সুভাষ মুখোপাধ্যায় (কবি)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
চিত্র:Subhash Mukhopadhyay image.jpg
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
জন্ম (১৯১৯-০২-১২)১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯
কৃষ্ণনগর, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
মৃত্যু জুলাই ৮, ২০০৩ (বয়স ৮৪)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
জীবিকা কবি
জাতীয়তা ভারতীয়
ধরণ উপন্যাস, কবিতা, গীতিনাট্যকার

সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯৮ জুলাই ২০০৩) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় বাঙালি কবি ও গদ্যকার। কবিতা তাঁর প্রধান সাহিত্যক্ষেত্র হলেও ছড়া, রিপোর্টাজ, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য সকল প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ এবং বহু দেশি-বিদেশি কবিতা বাংলায় অনুবাদও করেছেন স্বচ্ছন্দে। তাঁর কবিতা চড়া সুরে বাঁধা হলেও ছিল অনেক সহজবোধ্য। কথ্যরীতিতে রচিত তাঁর কবিতায় ছিল ব্যঙ্গ, সংহত আবেগের প্রকাশ ও নিপূণ শিল্পকলার অভিপ্রকাশ। ১৯৪০-এর দশক থেকে তাঁর অ-রোম্যান্টিক অকপট কাব্যভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের কাছেও অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। সমাজের তৃণমূল স্তরে নেমে গিয়ে সেই সমাজকে প্রত্যক্ষ করে তবেই কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হতেন তিনি। আদর্শ তাঁর কবিতাকে দিয়েছিল অভাবনীয় জনপ্রিয়তা। তবে কবিতার মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে তিনি কবিতাকে রসহীন ও সৌন্দর্যহীন করে ফেলেননি; এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে হন বিতর্কিত। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর হিমালয়প্রতিম অবদান অনস্বীকার্য। “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্যএসে গেছে ধ্বংসের বার্তা” বা “ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত” প্রভৃতি তাঁর অমর পংক্তি বাংলায় আজ প্রবাদতুল্য। ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতা মেট্রো নিউ গড়িয়া স্টেশনটি কবির নামে উৎসর্গ করে, এই স্টেশনটি বর্তমানে "কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন" নামে পরিচিত।

জীবন[সম্পাদনা]

জীবনারম্ভ[সম্পাদনা]

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মামাবাড়িতে। পিতা ক্ষিতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মা জানকীবালা দেবী। পিতা ছিলেন সরকারি আবগারি বিভাগের কর্মচারী; তাঁর বদলির চাকরির দৌলতে কবির ছেলেবেলা কেটেছিল পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। তাঁর ছেলেবেলার প্রথম দিকটা, যখন তাঁর বয়স তিন-চার, সে সময়টা কেটেছে কলকাতায়, ৫০ নম্বর নেবুতলা লেনে। একটা ভাড়াবাড়ির দোতলায় যৌথ পরিবারের ভিড়ের মধ্যে।[১] প্রথমে নওগাঁর স্কুলে এবং পরে কলকাতার মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন ও সত্যভামা ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন। ভবানীপুরের মিত্র স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে সক্রিয় রাজনীতি করার মানসে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে অনার্স-সহ বিএ পাস করেন। পরে আশুতোষ কলেজকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নে প্রয়াসী হন। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার ফলে পঠনপাঠন বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। কবি শিক্ষকরূপে লাভ করেন কবি কালিদাস রায় ও কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক মুরলীকৃষ্ণ বসুকে। বিদ্যালয়ে বন্ধুরূপে পান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রমানাথ রায়, পরিমল সেনগুপ্ত, রমাকৃষ্ণ মৈত্র প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে। আরও পরে কর্মজীবনে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় কবি বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, কারাজীবনের সঙ্গী আব্দুর রজ্জাক খান, সতীশ পাকড়াশী, উর্দু সাহিত্যিক পরভেজ শহীদী, চারু মজুমদার, গিরিজা মুখোপাধ্যায়, চিন্মোহন সেহানবীশ প্রমুখ স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বকে।

