আযান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(আজান থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
আরবি
أَذَان
অক্ষরীকরণ
aḏān, আযান, আজান
অনুবাদ
নামাজের জন্য আহ্বান

আযান আরবি: أَذَان‎‎ (অথবা আজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় যেমন: আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, এবং তুর্কমেনিস্তান, ইজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় তুরস্ক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা), আজন হিসেবে উচ্চারণ করা হয় উজবেকিস্তান, মুয়াজ্জিন কর্তৃক প্রার্থনার উদ্দেশ্য দিনের নির্ধারিত সময়ে ৫ বার আহবান করাকে আযান বলা হয়। সংজ্ঞা : ‘আযান’ অর্থ, ঘোষণা ধ্বনি (الإعلام)। পারিভাষিক অর্থ, শরী‘আত নির্ধারিত আরবী বাক্য সমূহের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উচ্চকণ্ঠে ছালাতে আহবান করাকে ‘আযান’ বলা হয়। ১ম হিজরী সনে আযানের প্রচলন।[১] হয়।ʾআযান শব্দের মূল অর্থ দাড়ায় أَذِنَ ডাকা,আহবান করা। যার মূল উদ্দেশ্য হল অবগত করানো। এই শব্দের আরেকটি বুৎপত্তিগত অর্থ হল ʾআজুন। (أُذُن), যার অর্থ হল "শোনা"। পবিত্র কুরআনে মোট পাঁচ স্থানে أذان শব্দটি এসেছে । এর মহাত্ম্য হচ্ছে আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছে । তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান ।

আযানের প্রচলন[সম্পাদনা]

আযানের সময়[সম্পাদনা]

প্রতি দিন-রাতে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ বার আযান দেওয়া হয়। আর আযান তখনই দেওয়া হয় যখন নামাযের সময় হয়। নীচে আযানের সময় দেওয়া হল: ১। ফজর:সবহে সাদিক উদিত হলে। সূর্য পূর্ব আকাশে উদিত হওয়ার আগ মুহূর্তে । ২। যোহর: সূর্য পশ্চিম আকাশে একটু ঢলে গেলে । ৩। আছর:সূর্যের প্রখরতা থাকতে । ৪। মাগরিব:সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে । ৫। এশা: সূর্য অস্ত যাওয়ার পর রাতেরএক তৃতীয়াংশে । [২]

হযরত বেলালের আযান[সম্পাদনা]

হযরত বেলাল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আযান দেন। তার আযানের ধ্বনি শুনে মদীনাবাসী একত্র হয়ে মসজিদ-এ-নববীতে আসেন সালাত (নামায) আদায় করার জন্য। রাসুল সা. এর নির্দেশে তিনিই প্রথম মদিনার মসজিদে নববীতে আযান প্রদান করেন । উল্লেখ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আযান ও একামত ছাড়া নামাজ পড়েছেন। [৩]

আযানের কথা বা বাক্যসমূহ[সম্পাদনা]

সুন্নি[৪][৫][৬][৭][সম্পাদনা]

আবৃত্তি আরবি প্রতিবর্ণীকরণ অনুবাদ বর্ণ
২ বার* الله اكبر আল্লাহু আকবার আল্লাহ সর্বশক্তিমান সুন্নী এবং শিয়া
২ বার اشهد ان لا اله الا الله আশহাদু-আল লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই সুন্নী এবং শিয়া
২ বার اشهد ان محمد الرسول الله আশহাদু-আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত দূত সুন্নী এবং শিয়া
২ বার حي على الصلاة হাইয়া আলাস সালা নামাজের জন্য এসো সুন্নী এবং শিয়া
২ বার حي على الفلاح হাইয়া আলাল ফালা সাফল্যের জন্য এসো সুন্নী এবং শিয়া
২ বার الصلاة خير من النوم আস সলাতু খাইরুম মিনান নাউম ঘুম হতে নামাজ উত্তম** (Fajr prayer only) সুন্নি
২ বার حي على خير العمل Hayya 'alā khayril-'amal Make haste towards the best deed শিয়া
২ বার الله اكبر আল্লাহু আকবার আল্লাহ্ মহান সুন্নী এবং শিয়া
১ বার** لا اله الا الله লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই সুন্নী এবং শিয়া

ফযরের নামাজের আযান[সম্পাদনা]

ফযরের নামাজের আযানে একটু ব্যতিক্রম আছে। আর তা হলো এই যে আযানের শেষভাগে "হাইয়া আলাল ফালাহ" দুই বার বলার পরে "আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম" বাক্যটি দুই বার বলতে হবে। এর পর যথারীতি "আল্লাহু আকবার", "আল্লাহু আকবার", "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলে আযার শেষ করতে হবে।

জুমার নামাজের আযান[সম্পাদনা]

