বিষয়বস্তুতে চলুন

আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (ইংরেজি: Offensive realism) হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক একটি কাঠামোগত তত্ত্ব, যা নব্যবাস্তববাদী চিন্তাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ারশাইমার[] প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন।

আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ মনে করে যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যিক প্রকৃতিই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসী আচরণকে উৎসাহিত করে। এই তত্ত্বটি প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদ থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এটি মহাশক্তিগুলোকে ক্ষমতা-সর্বাধিককারী এবং সংশোধনবাদী (revisionist) হিসেবে চিত্রিত করে, যারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ভারসাম্য রক্ষার [en] কৌশলের চেয়ে দায় এড়ানো [en] (buck-passing) এবং আত্মস্বার্থ বৃদ্ধিতেই বেশি প্রাধান্য দেয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়ন ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ধারণা প্রদান করলেও এটি সমালোচনার সম্মুখীনও হয়েছে।

আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ মনে করে যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যিক প্রকৃতিই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আগ্রাসী রাষ্ট্রীয় আচরণকে উৎসাহিত করে। এই তত্ত্বটি প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদ থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এটি বৃহৎ শক্তিগুলোকে ক্ষমতা-সর্বাধিককারী এবং সংশোধনবাদী (revisionist) হিসেবে চিত্রিত করে, যারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ভারসাম্য রক্ষার [en] কৌশলের চেয়ে দায় এড়ানো [en] (buck-passing) এবং আত্মস্বার্থ বৃদ্ধিতেই বেশি প্রাধান্য দেয়।

তাত্ত্বিক উৎস

[সম্পাদনা]

আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ হলো রাজনৈতিক বাস্তবতাবাদ চিন্তাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। এই ধারায় আরও অনেক পণ্ডিত রয়েছেন, যেমন রবার্ট গিলপিন [en], এরিক জে. ল্যাবস, ডিলান মতিন, সেবাস্তিয়ান রোসাতো, র‍্যান্ডাল শোয়েলার [en] এবং ফরিদ জাকারিয়া[][][][][] তবে, এখন পর্যন্ত আক্রমণাত্মক নব্যবাস্তববাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপটি হলো জন জে. মিয়ারশাইমারের তত্ত্ব। তিনি তাঁর ২০০১ সালের বই দ্য ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স [en]-এ এই তত্ত্বকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন।[]

মিয়ারশাইমারের আক্রমণাত্মক নব্যবাস্তববাদ তত্ত্বটি ধ্রুপদী বাস্তববাদীদের কিছু ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও, এটি ধ্রুপদী ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর প্রধান কারণ হলো, এই তত্ত্বটি রাষ্ট্রীয় আচরণকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি ব্যবস্থা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এবং বিজ্ঞান দর্শন হিসেবে দৃষ্টবাদ (positivism) ব্যবহার করে।[][][১০] এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই তাঁর তত্ত্বটি নব্যবাস্তববাদের উপধারার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদ তত্ত্বটিও এই একই ধারার অংশ।[১১]

মূলনীতি

[সম্পাদনা]

পাঁচটি মূল ধারণার উপর এই তত্ত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। এই ধারণাগুলো কেনেথ ওয়াল্টজ এর প্রতিরক্ষামূলক নব্যবাস্তববাদের মূল ধারণার মতোই। সেগুলো হলো:[১২][১৩]

  1. মহাশক্তিগুলোই বিশ্ব রাজনীতির প্রধান চালক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি নৈরাজ্যিক (অর্থাৎ কোনো বিশ্ব সরকার নেই, প্রতিটি রাজ্য স্বাধীন)।
  2. সব রাষ্ট্রেরই কিছু না কিছু আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।
  3. একটি রাষ্ট্র কখনোই অন্য রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না।
  4. টিকে থাকাই (survival) রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
  5. রাষ্ট্রগুলো যুক্তিবাদী চালক, এবং তারা নিজেদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য সেরা কৌশল তৈরি করতে সক্ষম।

