শ্রীনিবাস কৃষ্ণণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(শ্রীনিবাস কৃষ্ণান থেকে ঘুরে এসেছে)
শ্রীনিবাস কৃষ্ণণ
জন্ম (১৮৯৮-১২-০৪)ডিসেম্বর ৪, ১৮৯৮
মৃত্যু ১৪ জুন ১৯৬১(১৯৬১-০৬-১৪) (৬২ বছর)
কর্মক্ষেত্র পদার্থবিজ্ঞান
প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ
ন্যাশনাল ফিজিকাল ল্যাবরেটরী
প্রাক্তন ছাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ
পরিচিতির কারণ Raman effect

পদ্মভূষণ আচার্য কারিয়ামানিক্যম শ্রীনিবাস কৃষ্ণণ (কে এস কৃষ্ণণ নামেই বেশি পরিচিত) , ফেলো অব দ্য রয়েল সোসাইটি একজন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি রমন ইফেক্টের অন্যতম আবিষ্কারক।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

কৃষ্ণণ ১৮৯৮ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর তামিলনাডু রাজ্যের তিরুনেলভেলি জেলার ওয়াটরাপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুলেই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হলো কৃষ্ণণের। তারপর পাশের শ্রীভিলিপুত্তুর গ্রামের হিন্দু হাইস্কুল। সেখানে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিজ্ঞানের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা জন্মায় কৃষ্ণণের। কৃষ্ণণ তখন থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। দশম শ্রেণীতে ওঠার পর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক যখন আর্কিমেডিসের নীতির ওপর একটি রচনা লিখতে দিলেন কৃষ্ণণ শুধু রচনা লিখেই ক্ষান্ত হলো না – আর্কিমেডিসের নীতি কাজে লাগিয়ে কঠিন পদার্থের ঘনত্ব নির্ণয় করার জন্য একটি যন্ত্রও তৈরি করে ফেললো। কিছুদিন পরে অবশ্য সে জানতে পারলো যে তার তৈরি যন্ত্রটি নতুন কিছু নয় – অনেকদিন আগে থেকেই তা ‘নিকোলাস হাইড্রোমিটার’ নামে প্রচলিত। হিন্দু স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে মাদুরার আমেরিকান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেন কৃষ্ণণ। তারপর ভর্তি হলেন মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে। ভৌত বিজ্ঞানে বিএ পাশ করলেন। ১৯২৭ এর এপ্রিলে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এম-এসসি ডিগ্রির জন্য দরখাস্ত করলেন কৃষ্ণণ। ১৯২৩ সাল থেকে যেসব গবেষণা কাজ করেছেন সেগুলোর ভিত্তিতে রিসার্চ মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়ার জন্য আবেদনপত্রে সুপারিশ করেন স্যার সি ভি রামন। রামনের সুপারিশ ও কৃষ্ণণের গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে ১৯২৭ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন কৃষ্ণণ। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় কৃষ্ণণের গবেষণা-পত্রের ওপর ভিত্তি করে কৃষ্ণণকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে ১৯৩৩ সালে।

পেশাজীবন[সম্পাদনা]

মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ[সম্পাদনা]

মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে রসায়নের প্রদর্শক পদ খালি হলে সেখানে যোগ দিলেন কৃষ্ণণ।[১]। ক্রিশ্চিয়ান কলেজে চাকরি করার সময় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ নিয়মিত পড়তেন কৃষ্ণণ। সেখানে প্রফেসর রামনের গবেষণাপত্রগুলো পড়ে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললেন। রামনের জ্ঞানের গভীরতা ও পড়ানোর স্টাইলে মুগ্ধ শিক্ষার্থীদের অনেকেই রামনের রিসার্চগ্রুপে গবেষণা করার জন্য উদ্‌গ্রীব। প্রফেসর রামনের কাছ থেকে পদার্থবিজ্ঞান শিখবেন ভেবে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে এলেন ১৯২০ সালে। ১৯২১ সালে ইউরোপ ভ্রমণ-কালে রামন আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত যে সব পর্যবেক্ষণ করেছেন সেগুলোকে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করেছেন। ১৯২৩ সালের নভেম্বর মাসে রামনের গ্রুপে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দিলেন কে এস কৃষ্ণণ। পরবর্তী এক বছর ধরে কৃষ্ণণ পরীক্ষা করলেন ৬৫টি তরলের বিচ্ছুরণ ধর্ম। ১৯২৫ সালে ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলো কৃষ্ণণের প্রথম গবেষণাপত্র ‘অন দি মলিকিউলার স্ক্যাটারিং অব লাইট ইন লিকুইড্‌স’ [২]। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হলো কৃষ্ণণের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র [৩]। ১৯২৬ সালে স্যার রমনের সাথে আরো তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণণের। ১৯২৭ সালে কৃষ্ণণ নয়টি গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেন যাদের মধ্যে আটটির সহ-লেখক হিসেবে রামনের নাম আছে। সবগুলো পেপারই তরলের ভৌত-ধর্ম সংক্রান্ত। এই পেপারগুলো রামনের নোবেল বিজয়ী গবেষণার দিক-নির্দেশক। ১৯২৭ সালের শেষের আর্থার কম্পটনকে ‘কম্পটন ইফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে কৃষ্ণণ ও রামনের মনে হলো এক্সরে’র ক্ষেত্রে কম্পটন ইফেক্ট যেরকম সত্য – সেরকম ঘটনা আলোর ক্ষেত্রেও সত্য হবার সম্ভাবনা আছে। রামন সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাপারটা দ্রুত পরীক্ষা করে দেখবেন। ১৯২৮ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হলো পরীক্ষণের কাজ। রামন কৃষ্ণণের ওপর ভার দিলেন এ গবেষণার পরীক্ষাগুলো চালিয়ে যাবার জন্য। কৃষ্ণণ তখন এ সংক্রান্ত তত্ত্বীয় গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। ১৯২৩ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত স্যার সি ভি রামনের সাথে গবেষণা করে রামন-ইফেক্ট আবিষ্কারের পর ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিয়ে কৃস্টাল ম্যাগনেটিজম বিষয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সুযোগের মধ্যে বসে পরবর্তী পাঁচ বছরে এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন কৃষ্ণণ। সাম্প্রতিক কালে কার্বন সায়েন্সের যে অগ্রগতি হচ্ছে তাতে অনেক বছর আগে প্রকাশিত গ্রাফাইটের এন-আইসোট্রপিক চৌম্বকধর্ম সংক্রান্ত কৃষ্ণণের গবেষণাপত্রগুলোর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায় [৪]। কৃস্টালের গঠন সংক্রান্ত কৃষ্ণণের গবেষণাগুলো কাজে লাগে ঘনবস্তুর (কনডেন্সড ম্যাটার) চৌম্বকতত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় [৫]। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাথমিক যুগে চৌম্বকত্বের বিভিন্ন ধর্মের ব্যাখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যবহার শুরু করেন কৃষ্ণণ। এর জন্য যে সব পরীক্ষা তিনি করেন পরবর্তীতে সেগুলো চৌম্বকধর্ম বোঝার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হয় [৬]

ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্স[সম্পাদনা]

ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্স-এ গবেষণা সহকারী হিসেবে প্রথমবার এসেছিলেন কৃষ্ণণ ১৯২৩ সালে। দশ বছর পর এখন সেখানে প্রথম ‘মহেন্দ্রলাল সরকার অধ্যাপক’ হিসেবে ফিরে এসে নতুন উৎসাহে গবেষণা শুরু করলেন কৃষ্ণণ। বিভিন্ন যৌগলবণ ও লোহার চৌম্বকধর্ম নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা চালান কৃষ্ণণ। পর্যায় সারণীতে লোহার সাথে আরো যেসব মৌল আছে সবগুলোর চৌম্বরকধর্ম পরীক্ষা করে দেখা হলো। পর্যায় সারণীর রেয়ার আর্থ ইলেমেন্টগুলো পরীক্ষা করে দেখা হলো। যেসব কৃস্টালের খুবই সামান্য পরিমাণ চৌম্বকধর্ম আছে কৃষ্ণণ সেগুলো পরিমাপ করার পদ্ধতি বের করে ফেললেন। কৃস্টালের চৌম্বকক্ষেত্রের তত্ত্বীয় ফলাফলের সাথে মেলানো হলো। দেখা গেলো ভন ভেলক, পেনির তত্ত্বীয় ব্যাখ্যার সাথে মিলে যাচ্ছে। চৌম্বকধর্ম সম্পর্কিত পেপারগুলো প্রকাশিত হলো রয়েল সোসাইটি থেকে। গ্রাফাইট কৃস্টালের ওপর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় 'প্রসিডিংস অব রয়েল সোসাইটি'তে। কৃষ্ণণ প্রমাণ করলেন গ্রাফাইটের ডায়াম্যাগনেটিজম এর মান খুব বেশি। রয়েল সোসাইটির জার্নালে কৃষ্ণণের অনেকগুলো গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয় এসময়। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে চৌত্রিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণণের। কৃস্টাল ফিজিক্সে কৃষ্ণণের নাম উচ্চারিত হতে থাকে প্রায় নিয়মিত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হন কৃষ্ণণ। লর্ড রাদারফোর্ড নিজে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানান কৃষ্ণণকে।

