অপারেশন বর্গা
অপারেশন বর্গা ছিল পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকাজুড়ে চালানো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সংস্কার আন্দোলন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভাগচাষীদের (বর্গাদার) নাম নথিভুক্ত করা, যাতে দীর্ঘ এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এড়ানো যায়। এই কর্মসূচি বর্গাদারদের জমিদারদের (জোতদার) হাতে উচ্ছেদের হাত থেকে সুরক্ষা দিয়েছিল এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য অংশ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছিল। ১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে আইনি স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হয়। অপারেশন বর্গা ভূমি সংস্কারের একটি জনপ্রিয়, তবে কিছুটা বিতর্কিত পদক্ষেপ হিসেবে পরিচিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় সংবিধানের রাষ্ট্রীয় নীতির নির্দেশমূলক নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বর্গাদারদের জমির মালিক বানানো। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গাদারের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে। অপারেশন বর্গা ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম সফল ভূমি সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয়। [১]
পটভূমি
[সম্পাদনা]ভারতের ভূমি সংস্কার আইন (১৯৫৫) এবং এর পরবর্তী সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে সমস্ত ভাগচাষী তাদের লিজ নেওয়া জমিতে স্থায়ী ব্যবহার অধিকার পাবেন এবং এই অধিকার উত্তরাধিকারে স্থানান্তরযোগ্য হবে। ভাগচাষীরা তাদের আইনি অংশের ফসল জমিদারের কাছে প্রদান করলে, জমি অনাবাদী না রাখলে বা জমিদার ব্যক্তিগত চাষাবাদের জন্য জমি ফেরত চাইলে ব্যতীত, এই অধিকার ফলাতে পারতেন।
তবে, জমিদারেরা প্রায়শই ব্যক্তিগত চাষাবাদের শর্তটি ব্যবহার করে ভাগচাষীদের উচ্ছেদ করতেন। আরেকটি বড় বাধা ছিল যে একজন ভাগচাষীকে তার ভাড়াটিয়া হিসেবে সরকারি নথিভুক্তি করতে হতো। কিন্তু বেশিরভাগ ভাগচাষী নথিভুক্তি করতেন না, কারণ তাদের জমিদারেরা তাদের ভয় দেখাতো, ভোগ্যপণ্য ক্রেডিটের মতো অন্যান্য সহায়তা বন্ধ করত, এবং জমি ছাড়ার ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করত।[২] এই অসামঞ্জস্যের কারণে, জমিদারেরা নিয়মিতভাবে ভাগচাষীদের শোষণ করত—কখনও ফসল কাটার মৌসুমের আগে উচ্ছেদ করত, কখনও প্রাপ্য ফসলের চেয়ে কম অংশ দিত, আবার কখনও কৃষি বিনিয়োগের জন্য নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে অত্যধিক সুদের হার আরোপ করত।[৩]
ভাগচাষীদের সংখ্যা নির্ধারণ এবং তাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে আইনি নথিভুক্তি তাদের উচ্ছেদ এবং শোষণ থেকে রক্ষা করতে পারত। তবে বেশিরভাগ বর্গাদারই এই আইন অনুযায়ী তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতেন না এবং তাদের আর্থিক দুরবস্থার কারণে তারা জমিদারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। উপরন্তু, দীর্ঘ এবং জটিল নথিভুক্তি প্রক্রিয়া এবং জমিদারদের প্রতিশোধের ভয় তাদের নাম নথিভুক্তি করতে নিরুৎসাহিত করেছিল। অপারেশন বর্গার আগে পরিচালিত নথিভুক্তি কার্যক্রমে আনুমানিক ২২-২৫ লক্ষ ভাগচাষীর মধ্যে মাত্র ৪ লক্ষের নাম নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।