আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি (বেইজিং)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
জিডামচেং জিয়ায় ভূগর্ভস্থ শহরের প্রবেশ পথ

আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি (চীনা: 地下 城; পিনয়িন: Dìxià Cheng) একটি স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ের বোমারোধী আশ্রয় কেন্দ্র, যা চীনের বেইজিং শহরের তলদেশে অবস্থিত অনেকগুলো সুড়ঙ্গের সমন্বয়ে নির্মিত। এটাকে ভূগর্ভস্থ মহাপ্রাচীর হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা মূলত সামরিক প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল। কমপ্লেক্সটি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে সিনো-সোভিয়েত সম্পর্ক অবনতির [১][২] সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পারমাণবিক যুদ্ধের বিবেচনায় নির্মিত হয়েছিল, যা দর্শনার্থীদের জন্য ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়। [৩] দর্শনার্থীদেরকে কমপ্লেক্সটির আংশিক ভ্রমণ করতে দেয়া হয়,[৩] যাকে বলা হত “অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এবং সত্যি সত্যি ভুতুড়ে”।[৪] ডিজিয়া চেং (ভূগর্ভস্থ শহরের স্থানীয় নাম) ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সাল থেকে সংস্কারের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।[১]

অবস্থান[সম্পাদনা]

বেইজিং শহরের কেন্দ্রের তলদেশে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ শহরের সুড়ঙ্গগুলো ৮৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা (৩৩ বর্গমাইল) জুড়ে এবং ৮ থেকে ১৮ মিটার (২৬-৫৯ ফুট) মাটির গভীরে নির্মিত। [১][২] কমপ্লেক্সটিতে প্রবেশের জন্য প্রায় ৯০ টি প্রবেশপথ ছিল যার সবগুলোই কিয়ানমেন এর প্রধান রাস্তায় দোকানগুলোর ভেতর লুকানো ছিল।[৫] বেশিরভাগ প্রবেশপথই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে অথবা পুনঃনির্মাণ এর জন্য বন্ধ করা হয়েছে। জ্ঞাত অবশিষ্ট প্রবেশপথ গুলো হচ্ছে- ৬২ ওয়েস্ট ডোমোচেং স্ট্রিট কিয়ানমেন, চংগেন জেলার ৪৪ জিংফু দাজির বেইজিং কিয়ানমেন কার্পেট ফ্যাক্টরি, কিয়ানমেনএর ১৮ দাজহালান জিয়া।[১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৬৯ সালে সোভিয়েত - চীনের মধ্যে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, হেইলুংচিয়াং নদীর ঝেনবাও দ্বীপের সীমান্তে সংঘাতকালে চীনা চেয়ারম্যান মাও সে তুং ভূগর্ভস্থ শহর নির্মাণের আদেশ দেন। [২] Tভূগর্ভস্থ শহরটি পারমাণবিক, বায়োকেমিক্যাল এবং প্রচলিত সব ধরনের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল।[১] কমপ্লেক্সটি বেইজিং এর জনগণকে রক্ষার জন্য ও শহরের উপর হামলার সময় সরকারি কর্মকর্তারা যাতে শহরটিকে খালি করতে পারে সে জন্য তৈরী করা হয়েছিল।[৬] সুড়ঙ্গটির কাজ সমাপ্ত হলে এটি বেইজিং এর প্রায় ছয় মিলিয়ন বাসিন্দাদের আশ্রয় দিতে পারবে বলে সরকার দাবি করত।[৪]

কমপ্লেক্সটিতে বিভিন্ন সুবিধা যেমন- রেস্টুরেন্ট , ক্লিনিক , স্কুল , থিয়েটার , কারখানা , একটি রোলার স্কেটিং রিং , শস্য এবং তেল গুদাম , এবং একটি মাশরুম চাষের খামার ইত্যাদি দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছিল।এখানে প্রয়োজন হলে যাতে সহজেই পানির কূপ খনন করা যায় এইরকম ৭০টি সম্ভাব্য জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল।[২] টানেলের বাসিন্দাদের বিষাক্ত গ্যাস থেকে রক্ষা করতে, প্রায় ২৩০০ শ্যাফট বিশিষ্ট সম্প্রসারিত বায়ুচলাচল সিস্টেম তৈরি করা হয়েছিল,[৭] এছাড়াও গ্যাস ও পানিরোধী প্রকোষ্ঠ, সেইসাথে পুরু কংক্রিটের প্রধান ফটক নির্মাণ করা হয়েছিল সুড়ঙ্গটিকে বায়োকেমিক্যাল আক্রমণ ও পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।[২][৭]

কমপ্লেক্সটির প্রকৃত আয়তন আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ হয়নি,[২] তবে ধারণা করা হয় টানেলটি বেইজিং এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে যেমন- ঝঙ্গানহাই, বেইজিংয়ের গ্রেট হল, এমনকি শহরের উপকণ্ঠে সামরিক ঘাঁটির সাথে। [৬] চায়না ইন্টারনেট ইনফরমেশন সেন্টার এর দাবি অনুসারে পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চল বাদে “ এটি সম্ভবত সেন্ট্রাল বেইজিং এর সকল এলাকা, জিডান, জিন্যুমেন থেকে কিয়ানমেন এবং চংমেন এলাকার সাথে সংযুক্ত রয়েছে”।[২]  গুজব আছে প্রতিটি বাসভবনই গুপ্ত দরজার মাধ্যমে নিকটবর্তী সুড়ঙ্গ মুখের সাথে সংযুক্ত ছিল।[২] পরিকল্পনাটি ছিল, পারমাণবিক হামলা হলে বেইজিং এর জনসংখ্যার অর্ধেককে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে এবং বাকী অর্ধেককে পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চলে সরিয়ে নেয়া হবে।.[১]

সুড়ঙ্গটি স্কুল ছাত্র সহ ৩০০,০০০০ এর অধিক স্থানীয় নাগরিকদের স্বেচ্ছাশ্রম দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এমনকি এর কিছু অংশ কোনো ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই খনন করা হয়েছিল।[২] শতবর্ষ পুরোনো শহরের দেয়াল, টাওয়ার, গেট এমনকি জিথিমেন, ফুচেংমেন এবং চঙ্গয়েমেন শহরের পুরোনো ফটক ও কমপ্লেক্সের নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করার জন্য ধ্বংস করা হয়েছিল।.[২]

নির্মাণ শেষের পর থেকে সুড়ঙ্গটি স্থানীয়দের দ্বারা বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কারণ এটি শীতকালে উষ্ণ ও গ্রীষ্মকালে শীতল থাকত। [২]  ব্যস্ত রাস্তায়, কমপ্লেক্সটির কিছু অংশ সস্তা হোটেলে পরিবর্তিত হয়েছে, অন্য অংশগুলোও কেনাকাটা ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ,এমনকি থিয়েটারে রুপান্তরিত হয়েছে ।[২]

কমপ্লেক্সটি কখনো তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি , এমনকি এটি কখনো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত করা হয়নি । স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখনও সুড়ঙ্গে নিয়মিত পানির ফুটো চেক এবং কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।[২]

পর্যটন আকর্ষণ[সম্পাদনা]

কমপ্লেক্সটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০০ সালে খুলে দেয়া হয়, কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০০৮ থেকে এটি সংস্কারের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, [১] যখন খোলা ছিল, দর্শকের কমপ্লেক্সের আংশিক ভ্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ; শহরের ভূগর্ভস্থ শহরটি বিদেশী পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় ছিল কিন্তু কার্যত স্থানীয় নাগরিকদের দ্বারা বিস্মৃত হয়ে যায়। অন্যান্য অনেক প্রবেশপথ থাকা স্বত্বেও, বিদেশী দর্শকদের জন্য নির্ধারিত অনুমোদিত প্রবেশ পথ গুলো হচ্ছে, কিয়েনমেন এর একটি ছোট দোকানের ভিতর দিয়ে, তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের দক্ষিণ দিয়ে, ৬২ দক্ষিণ ডোমোচেং স্ট্রিট। পর্যটক গ্রুপ বিনা মুল্যে ও পূর্বানুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারত, একাকী পর্যটককে ২০ ইউয়ান (মার্কিন $ ২.৪০) ফি প্রদান করতে হত।[২]

সরকারী ভ্রমণ শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ শহরের একটি ক্ষুদ্র জায়গায় দর্শনার্থীদের ভ্রমণ করতে দিত। [৬] কমপ্লেক্সটির ভেতরে দর্শনার্থীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাওয়ার পথনির্দেশক স্তম্ভ দেখতে পেত যেখানে সুড়ঙ্গটি ব্যবহার করে পৌছানো যায় যেমন- তিয়েনআনমেন স্কয়ার এবং নিষিদ্ধ নগরী, কিছু প্রকোষ্ঠ যা তাদের মুল উদ্দেশ্য তৈরী করা হয়েছিল তার লেভেল দেখতে পেত যেমন- সিনেমা, হাসপাতাল, অস্ত্রাগার। [৫] স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সুড়ঙ্গ খননে উৎসাহিত করার জন্য মাও সে তুং এর একটি প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছিল যাতে স্লোগান লেখাছিল যেমন “শস্য সংগ্রহ কর” এবং “মানুষের জন্য: যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও, দুর্ভিক্ষ জন্য প্রস্তুত হও"।[৪] দর্শনার্থীদের জন্য নয় এমন জায়গায় বাঙ্কের বিছানা, ক্ষয় প্রাপ্ত কাপ বোর্ডে পানি বিশুদ্ধকারী যন্ত্রের দেখা মিলতে পারে। [১] সরকারী সফরের দর্শনার্থীদের একটি সচল রেশম কারখানা যা কমপ্লেক্সের ভূগর্ভস্থ কর্মীদের মিটিং কক্ষে সেখানে নিয়ে যাওয়া হত, সেখানে তাদের রেশম গুটি থেকে রেশম পাওয়ার প্রক্রিয়া দেখানো হত। দর্শনার্থীদের সেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কিয়ানমেন চারু ও কারু শিল্প কেন্দ্র এবং চায়না কাই থিন সিল্ক কোম্পানি থেকে স্মারক জিনিসপত্র কেনার সুযোগ ছিল।[৬]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

  • বেইজিং এর পর্যটন আকর্ষণ
  • আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি
  • আন্ডারগ্রাউন্ড প্রজেক্ট ১৩১ -পিএলএ হুবেই হেড কোয়ার্টার এর জন্য সুড়ঙ্গ

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. Jiang, Steven "Beijing Journal: An underground 'parallel universe'". Cable News Network (2008-02-01). Retrieved on 2008-07-14.
  2. Wang, Zhiyong.
  3. "Underground City".
  4. "Dixia Cheng".
  5. "Beijing Underground City ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১২ জুন ২০০৮ তারিখে".
  6. Hultengren, Irving A. "Beijing Underground City".
  7. "Going underground".

স্থানাঙ্ক: ৩৯°৫৪′০০″ উত্তর ১১৬°২৪′২২″ পূর্ব / ৩৯.৮৯৯৮৮৫° উত্তর ১১৬.৪০৬১২২° পূর্ব / 39.899885; 116.406122