রাজনৈতিক ও কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯৩২-৩৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিশোর ছাত্রদল-এর সক্রিয় সদস্যরূপে যোগ দেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই সময় কবি সমর সেন তাঁকে দেন হ্যান্ডবুক অব মার্কসিজম নামে একটি গ্রন্থ। এটি পড়ে মার্কসীয় রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন কবি। ১৯৩৯ সালে লেবার পার্টির সঙ্গে সংযোগ হয় তাঁর। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ পদাতিক। পরে ছাত্রনেতা বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্ররোচনায় লেবার পার্টি ত্যাগ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪২ সালে পান পার্টির সদস্যপদ। এই সময় সদ্যগঠিত ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের সাংগঠনিক কমিটিতে কবি বিষ্ণু দে-র সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তারপর মাসিক ১৫ টাকা ভাতায় সর্বক্ষণের কর্মীরূপে যোগ দেন পার্টির জনযুদ্ধ পত্রিকায়। ১৯৪৬ সালে দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে যোগ দেন কবি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে বহু কমিউনিস্ট বন্দীর সঙ্গে দু-বার কারাবরণ করেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও। এই সময় তিনি সামিল হন দমদম জেলের অনশন ধর্মঘটে। ১৯৫০ সালের নভেম্বর মাসে পান মুক্তি।

মুক্তির পর কবির জীবনে দেখা দেয় প্রচন্ড অর্থকষ্ট। একটি নতুন প্রকাশন সংস্থায় মাত্র ৭৫ টাকা বেতনে সাব-এডিটর নিযুক্ত হন তিনি। ১৯৫১ সালে সেই চাকরি ত্যাগ করে পরিচয় পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই বছরই পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হন সুলেখিকা গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯৫২ সালে সস্ত্রীক কবি ওঠেন বজবজ এলাকার ব্যঞ্জনবেড়িয়া গ্রামের শ্রমিক বস্তির একটি মাটির ঘরে; আত্মনিয়োগ করেন সেই অঞ্চলের চটকল মজুর সংগঠনের কাজে। পরে কলকাতার বন্দর অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের কাজও করেন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হলে তিনি থেকে যান পুরনো পার্টিতেই। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হলে ১৪৪ ধারা ভেঙে দ্বিতীয়বার কারাবরণ করেন। এই দফায় ১৩ দিন কারারুদ্ধ ছিলেন কবি। মাঝে কিছুকাল সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে একযোগে সন্দেশ পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন তিনি।

তারই সঙ্গে একে একে লিখে গেছেন অগ্নিকোণ, চিরকুট, কাল মধুমাস, ফুল ফুটুক, যত দূরেই যাই, ছেলে গেছে বনে, জল সইতে, একটু পা চালিয়ে ভাই প্রভৃতি যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ; হাংরাস, অন্তরীপ, হ্যানসেনের অসুখ বা ঢোলগোবিন্দের আত্মদর্শন প্রভৃতি গদ্যরচনা; চিঠি জুড়ে জুড়ে লেখা চিঠির দর্পণে-এর মতো প্রথাভাঙা উপন্যাস। অনুবাদ করেছেন নাজিম হকমত, পাবলো নেরুদা, হাফিজ-এর কবিতা, চর্যাপদঅমরুশতক ইত্যাদি।

শেষজীবন[সম্পাদনা]

১৯৭০-এর দশক থেকে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তন সাধিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অকুণ্ঠ সমর্থন জোগালেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনকে সমর্থন করেননি; কে কোথায় যায় উপন্যাসে এই আন্দোলনের প্রতি তাঁর বিরূপতা ব্যক্ত করেছিলেন। সমর্থন করেন ১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থাকে। এই সময়েই অ্যাফ্রো-এশীয় লেখক সমিতির কাজের চাপে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন থেকে দূরে সরে আসতে থাকেন কবি। ১৯৮১ সালে রণকৌশল ও অন্যান্য কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নে পার্টির সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লাভ করেন তাঁর সান্নিধ্য। ফলে সৃষ্টি হয় বিতর্ক। স্রোতের বিপরীতে চলে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের কাছে ঘৃণিত হন এ-যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। যকৃৎ ও হৃদপিণ্ডের অসুস্থতার কারণে দীর্ঘকাল রোগভোগের পর কলকাতায় তাঁর প্রয়াণ ঘটে। মৃত্যুকালে তিনি রেখে যান স্ত্রী ছাড়াও তাঁর তিন পালিতা কন্যাকে।

কবিতার দৃষ্টান্ত[সম্পাদনা]

পদাতিক[সম্পাদনা]