[৩]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]অপারেশন বর্গার আগে এই উদ্যোগটি ভূমি সংস্কার নামে পরিচিত ছিল। ভারতের প্রথম আইনত এবং কার্যকরী ভূমি সংস্কার ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে সংঘটিত হয়, যখন ইউনাইটেড ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। এই আন্দোলনটি সিপিআই(এম)-এর দুই নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙার এবং বিনয় চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। তবে ১৯৭০ সালে ইউনাইটেড ফ্রন্ট ক্ষমতা হারালে ভূমি সংস্কার কার্যক্রম ৭ বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে তারা বিদ্যমান বর্গা আইনগুলো কাজে লাগিয়ে কৃষি সংস্কারকে অগ্রসর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১৯৭৮ সালের জুন মাসে, ভূমি সংস্কার বিষয়ে একটি কর্মশালায় আলোচনার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অপারেশন বর্গা চালু করে। এটি ১৯৭৯ সালের বেঙ্গল ল্যান্ড হোল্ডিং রেভিনিউ অ্যাক্ট এবং ১৯৮০ সালের রেভিনিউ রুলসের মাধ্যমে আইনি স্বীকৃতি পায়।[৪] ১৯৮১ সালে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি আইন পাস করে যা বাগান, চাষের জমি, মৎস্য এবং ধর্মীয় ট্রাস্টগুলোর ভূমিকে ভূমি সংস্কারের আওতার বাইরে রাখার বিধান সরিয়ে দেয় (যদিও এই আইনটি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন পেতে বহু বছর লেগে যায়)।
অপারেশন বর্গার মূল লক্ষ্য ছিল ভাগচাষীদের (বর্গাদার) নাম নথিভুক্ত করা এবং তাদের চাষাবাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। ভাগচাষীদের সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টার উপর এই উদ্যোগটি নির্ভরশীল ছিল, যা ঐতিহ্যবাহী রাজস্ব আদালতের পদ্ধতির তুলনায় ভিন্ন, যেখানে প্রভাবশালী জমিদারদের পক্ষপাতিত্ব ছিল।[৪]
ভাগচাষীদের নাম নথিভুক্ত করা এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এতে ভাগচাষীরা জমিদারদের শোষণ থেকে সুরক্ষা পেত এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল জীবিকা নিশ্চিত হতো। এটি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি জমির মালিক হওয়ার সুযোগও তৈরি করেছিল। [১]
যদিও অপারেশন বর্গার সরাসরি লক্ষ্য বর্গাদারদের জমির মালিক বানানো ছিল না, তবুও এর অন্তর্ভুক্ত আইনে দুটি বিশেষ বিধান ছিল যা এই রূপান্তরকে সহজ করতে সাহায্য করে। প্রথমত, আইনটি বর্গাদারদের জমি বিক্রির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার অধিকার দেয়, যদি জমিদার জমি বিক্রি করতে চান। দ্বিতীয়ত, আইনটি রাজ্য সরকারকে একটি "ল্যান্ড কর্পোরেশন" গঠনের অনুমতি দেয়, যা বর্গাদারদের জমি কেনার জন্য অর্থ প্রদান করবে। তবে তহবিলের অভাবে এই দ্বিতীয় বিধানটি এখনও কার্যকর করা যায়নি। [১]
বাস্তবায়ন
[সম্পাদনা]অপারেশন বর্গা বাস্তবায়নের জন্য সরকার ভূমি সংস্কারে জনগণের অংশগ্রহণ এবং অংশীদারদের সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টার নীতিকে গ্রহণ করে। [৫] এই আন্দোলন শুধুমাত্র বর্গাদারদেরই নয়, গ্রামীণ শ্রমিক সংগঠন ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় সহায়তায় শুরু হয়েছিল। এই আন্দোলন শুধু বর্গাদারদের সক্রিয় অংশগ্রহণেই নয়, বরং গ্রামীণ শ্রমিক সংগঠন এবং স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পরিচালিত হয়েছিল। কার্যক্রমটি পাঁচটি ধাপে বিভক্ত ছিল:[৪]
- বর্গাদারদের ঘনত্ব বেশি এমন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অঞ্চল চিহ্নিত করা।
- অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অঞ্চলে সরকারি কর্মকর্তাদের শিবির স্থাপন।
- বর্গাদারদের সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের সভা।
- ভাগচাষীদের দাবিগুলো প্রমাণ করার জন্য গ্রামবাসীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে তদন্ত ও মাঠপর্যায়ের যাচাই।
- বর্গাদারদের অধিকার নিশ্চিত করতে 'পর্চা' নামে অস্থায়ী সনদপত্র প্রদান, যা ব্যাংক ঋণ পেতে সহায়ক।
প্রথমে, "পুনর্বাসন শিবির" বা "পুনঃসংগঠনী শিবির" নামে পরিচিত শিবিরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে বর্গাদারদের দলগত বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বর্গাদাররা এখানে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। প্রথম এই ধরনের শিবির ১৮ থেকে ২০ মে, ১৯৭৮ সালে হুগলি জেলার পোলবার তালুকের হালুসাইতে অনুষ্ঠিত হয়।[৩]
