আউট অব আফ্রিকা
| লেখক | কারেন ব্লিক্সেন |
|---|---|
| প্রকাশনার স্থান | যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক |
| ভাষা | ইংরেজী, ডেনিস, Swahili |
| ধরন | স্মৃতিকথা |
| প্রকাশক | জি পি পুটনাম'স সন্স (যুক্তরাজ্য); গিল্ডেন্দাল (ডেনমার্ক) |
প্রকাশনার তারিখ | ১৯৩৭ |
| মিডিয়া ধরন | ছাপা |
| পৃষ্ঠাসংখ্যা | ৪১৬ |
| আইএসবিএন | ০-৬৭৯-৬০০২১-৩ (hardcover edition) |
| ওসিএলসি | ২৫৭৪৭৭৫৮ |
| 967.62 20 | |
| এলসি শ্রেণী | DT433.54 .D56 1992 |
"আউট অব আফ্রিকা" হলো ডেনিশ লেখক কারেন ব্লিক্সেন -এর লেখা একটি স্মৃতিকথা, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। বইটিতে ব্লিক্সেন কেনিয়ায় তার বসবাসের আঠারো বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন, যখন অঞ্চলটি ব্রিটিশ পূর্ব আফ্রিকা নামে পরিচিত ছিল। এটি মূলত তার কফি বাগানে কাটানো জীবনের স্মৃতিচারণ, যেখানে তিনি প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ দশকগুলিতে আফ্রিকান ঔপনিবেশিক জীবনের একটি প্রাণবন্ত চিত্র প্রকাশ করে। ব্লিক্সেন বইটি ইংরেজিতে লিখেছিলেন এবং তারপর ডেনিশ ভাষায় পুনর্লিখন করেছিলেন। বইটি কখোনো কখোনো লেখকের ছদ্মনাম, ইসাক ডিনেসেনের অধীনে প্রকাশিত হয়েছে।
পটভূমি
[সম্পাদনা]১৯১৩ সালের শেষের দিকে, ২৮ বছর বয়সে, কারেন ব্লিক্সেন তার দ্বিতীয় কাকাতো ভাই সুইডিশ ব্যারন ব্রর ভন ব্লিক্সেন-ফিনেকেকে বিয়ে করার জন্য ব্রিটিশ পূর্ব আফ্রিকায় চলে আসেন এবং এক ব্রিটিশ উপনিবেশ অঞ্চলে জীবনযাপন শুরু করেন যা আজ কেনিয়া নামে পরিচিত। তরুণ ব্যারন এবং ব্যারনেস নাইরোবির দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত নংগং পাহাড়ের নীচে প্রায় ১০ মাইল (১৬ কিলোমিটার) বিস্তৃত এক কৃষিজমি কিনেছিলেন।
ব্লিক্সেনরা প্রথমে দুগ্ধজাত গবাদি পশু পালনের পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু পরে ব্রর তাদের খামারকে কফি বাগান হিসেবে গড়ে তোলেন। [১] বাগানটি মূলত ইউরোপীয়রা পরিচালনা করত। শুরুর দিকে পরিচালন সমিতির মধ্যে ক্যারেনের ভাই থমাসও ছিল। কফি বাগানে বেশিরভাগ কায়িক পরিশ্রম করত স্থানীয় বসতিহীন মানুষেরা। স্থানীয় কিকুয়ু উপজাতিদের বসতিহীন বলে সম্বোধন করা হত। এটি একটি ঔপনিবেশিক শব্দ। এদের মাধ্যমে সমাজের সেই শ্রেনীর মানুষদের বোঝানো হত যারা মজুরির বিনিময়ে ১৮০ দিনের জন্য তাদের মালিকদের কায়িক শ্রম দিত এবং অনাবাদী জমিতে বসবাস ও কৃষিকাজ করত। [২]
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে কফির দাম বেড়ে যায় এবং ব্লিক্সেন পরিবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। ১৯১৭ সালে কারেন এবং ব্রর তাদের মালিকানা অতিরিক্ত ৬,০০০ একর (২,৪০০ হেক্টর) জমি অধিগ্রহন করে তাদের কফির চাষবাস প্রসারিত করে। নতুন অধিগ্রীহিত জমির মধ্যে তাদের বাড়িও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আউট অব আফ্রিকাতে বেশ স্পষ্টভাবে এই সমস্ত ঘটনার বর্ননা করা হয়েছে [৩]
ব্লিক্সেন্সের দাম্পত্য জীবন ভালোভাবেই শুরু হয়েছিল। কারেন এবং ব্রর প্রায়শই শিকারে এবং সাফারিতে যেতেন । [৪] কিন্তু এটি শেষ পর্যন্ত তারা তাদের শিকারের শখ ধরে রাখতে পারেনি। ব্রর খামারে বিনিয়োগ করে অনেক টাকা লোকসান করেন। [৫] ১৯২১ সালে এই দম্পতি আলাদা হয়ে যায় এবং ১৯২৫ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর কারেন নিজেই খামারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন।
কারেন খামারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বেশ উপযুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীন এবং সক্ষম। তিনি জমি ভালোবাসতেন এবং তার স্থানীয় শ্রমিকদের পছন্দ করতেন। কিন্তু নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু এবং মাটি কফি চাষের জন্য আদর্শ ছিল না। খামারটি বেশ কয়েক বছর ধরে অপ্রত্যাশিত শুষ্ক অবস্থায় ছিল যার ফলে কম ফলন হয়েছিল। একবার ফসলের উপর ফড়িং-এর আক্রমণও হয়েছিল। কফির বাজার মূল্যের পতন খামারের উন্নয়নে কোনও সাহায্য করেনি। [৬] ফলে খামারটি আরও দেনার দায়ে ডুবে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৩১ সালে পারিবারিক কর্পোরেশন তাকে কারেনকে খামার বিক্রি করতে বাধ্য করে। খামারের ক্রেতা রেমি মার্টিন, যিনি জমিটিকে একটি আবাসিক প্লটে খোদাই করার পরিকল্পনা করেছিলেন, তিনি ব্লিক্সেনকে বাড়িতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ডেনমার্কে ফিরে আসেন।[৩]