পদাতিক কাব্যগ্রন্থের মে দিনের কবিতা শ্রমিক শ্রেণির এক বিজয়কাব্য। ধনতন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ ঔপনিবেশবাদের উচ্ছেদসাধনের ঋজু প্রত্যয় এখানে কবির কণ্ঠে –

শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না
প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;
মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না –
পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।
প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
দুর্যোগে পথ হয়, হোক দুর্বোধ্য
চিনে নেবে যৌবন আত্মা।

এই গ্রন্থেরই বধূ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্নিগ্ধ রোম্যান্টিকতার বিপরীত ধ্বনি শোনা যায়; কতকটা কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো গানের অনুষঙ্গে –

ইহার মাঝে কখন প্রিয়তম
উধাও; লোক লোচন উঁকি মারে
সবার মাঝে একলা ফিরি আমি
-লেকের জলে মরণ যেন ভালো।

চিরকুট[সম্পাদনা]

চিরকুট কাব্যটি বাংলা ফ্যাসিবিরোধী সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। শুধু ফ্যাসিবিরোধিতাই নয়, এই কাব্যে উঠে এসেছে ভারতের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি। স্ফুলিঙ্গ, জবাব চাই, প্রতিরোধ প্রতিজ্ঞা আমার, ফের আসবো, এই আশ্বিনে, চিরকুট প্রভৃতি কবিতায় আছে বিশ্বাস, বলিষ্ঠতা, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আবার আবেগের বিধুরতাও। ঘোষণা কবিতায় দেখা যায় –

গঙ্গার জোয়ার এসে লাগে
ভল্গার তীরের স্পর্শ,
চোখে নব সূর্যোদয় জাগে;
মুক্তি আজ বীরবাহু
শৃঙ্খল মেনেছে পরাভব;
দিগন্তে দিগন্তে দেখি
বিস্ফোরিত আসন্ন বিপ্লব।

অগ্নিকোণ[সম্পাদনা]

১৯৪৮ সালে পার্টির দৈনিকের টাকা তোলার জন্য কবি লেখেন মাত্র পাঁচটি কবিতার সংকলন অগ্নিকোণ। কবির ভাষায়, “রাজনীতিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির জন্যেই অগ্নিকোণের প্রকাশ”। [২] এই কাব্যে কবি উদ্বেল হয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তিসংগ্রামের সংবাদে –

লক্ষ লক্ষ হাতে
অন্ধকারকে দু’টুকরো ক’রে
অগ্নিকোণের মানুষ
সূর্যকে ছিঁড়ে আনে।

ফুল ফুটুক[সম্পাদনা]

অগ্নিকোণফুল ফুটুক কাব্য রচনার মধ্যবর্তী সময়ে কবি উপলব্ধি করেন এক চরম নান্দনিক সত্য,

সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালোবাসা, খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সব কটি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না। কবিতার গদ্যের আর কথা বলবার ভাষার বিভিন্নতা নতুন কবি স্বীকার করেন না। এমন এক ভাষায় তিনি লেখেন – যা বানানো নয়, কৃত্রিম নয়, সহজ, প্রাণবন্ত, বিচিত্র গভীর, একান্ত জটিল – অর্থাৎ অনাড়ম্বর সেই ভাষা। [৩]

এই সত্য প্রতিফলিত হয় তাঁর পরবর্তীকালের কাব্যগুলিতে। কমিউনিজমের বাঁধা বুলি ছেড়ে তিনি চিত্রকল্প নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় রত হন এই কাব্যগুলিতে। ফুল ফুটুক কাব্যের আরও একটা দিন কবিতায় অন্ধকারের এক আশ্চর্য ছবি আঁকেন কবি,

জলায় এবার ভাল ধান হবে –
বলতে বলতে পুকুরে গা ধুয়ে
এ বাড়ির বউ এল আলো হাতে
সারাটা উঠোন জুড়ে
অন্ধকার নাচাতে নাচাতে।

একটু পা চালিয়ে ভাই[সম্পাদনা]

আবার একটু পা চালিয়ে ভাই কাব্যে দেখা যায় অন্য একরকম বলিষ্ঠ বাগভঙ্গি। এই কাব্যের বাঘের আঁচড় কবিতাটি প্রণিধানযোগ্য,

থু
থু
থু...
এই একটি শব্দে
গলা চিরে
এবার আমি আগুন ওগরাব।

সম্মাননা[সম্পাদনা]