ঢাকা বিশ্ব্বিদ্যালয়[সম্পাদনা]

১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রিডার পদের জন্য দরখাস্ত করলেন। তাঁর দরখাস্তের সাথে সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন প্রফেসর সি ভি রামন, দেবেন্দ্র মোহন বসু, শিশিরকুমার মিত্র প্রমুখ। নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষ্ণণের ইন্টারভিউ হলো। ১৯২৮ সালের ৭ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন কৃষ্ণণ। কৃষ্ণণ যোগ দিয়েই কাজ শুরু করলেন কৃস্টালের চৌম্বকধর্ম বিষয়ে। ডায়াম্যাগনেটিক ও প্যারাম্যাগনেটিক কৃস্টালের ভৌতধর্মের পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টা করলেন কৃষ্ণণ। যেসব কৃস্টালের বিভিন্ন তলের ভৌতধর্মের মধ্যে পার্থক্য থাকে তাদের বলা হয় এন্‌-আইসোট্রপিক কৃস্টাল। এসব কৃস্টালের একাধিক প্রতিসরাঙ্ক থাকতে পারে। কিন্তু ঠিক কী কারণে প্রতিসরাঙ্কের তারতম্য ঘটছে তা জানা ছিল না কারো। কৃষ্ণণ কতকগুলো সহজ পরীক্ষা-পদ্ধতি বের করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি সাধারণ গবেষণাগারে বসে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ – এই পাঁচ বছরে কৃস্টালের গঠন সম্পর্কিত যুগান্তকারী সব কাজ করেছেন তিনি এখানে। কৃষ্ণণের বিশটি গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয় এই পাঁচ বছরে।

এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়[সম্পাদনা]

১৯৪২ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন প্রফেসর কৃষ্ণণ। গবেষণার পাশাপাশি ক্লাসে পাঠদান কীভাবে আরো আকর্ষণীয় করা যায় সে ব্যাপারে কাজ করেন কৃষ্ণণ। আলোর চিরায়ত বিক্ষেপণ তত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা, এক্স-রে ও ইলেকট্রন এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব, ওয়েভ মেকানিক্স ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল থার্মোডায়নামিক্সের অনেক মৌলিক সমস্যার সমাধান করেন তিনি। সহকর্মী এ বি ভাটিয়া’র সহযোগিতায় তিনি বিশুদ্ধ ও সংকর ধাতুর বৈদ্যুতিক পরিবাহিতার তত্ত্বীয় অনুসন্ধান চালান। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায় ইলেকট্রনের বিক্ষেপণ তত্ত্ব আইনস্টাইন ও স্মোলুকৌস্কির তাপমাত্রার তারতম্যের তত্ত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার কারণে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত সময়ে মাত্র তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণণের।

