করেছেন।[]

সুলতান আব্দ আল-রশিদের (রাজত্ব ১০৪৯-১০৫২) শাসনামলে বায়হাকী অবশেষে প্রধান সচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে ফান্দাকের মতে, স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ না করার অভিযোগে তাকে গজনির কাজি কারাগারে পাঠান। কিন্তু মুহাম্মদ আউফির মতে, তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কারণে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তুমান (বা নুয়ান) নামে এক ক্রীতদাসকে সুলতান পরবর্তীতে বায়হাকীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।[]

১০৫২ সালে বিদ্রোহী গোলাম তুঘরিল গজনি দখল করেন, সুলতান আব্দ আল-রশিদকে হত্যা করেন এবং সুলতানের লোকদের একটি দুর্গে বন্দি করেন, যেখানে বায়হাকীকেও সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তুঘরিলের শাসন মাত্র ১৫ দিন স্থায়ী হয়েছিল; গজনভি অনুগতদের হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন এবং ফাররুখ-জাদ (রাজত্ব ১০৫৩-১০৫৯) সিংহাসনে বসেন। তখন বায়হাকী কারাগার থেকে মুক্তি পান।[]

তারিখ-ই বায়হাকী রচনা ও মৃত্যু

[সম্পাদনা]
সুলতান ফাররুখ-জাদের (রাজত্ব ১০৫৩-১০৫৯) মুদ্রা।

ইবনে ফান্দাকের মতে, বায়হাকী সুলতান ফাররুখ-জাদের অধীনে সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং তার শাসনের শেষের দিকে আমলাতান্ত্রিক জীবন থেকে অবসর নিয়ে গজনীতে বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই তিনি তারিখ-ই বায়হাকি লিখতে শুরু করেন। তবে ফাররুখ-জাদের শাসনকাল সম্পর্কে বায়হাকীর বইতে দেওয়া মন্তব্যগুলো থেকে মনে হয় যে, তিনি ফাররুখ-জাদের দরবারে অংশ নেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি রিপোর্ট করেছেন যে, সেই বছরগুলোতে তিনি তার ইতিহাস গ্রন্থ লিখতেই ব্যস্ত ছিলেন।

সেলজুকদের কালপঞ্জি (আখবার আল-দাওলা আল-সালজুকিয়া) অনুসারে, বায়হাকী ১০৫৮ সালে সেলজুক এবং গজনভিদের মধ্যে শান্তি চুক্তির খসড়া তৈরি করেছিলেন।[] সেই অনুযায়ী, আব্দ আল-রশিদের আমলে অপমানিত ও কারারুদ্ধ হওয়ার পর তাকে সম্ভবত পুনরায় কাজে ডাকা হয়েছিল। যাই হোক, তারিখ-ই বায়হাকীর তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে বায়হাকী তার বৃদ্ধ বয়সে ১০৭৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে এই বইটি লেখার কাজেই নিয়োজিত ছিলেন।[] তার সমাধি তার জন্মস্থান হারেতসাবাদে অবস্থিত।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 Bosworth 2004, পৃ. 13।
  2. Dabashi 2012, পৃ. 129।
  3. Amirsoleimani 1999, পৃ. 244-245।
  4. 1 2 3 4 5 6 7 Yusofi 1988, পৃ. 889-894।
  5. Bosworth 1995, পৃ. 49।

উৎসসমূহ

[সম্পাদনা]
  • Amirsoleimani, Soheila (১৯৯৯)। "Truths and Lies: Irony and Intrigue in the Tārīkh-i Bayhaqī"। Iranian Studies৩২ (2, The Uses of Guile: Literary and Historical Moments, Spring)। Taylor & Francis: ২৪৩–২৫৯। ডিওআই:10.1080/00210869908701955
  • Bosworth, C. E (১৯৯৫)। The Later Ghaznavids: Splendour and Decay: The Dynasty in Afghanistan and Northern India 1040-1186। Munshiram Manoharlal Publishers Private, Limited। আইএসবিএন ৯৭৮৮১২১৫০৫৭৭২
  • Bosworth, C. Edmund (২০০৪)। "An Oriental Samuel Pepys? Abuʾl-Faḍl Bayhaqi's Memoirs of Court Life in Eastern Iran and Afghanistan, 1030-1041"। Journal of the Royal Asiatic Society। Third Series, Vol. ১৪, No. ১, Apr.।
  • Bosworth, C. Edmund (২০১২)। "Maḥmud b. Sebüktegin"। Encyclopaedia Iranica
  • Yusofi, G. H. (১৯৮৮)। "Bayhaqi, Abu'l-Fażl"। Encyclopaedia Iranica, Vol. III, Fasc. 8। পৃ. ৮৮৯–৮৯৪।
  • E.G. Browne. Literary History of Persia. 1998. আইএসবিএন ০-৭০০৭-০৪০৬-X
  • Jan Rypka, History of Iranian Literature. Reidel Publishing Company.
  • Dabashi, Hamid (২০১২)। The World of Persian Literary Humanism। Harvard University Press। পৃ. ১–৩৮৪। আইএসবিএন ৯৭৮-০৬৭৪০৭০৬১৫

টেমপ্লেট:ইসলামের ইতিহাসবিদ