প্রতিরক্ষামূলক নব্যবাস্তববাদের মতো, আক্রমণাত্মক বাস্তববাদও মনে করে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি নৈরাজ্যিক। এখানে যুক্তিবাদী মহাশক্তিগুলো একে অপরের উদ্দেশ্য নিয়ে অনিশ্চিত থাকে এবং টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে।[১৪][১৫] যদিও এই দুটি তত্ত্বের শুরুটা একই রকম, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মহাশক্তিগুলোর আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে মিয়ারশাইমারের আক্রমণাত্মক বাস্তববাদের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ ভিন্ন।[১৬][১৭]

এই দুটি তত্ত্বের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঠিক কতটুকু ক্ষমতা দরকার, তা নিয়ে। চূড়ান্তভাবে, মিয়ারশাইমারের তত্ত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে এবং যা থেকে যুদ্ধও হতে পারে।[১৮][১৯]

স্থিতাবস্থা বনাম ক্ষমতা-সর্বাধিককারী রাষ্ট্র

[সম্পাদনা]

জন মিয়ারশাইমার, কেনেথ ওয়াল্টজের প্রতিরক্ষামূলক বাস্তবতাবাদের "স্থিতাবস্থা-পক্ষপাত" (status quo bias) দূর করতে চেয়েছেন।[২০][২১] দুটি তত্ত্বই মনে করে যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে চায়। কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো, এই নিরাপত্তার জন্য ঠিক কতটুকু ক্ষমতার প্রয়োজন।

প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো স্থিতাবস্থা (status quo) বজায় রাখতে চায়। অর্থাৎ, তারা শুধু ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে নিজেদের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে চায়।[২২][২৩] এর বিপরীতে, আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ দাবি করে যে রাষ্ট্রগুলো আসলে ক্ষমতা-সর্বাধিককারী (power-maximising)। তারা সবসময় আরও ক্ষমতা অর্জনের জন্য আগ্রাসী মনোভাব পোষণ করে। এই তত্ত্ব অনুসারে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি মহাশক্তিগুলোকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করে।[২৩][২৪]

যেহেতু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নৈরাজ্যিক এবং কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই, তাই রাষ্ট্রগুলো একে অপরকে ভয় পায়। এই ভয় থেকেই তারা আত্মরক্ষার জন্য সবসময় নিজেদের আপেক্ষিক ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে।[২৫] মিয়ারশাইমারের ভাষায়: "তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের খরচে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের সুযোগ খোঁজে"।[২৬] কারণ, "একটি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে যত বেশি হবে, সে তত বেশি নিরাপদ থাকবে"।[২৭] রাষ্ট্রগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আধিপত্য (hegemony) প্রতিষ্ঠা করা—অর্থাৎ, ব্যবস্থায় একমাত্র মহাশক্তি হয়ে ওঠা।[২৮]

জন মিয়ারশাইমার এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সংক্ষেপে বলেছেন: "মহাশক্তিগুলো জানে যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সেরা উপায় হলো আধিপত্য অর্জন করা, যা অন্য কোনো শক্তির চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা দূর করে দেবে। কেবল একটি বিভ্রান্ত রাষ্ট্রই আধিপত্য অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করবে, এই ভেবে যে তার টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতা ইতিমধ্যেই আছে।"[২৯] তাই, আক্রমণাত্মক বাস্তববাদীরা বিশ্বাস করেন যে আধিপত্য অর্জনের জন্য আগ্রাসী নীতিই সেরা কৌশল।[৩০][৩১]

যেহেতু পুরো বিশ্বের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব, তাই রাষ্ট্রগুলোর সেরা লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক আধিপত্যকারী [en] হয়ে ওঠা।[৩০][৩১] ক্ষমতার এই নিরন্তর আকাঙ্ক্ষার কারণেই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলতে থাকে, যার ফলে যুদ্ধের আশঙ্কা সবসময়ই থেকে যায়।[৩২] আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জনের পরেই কেবল মহাশক্তিগুলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায়।