এই শিবিরগুলো ভূমি কর্মকর্তাদের জন্য বর্গাদার এবং অন্যান্য ভূমিহীন কৃষকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার সুযোগ তৈরি করে। প্রতিটি শিবিরে ৩০-৪০ জন দরিদ্র কৃষক, জমির মালিক এবং ১০-১৫ জন মাঠ পর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তা, যেমন জুনিয়র ভূমি সংস্কার কর্মকর্তা, "কানুনগো" এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা অংশ নিতেন। শিবিরের মেয়াদ প্রায় ৩ দিন থাকত, এবং কর্মকর্তারা শিবির চলাকালীন স্থানে অবস্থান করতেন। এই শিবিরগুলোর ব্যাপক প্রচার করা হতো ঢাক বাজিয়ে, লিফলেট বিতরণ করে এবং স্থানীয় কৃষক দলের মাধ্যমে। শিবির পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হতো।[৩]
শিবির চলাকালীন, বিভিন্ন পক্ষ ভূমি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করতেন। দাবি জানানো ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করা হতো এবং তা জমির মালিকদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে যাচাই করা হতো। পরে, বর্গাদারদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে রেকর্ড করা হতো এবং সমস্ত আইনি নথি সরাসরি বিতরণ করা হতো। [৫]
প্রথম বছরে কিছু সহিংসতা ঘটে, যেখানে জমির মালিকরা কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালায় এবং নাম নথিভুক্ত করতে আসা বর্গাদারদের হয়রানি করে। [৩][৫] তবে, সরকারি এবং সম্মিলিত সমর্থন বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ঘটনা কমে যায়। শাসক দলের কৃষক সংগঠনগুলো গ্রাম স্তরের প্রশাসনের সাথে একত্রে কাজ করে নথিভুক্তির জন্য উৎসাহিত করত। এটি জমিদার ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ব্যর্থ করে এবং ভীতি প্রদর্শন রোধ করে। "পুনর্বাসন শিবিরগুলো," যা ইতিমধ্যেই ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করতে ব্যবহার করা হচ্ছিল, নিবন্ধনের কার্যকরী সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সনদপত্র তাৎক্ষণিকভাবে জারি করা হতো।[২]
এই কার্যক্রমের অধীনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেকাংশে দূর করা হয়, যা বর্গাদারদের নাম নথিভুক্তির নিম্ন হারের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালের জুন পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে ৮,০০০-এরও বেশি সচেতনতা শিবির আয়োজন করা হয়, যার ফলে ৬.৭৫ লক্ষ ভাগচাষীর নাম নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়।[৬]
প্রভাব
[সম্পাদনা]অপারেশন বর্গা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট আইনি সংশোধনগুলি জমিদার-বর্গাদার সম্পর্ককে দুটি মৌলিক উপায়ে পরিবর্তন করে। প্রথমত, উচ্ছেদ-বিরোধী ব্যবস্থা জমিদারদের জোরপূর্বক বর্গাদারদের জমি থেকে সরিয়ে দেওয়া থেকে অনেকটাই বিরত রাখে। বর্গাদারদের অধিকার উত্তরাধিকারযোগ্য এবং চিরস্থায়ী করা হয়। দ্বিতীয়ত, বর্গাদারদের জন্য ফসলের একটি ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা হয়—যদি বর্গাদার শ্রম ব্যতীত অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করে তবে ৭৫ শতাংশ, আর যদি জমিদার সেই উপকরণ সরবরাহ করে তবে ৫০ শতাংশ। এই পদক্ষেপ জমিদারদের দ্বারা বর্গাদারদের শোষণ প্রতিরোধে সহায়ক হয়। [১]
১৯৭৯ সালের সংশোধনীকে বর্গাদারি নিষ্পত্তি নিয়ে বিচারিক ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর আগে, বিচারিক এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে একজন ভাড়াটিয়ার জন্য তার ভাড়াটিয়া অধিকার প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনীগুলিতে বর্গাদারি অধিকার দাবি অস্বীকারের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে জমিদারদের ওপর চাপানো হয়। "স্ব-চাষ" সংজ্ঞায়িত করা হয় জমিদারের পরিবারের সদস্যদের শারীরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত চাষাবাদ হিসেবে, এবং স্ব-চাষের অধীনে জমি পুনর্দখল কঠোর শর্তের অধীনে করা হয়।
