অলিউর রহমান
মৌলানা অলিউর রহমান খোরাসানী | |
|---|---|
| আওয়ামী উলামা পার্টির সভাপতি | |
| অফিসে ১৯৬৬ – ১৯৬৯ | |
| পূর্বসূরী | পদ স্থাপিত |
| উত্তরসূরী | আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ |
| উপাধি | বুদ্ধিজীবী |
| ব্যক্তিগত তথ্য | |
| জন্ম | শাহ অলিউর রহমান ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সিলেট জেলা, আসাম প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত |
| মৃত্যু | ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ (বয়স ৩৯) রায়েরবাজার, পূর্ব পাকিস্তান, পাকিস্তান |
| মৃত্যুর কারণ | হত্যাকাণ্ড |
| ধর্ম | ইসলাম |
| জাতীয়তা | পাকিস্তানি |
| জাতিসত্তা | বাঙালি |
| যুগ | বিংশ শতাব্দী |
| আখ্যা | সুন্নি |
| বংশ | শাহ কামাল কোহাফাহ |
| ব্যবহারশাস্ত্র | কুরআন, হাদিস |
| আন্দোলন | বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন |
| রাজনৈতিক দল | আওয়ামী লীগ |
| প্রধান আগ্রহ | তাফসির, হাদিস, ফিকহ, রাজনীতি |
| উল্লেখযোগ্য ধারণা | ধর্ম মন্ত্রণালয় |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | শরীয়তের দৃষ্টিতে ছয়দফা |
| পেশা | অনুবাদক |
| কাজ | হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক |
| মুসলিম নেতা | |
যার দ্বারা প্রভাবিত | |
যাদের প্রভাবিত করেন | |
| পুরস্কার | ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (২০০১) |
| পেশা | অনুবাদক |
অলিউর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, অনুবাদক ও তাফসিরকারক ছিলেন। আওয়ামী উলামা পার্টির এই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সময় আলবদর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন।
প্রারম্ভিক জীবন
[সম্পাদনা]অলিউর রহমান ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার মইয়ারচর গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশের টুকেরবাজার ইউনিয়নে অবস্থিত) জন্মগ্রহণ করেন। ১৩ ভাইবোনদের অন্যতম অলিউরের বাবা শাহ হাবিবুর রহমান খোরাসানী সুফি দরবেশ শাহজালালের সহচর শাহ কামাল কোহাফাহের বংশধর ছিলেন এবং তার পরিবারের পূর্বপুরুষেরা খোরাসান থেকে আগত। তার ছোটভাই সফিউর রহমান খোরাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে লোক-প্রশাসন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক ও পরবর্তী জীবনে অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৪৯ সালে আলিম পরীক্ষা ও ১৯৫০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অলিউর ১৯৫১ সালে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৩ সালে তিনি দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় পাশ করেন।[১][২]
কর্মজীবন
[সম্পাদনা]দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বছরেই তিনি বরিশালের আহমদিয়া মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। এরপরের বছর থেকে পাঁচ বছরের জন্য তিনি সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা চালিয়ে যান। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকায় স্থানান্তরিত হন। ষাটের দশকে তিনি বাংলা একাডেমীতে উর্দু ও আরবি অনুবাদক ও গবেষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি তাফসিরকারক হিসেবেও কাজ করতে থাকেন। ১৯৬৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী থেকে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাশাস্ত্রে দীক্ষিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে ঢাকার নিকটে জিঞ্জিরায় নিজস্ব হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলে চিকিৎসা সেবা দিতে শুরু করেন।[১]
রাজনৈতিক জীবন
[সম্পাদনা]১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনে তিনি সিলেট থেকে সক্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি উত্তেহাদুল উলামা নামক ধর্মীয় সংগঠনে যোগ দেন যা তখন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। তিনি উত্তেহাদুল উলামার পূর্ব পাকিস্তান শাখার সহ-সভাপতি ও ঢাকা শাখার সভাপতি হয়েছিলেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ার পর তিনি সংগঠনটি ত্যাগ করেন। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করার প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর আমির আবুল আ'লা মওদুদী সমালোচনা করলে তাকে সহ পূর্ব পাকিস্তানের একাধিক নেতাকে চিঠি লিখে অলিউর ছয় দফাকে গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান। পরবর্তীতে অলিউর শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে গঠিত আওয়ামী উলামা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, যা ছয় দফার জন্য সমর্থন বাড়াতে সেই সময় কর্মসূচি পরিচালনা করেছিলো। ছয় দফাকে অবদমন করার উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামী যে অপপ্রচার চালিয়েছিল সেগুলো প্রতিরোধ করতে তিনি তখন একাধিক বই রচনা করেন যেগুলো ছয় দফাকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখে।[১][৩] তিনি পাকিস্তানে ধর্ম সংক্রান্ত একটি পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিলেন।[৪] ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি অংশগ্রহণ করেন।[২]