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বঞ্চনা ও অসম্মান অনেক জুটলেও সাহিত্যের অঙ্গনে সম্মানিতই হয়েছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার পান ১৯৬৪ সালে; ১৯৭৭ সালে অ্যাফ্রো-এশিয়ান লোটাস প্রাইজ; ১৯৮২ সালে কুমারন আসান পুরস্কার; ১৯৮২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রদত্ত মির্জো টারসান জেড পুরস্কার; ১৯৯১ সালে আনন্দ পুরস্কার এবং ওই বছরেই পান সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার ও ভারতীয় জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। ১৯৯৬ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা সাহিত্য অকাদেমী ফেলোশিপ পান সুভাষ মুখোপাধ্যায়। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানিত করেছিল তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেশিকোত্তম দ্বারা।

এছাড়াও প্রগ্রেসিভ রাইটার্স ইউনিয়নের ডেপুটি সেক্রেটারি ও ১৯৮৩ সালে অ্যাফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের সাধারণ সংগঠক নির্বাচিত হন কবি। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ছিলেন সাহিত্য অকাদেমীর একজিকিউটিভ বোর্ডের সদস্য।

গ্রন্থাবলি[সম্পাদনা]

কাব্যগ্রন্থ[সম্পাদনা]

পদাতিক (১৯৪০), অগ্নিকোণ (১৯৪৮), চিরকুট (১৯৫০), ফুল ফুটুক (১৯৫৭), যত দূরেই যাই (১৯৬২), কাল মধুমাস (১৯৬৬), এই ভাই (১৯৭১), ছেলে গেছে বনে (১৯৭২), একটু পা চালিয়ে ভাই (১৯৭৯), জল সইতে (১৯৮১), চইচই চইচই (১৯৮৩), বাঘ ডেকেছিল (১৯৮৫), যা রে কাগজের নৌকা (১৯৮৯), ধর্মের কল (১৯৯১)।

কবিতা সংকলন[সম্পাদনা]

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭০), সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যসংগ্রহ, প্রথম খণ্ড (১৩৭৯ বঙ্গাব্দ), সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যসংগ্রহ, দ্বিতীয় খণ্ড (১৩৮১ বঙ্গাব্দ), কবিতাসংগ্রহ ১ম খণ্ড (১৯৯২), কবিতাসংগ্রহ ২য় খণ্ড (১৯৯৩), কবিতাসংগ্রহ ৩য় খণ্ড (১৯৯৪), কবিতাসংগ্রহ ৪র্থ খণ্ড (১৯৯৪)।

অনুবাদ কবিতা[সম্পাদনা]

নাজিম হিকমতের কবিতা (১৯৫২), দিন আসবে (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ, নিকোলো ভাপৎসারভের কবিতা), পাবলো নেরুদার কবিতাগুচ্ছ (১৩৮০ বঙ্গাব্দ), ওলঝাস সুলেমেনভ-এর রোগা ঈগল (১৯৮১ বঙ্গাব্দ), নাজিম হিকমতের আরো কবিতা (১৩৮৬ বঙ্গাব্দ), পাবলো নেরুদার আরো কবিতা (১৩৮৭ বঙ্গাব্দ), হাফিজের কবিতা (১৯৮৬), চর্যাপদ (১৯৮৬), অমরুশতক (১৯৮৮)।

ছড়া[সম্পাদনা]

মিউ-এর জন্য ছড়ানো ছিটানো (১৯৮০)।

কবিতা সম্পর্কিত গদ্যরচনা[সম্পাদনা]

কবিতার বোঝাপড়া, টানাপোড়েনের মাঝখানে

রিপোর্টাজ ও ভ্রমণসাহিত্য[সম্পাদনা]

আমার বাংলা (১৯৫১), যেখানে যখন (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), ডাকবাংলার ডায়েরী (১৯৬৫), নারদের ডায়েরী (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), যেতে যেতে দেখা (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), ক্ষমা নেই (১৩৭৮ বঙ্গাব্দ), ভিয়েতনামে কিছুদিন (১৯৭৪), আবার ডাকবাংলার ডাকে (১৯৮৪), টো টো কোম্পানী (১৯৮৪), এখন এখানে (১৯৮৬), খোলা হাতে খোলা মনে (১৯৮৭)।

অর্থনৈতিক রচনা[সম্পাদনা]

