মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
| মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় | |
|---|---|
| মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় | |
| পশ্চিমবঙ্গের একাদশতম মুখ্যমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, ভূমি ও ভূমিসংস্কার, তথ্য ও সংস্কৃতি, পর্বতাঞ্চল বিষয়ক, কৃষি, বিদ্যুৎ, কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার, সংখ্যালঘু কল্যাণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা মন্ত্রী, |
|
| কার্যালয়ে ২০ মে, ২০১১ – বর্তমান |
|
| পূর্বসূরী | বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য |
| রেলমন্ত্রী (ভারত) | |
| কার্যালয়ে ২২ মে, ২০০৯ – ১৯ মে, ২০১১ |
|
| পূর্বসূরী | লালু প্রসাদ যাদব |
| উত্তরসূরী | মনমোহন সিংহ (প্রোটেম) |
| সংসদীয় এলাকা | দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র (১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮, ২০০৪,২০০৯) |
| রেলমন্ত্রী (ভারত) | |
| কার্যালয়ে ২২ মে, ১৯৯৮ – ২০০১ |
|
| উত্তরসূরী | রামবিলাস পাসোয়ান |
| সংসদীয় এলাকা | দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র |
| ব্যক্তিগত বিবরণ | |
| জন্ম | ৫ জানুয়ারি ১৯৫৫ কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত |
| রাজনৈতিক দল | সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস |
| দাম্পত্য সঙ্গী | অবিবাহিত |
| সন্তান | নেই |
| বাসস্থান | সি-৪, এম. এস. ফ্ল্যাটস, বাবা খড়্গ সিংহ মার্গ,নতুন দিল্লি, ভারত (সরকারি) ৩০বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ (ব্যক্তিগত) |
| অধ্যয়নকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান |
যোগমায়া দেবী কলেজ(বি.এ.) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়(এম.এ.) শ্রী শিক্ষায়তন কলেজ(বি.এড.) যোগেশচন্দ্র চৌধুরী ল কলেজ(এলএল.বি.) |
| জীবিকা | রাজনীতি |
| ধর্ম | হিন্দু |
| স্বাক্ষর | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর স্বাক্ষর |
| ওয়েব সাইট | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় |
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৫৫) পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা-সভানেত্রী।[১][২][৩] বর্তমানে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, ভূমি ও ভূমিসংস্কার, তথ্য ও সংস্কৃতি, পর্বতাঞ্চল বিষয়ক, কৃষি, বিদ্যুৎ, কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার, সংখ্যালঘু কল্যাণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেরও ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী।[৪] তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী।[৫] মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন বাগ্মী রাজনীতিবিদ। তিনি তাঁর অনুগামীদের কাছে "দিদি" নামে পরিচিত। সম্প্রতি তাঁর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই সরকার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজত্বকারী কমিউনিস্ট সরকার ছিল।[৬][৭][৮] ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটে তিনি দুই বার রেল, এক বার কয়লা মন্ত্রকের এবং এক বার মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব, ক্রীড়া, নারী ও শিশুকল্যাণ বিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন।[৯] তিনি পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের জমি বলপূর্বক অধিগ্রহণ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিরোধিতা করে আন্দোলন করেছিলেন।[১][৮]
পরিচ্ছেদসমূহ |
জীবন [সম্পাদনা]
প্রারম্ভিক জীবন [সম্পাদনা]
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৫৫ সালের ৫ জানুয়ারি কলকাতার হাজরা অঞ্চলে এক দরিদ্র নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রমীলেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, মা গায়ত্রী দেবী ছিলেন গৃহবধূ। কলকাতার শ্রীশিক্ষায়তন কলেজ থেকে বি.এড. ডিগ্রি সম্পূর্ণ করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলকাতার যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজ অফ ল থেকে এলএল.বি. ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে প্রবেশ ছাত্রাবস্থাতেই। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর সংসার চালনার জন্য কিছুকাল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিবাহ করেননি।
জাতীয় কংগ্রেসে রাজনৈতিক জীবন [সম্পাদনা]
১৯৭০-এর দশকে অত্যন্ত অল্প বয়সে কংগ্রেস (আই) দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কর্মজীবনের সূচনা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্থানীয় কংগ্রেস নেত্রী রূপে পরিচিত হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কংগ্রেস (আই)-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।[১০] ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে বর্ষীয়ান কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন। সেই সময় তিনি ছিলেন দেশের সর্বকনিষ্ঠ সাংসদের অন্যতম। এই সময় তিনি সারা ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকও মনোনীত হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের কংগ্রেস-বিরোধী হাওয়ায় তিনি তাঁর কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন। কিন্তু ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্র থেকে পুনরায় সাংসদ নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪ ও ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও উক্ত কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
১৯৯১ সালে নরসিমা রাও মন্ত্রিসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানব সম্পদ উন্নয়ন, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী মনোনীত হন। পরে ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে খেলাধূলার প্রতি সরকারি ঔদাসিন্যের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।[১১] ১৯৯৩ সালে তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি তাঁর দলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম)-কে সহায়তা করার অভিযোগ আনেন। নিজেকে দলের একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ বলে উল্লেখ করে তিনি এক "পরিচ্ছন্ন কংগ্রেস"-এর দাবি জানান। কলকাতার আলিপুরে একটি জনসভায় গলায় শাল পেঁচিয়ে আত্মহত্যারও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।[১২] ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে পেট্রোলিয়ামের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে লোকসভার ওয়েলে বসে পড়েন তিনি। এই সময়ই সমাজবাদী পার্টি সাংসদ অমর সিংহের জামার কলার ধরে তাঁর সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন মমতা। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লোকসভায় রেল বাজেট পেশের দিন পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদে রেল বাজেট পেশ চলাকালীনই তদনীন্তন রেলমন্ত্রী রামবিলাস পাসোয়ানের দিকে নিজের শাল নিক্ষেপ করেন তিনি। পরে তিনি সাংসদ পদ থেকে ইস্তফাও দেন। কিন্তু লোকসভার তদনীন্তন অধ্যক্ষ পি. এ. সাংমা তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেন। পরে সন্তোষমোহন দেবের মধ্যস্থতায় তিনি ফিরে আসেন।
তৃণমূল কংগ্রেস [সম্পাদনা]
- মূল নিবন্ধ: সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস
১৯৯৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস স্থাপন করেন। অনতিকাল পরেই তাঁর দল দীর্ঘকাল বামফ্রন্ট-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধীশক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯৮ সালের ১১ ডিসেম্বর সমাজবাদী পার্টি সাংসদ দারোগা প্রসাদ সরোজ "মহিলা সংরক্ষণ বিলের" বিরোধিতায় লোকসভার ওয়ালে নেমে গেলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জামার কলার ধরে টানতে টানতে তাঁকে ওয়েলের বাইরে বের করে দেন।[১৩] এই ঘটনায় কিছু বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়।
১৯৯৯ সালে মমতা বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে সামিল হন। এই জোট সরকার গঠন করলে তিনি রেলমন্ত্রী মনোনীত হন।
রেল মন্ত্রকে প্রথম কার্যকাল [সম্পাদনা]
২০০০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রথম রেল বাজেট পেশ করেন। এই বাজেটে তিনি তাঁর নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের প্রতি অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিলেন।[১৪] দ্বি-সাপ্তাহিক নতুন দিল্লি-শিয়ালদহ রাজধানী এক্সপ্রেস চালুর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসাধনের লক্ষ্যে তিনি চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুরপাল্লার ট্রেন চালু করেন। এগুলি হল হাওড়া-পুরুলিয়া এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-নিউ জলপাইগুড়ি এক্সপ্রেস, শালিমার-বাঁকুড়া এক্সপ্রেস ও শিয়ালদহ-অমৃতসর সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস (সাপ্তাহিক)।[১৪] এছাড়া তিনি পুনে-হাওড়া আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসের দিনসংখ্যা বৃদ্ধি করেন এবং তিনটি এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিষেবার প্রসার ঘটান। তাঁর ক্ষুদ্র মন্ত্রিত্বকালে হাওড়া-দিঘা রেল প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল।[১৫]
এই সময় তিনি পর্যটন উন্নয়নের দিকেও মনোনিবেশ করেছিলেন। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েতে তিনি দুটি নতুন ইঞ্জিন চালু করেন এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম কর্পোরেশন লিমিটেড প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। এছাড়া ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নির্মাণের ব্যাপারে ভারতের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাংলাদেশ ও নেপাল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া লাইনগুলি আবার চালু করার কথাও বলেন। ২০০০-২০০১ আর্থিক বছরে তিনি মোট ১৯টি নতুন ট্রেন চালু করেছিলেন।[১৫]
এনডিএ ত্যাগের পর [সম্পাদনা]
২০০১ সালের প্রথম দিকে একটি রাজনৈতিক মতবিরোধের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনডিএ-র সঙ্গে সম্পর্ক সাময়িকভাবে ত্যাগ করেন। ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। তবে সেবার এই জোট বামফ্রন্টকে পরাজিত করতে অসমর্থ হয়েছিল। ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আবার এনডিএ-তে ফিরে আসেন এবং কয়লা ও খনি মন্ত্রকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত একমাত্র তৃণমূল সাংসদ।
২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের শিল্পনীতির বিরোধিতা করেন মমতা। ইন্দোনেশিয়া-ভিত্তিক সালিম গোষ্ঠীর মালিক বেনি সান্তোসো পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করতে এলে সরকার তাঁকে হাওড়ার একটি কৃষিজমি কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে প্রদান করে। এর পরই রাজ্যে বিক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। প্রবল বর্ষণের মধ্যেই সান্তোসোর আগমনের প্রতিবাদ জানাতে মমতা ও তাঁর সমর্থকেরা তাজ হোটেলের সামনে জড়ো হন। পুলিশ তাঁদের হটিয়ে দিলে তাঁরা পরে সান্তোসোর কনভয় ধাওয়াও করেন। উল্লেখ্য, কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি এড়াবার জন্য সরকার সান্তোসোদের কর্মসূচি তিন ঘণ্টা এগিয়ে এনেছিল।[১৬][১৭]
২০০৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েন। এই বছর পৌরনির্বাচনে তাঁর দল কলকাতা পৌরসংস্থার ক্ষমতা হারায়। কলকাতার তদনীন্তন মহানাগরিক সুব্রত মুখোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ২০০৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেস বড়োসড়ো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এই নির্বাচনে পূর্বের বিজিত আসনগুলির অর্ধেকেই দল পরাজিত হয়েছিল।
২০০৬ সালের ৪ অগস্ট লোকসভার তৎকালীন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর আনা একটি মুলতুবি প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়ার পর মমতা লোকসভার উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ সিংহ অটওয়ালের কাছে তাঁর ইস্তফাপত্র পাঠান। পশ্চিমবঙ্গে বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে এই মুলতুবি প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের সঠিক নিয়মাবলি না মানায় অধ্যক্ষ এটি বাতিল করে দিয়েছিলেন।[১৮][১৯]
২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটি জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাঁকে জোর করে বাধা দেওয়া হয়। মমতা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিধানসভাতেই সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে তিনি ১২ ঘণ্টা বাংলা বনধও ঘোষণা করেন।[২০] তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়করা বিধানসভায় ভাঙচুর চালান[২১], পথ অবরোধ করেন এবং অনেক জায়গায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগও করা হয়।[২০] এরপর ২০০৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর একটি বড়োসড়ো ধর্মঘট পালিত হয়েছিল।
নন্দীগ্রাম গণহত্যা [সম্পাদনা]
- মূল নিবন্ধ: নন্দীগ্রাম গণহত্যা
পশ্চিমবঙ্গ সরকার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একটি কেমিক্যাল হাব স্থাপন করতে চাইলে তমলুকের সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠের নেতৃত্বাধীন হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ এই অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণের নোটিশ জারি করেন।[২২][২৩] তৃণমূল কংগ্রেস এর বিরোধিতা করে। মুখ্যমন্ত্রী নোটিশটি বাতিল ঘোষণা করেন।[২৪] ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ কৃষকদের ছয়মাসব্যাপী অবরোধ তুলতে পুলিশ তাদের উপর গুলিচালনা করলে চোদ্দো জনের মৃত্যু ঘটে। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করে।[২৫] এরপর রাজনৈতিক সংঘর্ষে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।[২৬] নন্দীগ্রাম গণহত্যার প্রতিবাদে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের একটি বৃহৎ অংশ বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।[২৭][২৮][২৯] প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও তদনীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিলকে লেখা চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ আনেন।[৩০][৩১] আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নন্দীগ্রামের কেমিক্যাল হাব প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হন। কিন্তু কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মমতা প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হন। উর্বর কৃষিজমিতে শিল্পের বিরোধিতা ও পরিবেশ রক্ষার যে বার্তা নন্দীগ্রামের আন্দোলন প্রদান করে তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশে।
২০০৯ সালের নির্বাচনী সাফল্য [সম্পাদনা]
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত ভাল ফল করে। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস একাই ১৯টি আসনে জয়লাভ করে। তৃণমূলের জোটসঙ্গী জাতীয় কংগ্রেস ৬টি আসনে ও এসইউসিআই(সি) একটি আসনে জয়লাভ করে। তৃণমূল কংগ্রেস জোট মোট ২৬টি আসনে জয়লাভ করে।[৩২] অন্যদিকে বামফ্রন্ট ১৫টি ও বিজেপি একটি আসন পায়। তৃণমূল কংগ্রেসের ১৯ জন সাংসদের মধ্যে মহিলা সাংসদের সংখ্যা পাঁচ। উল্লেখ্য, তৃণমূল কংগ্রেস ভারতে মহিলা সংরক্ষণ বিলের প্রবল সমর্থক। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীরা রাজ্যের ৩৩ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের ইতিহাসে প্রথম শাসকদলকে লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত করে। এর আগে ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর রাজ্যের বিরোধী দল সবচেয়ে ভাল ফল করেছিল। কিন্তু সেবারও তাদের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪।
রেল মন্ত্রকে দ্বিতীয় কার্যকাল [সম্পাদনা]
২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বার রেলমন্ত্রী হন। এই বছরের রেল বাজেটে তিনি রেল মন্ত্রকের বিভিন্ন নতুন উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। দেশের ৫০টি স্টেশনকে তিনি আন্তর্জাতিক সুযোগসুবিধা সম্পন্ন বিশ্বমানের স্টেশনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেন। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে এই উন্নয়নের কাজ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এছাড়াও ৩৭৫টি স্টেশনকে তিনি আদর্শ স্টেশন ঘোষণা করেন। গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য বাজার, ফুড স্টল ও রেস্তোরাঁ, বইয়ের স্টল, পিসিও/এসটিডি/আইএসডি/ফ্যাক্স বুথ, ওষুধের দোকান ও স্টেশনারি দোকান, স্বল্পব্যয়ের হোটেল এবং ভূগর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা সহ মাল্টি-ফাংশনাল কমপ্লেক্স স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কমপ্লেক্সগুলিও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে গঠিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। রেলের গ্রুপ ডি কর্মচারীদের কন্যাসন্তানদের আত্মস্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করতে তাদের উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলের জমিতে সাতটি নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব দেন।[৩৩] এছাড়া যুব এক্সপ্রেস ও দুরন্ত এক্সপ্রেস নামে দুই প্রকার নতুন ট্রেনও চালু করেন তিনি। দুরন্ত বর্তমানে ভারতের দ্রুততম রেল পরিষেবা।[৩৪]
মহিলা নিত্যযাত্রীদের সুবিধার্থে ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই মমতা হাওড়া-ব্যান্ডেল শাখায় একটি লেডিজ স্পেশাল ট্রেন চালু করেন।[৩৫] পরে শিয়ালদহ-কল্যাণী, পানভেল-মুম্বই সিএসটি ইত্যাদি সারা দেশের একাধিক শাখায় মহিলা স্পেশাল ট্রেন চালু হয়।[৩৬] ১৮ সেপ্টেম্বর শিয়ালদহ ও নতুন দিল্লির মধ্যে প্রথম দুরন্ত এক্সপ্রেস চালু হয়।[৩৭] ২১ সেপ্টেম্বর চেন্নাই ও নতুন দিল্লির মধ্যে দ্বিতীয় দুরন্ত এক্সপ্রেসটি চালু হয়। মমতা সন্ত্রাসবিধ্বস্ত কাশ্মীরেও রেলপথের প্রসারে মনোযোগী হন। অক্টোবর মাসে অনন্তনাগ-কাদিগন্দ রেলওয়ে চালু হয়।[৩৮] ২০১০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মমতা নতুন উনিশটি রেল পরিষেবা চালু করেন।[৩৯]
তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]
- ↑ ১.০ ১.১ Yardley, Jim (January 14, 2011)। "The Eye of an Indian Hurricane, Eager to Topple a Political Establishment"। New York Times। http://www.nytimes.com/2011/01/15/world/asia/15india.html। সংগৃহীত January 14, 2011।
- ↑ "Council of Ministers - Who's Who - Government: National Portal of India"। http://india.gov.in। Government of India। সংগৃহীত 11 August 2010।
- ↑ "Mamata Banerjee sworn in as West Bengal chief minister"।
- ↑ http://www.thehindu.com/news/national/article2035875.ece
- ↑ http://www.theindiadaily.com/mamata-banerjee-takes-oath-as-first-woman-chief-minister-of-west-bengal/
- ↑ BBC News (13 May 2011)। "BBC News - India: Mamata Banerjee routs communists in West Bengal"। সংগৃহীত 14 May 2011।
- ↑ "Indian state election expected to end Kolkata's 34-year communist rule"। London: The Guardian। April 18, 2011। http://www.guardian.co.uk/world/2011/apr/18/india-state-election-kolkata-communist। সংগৃহীত 18 April 2011।
- ↑ ৮.০ ৮.১ "The woman taking on India's communists"। BBC World News। April 15, 2011। http://www.bbc.co.uk/news/world-south-asia-13077902। সংগৃহীত 15 April 2011।
- ↑ "Detailed Profile = Km. Mamata Banerjee"। http://india.gov.in। Government of India। সংগৃহীত 11 August 2010।
- ↑ "Mamta Banerjee Profile"। incredible-people.com।
- ↑ "Mamata mum on relations with BJP"। January 6, 2003। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ Ashis Chakrabarti (November 8, 1998)। "Theatrics of a Bengal tigress"। The Indian Express। সংগৃহীত November 12, 2007।
- ↑ "National Events in December 1998"। The Hindu। সংগৃহীত November 12, 2007।
- ↑ ১৪.০ ১৪.১ "New trains for West Bengal"। The Tribune। February 26, 2000। সংগৃহীত November 12, 2007।
- ↑ ১৫.০ ১৫.১ "Railways to focus on tourism, trans-Asian role, hardselling freight services"। Rediff.com। February 25, 2000। সংগৃহীত November 12, 2007।
- ↑ "Weather plays spoilsport for TMC"। October 21, 2005। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ "Missing on bandh day: its champions -- Mamata stays indoors, Cong scarce"। October 10, 2006। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ "Mamata Banerjee's unending tantrums"। August 8, 2005। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ "Mamata casts shame at House Paper throw at Speaker"। August 4, 2005। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ ২০.০ ২০.১ "Trinamool unleashes violence in W Bengal"। November 30, 2006। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ "Heritage vandalised in Bengal House"। December 2, 2006। সংগৃহীত December 2, 2006।
- ↑ "False alarm sparks clash"। The Telegraph। January 4, 2007। http://www.telegraphindia.com/1070104/asp/frontpage/story_7218357.asp।
- ↑ "Haldia authority's notification created confusion: Buddhadeb"। The Hindu। January 10, 2007। http://www.hindu.com/2007/01/10/stories/2007011006381200.htm।
- ↑ "Sub-Inspector killed in Nandigram"। The Hindu। February 8, 2007। http://www.hindu.com/2007/02/08/stories/2007020806021200.htm।
- ↑ "Stockpile squad trail heads towards party - Phone records spill Nandigram secret"। The Telegraph। March 19, 2007। http://telegraphindia.com/1070319/asp/frontpage/story_7537027.asp।
- ↑ "Red-hand Buddha: 14 killed in Nandigram re-entry bid"। The Telegraph। March 15, 2007। http://www.telegraphindia.com/1070315/asp/frontpage/story_7519166.asp। সংগৃহীত March 15, 2007।
- ↑ "Nandigram people's struggle "heroic": Clark"। One India। http://news.oneindia.in/2007/11/30/nandigram-peoples-struggle-heroic--clark-1196438590.html।
- ↑ Kirschbaum, Stevan। "Nandigram says 'No!' to Dow's chemical hub"। International Action Center। http://www.iacboston.org/india/1207-nandigram-says-no.html।
- ↑ "The Great Left Debate: Chomsky to Saddam, Iraq to Nandigram"। Indian Express। December 5, 2007। http://www.indianexpress.com/story/246969.html।
- ↑ Mitra, Ashok (November 15, 2007)। "You are not what you were - Ashok Mitra after 14th November, 2007"। Sanhati। http://sanhati.com/articles/446/।
- ↑ "'Go back Medha' posters in Kolkata"। India eNews.com। December 7, 2006। http://www.indiaenews.com/india/20061207/31650.htm।
- ↑ [১]
- ↑ "Railway Budget 2009-2010"। Indian Railways। সংগৃহীত October 16, 2009।
- ↑ "train travel just got better for women youth"। Breaking News 24/7। সংগৃহীত October 16, 2009।
- ↑ "Ladies Special Rolls Out"। Express India। সংগৃহীত October 16, 2009।
- ↑ "New CST Panvel Ladies Special"। Bombay-Local। সংগৃহীত October 16, 2009।
- ↑ "mamata-flags-off-sealdah-new-delhi-duronto-express"। Armoks News। সংগৃহীত October 16, 2009।
- ↑ "PM to inaugurate new Railway line in Kashmir today"। Sindh Today। সংগৃহীত November 13, 2009।
- ↑ "Mamata Banerjee to start 19 new trains on February 7"। Business Standard। সংগৃহীত February 4, 2010।
বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা]
- Official biographical sketch in Parliament of India website
- Official Party website
- www.expressindia.com
- [২]
|
|||||||
|
|||||
- অকার্যকর চিত্র সংযোগসহ পাতাসমূহ
- ১৯৫৫-এ জন্ম
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী
- কলকাতার ব্যক্তিত্ব
- পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি
- সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস
- বাঙালি রাজনীতিবিদ
- ভারতীয় মহিলা রাজনীতিবিদ
- লোকসভার সদস্য
- জীবিত ব্যক্তি
- ভারতীয় কমিউনিস্ট-বিরোধী রাজনীতিবিদ
- চতুর্দশ লোকসভার সদস্য
- পঞ্চদশ লোকসভার সদস্য
- ভারতের ক্যাবিনেট মন্ত্রী
- ভারতের রেলমন্ত্রী