ব্লিক্সেন ডেনমার্কে তাদের পারিবারিক বসবাসস্থল রাংস্টেডের রুংস্টেডলুন্ডে ফিরে আসেন এবং তার মায়ের সাথে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তিনি আবার লেখালেখির কাজ শুরু করেন। তিনি যৌবনে লেখালেখি শুরু করলেও পরের দিকে তিনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেননি কিন্তু দেশে ফেরার পর তিনি পুনরায় সেই কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে তিনি সেভেন গথিক টেলস নামের একটি কাল্পনিক গল্পের সংকলন প্রকাশ করেন ১৯৩৭ সালে তিনি তার কেনিয়া নিবাসের স্মৃতিকথা আউট অব আফ্রিকা প্রকাশ করেন। বইটির শিরোনাম সম্ভবত এক্স আফ্রিকা নামক তার একটি স্বরচিত কবিতার শিরোনাম থেকে নেওয়া হয়েছিল। কবিতাটি তিনি ১৯১৫ সালে লিখেছিলেন, যখন তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে ডেনিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কবিতাটির শিরোনাম সম্ভবত বিখ্যাত প্রাচীন ল্যাটিন প্রবাদের সংক্ষিপ্ত রূপ (অ্যারিস্টটল, প্লিনি, ইরাসমাস ইত্যাদি দার্শনিকদের ল্যাটিন প্রবাদের ছায়া দেখা যায়)।[৭]
গঠন এবং শৈলী
[সম্পাদনা]আউট অব আফ্রিকা বইটি মূলত পাঁচটি বিভাগে বিভক্ত। গল্পটির গতিবিধি অসমান্তরাল এবং কোন নির্দিষ্ট কালক্রম প্রতিফলিত করে না। বইয়ের প্রথম দুটি গল্প মূলত আফ্রিকান অধিবাসীদের উপর আলোকপাত করে যারা কফি খামারে বসবাস করতেন অথবা ব্যবসা করতেন। তাদের উপর যখন ভয়াবহ দুর্ঘটনাজনিত গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে তখন তাদের ন্যায়বিচার এবং শাস্তির স্থানীয় ধারণাগুলির সম্পর্কে লেখিকা তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ গল্পে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
বইটির তৃতীয় অংশে কিছু রঙিন স্থানীয় চরিত্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যারা ব্লিক্সেনের খামারকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে মনে করত।
বইটির চতুর্থ অংশ হল কয়েকটি ছোট উপ-অধ্যায়ের একটি সংগ্রহ যেখানে ব্লিক্সেন একজন শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকান উপনিবেশবাদীর জীবনকে আর গল্পে প্রতিফলিত করেছেন।
পঞ্চম এবং শেষ অংশ, যেটি আ ফেয়ারোয়েল ট্যু দ্যা ফার্ম শিরোনামে ভূষিত সেখানে গল্পের ঘটনাক্রম সমান্তরাল আকার করতে শুরু করে। এই পর্বে ব্লিক্সেন খামারের আর্থিক ব্যর্থতা এবং কেনিয়ায় তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অকাল মৃত্যুর বিবরণ দেন। শেষে খামারের বিক্রি হওয়া ও হস্তান্তরের ঘটনার বর্ননা করা হয়। দেশে ফেরার স্টিমার ধারার জন্য উগান্ডা রেলওয়েতে করে ব্লিক্সেন উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং পিছনে ফিরে তাকানোর সাথে সে তার প্রিয় নংগং পাহাড়শ্রেনীকে ক্রমশ আকারে ছোট হয়ে দূরে মিলিয়ে যেতে দেখছে। এই দৃশ্যের মাধ্যমে গল্পের যবনিকা পতন হয়।
"আউট অব আফ্রিকা" তার বিষণ্ণতা এবং শোকাবহ শৈলীর জন্য বিখ্যাত। ব্লিক্সেনের জীবনীকার জুডিথ থারম্যান এটি বর্ণনা করার জন্য একটি আফ্রিকান উপজাতীয় বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন। [৮] ব্লিক্সেন তার বইয়ে অন্তত পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর উল্লেখ করেছেন। বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের সাথে ব্লিক্সেন আফ্রিকায় তার দিনগুলির ক্ষত এবং স্মৃতিচারণের অনুভূতি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখা করেছেন। বিশেষ করে, যখন তিনি তার ব্যর্থ ব্যবসার অর্থনৈতিক বাস্তবতা বর্ণনা করেন, তখন তার কথায় হতাশা ও অস্বীকারের এক ধরনের বিদ্রূপ মিশে থাকে।
তবে ব্লিক্সেনের বিষণ্ণতার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল শুধুমাত্র তার নিজের খামারের ক্ষতি নয়, বরং পুরো কেনিয়ার রূপান্তর তাকে আরও গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে অনেক ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী কেনিয়াকে একধরনের চিরস্থায়ী স্বর্গ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। এক অভিযাত্রী এই অঞ্চলের পরিবেশকে নিও লিথিক যুগের গ্রীষ্মমন্ডলীয় পরিবেশের[৯] সাথে তুলনা করেছিলেন। ১৯০৯ সালে কেনিয়া সফর করা মার্কিন রাষ্ট্রপতি থিওডোর রুজভেল্ট, এই অঞ্চলের পরিবেশ ও ব্যবস্থাকে প্লাইস্টোসিন যুগের শেষ প্রান্তের সাথে তুলনা করেছিলেন।[১০]
সেই সময়ের ইউরোপীয় বসতি ছিল বিচ্ছিন্ন। কয়েক হাজার ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী, যাদের অধিকাংশই ব্রিটিশ জমিদার শ্রেণির সুশিক্ষিত সদস্য, তারা বিশাল বিস্তৃত জমিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তাদের খামার ছিল হাতি, জেব্রা, জিরাফ, সিংহ, জলহস্তী ও চিতাবাঘের আশ্রয়স্থল। ইউরোপীয় অভিজাত শ্রেণির শিকারের প্রতি গভীর আসক্তির কারণে কেনিয়া তখন এক শিকারীর স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়। ব্লিক্সেন নিজেই ১৯৬০ সালে উল্লেখ করেছিলে যে, ১৯১৪ সালে যখন তিনি কেনিয়ায় আসেন, তখন স্থানীয় পাহাড়ী অঞ্চলগুলি সত্যিই শিকারের জন্য এক অত্যন্ত সুবিধাজনক স্থান ছিল।[১১]
ইউরোপীয়দের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে ওঠে যে কেনিয়া প্রাগৈতিহাসিক যুগেই বিচ্রন করছে। তাদের এই ধারণা সেখানকার বাসিন্দাদের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যখন ব্লিক্সেন ৫১ বছর বয়সে "আউট অব আফ্রিকা"-এর পাণ্ডুলিপি শেষ করছিলেন, তখন তার ছোটবেলার পরিচিত কেনিয়া শুধুই অতীতের স্মৃতি হয়ে গিয়েছিল। কৃষি উন্নয়নের প্রসার উপনিবেশের মানুষের পদচিহ্নকে মুছে ফেলেছে। শিকারের জন্য অবাধ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড হ্রাস পেয়েছে। সেখানকার নতুন কৃষকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন মধ্যবিত্ত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর একটি সরকারি বসতি কর্মসূচির আওতায় সেখানে এসে বসবাস ও কৃষিকাজ করতে শুরু করেছিলেন।
ব্যারনেস ব্লিক্সেন তার আফ্রিকার স্মৃতিচারণে, তিনি যে আফ্রিকাকে চিনতেন, তার অপূরণীয় ক্ষতির জন্য শোকের সুর স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছেন। তবে একই সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে তার একাত্মতা এবং জীবনযাপনের মুক্তির অভিজ্ঞতাও তার গল্পগুলোর আবেগকে গভীরভাবে রঙিন করেছে।
বিষয়বস্তু
[সম্পাদনা]প্রথম নজরে মনে হয় যে বইটির বেশিরভাগ অংশ ব্লিক্সেনের স্মৃতি থেকে সংগঠিত। বিশেষ করে ফ্রম অ্যান ইমিগ্র্যান্টস নোটবুক শিরোনামে অভিহিত বইটির তৃতীয় অংশ যা সম্ভবত আফ্রিকায় থাকাকালীন তার লেখা তথ্যকে সংগঠিত করে লেখা হয়েছিল। বইয়ের এই অংশকে একে অপরের সাথে আলগাভাবে সম্পর্কিত বিবিধ পর্বের একটি শৃংখলা হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, প্রাথমিক অধ্যায়গুলির একটিতে তিনি তার তরুণ রাঁধুনি কামান্তের কথা উল্লেখ করেছেন।
বইটি পড়ে ঘনিষ্ঠভাবে বিচার করলে লেখিকার আরও অনেক দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাওয়া যায়।
পরীক্ষা
[সম্পাদনা]ব্লিক্সেন তার গল্পে দুটি পৃথক সমাজের পৃথক পৃথক বিচারধারার বিশদ এবং নৈতিক প্রভাব বিশদে বর্ননা করেন। বিচারের প্রথম সমীক্ষাটি তার খামারে আফ্রিকান উপজাতিদের একটি সমাবেশ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন যেখানে একটি কিকুয়ু শিশুর মামলার বিচার করা হয়েছিল, যে দুর্ঘটনাক্রমে তার খেলার সাথীকে হত্যা করেছিল এবং অন্য একজনকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। উপজাতিদের বিচারের এই প্রক্রিয়ায় মূলত পশ্চিমা ধাঁচের বিচার প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই আলাধা ছিল। অপরাধী শিশুর পিতাকে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে পশুপালের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া নির্ধারিত হয়েছিল।
এরপর ব্লিক্সেন নাইরোবিতে একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ফৌজদারি বিচারের বর্ণনা দেন যেখানে আসামী, ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী জ্যাসপার আব্রাহামের বিরুদ্ধে কিটোশ নামে একজন অবাধ্য আফ্রিকান দাসের ইচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ ছিল। ব্লিক্সেন সরাসরি দুটি কার্যধারার তুলনা করেননি, তবে বৈপরীত্যগুলি স্পষ্টভাবে বর্ননা করেছেন।
বৈপরীত্য এবং দ্বন্দ