যেখানে ভারতজুড়ে ভূমি সংস্কারে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ ছিল একটি ব্যতিক্রম। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক গ্রামীণ পরিবার ভূমি সংস্কার থেকে উপকৃত হয়েছে। ভূমি সংস্কার চালু হওয়ার পরবর্তী ২০ বছরে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রামীণ দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, এবং খাদ্য গ্রহণ ও মজুরির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে। [১] অপারেশন বর্গা এই সাফল্যের একটি বড় অংশ গঠন করে। তিনটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে:[১]
- বর্গাদারি সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ (অপারেশন বর্গা)।
- সিলিং-অধিক জমি পুনর্বণ্টন (ল্যান্ড-সিলিং আইন)।
- বসতভিটা জমি বিতরণ।
১৯৮৬–৮৮ সালে, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বর্ধমান এবং জলপাইগুড়ি এই তিনটি জেলায় অপারেশন বর্গার প্রভাব নিয়ে একটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ চালানো হয়। এতে কৃষি উৎপাদন, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, আয় এবং আয়ের বন্টন, এবং বর্গাদারি জমির ব্যবহারে গুণগত উন্নতি বিশ্লেষণ করা হয়।[৭]
সাফল্য
[সম্পাদনা]অপারেশন বর্গা বর্গাদারদের নাম নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত বর্গাদারদের অনুপাত ২৩ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৫ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটে। এই সংস্কারগুলো, পাশাপাশি ফসলের ন্যায্য ভাগের নিশ্চয়তা এবং জমিতে বর্গাদারদের অধিকতর অংশগ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ১৯৯৬ সালে ব্যানার্জি এবং ঘটকের পরিচালিত একটি নমুনা জরিপ অনুযায়ী, অপারেশন বর্গা এই সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রায় ৩৬ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জরিপে দেখা যায়, সংস্কারের পূর্বে মাত্র ১০ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি অংশ পেত। সংস্কারের পরে নিবন্ধিত ভাড়াটিয়াদের প্রায় অর্ধেক এবং এমনকি অনিবন্ধিত ভাড়াটিয়াদের এক-চতুর্থাংশেরই উৎপাদনের অংশ ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়।[২]
১৯৮২ সালের শেষে প্রায় ১২ লক্ষ বর্গাদার নিবন্ধিত হয়, যা মোট আনুমানিক সংখ্যা ২০-৩৫ লক্ষের মধ্যে ছিল[৩][৭] ১৯৯৪ সালের জুনের মধ্যে প্রায় ১৪.৬ লক্ষ বর্গাদার নিবন্ধিত হয়, যার জমির আয়তন প্রায় ৪৫১,৮০০ হেক্টর। ১৯৮৬-৮৮ সালের গবেষণা অনুযায়ী এই কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল বর্গাদারদের সামাজিক মর্যাদা এবং ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষার উন্নতি। [৭]
অপারেশন বর্গার মাধ্যমে রাজ্যের ভাড়াটিয়াদের অবস্থার পরিবর্তন কৃষকদের মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এসেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের আত্মহত্যা বা ফসলের ব্যর্থতার কারণে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় নেই। অপারেশন বর্গা এবং গরিব, প্রান্তিক ও পশ্চাৎপদ শ্রেণির মধ্যে উদ্বৃত্ত জমির বণ্টন একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে, যা কৃষকদের ঋণদাতাদের বা জমিদারদের দ্বারা সম্পূর্ণ ফসল কেড়ে নেওয়ার ভয়ে আত্মহত্যা থেকে রক্ষা করেছে।[৮]
সমালোচনা
[সম্পাদনা]অপারেশন বর্গা (এবং পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার সাধারণভাবে) তাদের সীমিত ক্ষেত্র এবং বৃহত্তর সমস্যাগুলি সমাধানে ব্যর্থতার জন্য সমালোচিত হয়েছে। এই সমালোচনার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলার উচ্চ জনসংখ্যা-ভূমির অনুপাত (যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ), ছোট এবং অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন জমির মালিকানা পদ্ধতি, এবং কৃষি-শিল্প বাজার গড়ে তুলতে সরকারের ব্যর্থতা। সমালোচকরা মনে করেন, এই ব্যর্থতাগুলি দারিদ্র্যকে পুনর্বণ্টন করেছে, কিন্তু সমৃদ্ধি সৃষ্টি করতে পারেনি। তারা বলেন, এই উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলার কৃষি অবকাঠামো এবং আর্থিক পরিস্থিতি ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোর তুলনায় তেমন উন্নত নয়।[৮]
উপরে উল্লিখিত 3টি জেলায় 1986-88 সালে পরিচালিত অপ বর্গা বিশ্লেষণে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে অপারেশন বর্গা, প্রজাস্বত্ব প্যাটার্নে পরিবর্তন আনতে আংশিকভাবে সফল হলেও, বর্গা জমিতে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সফল হয়নি যেখানে বর্গাদাররা। নির্ধারিত ফসলের ভাগ পেয়ে আসছিল। অধিকন্তু, এই এলাকায় বর্গাদারদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত না হওয়ার কারণে ফসল ভাগাভাগি পদ্ধতিতে অন্তর্নিহিত স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে উদ্যোক্তা এখনও কম থাকে।[৭]
গবেষণায় আরও উঠে আসে যে, এই বর্গাদারদের (যারা আইনের আওতায় তাদের ফসলের ভাগ পেয়েছিল) খারাপ কর্মক্ষমতার কারণ ছিল তাদের দরিদ্র সম্পদভিত্তি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও মূলধন বাজারে প্রবেশের অভাব। এ ছাড়া, কৃষি উপকরণের বাজারে বিভিন্ন ত্রুটিও বর্গাদারদের দুর্বল কর্মক্ষমতায় অবদান রাখে।[৭] অপারেশন বর্গা জমিদার-বিরোধী এবং কিছু কঠোর ব্যবস্থার জন্যও সমালোচিত হয়, যা অপব্যবহারের শিকার হতে পারে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অপারেশন বর্গার সাফল্য তার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পরে অব্যাহত ছিল না। ১৯৯৯ সালের ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে (এনএসএস) রিপোর্ট অনুসারে, সমস্ত বর্গাদারের মধ্যে মাত্র ৩০.৬ শতাংশ নিবন্ধিত ছিল এবং একটি "স্পষ্ট শ্রেণিভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব" লক্ষ্য করা যায়।[৬] এই ধরনের শ্রেণীগত পক্ষপাত, এবং শুধুমাত্র কৃষিজীবী শ্রেণীর মধ্যে এই শ্রেণিগত পক্ষপাত এবং কৃষক শ্রেণির মধ্যে কেবলমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের ফলে "গ্রামীণ ধনী" শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে,[৩] যেখানে দরিদ্র এবং পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়গুলো এই কর্মসূচির কার্যকারিতার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।[৯] গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, গ্রামে জমিদাররাই বৃহত্তম জমির মালিক হিসেবে রয়ে গেছেন এবং তাদের জমির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। [৯]
২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (SIPRD)-এর একটি বিস্তৃত জরিপে সতর্ক করা হয়েছিল যে, নিবন্ধিত বর্গাদারদের ১৪.৩৭ শতাংশ তাদের বর্গা জমি হারিয়েছেন, ২৬.২৮ শতাংশ ভবিষ্যতে জমি হারানোর ভয়ে ভুগছেন, এবং ১৩.২৩ শতাংশ পাট্টাদার তাদের প্রাপ্ত জমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।[১০][১১] উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গুরে, টাটা ন্যানো গাড়ি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্ট্যাটাস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, ৯৯৭-একর (৪.০৩-বর্গকিলোমিটার) প্রকল্প এলাকায় ৩৭ জন নিবন্ধিত বর্গাদারের জন্য ১৭০ জন অনিবন্ধিত বর্গাদার ছিলেন। [১০]
২০০৮ সালে পুনরায় চালু
[সম্পাদনা]অপারেশন বর্গার পরবর্তী ভূমি সংস্কারের ব্যর্থতা এবং বর্গাদার তালিকার ক্রমহ্রাসের মুখে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে অপারেশন বর্গা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়।[১০] এটি ছিল সিপিআই(এম) সরকারের একটি প্রচেষ্টা, যা পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে গ্রামীণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছিল (যেখানে সিপিআই(এম) পরবর্তীতে পরাজিত হয়)। ভূমি সংস্কার মন্ত্রী আব্দুল রেজ্জাক মোল্লা বিধানসভায় স্বীকার করেন যে, প্রায় ২০-২৭% বর্গাদার তাদের নিবন্ধিত অধিকার হারিয়েছেন। [১০]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 6 Tim Hanstad, Robin Nielsen, West Bengal's Bargadars and Landownership ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৯ অক্টোবর ২০০৭ তারিখে, Rural Development Institute ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৫ জুলাই ২০০৮ তারিখে, 21 February 2004.
- 1 2 3 Operation Barga – report by Theorie Et Applications en Microeconomie et Macroeconomie (TEAM) (Read online).
- 1 2 3 4 5 6 7 Suhas Chattopadhyay, Operation Barga: A comment, JSTOR: Economic and Political Weekly, Vol. 14, No. 49, 8 December 1979.
- 1 2 3 Sudipta Bhattacharyya, West Bengal: rural transformation since 1977 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৭ অক্টোবর ২০০৮ তারিখে, Ganashakti, 1999.
- 1 2 3 Paramjit Singh, Gurpreet Bal, Strategies of Social Change in India, pp. 148, M.D. Publications, 1996. আইএসবিএন ৮১-৭৫৩৩-০০৬-৬, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৫৩৩-০০৬-১.
- 1 2 Pranava K. Chaudhary, Operation Barga ends in a whimper, Times of India, 14 September 2002.
- 1 2 3 4 5 Impact of Tenancy Reforms on Production and Income Distribution – A Case Study of Operation barga in West Bengal. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে, National Centre for Agricultural Economics and Policy Research.
- 1 2 Did Operation Barga save Bengal farmers?, Financial Express, 17 April 2006.
- 1 2 Nirmalya Banerjee, Disparity in Operation Barga not declined, Times of India, 5 January 2002.
- 1 2 3 4 Nilanjan Dutta, Barga Blues ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ জুন ২০১৬ তারিখে, HardNews.com, 23 October 2008.
- ↑ The SIPRD study said, "Though Operation Barga is being extended from time to time, it is a paper extension only. The methodology as originally devised, that is, evening meetings to motivate the bargadars, spot enquiries into petitions for barga recording, etc., is no longer adopted by the revenue officials. Again, with the passage of time, the grassroots level democratic institutions, that is, panchayats and the peasant organisations etc. seem to have lost interest in the programme initially evinced by them. The methodology of Operation Barga having fallen in disuse and the thrust on recording petered out, the recording has been rendered a routine with its rate suffering a downward slide."
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ: 1977 সাল থেকে গ্রামীণ রূপান্তর ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৭ অক্টোবর ২০০৮ তারিখে, গণশক্তি, 1999।
- উৎপাদন ও আয় বণ্টনের উপর প্রজাস্বত্ব সংস্কারের প্রভাব – পশ্চিমবঙ্গে অপারেশন বর্গা একটি কেস স্টাডি। ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে , ন্যাশনাল সেন্টার ফর এগ্রিকালচারাল ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ।
- সুহাস চট্টোপাধ্যায়, অপারেশন বর্গা: একটি মন্তব্য, জেএসটিওর: ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি, খণ্ড. 14, নং 49, 8 ডিসেম্বর 1979।
- টিম হ্যানস্টাড, রবিন নিলসেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্গাদার এবং জমিদারশিপ, গ্রামীণ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, 21 ফেব্রুয়ারি 2004।