আফ্রিকান মহা হ্রদ

স্থানাঙ্ক: ৮°০০′ দক্ষিণ ৩৫°০০′ পূর্ব / ৮.০০০° দক্ষিণ ৩৫.০০০° পূর্ব / -8.000; 35.000
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নীল রঙে আফ্রিকান মহা হ্রদ প্রণালী।
পূর্ব আফ্রিকান রিফট এবং পুরো তথাকথিত মহা রিফট উপত্যকা সহ বৃহত্তর অঞ্চলের মানচিত্র
আফ্রিকান মহা হ্রদ অঞ্চল এবং এর উপকূলরেখার উপগ্রহ দৃশ্য।

আফ্রিকান মহা হ্রদ (সোয়াহিলি: মাজিওয়া মাকু) হল অনেকগুলি হ্রদের ক্রম, যেগুলি পূর্ব আফ্রিকান রিফ্টে, এবং তার আশেপাশে, রিফ্ট উপত্যকা হ্রদসমূহ তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিক্টোরিয়া হ্রদ, যেটি অঞ্চল অনুসারে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টাটকা জলের হ্রদ; টাংগানিকা হ্রদ, আয়তন এবং গভীরতায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাদু জলের হ্রদ এবং মালাউই হ্রদ, অঞ্চল অনুযায়ী বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম স্বাদু জলের হ্রদ।[১] সম্মিলিতভাবে, এগুলিতে ৩১,০০০ কিমি (৭৪০০ ঘন মাইল) জল ধরে। এই পরিমানটি বৈকাল হ্রদ বা উত্তর আমেরিকার মহা হ্রদের চেয়ে বেশি। পৃথিবীর মোট মিষ্টি জলের প্রায় ২৫% এই অঞ্চলে আছে। আফ্রিকার বিরাট রিফ্ট হ্রদগুলি হল বিশাল জীববৈচিত্র্যের প্রাচীন আশ্রয়স্থল, এবং বিশ্বের মৎস প্রজাতির ১০% এই অঞ্চলে পাওয়া যায়।

আফ্রিকার মহা হ্রদ অঞ্চলের মধ্যে যে দেশগুলি পড়ছে সেগুলি হল বুরুন্ডি, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, কেনিয়া, মালাউই, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া এবং উগান্ডা[২]

হ্রদ এবং নিকাশী অববাহিকা[সম্পাদনা]

নিকাশী অববাহিকা দ্বারা গোষ্ঠীবদ্ধ নিম্নলিখিতগুলির হ্রদগুলি অধিকাংশই আফ্রিকান মহা হ্রদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে। আফ্রিকান মহা হ্রদের অংশ হিসাবে বিবেচিত হ্রদের সঠিক সংখ্যা তালিকা অনুসারে পরিবর্তিত হয়, এবং রিফ্ট উপত্যকার ছোট ছোট হ্রদগুলিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, বিশেষত যদি তারা বৃহত্তর হ্রদগুলির মতো একই নিকাশী অববাহিকার অংশ হয়, যেমন কিয়োগা হ্রদ

শ্বেত নীল নদে প্রবাহিত[সম্পাদনা]

কঙ্গো নদী[সম্পাদনা]

শায়ার নদী হয়ে জাম্বেজি নদীতে প্রবাহিত[সম্পাদনা]

এন্ডোরিক অববাহিকা[সম্পাদনা]

আফ্রিকান মহা হ্রদ অঞ্চল[সম্পাদনা]

আফ্রিকান মহা হ্রদকে ঘিরে দেশগুলিকে নিয়ে মহা হ্রদ অঞ্চল (খুব কমই:মহত্তর হ্রদ অঞ্চল ব্যবহার হয়) গঠিত। এই দেশগুলির মধ্যে আছে বুরুন্ডি, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, কেনিয়া, মালাউই, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া এবং উগান্ডা[২] ইন্টারলাকাস্ট্রাইন ("হ্রদগুলির মধ্যে বিদ্যমান") এই বিশেষণটি দিয়ে এই অঞ্চলকে বোঝানো যায়,[৩] বা আরও নির্দিষ্টভাবে, হ্রদ দ্বারা আবদ্ধ রাষ্ট্রগুলি বা অঞ্চলগুলিকে বোঝায়।[৪]