ন্যাশনাল ফিজিকাল ল্যাবোরেটরি[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর দিল্লিতে নব প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফিজিকাল ল্যাবোরেটরির পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয় স্যার কৃষ্ণণকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কৃষ্ণণ জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক পদে এসে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও বৈজ্ঞানিক ভাবেই সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেন সমস্ত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বোর্ড অব রিসার্চ ইন নিউক্লিয়ার সায়েন্সের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন এসময় [৭]। কিন্তু এত প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও গবেষণার কাজ থেমে থাকেনি স্যার কৃষ্ণণের। আলোকের ব্যাতিচার, ইলেকট্রন-চাপ ও বিদ্যুৎ পরিবাহীতে তাপের বিস্তার নিয়ে কাজ করেছেন কৃষ্ণণ। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন থার্মিওনিক্স নিয়ে(থার্মিওনিক্স হলো উত্তপ্ত বস্তু থেকে যে ইলেকট্রন নির্গত হয় তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে ইলেকট্রনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজ)[৮]। সহকর্মী ডক্টর জৈনের সহযোগিতায় ইলেকট্রনের সেচুরেশান প্রেসার নির্ণয়ের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন কৃষ্ণণ। সহকর্মী ডক্টর সুন্দরমের সহযোগিতায় উত্তপ্ত নলের মধ্যে তাপমাত্রার বন্টন নীতির তত্ত্বীয় ভিত্তি স্থাপন করেন কৃষ্ণণ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চল্লিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় স্যার কৃষ্ণণের। ১৯৫৫ সালে আমেরিকান ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের বার্ষিক ডিনারে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় স্যার কৃষ্ণণকে। এ এক বিরল সম্মান। এর আগে যাঁরা এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন তাঁদের সবাই ছিলেন রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অথবা একাডেমি অব সায়েন্সের প্রেসিডেন্ট। কৃষ্ণণই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত যোগ্যতায় এ সম্মান পেলেন।

কৃষ্ণণের ডায়েরি[সম্পাদনা]

কৃষ্ণণের জীবদ্দশায় কৃষ্ণণের ডায়েরি অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৫৩ সালে প্রফেসর রামসেশানের সাথে কথোপকথনের সময় কৃষ্ণণ তাঁর ডায়েরির কথা উল্লেখ করেছিলেন [৯]। ১৯৬১ সালে কৃষ্ণণের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে শ্রীনিবাসনের কাছ থেকে ডায়েরিটি নিয়ে যান কে আর রামনাথন। ১৯৭০ সালের পর থেকে রামন-ইফেক্ট আবিষ্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখায় এই ডায়েরির অংশবিশেষ প্রকাশিত হতে থাকে কৃষ্ণণের পরিবারের অনুমতি ছাড়াই। কৃষ্ণণের ডায়েরি প্রথম সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে রয়েল সোসাইটির জার্নালে [১০]। ডায়েরিটি খুব একটা বড় নয়; ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ পর্যন্ত মাত্র কয়েকদিনের দিনলিপি পাওয়া যায় তাতে। রামন-এফেক্ট আবিষ্কারের দিনগুলোর প্রত্যক্ষ বিবরণ আছে এতে।

সামারফেল্ডের সাথে সাক্ষাৎ[সম্পাদনা]

১৯২৮ সালের অক্টোবর মাস। কলকাতায় এসেছেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সামারফেল্ড। পরপর পাঁচটি বক্তৃতা দিলেন তিনি ওয়েভ মেকানিক্সের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপর। কৃষ্ণণ সবগুলো বক্তৃতা শুনলেন। নিজের মত করে নোট নিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হবার মত করে একটা পান্ডুলিপি তৈরি করে সামারফেল্ডকে দিলেন। সামারফেল্ড পান্ডুলিপি পড়ে অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো তিনি নিজে লিখলেও এর চেয়ে ভালো লিখতে পারতেন না। সামারফেল্ড কৃষ্ণণকে বইটির সহ-লেখক হবার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু কৃষ্ণণ বিনীত ভাবে প্রত্যাখান করলেন সামারফেল্ডকে। ‘লেকচার্‌স অন ওয়েভ মেকানিক্স’ এর ভূমিকায় আর্নল্ড সামারফেল্ড কৃষ্ণণের অবদানের কথা স্বীকার করে অকুন্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছেন কৃষ্ণণকে।

নোবেল পুরস্কার ও কৃষ্ণণ[সম্পাদনা]

১৯৩০ সালে রামন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পৃথিবীবিখ্যাত হয়ে ওঠেন। নোবেল বক্তৃতায় রামন স্বীকার করেছেন কৃষ্ণণের অবদানের কথা। ১৯৩২ সালে অন্ধ্র ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসরের পদে কৃষ্ণণকে নিয়োগ করার জন্য সুপারিশ করে চিঠি লিখেছিলেন রামন। সেখানে তিনি লিখেছেন “১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে তার ওপর ভিত্তি না করে শুধুমাত্র ১৯২৮ সালের কাজের ওপর ভিত্তি করে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে কৃষ্ণণও নোবেল পুরস্কারের অংশীদার হতেন”।

রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ[সম্পাদনা]

১৯৪০ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান অধ্যাপক কৃষ্ণণ।

নাইট উপাধি প্রাপ্তি[সম্পাদনা]

১৯৪৬ সালে কৃষ্ণণকে নাইটহুড প্রদান করে ‘স্যার’ উপাধি দেয় ব্রিটিশ সরকার।

গবেষণাপত্র[সম্পাদনা]

বিজ্ঞানী স্যার কৃষ্ণণের প্রকাশিত ১৩৫টি গবেষণাপত্রের মধ্যে ৫০টি পেপার স্পেক্ট্রোস্কোপি সম্পর্কিত, ৬০টি পেপার ম্যাগনেটিজম, ২৩টি থার্মিওনিক্স, ২টি জনপ্রিয় লেখা [১১]

সম্মাননা[সম্পাদনা]

এক্স-রে কৃস্টালোগ্রাফির জন্য ১৯১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়াম ব্র্যাগ কৃষ্ণণকে আমন্ত্রণ জানান লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউটে। ১৯৩৭ সালে বেলজিয়ামের লিজ (Liege) ইউনিভার্সিটি মেডেল প্রদান করা হয় কৃষ্ণণকে। ১৯৪১ সালে কৃষ্ণ রাজেন্দ্র জুবিলি গোল্ড মেডেল পান প্রফেসর কৃষ্ণণ। জাতীয় পর্যায়ে ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত হন স্যার কৃষ্ণণ। ১৯৬১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পুরস্কার ভাটনগর পুরস্কার পান। ১৯৬১ সালে ভারতের জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করা হয় স্যার কৃষ্ণণকে।

ধর্মবিশ্বাস[সম্পাদনা]

বিজ্ঞান আর বিনয় পাশাপাশি ছিল কৃষ্ণণের জীবনে। যত বেশি সাফল্য পেয়েছেন তত বেশি বিনয়ী হয়ে উঠেছেন কৃষ্ণণ। ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব কৃষ্ণণের জীবনে গভীরভাবে ছিল। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান একাকী অনেক কিছুরই সমাধান দিতে পারে না। বিজ্ঞানের সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শনেরও দরকার হয়।

পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

কৃষ্ণণ দুই পুত্র ও চার কন্যার জনক।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৬১ সালে জুন মাসের ১৩ তারিখ বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকে মারা যান স্যার কৃষ্ণণ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Subodh Mahanti, Kariamanikkam Srinivasa Krishnan. Vigyan Prasar Science Portal www.vigyanprasar.gov.in/scientists/KS_Krishnan/KariamanikkamSKrishnan.htm, 2011
  2. K. S. Krishnan, On the molecular scattering of light in liquids. Philosophical Magazine, 1925. 50: p. 679-715
  3. K. S. Krishnan, A discussion of the available data on light-scattering in fluids. Proc. Indican Assn. Cutiv. Sci., 1926. 9: p. 251-270
  4. M. S. Dresselhaus, G. Dresselhaus, and A.K. Ramdas, Impact of K. S. Krishnan on contemorary carbon science research. Current Science, 1998. 75(10): p. 1212-1216.
  5. A. K. Ramdas and H. Alawadhi, Magneto-optics of II-VI diluted magnetic semiconductors. Current Science, 1998. 75(11): p. 1216-1221
  6. A. K. Raychaudhuri, Modern magnetism and the pioneering experiments of K. S. Krishnan. Current Science, 1998. 75(11): p. 12071211
  7. Shiv Visvanathan, The tragedy of K. S. Krishnan: A sociological fable. Current Science, 1998. 75(11): p. 1272-1275
  8. Pranab Bandyopadhyay, Great Indian Scientists. 1993, Delhi: Book Club
  9. S. Ramaseshan, A conversation with K. S. Krishnan on the story of the discovery of the Raman effect. Current Science, 1998. 75(11): p. 1265-1272.
  10. Mallik, D.C.V., The Raman Effect and Krishnan’s Diary. Notes and Records of the Royal Society of London, 2000. 54(1): p. 67-83
  11. B. S. Kademani, V. L. Kalyane, and K. A. B, Scientometric portrait of sir K S Krishnan. Indian Jour. Inf., Lib. & Soc., 1996. 9(2): p. 125-150