ভারসাম্য রক্ষা বনাম দায় এড়ানো

[সম্পাদনা]

আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আধিপত্য৷ প্রতিষ্ঠা করা। এটি প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত, কারণ তারা মনে করে আধিপত্যের অনেক আগেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।[৩৩] প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদীদের মতে, কোনো রাষ্ট্র অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে অন্য রাষ্ট্রগুলো জোটবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষা [en] (balancing) করে, যা ওই ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।[৩৪]

কিন্তু মিয়ারশাইমার এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, কখন যথেষ্ট ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে তা বোঝা খুব কঠিন এবং জোটবদ্ধ হয়ে ভারসাম্য রক্ষা করাও সবসময় সহজ ও কার্যকর নয়।[৩৫][৩৬][৩৭] তাঁর মতে, যখন কোনো মহাশক্তিকে আত্মরক্ষা করতে হয়, তখন সে সরাসরি ভারসাম্য রক্ষার পরিবর্তে দায় এড়ানোর [en] (buck-passing) পথ বেছে নিতে পারে। এর অর্থ হলো, নিজে হস্তক্ষেপ না করে দায়িত্বটি অন্য রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।

মিয়ারশাইমার ভূগোল এবং ক্ষমতার বণ্টনের ওপর ভিত্তি করে দেখান যে, মহাশক্তিগুলো ভারসাম্য রক্ষার চেয়ে দায় এড়ানোকেই বেশি পছন্দ করে, বিশেষ করে যখন কোনো একক বিশ্ব-আধিপত্যকারী শক্তি উত্থানের আশঙ্কা থাকে না।[৩৮][৩৯][৪০]

যখন কোনো মহাশক্তি আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে, তখন সে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায়। তখন সে নিজে সরাসরি না জড়িয়ে দূর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এই কৌশলকে অফশোর ব্যালেন্সিং [en] বলা হয়। সে অন্য অঞ্চলের সম্ভাব্য আধিপত্যকারীর বিরুদ্ধে স্থানীয় রাষ্ট্রগুলোকে উস্কে দেয় এবং নিজে কেবল শেষ উপায় হিসেবে হস্তক্ষেপ করে।[৩১]

অবদান ও সমালোচনা

[সম্পাদনা]

মিয়ারশাইমারের আক্রমণাত্মক নব্যবাস্তববাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, কিন্তু এটি অনেক সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। নিচে এই তত্ত্বের কিছু অবদান এবং এর বিরুদ্ধে কিছু যুক্তি তুলে ধরা হলো। তবে এই তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়।

তাত্ত্বিক অবদান

[সম্পাদনা]

প্রথমত, অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে মিয়ারশাইমারের তত্ত্বটি ওয়াল্টজের প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদের একটি ভালো পরিপূরক। প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদ বলে যে, আন্তর্জাতিক কাঠামো রাষ্ট্রগুলোকে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করতে বাধ্য করে। আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ এই ধারণার সাথে একমত, কিন্তু এটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে যে, এই নৈরাজ্যিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রগুলোকে শুধু আত্মরক্ষা করতে নয়, বরং ক্ষমতা বাড়াতেও উৎসাহিত করে। এভাবে ওয়াল্টজের তত্ত্ব যেসব বিষয় ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ তার একটি ব্যাখ্যা দেয়। যেমন, এটি ব্যাখ্যা করে যে কেন সংশোধনবাদী রাষ্ট্র [en] বা আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলো এমন আচরণ করে।[৪১]

