অ্যাডাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
আদম, অ্যাডাম
মৃত্যু
হাওয়া (হবা)
পেশানবি
সন্তান১৪০ জোড়া সন্তান ছিল
পিতা-মাতাবিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী প্রথম মানুষ; সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি

আদম বা অ্যাডাম (ইংরেজি: Adam) আব্রাহামীয় ধর্ম এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীতে উল্লেখিত একজন ব্যক্তি। ইহুদি, খ্রিস্টানইসলাম ধর্মের অনুসারীদের বিশ্বাস অনুসারে তিনি ছিলেন প্রথম সৃষ্ট মানব। ইসলাম ধর্মের বর্ণনা মতে তিনি আল্লাহ প্রেরিত রাসুল বা বাণীবাহক এবং তাকে এই ধর্মে হযরত আদম (আ:) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার স্ত্রী ছিলেন হাওয়া (হবা)। পৃথিবীতে আদমই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি জানতেন তিনি কত বছর বাচবেন। সৃষ্টিকর্তা (ইসলামে আল্লাহ) তাকে বলেছিলেন, "তুমি সহস্র বছর পৃথিবীতে বেচে থাকবে।"

প্রথম মানব ও নবি[সম্পাদনা]

ইসলাম ধর্ম মোতাবেক আদম(আ:) আল্লাহর সৃষ্ট প্রথম মানব। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা থেকে জানা যায়, আল্লাহ যখন ফেরেশতাদেরকে জানালেন যে তিনি পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন তখন ফেরেশতারা বলল,

“আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করছি!" তখন আল্লাহ বলেন “নিঃসন্দেহে আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।” [১]

আল্লাহ তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন। তারপর তার দেহে প্রাণ সঞ্চার করেন। হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয় আদমের পাঁজর থেকে। সৃষ্টির পর তাদের আবাস হয় বেহেশত বা জান্নাতে । মানুষ যেহেতু সকল সৃষ্টির সেরা তাই আল্লাহ ফেরেশতাকুলকে আদেশ করেন আদমকে সিজদা করার জন্য। ইবলিশ ব্যতীত সকল ফেরেশতা এই আদেশ প্রতিপালন করেন। কুরআনে বলা হয়েছে,

“আমি আদমকে পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিব।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত: ৩০)[২]

কুরআনে আদম (আ:)-এর নাম ১০টি সুরার ৫০ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল বাকারা,[৩],সুরাআলে ইমরান[৪], সূরা আল আরাফ, সূরা ইসরা, সূরা আল কাহফ এবং সূরা ত্বোয়া-হাতে তার নাম, গুনাবলী ও কার্যাবলী আলোচনা করা হয়েছে। সূরা আল হিজর ও সূরা ছোয়াদে শুধু গুণাবলী এবং সূরা আল ইমরান, সূরা আল মায়িদাহ এবং সূরা ইয়াসীনে আনুষঙ্গিক রুপে শুধু নামের উল্লেখ আছে।

[৫]

আবূ হূরায়রা থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুহাম্মদ বলেন, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টিকালে তার উচ্চতা ছিল ৬০ কিউবিট এবং মানুষ বেহেশতে প্রবেশকালে আদমের আকার লাভ করবে।[৬]

আদমের সৃষ্টি[সম্পাদনা]

আদমের সিজদাহ ও শয়তানের অনুরাগ,,,,[সম্পাদনা]

বেহেশত/স্বর্গ থেকে বিতাড়ন[সম্পাদনা]

সৃষ্টির পর আদম ও হাওয়ার অবস্থান ছিল বেহেশতে বা স্বর্গে। সেখানে তাদের জন্য গন্দম ফল খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। শয়তানের প্ররোচনায় আদম এবং হাওয়া উভয়ই গন্দম ফল খেয়ে ফেলেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এটি মানুষের আদিপাপ বলে পরিগণিত হয় (বাইবেলের ভাষায়)। এর শাস্তিস্বরূপ সৃষ্টিকর্তা ( ইসলামে আল্লাহ) তাদের বেহেশত/ স্বর্গ থেকে বিতাড়ন করেন এবং শাস্তিস্বরূপ তাদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। আদম এবং হাওয়া পৃথিবীর ভিন্ন দুটি স্থানে অবতরণ করেন। আদম অবতরণ করেন সিংহলের আদম পাহাড়ে আর হাওয়া অবতরণ করেন সৌদি আরবের হেজাজে। দীর্ঘদিন পর মক্কার আরাফাত নামক প্রান্তরে তাদের পুনর্মিলন হয় (কুরআনের ভাষায়)।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

পৃথিবীর জীবন[সম্পাদনা]

পৃথিবীতে আগমনের পর আদম ও হাওয়াকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কাবাগৃহ নির্মাণের আদেশ প্রদান করা হয়। ক্বাবা নির্মিত হয়ে গেলে তাদেরকে তা তাওয়াফ করার আদেশ দেয়া হয়। বর্ণিত আছে আদম কর্তৃক নির্মিত ক্বাবা নূহের মহাপ্লাবন পর্যন্ত অক্ষত ছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

পরিবার[সম্পাদনা]

আদমের নিঃসঙ্গতা দূরীকরণের জন্য তার বাম পাঁজরের হাড় থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়। তার স্ত্রী ছিলেন হাওয়া। পৃথিবীতে আগমনের পর তাঁদের অনেকজন সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করেছিল ।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] আলোচিত সন্তানগণ হলেন: হাবিল, কাবিল, আকলিমা, লাইউদা [৭]। তাদের সন্তান শিস (আ:) পরবর্তীতে আল্লাহর একজন নবি (বাণীবাহক) হয়েছিলেন।

বিভিন্ন ধর্মে আদম[সম্পাদনা]

হিব্রু বাইবেলে আদম

আদিপুস্তক ১:-

মানবজাতিকে নিয়ে  ঈশ্বরের সৃষ্টির সর্বশেষ হিসাবে মানব সৃষ্টি সম্পর্কে বলে: "নর-স্ত্রী তিনি(ঈশ্বর) তাদের সৃষ্টি করেছেন, এবং তাদের আশীর্বাদ করেছেন এবং তাদের নাম আদম বলেছেন।" (আদিপুস্তক ৫: ২ সি)

ঈশ্বর মানবজাতিকে আশীর্বাদ করেন এবং আদেশ দেন "ফলশালী ও বহুগুণে বেড়ে ওঠো" এবং তাদের দান করে বলেন "সমুদ্রের মাছ, বাতাসের পাখি, গবাদি পশু এবং সমস্ত পৃথিবীর উপরে এবং সমস্ত লতানো জিনিসের উপরে তোমাদের কর্তৃত্ব দান করলাম যা পৃথিবীতে লম্বা হয়। "(আদিপুস্তক ১.২৬-২৭)।

আদিপুস্তক ২-

"ঈশ্বর 'আদম'(যার অর্থ একক পুরুষ মানুষ) গঠন করলেন মাটির ধুলাবালি থেকে এবং তাঁর নাকের মধ্যে জীবনের নিঃশ্বাস ফেললেন "(আদিপুস্তক ২) ঈশ্বর তখন এই প্রথম মানুষকে রাখলেন ইদনের উদ্যানে এবং তাকে বললেন যে, "বাগানের প্রতিটি গাছের ফল আপনি নির্দ্বিধায় খেতে পারো: তবে এই জ্ঞানের গাছের ফলটি অবশ্যই খাবে না: যেদিন তুমি তার ফল খাবে সেদিন তুমি অবশ্যই মারা যাবে! "(আদিপুস্তক ২:১৬)

ঈশ্বর বোধ করেলেন যে "লোকটির একা থাকা ভাল নয়" (আদিপুস্তক ২:১৮) এবং তাই কিছু প্রাণী আদমের কাছে নিয়ে আসে। সে তাদের নাম দেয়, কিন্তু সমস্ত প্রাণীর মধ্যে তাঁর কোনও সহকর্মী খুঁজে পাওয়া যায় নি! (আদিপুস্তক)

আদম যখন গভীর নিদ্রামগ্ন থাকে ঈশ্বর তার থেকে একটি মহিলা(হবাকে) গঠন করেন (আদিপুস্তক ২: ২১-২২), এবং আদম জেগে উঠে তাকে তাঁর সহায়ক হিসাবে অভিবাদন জানায়।

আদিপুস্তক ৩( পতনের গল্প):

একটি সর্প সেই মহিলাকে(আদমের সহায়ক হবা) ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করতে এবং জ্ঞানের গাছের ফল খেতে প্ররোচিত করে, যা জ্ঞান দেয়। মহিলা আদমকে অনুরূপভাবে কাজটি করার জন্য রাজি করে, যার পরে তারা জ্ঞানবৃক্ষের ফলটি খায়। অতঃপর তার তাদের নগ্নতার বিষয়ে সচেতন হয় এবং গাছের পাতা দ্বারা নিজেদের  আচ্ছাদন করে এবং ঈশ্বরের দৃষ্টিতে আড়াল করে। ঈশ্বর আদমকে প্রশ্ন করলে তিনি হবাকে দোষ দেয়। প্রথমে সর্পের উপরে ঈশ্বর রায় পাঠান। ফলটি হবার পেটে যাবার জন্য নিন্দা করেন। তারপরে তার সাজা হিসেবে তাকে সন্তান প্রসবের দায়িত্ব দেন এবং পরাধীনতার ব্যথার নিন্দা করে।  অবশেষে আদমকে বলেন তুমি তোমার খাদ্যের জন্য পৃথিবীতে কাজ করবে এবং শ্রমের জন্য নিন্দিত হবে এবং ফিরে আসেন তার সাজা স্বর্গমৃত্যুর উপর। অতঃপর ঈশ্বর পুরুষ ও স্ত্রীকে ইদনের উদ্যান থেকে বের করে দেন,যাতে তারা জীবন বৃক্ষকে না খায় এবং না অমর হয়ে যায়।

আদম চূড়া[সম্পাদনা]

আদম পাহাড় বা আদম চূড়া শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে শ্রীপাড়া প্রদেশে অবস্থিত একটি পবিত্র চূড়া। এই চূড়ায় একটি পায়ের ছাপ আছে যার দৈর্ঘ্য ৫' ৭ এবং প্রস্থ ২' ৬। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিশ্বাস পৃথিবীর আদিমানব জাতির আদিপিতা হজরত আদম (আঃ) নিষিদ্ধ ফল বক্ষণের কারণে সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক স্বর্গ/জান্নাত থেকে বিতাড়িত হন এবং এখানে প্রথম পৃথিবীতে নামেন। মুসলমানদের মতে, আদম ৩০' লম্বা ছিলেন। আদম পৃথিবীতে এসে চরম অনুতপ্ত হন এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন ভূলের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ এক পায়ে এক হাজার বছর দাড়িয়ে থাকেন এবং কান্নাকাটি করতে থাকেন। তার ফলস্বরূপ এখানে পবিত্র পায়ের পদচিহ্নের দাগ পড়ে যায়।

বংশতালিকা[সম্পাদনা]

আদমহবা
কয়িনহেবলশেথ
হনোকইনোশ
ঈরদকৈনন
মহূয়ায়েলমহললেল
মথূশায়েলযেরদ
আদালেমকসিল্লাহনোক
যাবলযূবলতূবল-কয়িননয়মামথূশেলহ
লেমক
নোহ
শেমহামযেফৎ

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. কুরআন ১:৩০
  2. কুরআন ২:৩০
  3. কুরআন ২:৩০-৩৭
  4. কুরআন ৩:৫৬-৫৯
  5. কুরআনে আদম এর নাম "আদম -কুরআন সার্চ", আদম,
  6. Abu Abdullah Muhammad ibn Ismail ibn Ibrahim ibn al-Mughira al-Ja'fai., Sahih Bukhari Volume 4, Book 55
  7. ইবনে জারির আত-তাবারি (র)এর গ্রন্থ হতে " ইশতিয়াক মাহামুদ "বর্ণনা করেছেন।