[সম্পাদনা]বিচারের এই দুই প্রক্রিয়ার বর্ননা বইয়ের অন্যনায় অংশ থেকে পৃথকভাবে ও গুরুত্ব সহকারে বর্নিত হয়েছে। ব্লিক্সেনের প্রিয় ধারণাগুলির মধ্যে একটি: বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য যার সম্পর্কে তিনি গভীর অনুসন্ধিতসু ছিলেন। সম্ভবত তার এই ধারণার সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাটি আছে, "শ্যাডোস অন দ্য গ্রাস" বইটিতে, যা তিনি কেনিয়া ছেড়ে যাওয়ার ত্রিশ বছর পর লিখেছিলেন।[১২]
আফ্রিকায় বসবাসকালীন তিনি বরাবরই সমাজের এই বৈপরীত্য ও দ্বৈততার সম্মুখীন হয়েছেন। তার বর্ননায় শহর ও গ্রাম, শুষ্ক ঋতু ও বর্ষাকাল, মুসলিম ও খ্রিস্টান এই সকল বীপরিতমুখী ধারণার উল্লেখ দেখা যায়। তার রচনার সবচেয়ে ধ্রুব বিষয়বস্তু হল আফ্রিকান এবং ইউরোপীয় ভাষার বৈপরীত্য।
আফ্রিকান সমাজ
[সম্পাদনা]"আউট অব আফ্রিকা" বইটিতে ব্লিক্সেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তার খামারে বা তার কাছাকাছি বসবাসকারী আফ্রিকানদের চরিত্র এবং তাদের সাথে সহাবস্থানের জন্য ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের (তিনি নিজেও অন্তর্ভুক্ত) প্রচেষ্টার গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে।
যদিও ব্লিক্সেন জমিদারীর উর্দ্ধতন পদে ছিলেন তবুও তিনি আফ্রিকানদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন ।[১৩] তার এই ব্যবহারের জন্য অন্যান্য উপনিবেশবাদী ইউরোপীয় এবং কিছু আফ্রিকানও তাকে ক্রমশ সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। [১৪] তিনি তার কর্মীদের ভালো বন্ধু হিসাবে উল্লেখ করেছেন। পরে তিনি নিজেকে এই সত্যের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলেন যে তিনি যে তিনি কখোনোই তাদেরকে পুরোপুরি জানতে ও চিনতে পারেননি, কিন্তু তারা হয়তো তাকে ভালোভাবে চিনেছিলেন ও বুঝেছিলেন। [১৫]
ব্লিক্সেন আফ্রিকানদের সংস্কৃতির সম্পর্কে তার পরযবেক্ষণ বর্ণনা করেন। যেসকল কিকুয়ু তার খামারে কাজ করেছেন, যারা তাদের নিজস্ব ভেড়া ও গবাদি পশু পালন ও ব্যবসা করেছেন, এছাড়াও যোদ্ধা সংস্কৃতি মাসাই জনজাতির লোকেরা যারা খামারের দক্ষিণে তাদের একটি নির্দিষ্ট উপজাতীয় সংরক্ষিত অঞ্চলে অস্থায়ী যাযাবর হিসাবে তাতক্ষণিকভাবে বসবাস করতেন এবং গবাদি পশুপালন করতেন, এই সকল জনজাতির জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের কথা তার লেখায় ফুটে উঠেছে। সোমালিল্যান্ড থেকে কাজের উদ্দেশ্যে দক্ষিণে কেনিয়ায় আগত সোমালি মুসলমানদের জীবন সম্পর্কেও ব্লিক্সেন কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য ভারতীয় বণিক সংখ্যালঘুর কিছু সদস্য যারা উপনিবেশের প্রাথমিক বিকাশে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের কথাও তার লেখায় স্থান পেয়েছে।
আফ্রিকানদের এবং তাদের আচরণ বা রীতিনীতি সম্পর্কে তার বর্ণনাক্রম কখনও কখনও সমসাময়িক এমন কিছু বর্ণগত ভাষা ব্যবহার করে, যা এখন ঘৃণ্য বলে মনে করা হয়। কিন্তু তার প্রতিকৃতিগুলি স্পষ্ট এবং গ্রহণযোগ্য এবং সাধারণত আফ্রিকানদের বর্বর বা সরল হিসাবে ধারণা থেকে উন্মুক্ত। তিনি প্রাচীন উপজাতীয় রীতিনীতির যুক্তি এবং মর্যাদার অনুভূতি প্রকাশ করেন। আফ্রিকানদের কিছু প্রথা, যেমন বিবাহের সময় তারা যে যৌতুক আনবে তার উপর ভিত্তি করে কন্যাদের মূল্যায়ন করা; -এইসকল রীতিনীতি ইউরোপীয় সমাজের দৃষ্টিতে কুৎসিত বলে মনে করা হয়। এই ঐতিহ্যগুলি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ব্লিক্সেনের বর্ননা মূলত বিচার-বিবেচনার বাইরে গিয়ে কিছু বিতর্কিত কিন্তু বাস্তবমুখী ভাষা প্রয়োগ করেছে।
ব্লিক্সেন তার অনেক আফ্রিকান কর্মচারী এবং পরিচিতজন তাকে প্রশংসা পেয়েছিলেন। তারা তাকে একজন চিন্তাশীল এবং জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। তারা নিজস্ব অনেক বিরোধ ও দ্বন্দ্বের সমাধানের জন্য তার উপদেশ চাইতেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ।
ইউরোপীয় সমাজ
[সম্পাদনা]তার লেখায়, আফ্রিকার বহিরাগত যেসকল চরিত্রগুলি স্থান পেয়েছে তারা বেশিরভাগই ইউরোপীয় - উপনিবেশবাদী এবং কেনিয়ায় থেকে যাওয়া কিছু ভ্রমণকারী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন ডেনিস ফিঞ্চ হ্যাটন। স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর কিছু সময়ের জন্য তিনি ব্লিক্সেনের প্রেমিক ছিলেন। ফিঞ্চ হ্যাটন, ব্লিক্সেনের মতোই, তার আফ্রিকান পরিচিতদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বোধ করতেন বলে জানা যায়। তার প্রতি ব্লিক্সেন "আউট অব আফ্রিকা" -তে প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।