ভূতের বেগার (১৯৫৪, কার্ল মার্ক্স রচিত ওয়েজ লেবার অ্যান্ড ক্যাপিটাল অবলম্বনে)।

অনুবাদ রচনা[সম্পাদনা]

মত ক্ষুধা (১৯৫৩, ভবানী ভট্টাচার্যের সো মেনি হাঙ্গার্স উপন্যাসের অনুবাদ), রোজেনবার্গ পত্রগুচ্ছ (১৯৫৪), ব্যাঘ্রকেতন (নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি অনুবাদ), রুশ গল্প সঞ্চয়ন (১৯৬৮), ইভান দেনিসোভিচের জীবনের একদিন (১৯৬৮), চে গেভারার ডায়েরী (১৯৭৭), ডোরাকাটার অভিসারে (১৯৬৯, শের জঙ্গের ট্রায়াস্ট উইথ টাইগার্স অবলম্বনে), আনাফ্রাঙ্কের ডায়েরী (১৯৮২), তমস (১৩৯৫ বঙ্গাব্দ, ভীষ্ম সাহানীর উপন্যাসের অনুবাদ)।

উপন্যাস[সম্পাদনা]

হাংরাস (১৯৭৩), কে কোথায় যায় (১৯৭৬), চিঠির দর্পণে

জীবনী[সম্পাদনা]

জগদীশচন্দ্র (১৯৭৮), আমাদের সবার আপন ঢোলগোবিন্দের আত্মদর্শন (১৯৮৭), ঢোলগোবিন্দের এই ছিল মনে

শিশু ও কিশোর সাহিত্য[সম্পাদনা]

নীহাররঞ্জন রায় রচিত বাঙ্গালীর ইতিহাস গ্রন্থের কিশোর সংস্করণ (১৯৫২), অক্ষরে অক্ষরে আদি পর্ব (১৯৫৪), কথার কথা (১৯৫৫), দেশবিদেশের রূপকথা (১৯৫৫), বাংলা সাহিত্যের সেকাল ও একাল (১৯৬৭), ইয়াসিনের কলকাতা (১৯৭৮)।

সম্পাদিত গ্রন্থ[সম্পাদনা]

কেন লিখি (১৯৪৫, বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিকদের জবানবন্দী, হিরণকুমার সান্যালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রচিত), একসূত্র (১৯৫৫, ফ্যাসিবিরোধী কবিতা সংকলন, গোলাম কুদ্দুসের সঙ্গে যৌথ সম্পাদনা), ছোটদের পুজো সংকলন – পাতাবাহার, বার্ষিক আগামী ইত্যাদি।

সংকলন[সম্পাদনা]

গদ্যসংগ্রহ (১৯৯৪)

উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামানুসারে নামাঙ্কিত কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনের সম্মুখভাগ।
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ পদাতিক-এর নামানুসারে ২০০৯ সালে শিয়ালদহ-নিউ জলপাইগুড়ি এক্সপ্রেসের নাম রাখা হয় "পদাতিক এক্সপ্রেস"।[৪]
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামানুসারে ২০১০ সালে কলকাতা মেট্রোর নিউ গড়িয়া স্টেশনটির নাম "কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন" রাখা হয়।[৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • বাংলা সাহিত্য পরিচয় ও সাহিত্যটীকা (প্রাচীন-মধ্য-আধুনিক যুগ), ডক্টর পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তুলসী প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০৮ সংস্করণ
  • সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (দ্বিতীয় খণ্ডের সংযোজন), অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০০৪
  • সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী, শিশিরকুমার দাশ সংকলিত ও সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০০৩

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. সন্দীপ দত্ত; সুভাষ মুখোপাধ্যায় : জীবন ও সাহিত্য; র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, কলকাতা; অক্টোবর, ২০০২; পৃ. ২০১
  2. মনোজ ভোজ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মিছিলের মুখ’, ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায় : জীবন ও সাহিত্য’, শারদীয়া পত্রপুট, ১৪০২, পৃ. ১৩৫
  3. মুখবন্ধ : নাজিম হিকমতের কবিতা
  4. "Tracks & trains for ‘backward’ region"Telegraph Calcutta। 5 October 2009। সংগৃহীত 7 October 2012 
  5. "Kolkata metro reaches New Garia"। Railway Gazette। 7 October 2012। সংগৃহীত 23 July 2011 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]