বিষয়বস্তুতে চলুন

অ্যালবাম আমিকোরাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
A
ইয়োহান ভালেনটিন ডাইগারের বন্ধুত্বের বইয়ের একটি দু’পাতা, যেখানে ১৫৫৩ সালের আগস্ট মাসের কিছু লেখা আছে।

অ্যালবাম অ্যামিকোরাম (ল্যাটিন : Album amicorum; অর্থ ‘বন্ধুদের অ্যালবাম’ বা ‘বন্ধুত্বের বই’) ছিল কবিতার খাতা, অটোগ্রাফ বই এবং আধুনিক বন্ধুত্বের বইয়ের একটি প্রাথমিক রূপ। এটি সংস্কার আন্দোলন (রিফরমেশন) সময়কালে উদ্ভূত হয়, যখন বিশিষ্ট সংস্কারপন্থীদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।১৮শ শতকে বন্ধুত্বের বইয়ের প্রচলন প্রধানত প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; ক্যাথলিকদের তুলনায় তাদের মধ্যে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। উনিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বইগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল।১৭৭০ সালের পর থেকে বন্ধুত্বের বইয়ের জন্য পূর্বমুদ্রিত পৃথক পৃষ্ঠা (স্টামবুখব্লাট) ব্যবহার শুরু হয়। এসব পৃষ্ঠা জার্মানির গটিংগেন শহরের বই বাঁধাইকারী ও মুদ্রণকর্মী ইয়োহানেস কার্ল ভিডারহোল্ড (১৭৪৩–১৮২৬) আলগা পাতার সংগ্রহ হিসেবে প্রকাশ করেন। [][]

ব্যবহার

[সম্পাদনা]
রুপস্টেইনের বন্ধুত্বের বইয়ের অলংকরণ (১৭৭৩)

বন্ধুত্বের বইয়ে সাধারণত দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একে অপরের প্রতি বন্ধুত্বের অঙ্গীকার প্রকাশ করতেন, অন্যজনের অ্যালবামে একটি পৃষ্ঠা পূরণ করার মাধ্যমে। এটি সাধারণত কোনো বিশেষ উপলক্ষে—যেমন উৎসবের সময় বা শিক্ষাজীবন শেষে কোনো স্থান ত্যাগ করার মুহূর্তে—লিখে দেওয়া হতো।

পরবর্তীতে পুনর্মিলন বা অন্য কোনো উৎসবের সময় সেই লেখাটি নবায়নও করা হতো। এর ফলে বন্ধুত্বের বইটি বইয়ের মালিকের শৈশব ও ছাত্রজীবনের বন্ধুদের স্মৃতি আজীবন ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করত।

এ ছাড়া এসব বইয়ে অধ্যাপকদের স্বাক্ষর (যেমন গ্যোথের *ফাউস্ট*-এ বর্ণিত ছাত্রজীবনের দৃশ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়) এবং যাজক, অভিজাত ব্যক্তি ও খ্যাতিমান ব্যক্তিদের স্বাক্ষরও সংরক্ষিত থাকত। অনেক সময় এসব বই শিক্ষার্থীদের জন্য সুপারিশপত্রের মতো কাজ করত, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের সময়। উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির স্বাক্ষর সংগ্রহ করলে ভবিষ্যতে পৃষ্ঠপোষক বা রক্ষক পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতো।

বিষয়বস্তু ও তাৎপর্য

[সম্পাদনা]

এর পূর্ণাঙ্গ রূপে একটি এন্ট্রিতে সাধারণত ব্যক্তিগত নোট অন্তর্ভুক্ত থাকত; যেমন হাতে লেখা শুভেচ্ছাবার্তা, নিজের রচিত কোনো কবিতা অথবা অন্যান্য ছোট সাহিত্যিক লেখা। যেসব কবিতার শিরোনাম থাকত(যেখানে মালিকের নাম বসানো হতো), সেগুলো সাধারণত বন্ধুত্বের বইয়ের (Friendship book) জন্যই রচিত হতো।

রঙিন বন্ধুত্বের বইয়ের পৃষ্ঠা, রেনানিয়া হাইডেলবার্গ, ১৮২২

আদর্শভাবে লেখক তার বার্তা বা কবিতার পাশে তারিখ ও স্থান উল্লেখ করতেন। পৃষ্ঠাটিতে প্রায়ই একটি জীবনদর্শনমূলক উক্তি বা মূলমন্ত্র (symbolum) লেখা থাকত। স্বাক্ষর দেওয়া ছিল অপরিহার্য। এই স্বাক্ষরে শুধু লেখকের নাম নয়, তিনি কোন অনুষদে পড়তেন এবং কোথা থেকে এসেছেন—তাও উল্লেখ থাকত।

এ ছাড়া লেখকের নামের আগে একটি নির্দিষ্ট উৎসর্গমূলক বাক্য (Dedikationsformel) যুক্ত থাকত, যার মাধ্যমে বইয়ের মালিককে লেখককে স্মরণ করতে অনুরোধ জানানো হতো (যেমন: “এই পৃষ্ঠাটি পড়ার সময় অমুককে স্মরণ করো”)। এই রীতি আজও বিশেষ করে কিশোরীদের অটোগ্রাফ বইয়ে দেখা যায়।

শিল্পীসুলভ লেখকেরা রঙিন কলম ও কালি দিয়ে চিত্রাঙ্কন করতেন। তবে সবাই আঁকতে পারতেন না বলে ১৮শ শতকে একটি নতুন বাজার গড়ে ওঠে—আগেই নকশা করা বন্ধুত্বের বইয়ের পৃষ্ঠা বিক্রি শুরু হয়, যেখানে শুধু ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করলেই হতো। বিশ্ববিদ্যালয় বা ছাত্রজীবনের দৈনন্দিন দৃশ্যসংবলিত নকশাগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল।

বন্ধুত্বের বইয়ের বিষয়বস্তু মূলত বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। বিভিন্ন শতকে প্রচলিত ছাত্র সংঘ ও সংগঠনগুলোর চিহ্ন এসব পৃষ্ঠায় প্রতিফলিত হয়েছে। ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত অনেক ছাত্রসংঘ নিষিদ্ধ থাকায়, বন্ধুত্বের বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

গোপনীয়তার কারণে শিক্ষার্থীরা নানা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করত, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের সংঘের সদস্যত্ব প্রকাশ করলেও তা প্রমাণ করা যেত না। এসব সাংকেতিক উপাদান থেকেই ছাত্রসংঘগুলোর পরিচয়চিহ্ন গড়ে ওঠে, যেগুলোর কিছু আজও ব্যবহৃত হচ্ছে—যেমন বৃত্ত বা সংঘচিহ্ন, যা প্রায় প্রতিটি ছাত্র সংগঠনের প্রতীকে দেখা যায়।


তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Rost, Henrike (২০২০), Musik-Stammbücher. Erinnerung, Unterhaltung und Kommunikation im Europa des 19. Jahrhunderts, Wien / Köln / Weimar: Böhlau, আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৪১২-৫১৮৭২-১
  2. "Göttinger Universitätsgeschichte – Stammbuchblätter"kulturerbe.niedersachsen.de (জার্মান ভাষায়)। ১৮ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৭