ব্লিক্সেন তার লেখায় বহিরাগতদের বেশিরভাগ বর্ননা সেই ইউরোপীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন যারা তার ধারাবাহিক ও প্রিয় অতিথি ছিলেন, যেমন তিনি একজন পুরুষের বর্ননা দিয়েছেন যাকে তিনি কেবল ওল্ড নুডসেন হিসাবে সম্বোধন করেছেন। তিনি একজন সাধারণ ডেনিশ মতস্য শীকারী যিনি তার খামারে বসবাসের জন্য আমন্ত্রিত হন এবং কয়েক মাস পরে সেখানেই মারা যান।
ওয়েলসের যুবরাজ এডওয়ার্ডও তার গল্পে স্থান পেয়েছেন। ১৯২৮ সালে তার উপনিবেশে সফর কেনিয়ার অভিজাত সামাজিক মহলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ছিল (উপনিবেশের গভর্নর এই উপলক্ষে নাইরোবির রাস্তাগুলি সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছিলেন)। [১৬]
মুখ্য চরিত্র
[সম্পাদনা]- মাননীয় ডেনিস ফিঞ্চ হ্যাটন – ব্লিক্সেন তার লেখায় ফিঞ্চ হ্যাটনকে একধরনের দার্শনিক সম্রাট হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তার বর্ননায় ফিঞ্চ একজন ব্যতিক্রমী জ্ঞানী ও স্বাভাবিক সৌন্দর্যে ভরপুর মানুষ, যিনি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম ছিলেন, অথচ একইসঙ্গে কোথাও পুরোপুরি মানিয়ে যেতে পারেননি। ব্লিক্সেন লেখেন, “যখন তিনি খামারে ফিরে আসতেন, তখন খামারের সবকিছু যেন প্রাণ ফিরে পেত— কথা বলত… যখন আমি তার গাড়ির শব্দ শুনতাম, তখন একসঙ্গে খামারের সমস্ত বস্তু একসাথে তার আগমনের কথা জানিয়ে দিত।[১৭] এই ধরনের প্রশংসাসূচক বিবরণ ফিঞ্চ হ্যাটনের ক্ষেত্রে বিরল নয়। বলা হয়, ছোটবেলা থেকেই তার চারদিকে তিনি একধরনের উষ্ণতা ও প্রশান্তি ছড়াতেন, যা অনেকের কাছে একেবারে অমোঘ আকর্ষনীয় ছিল। যদিও সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয় যে ব্লিক্সেন ফিঞ্চ হ্যাটনের প্রেমিকা ছিলেন এবং তিনি তার সম্পর্কে গভীর প্রশংসায় মগ্ন ছিলেন, "আউট অব আফ্রিকা"-তে তিনি কখনোই তাদের সম্পর্কের কথা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেননি। ফিঞ্চ হ্যাটন ছিলেন এক ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্য এবং ইটন ও অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষিত। কিন্তু তিনি তার অভিজাত ব্রিটিশ পরিচয়কে পেছনে ফেলে ১৯১১ সালে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে, আফ্রিকায় চলে আসেন।.[১৮] শুরুতে তিনি কৃষক ও ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করলেও পরে শ্বেতাঙ্গ শিকারিতে পরিণত হন, এবং আফ্রিকানদের মধ্যে তিনি বেশ জনপ্রিয়ই ছিলেন। ব্লিক্সেনের সঙ্গে ফিঞ্চ হ্যাটনের প্রথম দেখা হয় ১৯১৮ সালে এক নৈশভোজে। তার চিঠিপত্র ও "আউট অব আফ্রিকা"-র কিছু অংশ থেকে বোঝা যায় যে, ফিঞ্চ হ্যাটনই ছিলেন ব্লিক্সেনের জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। ব্লিক্সেন তার ভাইকে একবার লিখেছিলেন, “আমি সেই মাটিকেও ভালোবাসতে বাধ্য, যেখানে তিনি পা রাখেন; যখন তিনি থাকেন, তখন ভাষার সীমা ছাড়িয়ে সুখ অনুভব করি আমি, আর যখন তিনি চলে যাযন, তখন আমি মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক কষ্টে ভুগি।”[১৯] ১৯২৩ সালের আগস্টের পর থেকে, যখন তিনি শিকার সফরে আর অংশ নিতেননা, তখন ব্লিক্সেনের খামারই ছিল তার প্রধান আশ্রয়স্থল।[২০] ব্লিক্সেনের মতো তিনিও আজীবন বিদ্রোহী স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং তার প্রতি ব্লিক্সেনের গভীর আবেগ থাকা সত্ত্বেও ফিঞ্চ হ্যাটন কখনোই তাদের সম্পর্ককে স্থায়ী রূপ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না, যা ব্লিক্সেনের জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ছিল। [২১] বলা হয়ে থাকে যে, ব্লিক্সেন অন্তত একবার হলেও নিজের গর্ভপাত ঘটিয়েছিলেন এবং সেই সন্তান ছিল ফিঞ্চ হ্যাটনের।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ১৯৩০ সালের শেষ থেকে ১৯৩১ সালের শুরুর দিকে, ফিঞ্চ হ্যাটন ব্লিক্সেনকে তার ডি হ্যাভিল্যান্ড গিপসি মথ বাইপ্লেনে করে খামার ও আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের উপর দিয়ে আকাশপথে সফর করার অভিজ্ঞতা দেন, যা ব্লিক্সেনের মতে তার খামারে কাটানো সময়ের “সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহূর্ত” ছিল। কিন্তু মে ১৯৩১ সালে যখন ফিঞ্চ হ্যাটন তার গিপসি মথ প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত হন, তখন তাদের সম্পর্ক সম্ভবত চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
