বিষয়বস্তুতে চলুন

অ্যালিসিয়া কাউইয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অ্যালিসিয়া কাউইয়া
২০১৫ সালে অ্যালিসিয়া কাউইয়া
জন্ম
নোনেনো সম্প্রদায়, ইয়াসুনি, ইকুয়েডর
প্রতিষ্ঠানন্যাশনাল ওয়াওরানি ফেডারেশন (এনএডবলুই), ইকুয়েডর ওয়াওরানি মহিলা সমিতি

অ্যালিসিয়া কাউইয়া বা কাহুইয়া[] হলেন একজন পরিবেশ কর্মী ও ইকুয়েডরের হুয়াওরানি আদিবাসীদের নেত্রী। তিনি ইকুয়েডরের হুয়াওরানি জনগোষ্ঠীর সহ-সভাপতি এবং ইকুয়েডরের আমাজনে তেল শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার কাজের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ২০১৩ সালে তিনি তেল কোম্পানিগুলির হাত থেকে আমাজন অববাহিকা রক্ষার জন্য ইকুয়েডরের সংসদে একটি বক্তৃতা দেন।

জীবনী

[সম্পাদনা]

পরিবার এবং শৈশব

[সম্পাদনা]

কাউইয়ার জন্ম ইকুয়েডরের ইয়াসুনি জাতীয় উদ্যান অঞ্চলের এক হুয়াওরানি আদিবাসী জনগোষ্ঠী পরিবারে। তার ঠাকুমা ইতেকা একজন ভয়ঙ্কর হুয়াওরানি যোদ্ধা হিসাবে পরিচিত ছিলেন।[]

শৈশবে কাউইয়াকে মিশনারিদের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠানো হয়েছিল, যাদের কাজ ছিল "বর্বরদের সভ্য করা" যাতে তেল কোম্পানিগুলি কোনও প্রতিরোধ ছাড়াই আদিবাসী অঞ্চলে তাদের তেল অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যদিও তার ঠাকুমা ইতেকা পরে তাকে আবার নিজেদের বনাঞ্চলে ফিরিয়ে এনেছিল।[]

রাজনৈতিক জীবন

[সম্পাদনা]

নিউ ইন্টারন্যাশনালিস্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে কাউইয়া বলেছিলেন যে, তিনি ১৩ বছর বয়সে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি একজন নেতা ছিলেন। ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ-শাসিত সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি তার ঠাকুমা ইতেকার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।[]

সেই সময় মহিলাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি ছিল না। কিন্তু আমার ঠাকুমা বলেছিলেন যে পুরুষ এবং মহিলারা যখন তাদের অঞ্চল [তেল কোম্পানিগুলির আক্রমণ থেকে] রক্ষা করার জন্য একই সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তখন কেন তারা একসাথে এটি করতে পারল না?

অ্যালিসিয়া কাউইয়া, নিউইট.ওআরজি

তিনি ন্যাশনাল ওয়াওরানি ফেডারেশন (এনএডাবলুই)-এর সহ-সভাপতি হন। ২০০৫ সালে তিনি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতারা মিলে অ্যাসোসিয়েশন ডি মুজেরেস ওয়াওরানি দেল ইকুয়েডর (ইকুয়েডর ওয়াওরানি মহিলা সমিতি) নামে একটি মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহিলা সমিতির সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় ৩০০ জন। এই সমিতির লক্ষ্য হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের প্রাকৃতিক জীবনধারা রক্ষা করা এবং তেল কোম্পানিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করা।[]

২০১৩ সালে তিনি ইকুয়েডরের সংসদে ইয়াসুনি-আইটিটি পরিকল্পনা এবং আমাজনে তেল কোম্পানিগুলির অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য একটি বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতায় তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বলেন। এই বক্তৃতার কথা সেইসময় সংবাদপত্রের শিরোনামে উঠে আসে।

ইকুয়েডরে তেল কোম্পানিগুলির দ্বন্দ্ব

[সম্পাদনা]

১৯৭২ সাল থেকে ইকুয়েডর হলো দক্ষিণ আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানিকারক দেশ। ভেনেজুয়েলা এবং মেক্সিকোর পরে রপ্তানিকারক দেশ হিসাবে তৃতীয়। তেল উত্তোলনের জন্য যে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল তা ইকুয়েডরের আমাজন অঞ্চলকে সামাজিক এবং পরিবেশগত উভয় দিক থেকেই প্রভাবিত করেছিল।[]

২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর আইএসিএইচআর-এর অধিবেশনে অ্যালিসিয়া কাউইয়া (মাঝখানে)

সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলির মধ্যে একটি হল টেক্সাকো-শেভরন মামলা। এই মার্কিন তেল কোম্পানিটি ১৯৬৪ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে ইকুয়েডরের আমাজন অঞ্চলে তেল অনুসন্ধানের কাজ করে। এই সময়কালে টেক্সাকো ১৫টি পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রে ৩৩৯টি কূপ খনন করেছিল। এছাড়া ৬২৭টি বিষাক্ত বর্জ্য জলের গর্তও খনন করা হয়। সেইসঙ্গে তেল অবকাঠামোর অন্যান্য বর্জ্য উপাদানও ঐ অঞ্চলে ফেলা হয়। পরে জানা গেছে যে, অত্যন্ত দূষণকারী এবং বর্তমানে অপ্রচলিত প্রযুক্তিগুলি ব্যয় হ্রাস করার উপায় হিসাবে সেগুলি এখানে ব্যবহার করা হয়েছিল।[]