দ্বিতীয়ত, কিছু পণ্ডিতের মতে এই দুটি তত্ত্ব মিলেমিশে কাজ করতে পারে, যা রাষ্ট্রগুলোর রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক—উভয় ধরনের আচরণকেই আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হবে।[৪২] এর আরেকটি বড় অবদান হলো, এটি পররাষ্ট্র নীতি এবং জোট গঠনের তত্ত্বকে সমৃদ্ধ করেছে। ওয়াল্টজের তত্ত্ব শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করত, কিন্তু মিয়ারশাইমারের তত্ত্ব রাষ্ট্রগুলোর ব্যক্তিগত আচরণ ও পররাষ্ট্রনীতিকেও ব্যাখ্যা করতে পারে।[৪৩][৪৪] এ ছাড়া, ক্ষমতার বণ্টনের সাথে ভূগোলের মতো নতুন বিষয় যুক্ত করায় এই তত্ত্বটি আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে পারে, কখন রাষ্ট্রগুলো আগ্রাসী হবে বা কখন তারা দায় এড়ানো [en] বা ভারসাম্য রক্ষার [en] কৌশল বেছে নেবে।[৪৫][৪৬]

তাত্ত্বিক সমালোচনা

[সম্পাদনা]

কিছু পণ্ডিত মিয়ারশাইমারের তত্ত্বের যুক্তিতে ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, জ্যাক স্নাইডার বলেন, মিয়ারশাইমারের তত্ত্ব 'নিরাপত্তা উভয়সংকট' (security dilemma) ধারণাটিকে নষ্ট করে দেয়। নিরাপত্তা উভয়সংকটের মূল ভিত্তি হলো অন্য রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে 'অনিশ্চয়তা'। কিন্তু মিয়ারশাইমার যদি ধরেই নেন যে সব রাষ্ট্রই আগ্রাসী, তাহলে তো আর কোনো অনিশ্চয়তা থাকে না। তখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাটি কাল্পনিক ভয়ের কারণে হয় না, বরং একটি বাস্তব কারণেই হয়।[৪৭]

পিটার টফটের মতে, এই তত্ত্বের বিশ্লেষণে সমস্যা রয়েছে। এই তত্ত্বে ভূগোলের মতো একটি অ-কাঠামোগত বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করায় এর ফোকাস বিশ্বব্যবস্থা থেকে সরে গিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু 'অঞ্চল' বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়নি।[৪৮]

ক্রিস্টোফার লেন [en] ভূগোলের ব্যবহার নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মিয়ারশাইমারের 'পানির প্রতিবন্ধকতা' (stopping power of water) যুক্তিটিকে স্ববিরোধী মনে করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, "পানি যদি আমেরিকাকে অন্য অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে বাধা দেয়, তবে অন্য শক্তিকে কীভাবে আমেরিকার উঠোনে হুমকি দিতে বাধা দেয় না?"[৪৯] এ ছাড়া তিনি মনে করেন, আঞ্চলিক আধিপত্যকারী একটি রাষ্ট্র কেন হঠাৎ করে ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা ছেড়ে দেবে এবং স্থিতাবস্থা চাইতে শুরু করবে, তা পরিষ্কার নয়।[৫০]

আরেক ধরনের সমালোচনা হলো, এই তত্ত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করে।

  • অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: তত্ত্বটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি বা সমাজকে বিবেচনা করে না, যা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে।[৫১][৫২]
  • আন্তর্জাতিক হুমকি: সন্ত্রাসবাদের মতো আন্তর্জাতিক হুমকিকে এই তত্ত্ব বিবেচনা করে না।
  • অন্যান্য লক্ষ্য: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাড়া অন্যান্য লক্ষ্য, যেমন—আদর্শ, মানবাধিকার বা জাতীয় ঐক্যকে এটি গুরুত্ব দেয় না।[৫৩]
  • যুদ্ধের ব্যয়: এই তত্ত্বটি 'যুদ্ধ ব্যয়বহুল'—এই বিষয়টি এড়িয়ে যায়। সমালোচকরা বলেন, যুদ্ধ করে সম্পদ নষ্ট করার চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে ভাগাভাগি করে নেওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত। অবিরাম যুদ্ধ রাষ্ট্রকে আরও অনিরাপদ করে তুলতে পারে, কারণ যুদ্ধের ব্যয়ে তার শক্তি শেষ হয়ে যায়।[৫৪]

সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো, তত্ত্বটি বাস্তব পৃথিবীর অনেক ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারে না। যেমন, বিংশ শতাব্দীতে জাপানের সাম্রাজ্য বিস্তার, ঠান্ডা যুদ্ধের পরও ন্যাটোর টিকে থাকা, বা জার্মানির আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারা।[৫২][৫৫] সমালোচকরা চীনের উত্থান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলেন, চীন আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা না করে সহযোগিতার মাধ্যমেও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।[৫৬][৫৭] তাঁরা আরও বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসলে শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং একটি বিশ্ব-আধিপত্যকারী শক্তি। তাই মিয়ারশাইমারের 'অফশোর ব্যালেন্সিং'-এএর ধারণাটি আমেরিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না।[৫৮][৫৯]

  1. Toft, Peter (ডিসেম্বর ২০০৫)। "John J. Mearsheimer: an offensive realist between geopolitics and power"Journal of International Relations and Development (4): ৩৮১–৪০৮। ডিওআই:10.1057/palgrave.jird.1800065
  2. Feng, Liu; Ruizhuan, Zhang (গ্রীষ্ম ২০০৬)। "The typologies of realism"। The Chinese Journal of International Politics (1): ১২৪ and ১২৬। ডিওআই:10.1093/cjip/pol006এস২সিআইডি 20926426
  3. Taliaferro, Jeffrey W. (শীতকাল ২০০০–২০০১)। "Security seeking under anarchy: defensive realism revisited"। International Security২৫ (3): ১২৮–১২৯ and ১৩৪। ডিওআই:10.1162/016228800560543জেস্টোর 2626708এস২সিআইডি 57568196
  4. Gerald Geunwook Lee, "To Be Long or Not to Be Long–That is the Question: The Contradiction of Time-Horizon in Offensive Realism", Security Studies 12:2 (2003): 196.
  5. Yang, Anthony Toh Han (২০২৪)। "Review: Bandwagoning in international relations: China, Russia, and their neighbors"। Asian Affairs৫৫ (1): ৯২–৯৪। ডিওআই:10.1080/03068374.2024.2326037
  6. Rosato, Sebastian (২০১৫)। "The inscrutable intentions of great powers"। International Security৩৯ (3): ৪৮–৮৮। ডিওআই:10.1162/ISEC_a_00190
  7. John J. Mearsheimer, The Tragedy of Great Power Politics (New York, NY: W.W. Norton, 2001).
  8. Glenn H. Snyder, "Mearsheimer's World—Offensive Realism and the Struggle for Security: A Review Essay", International Security 27:1 (2002): 151.
  9. Feng and Zheng, Typologies of Realism, 113–114.
  10. Kaplan, Robert D. (২০১২)। "Why John J. Mearsheimer Is Right (About Some Things)"The Atlantic Magazine
  11. Kenneth N. Waltz, "Realist Thought and Neorealist Theory", Journal of International Affairs 44:1 (1990): 34.
  12. Mearsheimer, J. (2005). Structural Realism, in T. Dunne, M. Kurki & S. Smith, International Relations Theory: Discipline and Diversity. Oxford: Oxford University Press.
  13. Mearsheimer, John J. "The false promise of international institutions." International Security 19, no. 3 (1994): 5–49.
  14. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 30–31.
  15. Eric J. Labs, "Beyond Victory: Offensive Realism and the Expansion of War Aims", Security Studies 6:4 (1997): 7–8.
  16. Shiping Tang, "From Offensive to Defensive Realism: A Social Evolutionary Interpretation of China's Security Strategy", 148–149, in China's Ascent: Power, Security, and the Future of International Politics, edited by Robert Ross and Zhu Feng. (Ithaca: Cornell University Press, 2008).