- ফারাহ আডেন-যখন ব্লিক্সেন প্রথম ফারাহকে দেখেন, তখন তিনি ভুল করে তাকে একজন ভারতীয় মনে করেছিলেন। আসলে ফারাহ ছিলেন সোমালি, হাবর ইউনিস গোত্রের সদস্য যারা সাধারণত বুদ্ধিমান, সাহসী ও সুদর্শন হন। এরা মূলত গবাদিপশু ব্যবসায়ীদের গোষ্ঠী। ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের মধ্যে সে সময় সোমালি উপজাতির লোকেদের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ করার প্রচলন ছিল। নিয়োগকর্তাদের মতে, অধিকাংশ সোমালিরা ছিলেন দক্ষ ও সংগঠিত ব্যবস্থাপক। শ্যাডোস অন দ্যা গ্রাস গ্রন্থে ব্লিক্সেন সোমালিদেরকে আফ্রিকার অভিজাত শ্রেনীভুক্তদের মধ্যে গণ্য করেছেন, যাদের সংস্কৃতি ও বুদ্ধিমত্তা ইউরোপীয়দের সমকক্ষ বলে তিনি মনে করতেন। ফারাহ প্রথমে ব্রর ব্লিক্সেনের অধীনে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। ব্রর তাকে মোম্বাসায় পাঠান কারেন ব্লিক্সেনকে জাহাজ থেকে স্বাগত জানানোর জন্য। জীবনীকার জুডিথ থারম্যানের মতে, "ফারাহর সঙ্গে মোম্বাসায় দেখা হওয়ার পরই ব্লিক্সেনের নতুন জীবন শুরু হয়।"[২২] ব্লিক্সেন তার খামারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ফারাহকে দেন এবং পরে তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে শুরু করেন। ফারাহ স্থানীয় আফ্রিকানদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন এবং তার অনেক বাস্তব সমস্যার সমাধান করতেন। তারা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন, ব্লিক্সেন নিজেই তাদের সম্পর্ককে "সৃজনশীল ঐক্য" বলে অভিহিত করেন। [২৩] ব্লিক্সেনের আত্মজীবনীতে তার খামার বিক্রির অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল "ফারাহ অ্যাণ্ড আই সেল আউট"। ব্লিক্সেন ও তার স্বামীর বিবাহবিচ্ছেদের পরও ফারাহ তার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, যদিও মাঝে মাঝে সে ব্ররের সাফারির জন্য কাজ করত।[২৪]
- কামান্তে গাটুরা – একজন অল্পবয়সী ছেলে, যার শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত। ব্লিক্সেনের জীবনে প্রবেশ করার পর তাকে কাছের স্কটিশ খ্রিস্টান মিশনে চিকিৎসা করানো হয় এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি ব্লিক্সেনের রাঁধুনি হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন এবং একইসঙ্গে তার নিজ জীবনধারা ও সিদ্ধান্তের প্রতি ব্যঙ্গাত্মক, সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করতে শুরু করেন। অনেকের মতে, ব্লিক্সেন ও কামান্তের বন্ধুত্ব স্বতঃসিদ্ধ ছিল কারণ তারা উভয়েই নিঃসঙ্গতাকে গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজ নিজ সংস্কৃতির প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। কামান্তের কিছু স্মৃতিকথা ও গল্প পরে পিটার বেয়ার্ডের সম্পাদনায় "লংগিং ফর ডার্কনেসঃ কামান্তে'স টেলস ফ্রম আউট অব আফ্রিকা" শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
- সম্মানীয় বার্কলে কোল– কোলও ছিলেন ফিঞ্চ হ্যাটনের মতোই এক ব্রিটিশ অভিবাসী, যিনি কেনিয়ার অভিজাত শ্রেণির মধ্যে বিলাসী জীবনযাপন করতেন। রেজিনাল্ড বার্কলি কোল (১৮৮২-১৯২৫) ছিলেন একজন অ্যাংলো-আইরিশ অভিজাত, এনিসকিলেনের চতুর্থ আর্লের পুত্র। তিনি বোয়ার যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সৈনিক এবং তার বিদ্রুপাত্মক রসবোধ ও বিলাসিতাপূর্ণ জীবনধারার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন তৃতীয় ব্যারন ডেলামেয়ারের ভগ্নিপতি এবং নাইরোবির বিখ্যাত মুথাইগা ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যা উপনিবেশিক কেনিয়ার অভিজাতদের জন্য একটি কেন্দ্রস্থল ছিল।.[২৫] কোল ছিলেন ফিঞ্চ হ্যাটনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তারা একসঙ্গে ব্লিক্সেনের খামারের জন্য বিলাসবহুল মদ সরবরাহ করতেন। ব্লিক্সেন একবার বলেছিলেন যে, কোল প্রতিদিন সকাল এগারোটায় এক বোতল শ্যাম্পেন পান করতেন এবং গ্লাসের মান সম্পর্কে অভিযোগ করতেন। ১৯২৫ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোল মারা যান। ব্লিক্সেন তার মৃত্যু সম্পর্কে লেখেন, "তার সঙ্গে এক যুগের অবসান হলো। দেশের রুটির মধ্যে থেকে তার স্বাদ খামির যেন হারিয়ে গেল।"[২৬]
- কিনানজুই – কিনানজুই ছিলেন ব্লিক্সেনের অঞ্চলের প্রধান। ব্লিক্সেন তার স্মৃতিকথায় তাকে একজন "একজন বুদ্ধিমান বৃদ্ধ, যিনি সুপরিচিত এবং প্রকৃত মহত্ত্বের অধিকারী" হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।[২৭] ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ তার পূর্বসূরির সঙ্গে বনিবনা করতে পারেনি, তাই তারা কিনানজুইকে স্থানীয় কিকুয়ু জনগোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ করে।[২৭] ব্লিক্সেনের খামারে বসবাসকারী কিকুয়ু জনগণের জন্য তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ব্লিক্সেন যখন কেনিয়ায় পৌঁছান, তখন কিনানজুই তাকে আশ্বাস দেন যে, তিনি কখনো শ্রমিক সংকটে পড়বেন না। যদিও ব্লিক্সেন তার কিছু দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করেন, যেমন—একবার তিনি একজন মার্কিন কূটনীতিকের কাছ থেকে একটি বিশাল গাড়ি কেনেন। তবে ব্লিক্সেন তাকে সম্মানের সঙ্গে তার কথা উপস্থাপন করেছেন। ব্লিক্সেন তাকে বর্ননা করেছেন একজন যোগ্য নেতা হিসেবে যার ছিল রাজকীয় ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ। তার স্মৃতিকথার শেষভাগে কিনানজুইয়ের মৃত্যু বর্ণনা করা হয়েছে, যা কোল ও ফিঞ্চ হ্যাটনের মৃত্যুর মতো ব্লিক্সেনকে আরও একা ও অনিশ্চিত করে তোলে।
আশ্চর্যজনকভাবে"আউট অব আফ্রিকা" -এর গল্পগুলিতে ব্লিক্সেনের স্বামী ব্রর ভন ব্লিক্সেন-ফিনেকের কোনও স্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য বা উল্লেখ দেখা যায়না। ব্লিক্সেন তার ছোটবেলার শিকার ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলিতে তিনি ব্ররের সাথে থাকতেনবলে জানা যায়, কিন্তু সেই প্রসঙ্গে তার কথা বিশেষ উল্লেখ করেননি। ব্লিক্সেন দু একবার তার স্বামীর উল্লেখ করেছেন [২৮] কিন্তু তিনি কখনও তার প্রথম নাম ব্যবহার করেননি। যদিও বিচ্ছেদ এবং বিবাহবিচ্ছেদের সময় ব্লিক্সেন ও তার স্বামী বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বজায় রেখেছিলেন, তবুও অন্যান্য মহিলাদের সাথে ব্ররের মেলামেশা ক্যারেনকে বিব্রত করে তোলে। কিছু নিয়মের আওতায় তাকে বাধ্য হয়ে এমন সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতে হত যেখানে ব্রর তার একজন উপপত্নীর সাথে উপস্থিত থাকতেন (যার মধ্যে একজন তার পরবর্তী স্ত্রী হয়েছিলেন)। ব্লিক্সেন ব্যক্তিগতভাবে এই সামাজিক কঠোরতার প্রতি বিরক্ত ছিলেন।
শ্যাডোস অন দ্যা গ্রাস
[সম্পাদনা]১৯৬০ সালে, ৭৬ বছর বয়সে, ব্লিক্সেন "শ্যাডোস অন দ্য গ্রাস" প্রকাশ করেন, যা আফ্রিকায় তার দিনগুলির স্মৃতিচারণের আরো একটি সংক্ষিপ্ত সংকলন। আফ্রিকার বাইরের অনেক মানুষ এবং ঘটনা এই বইয়ের পৃষ্ঠাগুলিতে বর্ণিত হয়েছে। বইয়ের সংক্ষিপ্ততা এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত বিষয়বস্তুর কারণে, সাম্প্রতিক কালে "শ্যাডোস অন দ্য গ্রাস" বইটি "আউট অব আফ্রিকা" -এর সাথে সম্মিলিত খণ্ড হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে।
রূপান্তর
[সম্পাদনা]১৯৮৫ সালে সিডনি পোল্যাক আউট অব আফ্রিকা বইটির উপর ভিত্তি করে সমনামের আউট অব আফ্রিকা) একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন, যাতে অভিনয় করেছিলেন মেরিল স্ট্রিপ, রবার্ট রেডফোর্ড এবং ক্লাউস মারিয়া ব্র্যান্ডাউয়ার -এর মতো অভিনেতা অভিনেত্রীরা। ছবিটি সমালোচকদের কাছ থেকে মিশ্র এবং সাধারণভাবে ইতিবাচক পর্যালোচনা পেয়েছিল। এই সিনেমাটি সাতটি বিভাগে একাডেমি পুরস্কার জিতেছিল যাদের মধ্যে রয়েছে; সেরা ছবি, সেরা পরিচালক (পোল্যাক) এবং সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য ।
সিনেমাতে গল্পের সমস্ত ঘটনার যথাযথ চলচ্চিত্র রূপান্তর না করে একে একটি প্রেমের গল্প হিসাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। চিত্রনাট্যতে কার্ট লুয়েডট রচিত ব্লিক্সেনের দুটি জীবনী থেকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরনা নেওয়া হয়েছে। এই চলচ্চিত্রে ব্লিক্সেনের কেনিয়ার বছরগুলির একটি সংকুচিত কালানুক্রমিক বর্ণনা করা হয়েছে যা বিশেষ করে তার আসুখী দাম্পত্য এবং ফিঞ্চ হ্যাটনের সাথে তার সম্পর্কের উপর আলোকপাত করে। ব্লিক্সেনের আরও কিছু কাব্যিক বর্ণনা এবং বইয়ের কয়েকটি পর্ব ছবিতে প্রদর্শিত হয়েছে, যেমন যুদ্ধের সময় ব্লিক্সেনের সরবরাহের গাড়ি চালানোর কাজ করা, খামারে আগুন লেগে যাওয়া এবং তার কারনে উতপন্ন আর্থিক সমস্যা এবং তার কিকুয়ু কর্মীদের জন্য একটি বাড়ি খুঁজে পেতে তার সংগ্রাম ইত্যাদি। বেশিরভাগ প্রধান চরিত্র তাদের আসল নাম দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, যদিও কিছু বিবরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে।