বান্টু সোয়াহিলি ভাষা হল আফ্রিকান মহা হ্রদ অঞ্চলের সর্বাধিক কথ্য ভাষা[৫] এই ভাষাটি এই অঞ্চলের পাঁচটি দেশের জাতীয় বা দাপ্তরিক ভাষা হিসাবেও ব্যবহার করা হয়, দেশগুলি হল: তানজানিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র।

আনুমানিক ১.০৭ কোটি মানুষের উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে, এবং এই অঞ্চলে উদ্বৃত্ত কৃষির কারণে, অঞ্চলটি কয়েকটি ছোট রাজ্য নিয়ে সংগঠিত হয়ে উঠেছিল। এই রাজতন্ত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল বুগান্ডা, বুনিওরো, রুয়ান্ডা এবং বুরুন্ডি। উপ-সাহারান আফ্রিকার জন্য অস্বাভাবিক হলেও, ঐতিহ্যবাহী সীমানাগুলি মূলত ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা রক্ষিত ছিল। তবে রাজতন্ত্রকে বিভক্ত করার জন্য, বা যাতে কম ইউরো কেন্দ্রিক বলে বিবেচিত গোষ্ঠীর তুলনায় পছন্দসই দলগুলিকে আপেক্ষিক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে তার জন্য জাতীয় সীমানা টানা ছিল, এটি ঔপনিবেশিকরা পছন্দ করেনি।

এই অঞ্চলে নীলনদের উৎস থাকার কারণে, অঞ্চলটি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপীয়রা আগ্রহী ছিল। এই অঞ্চলে আগত প্রথম ইউরোপীয়ানরা ছিলেন ধর্মপ্রচারক। তাঁরা স্থানীয়দের ধর্মান্তরিত করতে খুব একটা সাফল্য পাননি বটে, কিন্তু অঞ্চলটিকে পরবর্তীতে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। পৃথিবীর অন্যান্য অংশের সাথে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের ফলে মানুষ এবং পশুসম্পদ উভয়ই এখানে পরপর কয়েকটি ধ্বংসাত্মক মহামারীর কবলে পড়েছিল। স্বাধীনতার পরে প্রচন্ড সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসাবে একে দেখা হলেও, এই অঞ্চলটি সাম্প্রতিক দশকগুলিতে গৃহযুদ্ধ এবং সংঘাতের মাধ্যমে বিভক্ত হয়েছে। একমাত্র তানজানিয়া এই সমস্ত দুর্দশামুক্ত ছিল। ইউএনএইচসিআর এর মতে, তানজানিয়া এই অঞ্চলের সর্বাধিক কঙ্গো শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলগুলি প্রচন্ড দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।[৬]

জলবায়ু[সম্পাদনা]

উচ্চভূমিগুলি তুলনামূলকভাবে শীতল, সেখানে গড় তাপমাত্রা ১৭ °সে (৬৩ °ফা) এবং ১৯ °সে (৬৬ °ফা) এর মধ্যে ওঠানামা করে। এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এখানকার প্রধান নিকাশী অববাহিকার মধ্যে আছে কঙ্গো-জাইরে, নীল নদ এবং জাম্বেজি নদী। এগুলি যথাক্রমে আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগরে প্রবাহিত হয়েছে।

কঙ্গো-জাইরে অববাহিকার নিম্নভূমিতে প্রচুর বনাঞ্চল আছে, আবার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় উচ্চভূমিতে তৃণভূমি এবং সাভানা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। নিম্নভূমিতে তাপমাত্রার গড় প্রায় ৯৫ °ফা (৩৫ °সে)। তুর্কানা হ্রদের চারপাশে জলবায়ু গরম এবং খুব শুষ্ক। অক্টোবরে একটি সংক্ষিপ্ত বর্ষা মরশুমের পরে এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত দীর্ঘকালীন বৃষ্টিপাত হয়।

উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত[সম্পাদনা]

পশ্চিম রিফ্ট উপত্যকার হ্রদগুলি মিষ্টি জলের এবং বহু সংখ্যক স্থানিক প্রজাতিগুলির আশ্রয়স্থল। হ্রদগুলিতে ১,৫০০ টিরও বেশি সিক্লিড মাছের প্রজাতি আছে,[৭] এছাড়া অন্যান্য মাছের প্রজাতিও আছে। হ্রদগুলি বেশ কয়েকটি উভচর প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। নীলনদের কুমির প্রচুর আছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে আছে হাতি, গরিলা এবং জলহস্তী

তুর্কানা হ্রদ অঞ্চলে কেনিয়ার স্থানীয় শত শত প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। ফ্লেমিংগো এর অগভীর জলে ঘুরে বেড়ায়। পূর্ব আফ্রিকা রিফ্ট ব্যবস্থা এই পাখিদের উড়ানপথের কাজ করে, আরও শত শত পাখি এই রাস্তা ধরে চলে আসে। পাখিগুলি মূলত হ্রদের প্লাঙ্কটনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে, সেগুলি আবার মাছেরও খাদ্য।

এখানকার গাছপালার মধ্যে বৃষ্টিপাত অরণ্য থেকে শুরু করে সাভানা ঘাস সবই আছে। কিছু হ্রদে, দ্রুত বর্ধমান ক্ষতিকর কিছু উদ্ভিদ আছে, যেমন, কচুরি পানা,- যেগুলি জলতলকে ঢেকে ফেলে। এছাড়া আছে উপকূলে আটকে থাকা প্যাপিরাস। এগুলি জলজ প্রাণিদের জন্য সমস্যাসঙ্কুল। কচুরিপানা এ পর্যন্ত কেবল ভিক্টোরিয়া হ্রদকে প্রভাবিত করেছে।

ভূতত্ত্ব[সম্পাদনা]

১.২ কোটি বছর আগে পর্যন্ত, নিরক্ষীয় মালভূমির সমৃদ্ধ জলরাশি, হয় পশ্চিম দিকে কঙ্গো নদী প্রণালীতে বা পূর্বদিকে ভারত মহাসাগরে প্রবাহিত হত। মহা রিফ্ট উপত্যকা তৈরি হওয়ার পর বিষয়টি পরিবর্তিত হয়ে যায়। দুটি ভূত্বকীয় পাত পৃথক হয়ে দূরে সরে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর ভূত্বকে একটি রিফ্ট তৈরি হয়। এটি ভূত্বকের একটি দুর্বল অঞ্চল। প্রায়ই এর সঙ্গে থাকে গ্র্যাবেন বা গর্ত, যার মধ্যে জল জমা হয়ে থাকে। ম্যান্টলের স্রোত প্রবাহিত হয়ে এই রিফ্ট বা ফাটল শুরু হয়েছিল পূর্ব আফ্রিকা থেকে, তারপর এটি বাকি আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যায়। ভূ-তাত্ত্বিক উত্থানের ফলে যে অববাহিকাগুলি তৈরি হয়েছিল, সেগুলি জলপূর্ণ এবং জল এখন উত্তরে প্রবাহিত হয়।

ভিক্টোরিয়া হ্রদটি আসলে রিফ্ট উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত নয়। এটি পূর্ব এবং পশ্চিমী রিফ্টহগুলির মধ্যে একটি নিম্নাঞ্চলে সৃষ্ট, দুই পাশের রিফ্টের উত্থানের ফলে গঠিত।

প্রত্নতত্ত্ব[সম্পাদনা]