পারিবারিক জীবন, মৃত্যু ও কিংবদন্তি
[সম্পাদনা]১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অলিউর জিঞ্জিরার নিকটস্থ কাঠুরিয়া গ্রামে আত্মগোপন করেন। কিন্তু সেখানে তাকে লোকজন চিনে ফেলে। ফলে,[৫] ১১ ডিসেম্বর শুক্রবারে তিনি লালবাগে এক বন্ধুর বাড়িতে চলে যান এবং সেখানকার একটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গেলে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তার খোঁজ পেয়ে যায়। সেই রাতে তিনি বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই রাতে আলবদর বাহিনী বাড়ি থেকে তাকে ও তার বন্ধুকে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অলিউরের বন্ধু ফিরে এসে এলাকাবাসী ও পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে তাদেরকে অপহরণ করে রায়েরবাজারে নিয়ে গিয়ে একটি কুঠুরিতে বন্দি করে অলিউরের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং ১৪ ডিসেম্বরে তাকে হত্যা করা হয়। তবে অলিউরের মৃতদেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।[৬][১] ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত নিহত বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় তার নাম রয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রেরিত জরুরি চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অলিউরের অবদানের কথা স্বীকার করে তার পরিবারকে আর্থিক সাহায্য প্রদানের জন্য মন্ত্রী মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নিকট অনুরোধ করেছিলেন। অলিউর মৃত্যুর আগে এক স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গিয়েছিলেন যার একজন মোহাম্মদ জুনায়েদ খোরাসানী হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।[১] শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম অলিউরের সম্পর্কে বলেছেন "কোনো কোনো আলেম যে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এতো আধুনিক জ্ঞান ও চিন্তা চেতনার অধিকারী হতে পারেন এবং এত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দিতে পারেন তা মাওলানা অলিউর রহমানের বক্তৃতা শোনার আগে আমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীকার আন্দোলনের এক মহান নেতা হিসেবে এই মাওলানার ঐতিহাসিক অবদান তাকে অমর করে রেখেছে দেশ ও জাতির কাছে"।[৩] ২০০১ সালে তাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার দেওয়া হয়।[২] ২০২৪ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারি গেজেটের মাধ্যমে তাকে মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।[৭]
গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]অলিউরের উল্লেখযোগ্য বইগুলো:[১]
- শরীয়তের দৃষ্টিতে ছয়দফা
- ৬ দফা ইসলামের বিরোধী নহে
- যুক্তি ও কষ্টি পাথরে ছয়দফা
- জয়বাংলা ও কয়েকটি স্লোগান প্রসঙ্গে
- স্বতন্ত্র ধর্ম দপ্তর: একটি জাতীয় প্রয়োজন
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 6 চৌধুরী, দ্বোহা (১৪ ডিসেম্বর ২০২১)। "শহীদ বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমান: ৬ দফার পক্ষে গড়ে তোলেন জনসমর্থন"। দ্য ডেইলি স্টার।
- 1 2 3 সিদ্দিকী, ইকবাল (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "A Forgotten Patriot"। দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)।
- 1 2 "শহীদ বুদ্ধিজীবি তালিকায় কেন নেই মাওলানা অলিউর রহমানের নাম?"। আওয়ার ইসলাম। ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭।
- ↑ "সিলেটের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা"। সিলেটটুডে২৪.নিউজ। ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭।
- ↑ "স্বাধীনতা যুদ্ধে ১১ আলেম ও মাদরাসার বক্তব্য ও অবস্থান!"। আওয়ার ইসলাম। ১৭ ডিসেম্বর ২০২২।
- ↑ "মাওলানা অলিউর রহমান"। প্রথম আলো। ২০ জুলাই ২০২১।
- ↑ রনি, আবু সালেহ (৫ মার্চ ২০২৪)। "৭২ শিক্ষকসহ শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি পেলেন ১০৮ জন"। সমকাল।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- শিবলি, শাকের হোসাইন (২০০৮)। "শহীদ বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমান: শুধু আলেম হওয়াতেই কি তার প্রতি এই অবহেলা?"। আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে। খণ্ড ১। আল-এছহাক প্রকাশনী। পৃ. ১৩১–১৪৪।
- "ধর্মের নামে ওরা ধার্মিককে করেছে হত্যা"। দৈনিক আজাদ। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। পৃ. ৮।
- ১৯৩২-এ জন্ম
- ১৯৭১-এ মৃত্যু
- পাকিস্তানি হোমিওপ্যাথ
- পাকিস্তানের ইসলামি চিন্তাবিদ
- পাকিস্তানি সুন্নি মুসলিম পণ্ডিত
- পাকিস্তানি অনুবাদক
- সিলেট জেলার রাজনীতিবিদ
- ২০শ শতাব্দীর অনুবাদক
- বাংলা ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী
- ১৯৭১-এ শহীদ বুদ্ধিজীবী
- বাঙালি লেখক
- বাঙালি বুদ্ধিজীবী
- মুসলিম সংস্কারক
- মুসলিম দার্শনিক
- সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক