বিষয়বস্তুতে চলুন

অধিবিদ্য কবিগোষ্ঠী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মেটাফিজিক্যাল কবি
কবি আব্রাহাম কাউলি, যার জীবনীতে স্যামুয়েল জনসন প্রথম মেটাফিজিক্যাল কবিতার বর্ণনা দেন
সক্রিয় বছর১৬০০-১৬৯০
প্রধান ব্যক্তিত্বজন ডান, জর্জ হার্বার্ট, অ্যান্ড্রু মার্ভেল, হেনরি ভন, রিচার্ড ক্র্যাশাও, আব্রাহাম কাউলি
অনুপ্রেরণাবারোক সাহিত্য, জামবাতিস্তা মারিনো
অনুপ্রাণিতটি এস এলিয়ট, আধুনিকতাবাদ

মেটাফিজিক্যাল কবি বা অধিবিদ্য কবিগোষ্ঠী বলতে ১৭শ শতাব্দীর প্রথমার্ধের একদল ইংরেজ গীতিকবিকে বোঝায়, যাদের কবিতায় উদ্ভাবনী মেটাফিজিক্যাল কনসিট বা চমকপ্রদ রূপকল্পের ব্যবহার, বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি এবং কথ্য ভাষার সুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়। এরা কোনো আনুষ্ঠানিক সাহিত্য আন্দোলন হিসেবে সংগঠিত ছিলেন না, কিন্তু তাদের রচনার মধ্যে মিল থাকায় পরবর্তীকালে সমালোচকরা তাদের একত্রে এই নামে অভিহিত করেছেন।[]

এই শব্দবন্ধটি প্রথম ব্যবহার করেন সমালোচক স্যামুয়েল জনসন তার Lives of the Most Eminent English Poets (১৭৭৯-৮১) গ্রন্থে। বিংশ শতাব্দীতে টি এস এলিয়ট সহ আধুনিক সমালোচকদের আগ্রহের ফলে এই কবিদের গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।[]

নামকরণের উৎপত্তি

[সম্পাদনা]

আব্রাহাম কাউলি সম্পর্কিত অধ্যায়ে স্যামুয়েল জনসন লেখেন, ১৭শ শতাব্দীর শুরুতে এমন এক শ্রেণির লেখকের আবির্ভাব ঘটে যাদেরকে মেটাফিজিক্যাল কবি বলা যেতে পারে।[] জনসন সম্ভবত এই শব্দটি জন ড্রাইডেন এর একটি মন্তব্য থেকে নিয়েছিলেন। ড্রাইডেন জন ডান সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি শুধু ব্যঙ্গ কবিতায় নয়, প্রেমের কবিতাতেও অধিবিদ্যা টেনে আনেন এবং দর্শনের সূক্ষ্ম জল্পনা দিয়ে নারীর মনকে বিভ্রান্ত করেন।[]

ড্রাইডেনের আগেও ড্রামন্ড অফ হথর্নডেন ১৬৩০-এর দশকে এক চিঠিতে অভিযোগ করেছিলেন যে, কিছু মানুষ কবিতাকে সংস্কার করার নামে তাকে মেটাফিজিক্যাল ধারণা ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ খুঁটিনাটিতে পরিণত করার চেষ্টা করছে।[]

সমালোচনা

[সম্পাদনা]

অগাস্টান যুগের সমালোচনা

[সম্পাদনা]

স্যামুয়েল জনসন মেটাফিজিক্যাল কবিদের প্রশংসা করেননি। তিনি বলেন, মেটাফিজিক্যাল কবিরা ছিলেন পণ্ডিত মানুষ এবং পাণ্ডিত্য দেখানোই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ছন্দে তা দেখাতে গিয়ে তারা কবিতা না লিখে শুধু পদ্য লিখেছেন, এবং প্রায়ই এমন পদ্য যা কানের চেয়ে আঙুলে গুনে মাপতে হয়।[] তার মতে, সবচেয়ে অসম ধারণাকে তারা জোর করে একসঙ্গে জুড়ে দিতেন।

জনসনের আগেও অগাস্টান কবিতার সমর্থকরা এই শৈলীর সমালোচনা করেছিলেন। জন ড্রাইডেন তার ম্যাক ফ্লেকনো কবিতায় এই ধরনের অতিরঞ্জিত উপমার ব্যঙ্গ করেছিলেন। জোসেফ অ্যাডিসন দ্য স্পেকটেটর পত্রিকায় জর্জ হার্বার্ট এর কবিতাকে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।[]

বিংশ শতাব্দীতে পুনর্মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

১৯২১ সালে টি এস এলিয়ট তার বিখ্যাত প্রবন্ধ The Metaphysical Poets প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে তিনি হার্বার্ট জে. সি. গ্রিয়ারসন সম্পাদিত সংকলনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে মেটাফিজিক্যাল কবিদের গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন, এই কবিদের মধ্যে চিন্তা ও অনুভূতির এক ঐক্য ছিল, যাকে তিনি unified sensibility বলেছেন।[]

এলিয়টের এই প্রবন্ধের ফলে জন ডানের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৬১ সালে সমালোচক এ. আলভারেজ মন্তব্য করেন যে, মেটাফিজিক্যাল কবিদের নিয়ে লেখার সময় হয়তো এখন একটু দেরি হয়ে গেছে, কারণ ডানের জনপ্রিয়তা আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গেই শেষ হয়েছে।[] পরবর্তীতে অনেকে মনে করেন, এই কবিদের বারোক যুগের কবি হিসেবে অভিহিত করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।[]

কবিদের তালিকা নির্ধারণ

[সম্পাদনা]

মেটাফিজিক্যাল ধারার অন্তর্ভুক্ত কবি কারা, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। স্যামুয়েল জনসন শুরুতে মাত্র তিনজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন, আব্রাহাম কাউলি, জন ডান এবং জন ক্লিভল্যান্ড

পরে হার্বার্ট গ্রিয়ারসন তার Metaphysical Lyrics and Poems of the Seventeenth Century (১৯২১) সংকলনে এই ধারার একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা দেন।[১০] হেলেন গার্ডনার তার Metaphysical Poets (১৯৫৭) সংকলনে উইলিয়াম শেকসপিয়র এবং ওয়াল্টার র‍্যালি এর মতো পূর্বসূরীদেরও অন্তর্ভুক্ত করেন।

আধুনিক গবেষকদের মতে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলেন পাঁচজন, জন ডান, জর্জ হার্বার্ট, হেনরি ভন, অ্যান্ড্রু মার্ভেল এবং রিচার্ড ক্র্যাশাও।[১১] এছাড়া থমাস ট্রাহার্ন, এডওয়ার্ড টেলর এবং জন নরিস এর মতো কবি, যাদের রচনা বহুদিন অপ্রকাশিত ছিল, তাদেরও এখন এই ধারায় যুক্ত করা হয়।

বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

প্রচলিত কৃত্রিমতা থেকে মুক্তি

[সম্পাদনা]

গ্রিয়ারসনের মতে, মেটাফিজিক্যাল কবিরা তাদের পূর্বসূরীদের কৃত্রিম কাব্যিক ভাষা ও প্রচলিত উপমা থেকে বেরিয়ে এসে একটি মুক্ত ও স্বাভাবিক শৈলী তৈরি করেছিলেন।[১০] জনসনও স্বীকার করেছেন যে, তাদের শৈলী অনুকরণ থেকে অনুকরণ বা ঐতিহ্যবাহী চিত্রকল্প দিয়ে অর্জন করা যায় না।

ইউরোপীয় বারোক প্রভাব ও কনসিটের ব্যবহার

[সম্পাদনা]

এই কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইউরোপীয় বারোক শৈলীর প্রভাব, বিশেষ করে চমকপ্রদ কনসিট ও অতিরঞ্জন। ইতালিতে একে Concettismo এবং স্পেনে Conceptismo বলা হতো।[১২] ইতালীয় কবি জামবাতিস্তা মারিনো এর প্রভাব ক্র্যাশাও এর অনুবাদে স্পষ্ট।

এই কবিরা প্রেম, ধর্ম ও নৈতিকতাকে অস্বাভাবিক তুলনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতেন। যেমন জন ডানের কবিতায় দুই প্রেমিককে কম্পাসের দুই কাঁটার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।[]

শব্দক্রীড়া ও বুদ্ধিদীপ্তি

[সম্পাদনা]

মেটাফিজিক্যাল কবিরা শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসতেন। ড্রাইডেনের ভাষায় জর্জ হার্বার্ট একটিমাত্র শব্দকে দশ হাজারভাবে নিংড়ে নিতেন। এই ধরনের শব্দক্রীড়া বারোক সাহিত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চেতনা

[সম্পাদনা]

ইংরেজ মেটাফিজিক্যাল কবিরা সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও ভৌগোলিক জ্ঞানকে কবিতায় ব্যবহার করে ধর্মীয় ও নৈতিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন। এই বৈশিষ্ট্যই তাদের সমসাময়িক ক্যাভালিয়ার কবিদের থেকে আলাদা করেছে।

প্লেটোনিক প্রভাব

[সম্পাদনা]

এদের অনেকের কবিতায় প্লেটোর প্রেমতত্ত্বের প্রভাব দেখা যায়। এডওয়ার্ড হার্বার্ট এবং আব্রাহাম কাউলি প্লেটোনিক প্রেম নিয়ে সরাসরি কবিতা লিখেছেন। হেনরি ভন ও থমাস ট্রাহার্নের কবিতায় নব্য প্লেটোবাদী ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রভাব ও উত্তরাধিকার

[সম্পাদনা]

মেটাফিজিক্যাল কাব্যরীতি কেবল ১৭শ শতাব্দীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তরুণ জন মিল্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন এই শৈলীতে কবিতা লিখেছিলেন। তার On the Morning of Christ's Nativity (১৬২৯) কবিতায় বারোক কনসিটের ব্যবহার দেখা যায়।[১৩]

তরুণ জন ড্রাইডেনও তার প্রথম দিকের শোককবিতায় এই শৈলী ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি আলেকজান্ডার পোপ তার প্রথম জীবনে কাউলির অনুকরণে কবিতা লিখেছিলেন এবং ডানের ব্যঙ্গ কবিতার পুনর্লিখন করেছিলেন।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 "Metaphysical poets"Poetry Foundation। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  2. "Metaphysical poets"Fact Monster - Encyclopedia। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  3. 1 2 "Lives of the Poets - Life of Cowley"Project Gutenberg। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  4. Gardner, Helen (১৯৫৭)। Metaphysical Poets। Oxford University Press। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  5. "Drummond of Hawthornden Letters"Bartleby.com। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  6. "The Spectator No. 58"Internet Archive। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  7. "T.S. Eliot on The Metaphysical Poets"University of Wyoming। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  8. Alvarez, A. (১৯৬১)। The School of Donne। Chatto & Windus। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  9. Segel, Harold B. (১৯৭৪)। The Baroque Poem: a comparative survey। E. P. Dutton। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  10. 1 2 "Introduction to Metaphysical Lyrics & Poems of the Seventeenth Century"Bartleby.com। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  11. "Metaphysical poets"Oxford Dictionary of National Biography। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  12. "Concettismo"Oxford Reference। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬
  13. "John Milton - Early translations and poems"Encyclopaedia Britannica। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০২৬

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  • Gardner, Helen. The Metaphysical Poets. Penguin, 1957.
  • Grierson, Herbert J.C. Metaphysical Lyrics & Poems of the Seventeenth Century, Oxford, 1921.
  • Alvarez, A. The School of Donne, London, 1961.

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]