জুমার নামাজের আযান দুইবার দিতে হয়। প্রথমত নামাযের ওয়াক্ত হলে মুয়াযযিন প্রথমবার আযান দেবেন। আবার মূল খুৎবা শুরুর আগে, ইমাম তথা খতীব মিম্বরে আসীন হলে ঠিক তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‌‌‌মুআযযিন দ্বিতীয়বার আযান দিবেন, একে বলা হয় সা-নী আযান। খুৎবা শেষে নামাজ শুরুর প্রাক্কালে ‌‌‌মুআযযিন যথারীতি ইকামত দিবেন।

আযানের দোয়া[সম্পাদনা]

আযানের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব । মুয়াযযিন যখন আযানের এক-একটি বাক্য বলা শেষ করবেন তখন শ্রোতা তার উত্তরে একই বাক্য পাঠ করবেন। আযান মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়। এ সময় কোনো কাজ করা বা কথা বলাও নিষেধ। এমনকি এসময় কুরআন শরীফ পাঠ করা স্থগিত রাখতে হয়। আযান শেষে দরুদে ইবরাহীম বা দরুদ শরীফ পড়ে এই দোয়া পড়তে হয়। আযানের দোয়া হলো:

আরবিঃ اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ سَيّدِنَا مُحَمَّدَاً الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامَاً مَحْمُودَاً الَّذِي وَعَدْتَهُ وَارْزُقْنَا شَفَا عَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَتِه إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা রাব্বাহাযিহিদ দাওয়াতিত্তাম্মাহ ওয়া সালাতি ক্বায়িমা, আতি সায়্যিদিনা মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলা ওয়াদ্দারাজাতার রাফিয়াহ, ওয়াব আসহু মাক্কামাম্মাহমুদানিল্লাযি ওয়া আত্তাহ, ওয়ার যুক্বনা শাফা'আতাহু ইয়াওমাল ক্বিয়া-মাহ ইন্নাকা লা তুখলিফুল মিয়াদ।

আযানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য[সম্পাদনা]

ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য ও নিদর্শন হলো আজান। আজানের মাধ্যমে মহান আল্ল­াহ-তায়ালার একাত্মবাদ, বড়ত্ব ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দৈনিক পাঁচবার আজানের সুমধুর তানে মুমিনের হৃদয়ে ইমানের জোয়ার আসে, খোদাপ্রেমে সিক্ত হয় মুমিনের অন্তরাত্মা। আজান শোনামাত্র মুসলমানগণ সব ভেদাভেদ ভুলে মসজিদে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লাশারিকের স্বীকৃতি দেন।

আর সে অপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করে যুগে যুগে অগণিত অমুসলিম ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইমানের শরাব পান করে ধন্য হয়েছেন। সঙ্গত কারণেই মুসলিম সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আজানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আজানের তাৎপর্য সম্পর্কে মহান আল্ল­াহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, আর যখন তোমরা নামাজের দিকে আহ্বান কর (আজান দাও), তখন তারা (কাফেররা) একে হাসি-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুক হিসেবে গ্রহণ করে।

এর কারণ হচ্ছে তারা এমন সম্প্রদায়, যাদের বুদ্ধি-বিবেক নেই। (সূরা মায়েদা, আয়াত-৫৮)। মহান আল্ল­াহতায়ালা এ সম্পর্কে আরও ইরশাদ করেন, হে মুমিনগণ! যখন জুমার দিনে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয় (আজান দেওয়া হয়), তখন তোমরা আল্ল­াহর স্মরণের দিকে (নামাজের দিকে) ধাবিত হও। আর ক্রয়-বিক্রয় বর্জন কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে। (সূরা জুমা, আয়াত-০৯)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যখন আজান দেওয়া হয়, তখন শয়তান বায়ু নির্গমন করতে করতে এত দূরে চলে যায় যে, সেখান থেকে আজান শোনা যায় না। (বোখারি)।

প্রিয়নবী (সা.) আরও ইরশাদ করেন, যখন নামাজের সময় হয়, আর তোমরা দুজন ব্যক্তি থাক, তাহলে তোমাদের থেকে একজন আজান ও ইকামাত দেবে এবং দুজনের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করবে। (বোখারি)।

যে ব্যক্তি আজান দেয়, শরিয়তের পরিভাষায় তাকে মুয়াজ্জিন বলা হয়। আমাদের সমাজে কতিপয় মানুষ আজান দেওয়াকে নিচু কাজ মনে করে, অথচ আজান দেওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত একটি আমল। কেয়ামতের দিবসে মুয়াজ্জিনগণ বিশেষ মর্যাদাবান হবেন। সেদিন চন্দ্র, সূর্য, পাহাড়-পর্বত, নদনদী, গাছপালা, পশু, পাখি এবং প্রত্যেক প্রাণী ও নিষ্প্রাণ দুনিয়াতে যাদের কাছে মুয়াজ্জিনের আজান পৌঁছত, সবাই তার জন্য সাক্ষ্য দেবে। মুয়াজ্জিনের জন্য রয়েছে অফুরন্ত নেয়ামত, সুউচ্চ মর্যাদা ও জান্নাতের সুসংবাদ।

মহান আল্ল­াহতায়ালা সূরা হা-মীম সেজদার ৩৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা কার? যে আল্ল­াহর দিকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন মুসলমান।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]