  17. Taliaferro, Security Seeking, 134.
  18. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 32–33.
  19. Snyder, Mearsheimer's World, 153.
  20. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 20.
  21. Snyder, Mearsheimer's World,157–158.
  22. Kenneth N. Waltz, Theory of International Politics (Reading, MA: Addison-Wesley Publishing Company, 1979): 126.
  23. 1 2 Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 21.
  24. Sten Rynning and Jens Ringsmose, "Why Are Revisionist States Revisionist? Reviving Classical Realism as an Approach to Understanding International Change", International Politics 45 (2008)
    26.
  25. John J. Mearsheimer, "China's Unpeaceful Rise", Current History 105: 690 (2006): 160.
  26. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 34.
  27. John J. Mearsheimer, "The False Promise of International Institutions", International Security 19:3 (1994–1995): 11–12.
  28. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 21 and 29.
  29. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 35.
  30. 1 2 Mearsheimer, China's Unpeaceful Rise, 160.
  31. 1 2 3 Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 141.
  32. Mearsheimer, The False Promise, 12.
  33. Snyder, Mearsheimer's World, 154.
  34. Peter Toft, "John J. Mearsheimer: An Offensive Realist Between Geopolitics and Power", Journal of International Relations and Development 8 (2005): 390.
  35. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 34–35 and 156–157.
  36. Dylan Motin, Bandwagoning in International Relations: China, Russia, and Their Neighbors (Wilmington: Vernon Press, 2024), 20–21.
  37. Wang, Offensive Realism, 178.
  38. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 155, 160, 261 and 272.
  39. Wang, Offensive Realism, 179.
  40. Feng & Z Ruizhuan, Typologies of Realism, 124.
  41. Snyder, Mearsheimer's World, 158.
  42. Toft, John J. Mearsheimer, 403.
  43. Toft, John J. Mearsheimer, 389.
  44. Mearsheimer, Tragedy of Great Power Politics, 422 note 60.
  45. Dylan Motin, Territorial Expansion and Great Power Behavior During the Cold War: A Theory of Armed Emergence (London: Routledge, 2025), 15.
  46. Toft, John J. Mearsheimer, 401.
  47. Snyder, Mearsheimer's World, 155–156.
  48. Toft, John J. Mearsheimer, 393.
  49. Christopher Layne, "The Poster Child for Offensive Realism: America as a Global Hegemon", Security Studies 12:2 (2002/2003): 127.
  50. Layne, The Poster Child for Offensive Realism, 129.
  51. David C. Hendrickson, "The Lion and the Lamb: Realism and Liberalism Reconsidered", World Policy Journal 20:1 (2003): 97; Snyder, Mearsheimer's World, 172.
  52. 1 2 Kagan, Why John J. Mearsheimer is Right.
  53. Snyder, Mearsheimer's World, 171–172.
  54. On Bargaining Theory see David A. Lake, "Two Cheers for Bargaining Theory: Assessing Rationalist Explanations of the Iraq War," International Security 35:3 (2010/11): 15.
  55. Toft, John J. Mearsheimer, 396–397.
  56. Jonathan Kirshner, "The Tragedy of Offensive Realism: Classical Realism and the Rise of China", European Journal of International Relations 18:1 (2010): 59–61.
  57. Toft, John J. Mearsheimer, 397.
  58. .Layne, The Poster Child for Offensive Realism, 162–163.
  59. Toft, John J. Mearsheimer, 397–399.