১৯৬৯ সালে নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার এবং বিজ্ঞান লেখক রবার্ট আরড্রে ইউনিভার্সাল স্টুডিওর জন্য আউট অব আফ্রিকার উপর ভিত্তি করে একটি পূর্ববর্তী চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, কিন্তু চিত্রনাট্যটি কখনও চলচ্চিত্রে রূপান্তর করা হয়নি। [২৯] ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, এনবিসিইউনিভার্সাল ইন্টারন্যাশনাল স্টুডিওস হ্যারি পটার এবং গ্র্যাভিটি প্রযোজক ডেভিড হেইম্যানের সাথে একটি যৌথ প্রকল্প ঘোষণা করে যাতে এই স্মৃতিকথা বিষয়ক গল্পটির উপর ভিত্তি করে একটি নাটকীয় টিভি ধারাবাহিক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দ্য নাইট ম্যানেজারের পরিচালক/নির্বাহী প্রযোজক সুজান বিয়ার এটি পরিচালনা এবং নির্বাহী প্রযোজনা করবেন বলে প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে। [৩০]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Lorenzetti, Linda Rice, ‘Out of Africa': Karen Blixen's coffee years, Tea & Coffee Trade Journal, 1 September 1999
- ↑ Dinesen, Isak, Out of Africa, from the combined Vintage International Edition of Out of Africa and Shadows on the Grass, New York 1989, p. 9
- 1 2 Lorenzetti, 'Out of Africa': Karen Blixen's coffee years
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 132
- ↑ Herne, Brian, White Hunters: The Golden Age of Safaris, Macmillan, 1999, p. 115
- ↑ Herne, White Hunters: The Golden Age of Safaris, p. 117
- ↑ Feinberg, Harvey M., and Solow, Joseph B., “Out of Africa,” The Journal of African History (2002), 43: 255–261 Cambridge University Press
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 123
- ↑ Clark, James Lippitt, memorial essay on Carl Akeley, copy in the archives of the Explorers' Club, New York City
- ↑ Roosevelt, Theodore, African Game Trails, Charles Scribner's Sons, 1909, page 2
- ↑ Dinesen, Isak, Shadows on the Grass, from the combined Vintage International Edition of Out of Africa and Shadows on the Grass, New York 1989, p. 384
- ↑ Dinesen, Shadows on the Grass, Vintage International Edition, p. 384
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 121
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 171
- ↑ Dinesen, Out of Africa, Vintage International Edition, p. 19
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 246
- ↑ Dinesen, Out of Africa, Vintage International Edition, p. 217
- ↑ Herne, White Hunters: The Golden Age of Safaris, p. 109
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 191
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 184
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, pp. 184-188
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 114
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 115
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, p. 168
- ↑ Thurman, Isak Dinesen: The Life of a Storyteller, pp. 153–155.
- ↑ Dinesen, Out of Africa, Vintage International edition, p. 216
- 1 2 Dinesen, Out of Africa, Vintage International edition, p. 136
- ↑ Dinesen, Out of Africa, Vintage International edition, p. 256
- ↑ Maslin, Janet (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪)। "At the Movies"। New York Times। New York। সংগ্রহের তারিখ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- ↑ Andreeva, Nellie (৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। "'Out Of Africa' TV Series Adaptation From David Heyman & Susanne Bier In Works At NBCU International Studios"। Deadline। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।