প্রায় কুড়ি থেকে তিরিশ লক্ষ বছর আগে, তুর্কানা হ্রদটি বৃহত্তর এবং অঞ্চলটি আরও উর্বর ছিল, সেই সময় এই অঞ্চল প্রাচীন মহা বনমানুষদের বসতি হয়ে উঠেছিল। রিচার্ড লিকি এ অঞ্চলে অসংখ্য নৃতাত্ত্বিক খননের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার থেকে হোমিনিনিদের অবশেষের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়েছিল। কুড়ি লক্ষ বছর আগেকার খুলি ১৪৭০ পাওয়া গেছে ১৯৭২ সালে। প্রথমে এটি হোমো হাবিলিস এর বলে মনে করা হয়েছিল, তবে কিছু নৃবিজ্ঞানী এটিকে একটি নতুন প্রজাতি, হোমো রুডলফেনসিস হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। হ্রদের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে (পূর্বে রুডল্ফ হ্রদ নামে পরিচিত ছিল)। ১৯৮৪ সালে, তুর্কানা বালক, একটি হোমো ইরেক্টাস ছেলের প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছিল। খুব সাম্প্রতিককালে, সেখানে ৩,৫০০,০০০ বছরের পুরনো একটি খুলি আবিষ্কার করা হয়েছিল, যার নাম কেনিয়্যানথ্রোপাস প্ল্যাটিওপ্স্, যার অর্থ "কেনিয়ার সমতল মুখযুক্ত মানুষ"।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

মাছ ধরা — মূলত তেলাপিয়া প্রজাতির তবে নীলনদের পার্চ জাতীয় মৎস্য এখানকার প্রধান জীবিকার জোগান দেয়। সীমানায় চারটি মহা হ্রদ থাকায়, উগান্ডা বিশ্বের স্বাদু জলের মাছের অন্যতম বৃহত্তম উৎপাদক।উচ্চভূমিতে জলবায়ু এবং সমৃদ্ধ আগ্নেয় জমি নিবিড় চাষে সাহায্য করে।

মহা হ্রদ অঞ্চল রাজ্য অর্থনীতির বিভিন্ন কাঠামো রয়েছে এবং তারা বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। জিডিপির আসল বৃদ্ধির হার বুরুন্ডিতে ৫.১ শতাংশ থেকে শুরু করে ডিআরসি-তে ৬.৪ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. "~ZAMBIA~"। www.zambiatourism.com। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০৩-১৪ 
  2. "International Documentation Network on the Great African Lakes Region"। Princeton University Library। সংগ্রহের তারিখ ২২ নভেম্বর ২০১৩ 
  3. Shillington, Kevin (২০১৩)। Encyclopedia of African History। Routledge। পৃষ্ঠা 320। আইএসবিএন 978-1-135-45669-6the fertile corridor of the Great Lakes Region (also called the interlacustrine region) 
  4. টেমপ্লেট:M-W "the region of Africa that is bounded by Lakes Victoria, Kyoga, Albert, Edward, and Tanganyika"
  5. Shema, Rutagengwa Claude। "Great Lakes Region of Africa – Burundi"। Regional Coordinator Great Lakes Peace Initiative (GLPI)। সংগ্রহের তারিখ ২২ নভেম্বর ২০১৩ 
  6. "Great Lakes Region News"UNHCR। সংগ্রহের তারিখ ২২ অক্টোবর ২০১৫ 
  7. Turner; Seehausen; Knight; Allender; Robinson (২০০১)। "How many species of cichlid fishes are there in African lakes?"। Molecular Ecology10 (3): 793–806। ডিওআই:10.1046/j.1365-294x.2001.01200.xপিএমআইডি 11298988 

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Chrétien, Jean-Pierre (২০০৬)। The Great Lakes of Africa: Two Thousand Years of History। Straus, Scott কর্তৃক অনূদিত। New York: Zone Books। আইএসবিএন 1-890951-35-8 

টেমপ্লেট:Regions of Africa