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  • Feng, Liu; Ruizhuan, Zhang (গ্রীষ্ম ২০০৬)। "The typologies of realism"। The Chinese Journal of International Politics (1): ১০৯–১৩৪। ডিওআই:10.1093/cjip/pol006এস২সিআইডি 20926426
  • Hendrickson, David C. "The Lion and the Lamb: Realism and Liberalism Reconsidered." World Policy Journal 20:1 (2003): 93–102.
  • Kaplan, Robert D. (২০১২)। "Why John J. Mearsheimer Is Right (About Some Things)"The Atlantic Magazine
  • Kirshner, Jonathan. "The Tragedy of Offensive Realism: Classical Realism and the Rise of China." European Journal of International Relations 18:1 (2012): 53–75.
  • Labs, Eric. "Beyond Victory: Offensive Realism and the Expansion of War Aims." Security Studies 6:4 (1997): 1–49.
  • Lake, David A. "Two Cheers for Bargaining Theory: Assessing Rationalist Explanations of the Iraq War." International Security 35:3 (2010/11): 7–52.
  • Layne, Christopher. "The Poster Child for Offensive Realism: America as a Global Hegemon." Security Studies 12:2 (2002/2003): 120–163.
  • Lee, Gerald Geunwook. "To be Long or Not to Be Long—That is the Question: The Contradiction of Time-Horizon in Offensive Realism." Security Studies 12:2 (2002/2003): 196–217.
  • Levy, Jack S. and William R. Thompson. "Balancing on Land and at Sea: Do States Ally Against the Leading Global Power?" International Security 35:1 (2010): 7–43.
  • Lieber, Keir A. and Gerard Alexander. "Waiting for Balancing Why the World Is Not Pushing Back." International Security 30:1 (2005): 109–139.
  • Lim, Y.-H. China's Naval Power, Surrey, New York, Ashgate, 2014, 234 p. (আইএসবিএন ৯৭৮১৪০৯৪৫১৮৪৬).
  • Mearsheimer, John J. "The False Promise of International Institutions." International Security 19:3 (1994–1995): 5–49.
  • Mearsheimer, John J. The Tragedy of Great Power Politics. New York, NY: W.W. Norton, 2001.
  • Mearsheimer, John J. "China's Unpeaceful Rise." Current History 105:690 (2006): 160–162.
  • Motin, Dylan. Bandwagoning in International Relations: China, Russia, and Their Neighbors. Wilmington: Vernon Press, 2024.
  • Motin, Dylan. Territorial Expansion and Great Power Behavior During the Cold War: A Theory of Armed Emergence. London: Routledge, 2025.
  • Rynning, Sten and Jens Ringsmose. "Why Are Revisionist States Revisionist? Reviving Classical Realism as an Approach to Understanding International Change." International Politics 45 (2008): 19–39.
  • Shiping Tang. "From Offensive to Defensive Realism: A Social Evolutionary Interpretation of China's Security Strategy." In China's Ascent: Power, Security, and the Future of International Politics, edited by Robert Ross and Zhu Feng, 141–162. Ithaca, NY: Cornell University Press, 2008.
  • Snyder, Glenn H. "Mearsheimer's World—Offensive Realism and the Struggle for Security: A Review Essay." International Security 27:1 (2002): 149–173.
  • Taliaferro, Jeffrey W. (শীতকাল ২০০০–২০০১)। "Security seeking under anarchy: defensive realism revisited"। International Security২৫ (3): ১২৮–১৬১। ডিওআই:10.1162/016228800560543জেস্টোর 2626708এস২সিআইডি 57568196
  • Toft, Peter (ডিসেম্বর ২০০৫)। "John J. Mearsheimer: an offensive realist between geopolitics and power"Journal of International Relations and Development (4): ৩৮১–৪০৮। ডিওআই:10.1057/palgrave.jird.1800065
  • Waltz, Kenneth N. Theory of International Politics (Reading, MA: Addison-Wesley Publishing Company, 1979).
  • Waltz, Kenneth N. "Realist Thought and Neorealist Theory." Journal of International Affairs 44:1 (1990): 21–37.
  • Waltz, Kenneth N. "International Politics Is Not Foreign Policy." Security Studies 6:1 (1996): 54–57.
  • Wang, Yuan-Kang. "Offensive Realism and the Rise of China." Issues & Studies 40:1 (2004): 173–201.

গ্রন্থপঞ্জী

[সম্পাদনা]
  • Robert Giplin, War and Change in World Politics (Cambridge: Cambridge University Press, 1981).
  • Randall L. Schweller, "Bandwagoning for Profit: Bringing the Revisionist State Back In", International Security 19 :1 (1994): 72–107.
  • Fareed Zarkaria, From Wealth to Power: the Unusual Origins of America's World Role (Princeton: Princeton University Press, 1998).