কোম্পানিটি দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর, সরকার ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তার কারণ কোম্পানিটি ১৯ মিলিয়ন ডলারের ফি পরিশোধের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। এই দ্বন্দ্ব বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। পরে ২০১৭ সালের জুনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট টেক্সাকো-শেভরনের পক্ষে রায় দেয়। ইকুয়েডরের আদিবাসী পরিবেশ কর্মীরা বলেছেন যে, তারা এই কোম্পানিগুলিকে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।[]

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে, ইকুয়েডর সরকার ইয়াসুনি এলাকা এবং ৪৩ ব্লক (ইশপিঙ্গো, টিপুতিনি এবং তাম্বোকোচা) অঞ্চলে তেল উত্তলনের কথা ঘোষণা করে যার ফলে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ার কথা ছিল।[]

কাউইয়ার বক্তৃতা

[সম্পাদনা]

৩ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে ইকুয়েডরের রাজধানী কিতোতে জাতীয় পরিষদ ইয়াসুনি-আইটিটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য একত্রিত হয়। কাউইয়াকে ইকুয়েডরের হুয়াওরানি জাতির সহ-সভাপতি হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওয়াওরানি জাতির সভাপতি মোই এনোমেঙ্গার চাপ সত্ত্বেও, অ্যালিসিয়া কাউইয়া কিতোতে জাতীয় পরিষদের সামনে তেল শোষণের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন।[][] প্রথমে তার মাতৃভাষা হুয়াওরানিতে, তারপর স্প্যানিশ ভাষায়, তেল কোম্পানিগুলির নিন্দা করে তিনি তার আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের পক্ষে বক্তব্য রাখেন :

হুয়াওরানি অঞ্চলে সাতটি কোম্পানি কাজ করছে এবং আমরা আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছি... আমরা কী উপকৃত হয়েছি? মোটেও না।

অ্যালিসিয়া কাউইয়া, নিউইট.ওআরজি

তিনি আমাজনে তেল খননের নেতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে অনেকেই বন উজাড় করে চলেছেন। এমনকি পরবর্তীতে কিছু মানুষ আদিবাসীর মৃত্যুর সাথেও জড়িত রয়েছেন।

তবে কাউইয়া ভাষণ জাতীয় পরিষদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট ছিল না, এবং ইয়াসুনি-আইটিটি পরিকল্পনা ভোটের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছিল। অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে।[১০]

পরিণতি

[সম্পাদনা]

তার বক্তৃতার পর, কাউইয়াকে মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হয়। যদিও মৃত্যুর হুমকি তাকে তার কর্তব্য থেকে টলাতে পারেনি। এই হুমকি তার সক্রিয়তাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। এর পরেও তিনি এএমডবলুএই-এর নেতা হিসেবে তিনি তার সম্প্রদায়ের পক্ষে ওকালতি চালিয়ে যান।

পুরস্কার

[সম্পাদনা]

২০২৩ সালের নভেম্বরে কাউইয়ার নাম বিবিসির ১০০ জন নারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।[১১]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "Autoridades del Consejo de Gobierno ..."। La Confederación de Nacionalidades Indígenas del Ecuador। সংগ্রহের তারিখ ২৫ নভেম্বর ২০২৩
  2. 1 2 3 "One woman against Big Oil and patriarchy"New Internationalist (ইংরেজি ভাষায়)। ১ মার্চ ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৭
  3. "Amazon women on the front lines: the Waorani — Global Greengrants Fund"। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৭
  4. Ortiz, Pablo (১৯৯৫)। Marea negra en la Amazonia: conflictos socioambientales vinculados a la actividad petrolera en el Ecuador (স্পেনীয় ভাষায়)। Editorial Abya Yala। আইএসবিএন ৯৭৮৯৯৭৮০৪১৪৬৮
  5. Pigrau, Antoni (২৭ জুলাই ২০১৪)। "Revista Catalana de Dret Ambiental"The Texaco-Chevron Case in Ecuador: Law and Justice in the Age of Globalization। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুলাই ২০১৭
  6. "Victoria para Chevron en caso de contaminación en Ecuador, concede la Corte Suprema de Estados Unidos"El Universo (স্পেনীয় ভাষায়)। ১৯ জুন ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুলাই ২০১৭
  7. Telégrafo, El (৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। "El ITT se ubica como la fuente más importante de ingresos"El Telégrafo (স্পেনীয় ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুলাই ২০১৭
  8. "One woman against Big Oil and patriarchy"New Internationalist (ইংরেজি ভাষায়)। ১ মার্চ ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুলাই ২০১৭
  9. "Alicia Cawiya opacó la fiesta del oficialismo | Diario El Comercio de Quito"Noticias Ecuador - Ecuador en vivo (স্পেনীয় ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৭[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  10. "La Historia – Yasuní-ITT: Empieza la explotación petrolera en polémico bloque de la Amazonía"lahistoria.ec (স্পেনীয় ভাষায়)। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৭
  11. "BBC 100 Women 2023: Who is on the list this year?"BBC News (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ২৩ নভেম্বর ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৩