শ্রীনিবাস কৃষ্ণান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শ্রীনিবাস কৃষ্ণান
চিত্র:কৃষ্ণান.jpg
জন্ম (১৮৯৮-১২-০৪)ডিসেম্বর ৪, ১৮৯৮
মৃত্যু ১৪ জুন ১৯৬১(১৯৬১-০৬-১৪) (৬২ বছর)
কর্মক্ষেত্র পদার্থবিজ্ঞান
প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ
ন্যাশনাল ফিজিকাল ল্যাবরেটরী
প্রাক্তন ছাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ
পরিচিতির কারণ Raman effect

পদ্মভূষণ আচার্য কারিয়ামানিক্যম শ্রীনিবাস কৃষ্ণান (কে এস কৃষ্ণান নামেই বেশি পরিচিত) , ফেলো অব দ্য রয়েল সোসাইটি একজন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি রমন ইফেক্টের অন্যতম আবিষ্কারক।

পরিচ্ছেদসমূহ

শৈশব ও শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

কৃষ্ণান ১৮৯৮ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর তামিলনাডু রাজ্যের তিরুনেলভেলি জেলার ওয়াটরাপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুলেই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হলো কৃষ্ণানের। তারপর পাশের শ্রীভিলিপুত্তুর গ্রামের হিন্দু হাইস্কুল। সেখানে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিজ্ঞানের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা জন্মায় কৃষ্ণানের। কৃষ্ণান তখন থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। দশম শ্রেণীতে ওঠার পর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক যখন আর্কিমেডিসের নীতির ওপর একটি রচনা লিখতে দিলেন কৃষ্ণান শুধু রচনা লিখেই ক্ষান্ত হলো না – আর্কিমেডিসের নীতি কাজে লাগিয়ে কঠিন পদার্থের ঘনত্ব নির্ণয় করার জন্য একটি যন্ত্রও তৈরি করে ফেললো। কিছুদিন পরে অবশ্য সে জানতে পারলো যে তার তৈরি যন্ত্রটি নতুন কিছু নয় – অনেকদিন আগে থেকেই তা ‘নিকোলাস হাইড্রোমিটার’ নামে প্রচলিত। হিন্দু স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে মাদুরার আমেরিকান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেন কৃষ্ণান। তারপর ভর্তি হলেন মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে। ভৌত বিজ্ঞানে বিএ পাশ করলেন। ১৯২৭ এর এপ্রিলে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এম-এসসি ডিগ্রির জন্য দরখাস্ত করলেন কৃষ্ণান। ১৯২৩ সাল থেকে যেসব গবেষণা কাজ করেছেন সেগুলোর ভিত্তিতে রিসার্চ মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়ার জন্য আবেদনপত্রে সুপারিশ করেন স্যার সি ভি রামন। রামনের সুপারিশ ও কৃষ্ণানের গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে ১৯২৭ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন কৃষ্ণান। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় কৃষ্ণানের গবেষণা-পত্রের ওপর ভিত্তি করে কৃষ্ণানকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে ১৯৩৩ সালে।

পেশাজীবন[সম্পাদনা]

মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ[সম্পাদনা]

মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজে রসায়নের প্রদর্শক পদ খালি হলে সেখানে যোগ দিলেন কৃষ্ণান।[১]। ক্রিশ্চিয়ান কলেজে চাকরি করার সময় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ নিয়মিত পড়তেন কৃষ্ণান। সেখানে প্রফেসর রামনের গবেষণাপত্রগুলো পড়ে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললেন। রামনের জ্ঞানের গভীরতা ও পড়ানোর স্টাইলে মুগ্ধ শিক্ষার্থীদের অনেকেই রামনের রিসার্চগ্রুপে গবেষণা করার জন্য উদ্‌গ্রীব। প্রফেসর রামনের কাছ থেকে পদার্থবিজ্ঞান শিখবেন ভেবে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে এলেন ১৯২০ সালে। ১৯২১ সালে ইউরোপ ভ্রমণ-কালে রামন আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত যে সব পর্যবেক্ষণ করেছেন সেগুলোকে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করেছেন। ১৯২৩ সালের নভেম্বর মাসে রামনের গ্রুপে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দিলেন কে এস কৃষ্ণান। পরবর্তী এক বছর ধরে কৃষ্ণান পরীক্ষা করলেন ৬৫টি তরলের বিচ্ছুরণ ধর্ম। ১৯২৫ সালে ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলো কৃষ্ণানের প্রথম গবেষণাপত্র ‘অন দি মলিকিউলার স্ক্যাটারিং অব লাইট ইন লিকুইড্‌স’ [২]। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হলো কৃষ্ণানের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র [৩]। ১৯২৬ সালে স্যার রমনের সাথে আরো তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের। ১৯২৭ সালে কৃষ্ণান নয়টি গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেন যাদের মধ্যে আটটির সহ-লেখক হিসেবে রামনের নাম আছে। সবগুলো পেপারই তরলের ভৌত-ধর্ম সংক্রান্ত। এই পেপারগুলো রামনের নোবেল বিজয়ী গবেষণার দিক-নির্দেশক। ১৯২৭ সালের শেষের আর্থার কম্পটনকে ‘কম্পটন ইফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে কৃষ্ণান ও রামনের মনে হলো এক্সরে’র ক্ষেত্রে কম্পটন ইফেক্ট যেরকম সত্য – সেরকম ঘটনা আলোর ক্ষেত্রেও সত্য হবার সম্ভাবনা আছে। রামন সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাপারটা দ্রুত পরীক্ষা করে দেখবেন। ১৯২৮ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হলো পরীক্ষণের কাজ। রামন কৃষ্ণানের ওপর ভার দিলেন এ গবেষণার পরীক্ষাগুলো চালিয়ে যাবার জন্য। কৃষ্ণান তখন এ সংক্রান্ত তত্ত্বীয় গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। ১৯২৩ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত স্যার সি ভি রামনের সাথে গবেষণা করে রামন-ইফেক্ট আবিষ্কারের পর ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিয়ে কৃস্টাল ম্যাগনেটিজম বিষয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সুযোগের মধ্যে বসে পরবর্তী পাঁচ বছরে এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন কৃষ্ণান। সাম্প্রতিক কালে কার্বন সায়েন্সের যে অগ্রগতি হচ্ছে তাতে অনেক বছর আগে প্রকাশিত গ্রাফাইটের এন-আইসোট্রপিক চৌম্বকধর্ম সংক্রান্ত কৃষ্ণানের গবেষণাপত্রগুলোর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায় [৪]। কৃস্টালের গঠন সংক্রান্ত কৃষ্ণানের গবেষণাগুলো কাজে লাগে ঘনবস্তুর (কনডেন্সড ম্যাটার) চৌম্বকতত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় [৫]। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাথমিক যুগে চৌম্বকত্বের বিভিন্ন ধর্মের ব্যাখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যবহার শুরু করেন কৃষ্ণান। এর জন্য যে সব পরীক্ষা তিনি করেন পরবর্তীতে সেগুলো চৌম্বকধর্ম বোঝার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হয় [৬]

ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্স[সম্পাদনা]

ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্স-এ গবেষণা সহকারী হিসেবে প্রথমবার এসেছিলেন কৃষ্ণান ১৯২৩ সালে। দশ বছর পর এখন সেখানে প্রথম ‘মহেন্দ্রলাল সরকার অধ্যাপক’ হিসেবে ফিরে এসে নতুন উৎসাহে গবেষণা শুরু করলেন কৃষ্ণান। বিভিন্ন যৌগলবণ ও লোহার চৌম্বকধর্ম নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা চালান কৃষ্ণান। পর্যায় সারণীতে লোহার সাথে আরো যেসব মৌল আছে সবগুলোর চৌম্বরকধর্ম পরীক্ষা করে দেখা হলো। পর্যায় সারণীর রেয়ার আর্থ ইলেমেন্টগুলো পরীক্ষা করে দেখা হলো। যেসব কৃস্টালের খুবই সামান্য পরিমাণ চৌম্বকধর্ম আছে কৃষ্ণান সেগুলো পরিমাপ করার পদ্ধতি বের করে ফেললেন। কৃস্টালের চৌম্বকক্ষেত্রের তত্ত্বীয় ফলাফলের সাথে মেলানো হলো। দেখা গেলো ভন ভেলক, পেনির তত্ত্বীয় ব্যাখ্যার সাথে মিলে যাচ্ছে। চৌম্বকধর্ম সম্পর্কিত পেপারগুলো প্রকাশিত হলো রয়েল সোসাইটি থেকে। গ্রাফাইট কৃস্টালের ওপর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় 'প্রসিডিংস অব রয়েল সোসাইটি'তে। কৃষ্ণান প্রমাণ করলেন গ্রাফাইটের ডায়াম্যাগনেটিজম এর মান খুব বেশি। রয়েল সোসাইটির জার্নালে কৃষ্ণানের অনেকগুলো গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয় এসময়। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে চৌত্রিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের। কৃস্টাল ফিজিক্সে কৃষ্ণানের নাম উচ্চারিত হতে থাকে প্রায় নিয়মিত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হন কৃষ্ণান। লর্ড রাদারফোর্ড নিজে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানান কৃষ্ণানকে।

ঢাকা বিশ্ব্বিদ্যালয়[সম্পাদনা]

১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রিডার পদের জন্য দরখাস্ত করলেন। তাঁর দরখাস্তের সাথে সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন প্রফেসর সি ভি রামন, দেবেন্দ্র মোহন বসু, শিশিরকুমার মিত্র প্রমুখ। নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষ্ণানের ইন্টারভিউ হলো। ১৯২৮ সালের ৭ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন কৃষ্ণান। কৃষ্ণান যোগ দিয়েই কাজ শুরু করলেন কৃস্টালের চৌম্বকধর্ম বিষয়ে। ডায়াম্যাগনেটিক ও প্যারাম্যাগনেটিক কৃস্টালের ভৌতধর্মের পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টা করলেন কৃষ্ণান। যেসব কৃস্টালের বিভিন্ন তলের ভৌতধর্মের মধ্যে পার্থক্য থাকে তাদের বলা হয় এন্‌-আইসোট্রপিক কৃস্টাল। এসব কৃস্টালের একাধিক প্রতিসরাঙ্ক থাকতে পারে। কিন্তু ঠিক কী কারণে প্রতিসরাঙ্কের তারতম্য ঘটছে তা জানা ছিল না কারো। কৃষ্ণান কতকগুলো সহজ পরীক্ষা-পদ্ধতি বের করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি সাধারণ গবেষণাগারে বসে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ – এই পাঁচ বছরে কৃস্টালের গঠন সম্পর্কিত যুগান্তকারী সব কাজ করেছেন তিনি এখানে। কৃষ্ণানের বিশটি গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয় এই পাঁচ বছরে।

এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়[সম্পাদনা]

১৯৪২ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন প্রফেসর কৃষ্ণান। গবেষণার পাশাপাশি ক্লাসে পাঠদান কীভাবে আরো আকর্ষণীয় করা যায় সে ব্যাপারে কাজ করেন কৃষ্ণান। আলোর চিরায়ত বিক্ষেপণ তত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা, এক্স-রে ও ইলেকট্রন এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব, ওয়েভ মেকানিক্স ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল থার্মোডায়নামিক্সের অনেক মৌলিক সমস্যার সমাধান করেন তিনি। সহকর্মী এ বি ভাটিয়া’র সহযোগিতায় তিনি বিশুদ্ধ ও সংকর ধাতুর বৈদ্যুতিক পরিবাহিতার তত্ত্বীয় অনুসন্ধান চালান। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায় ইলেকট্রনের বিক্ষেপণ তত্ত্ব আইনস্টাইন ও স্মোলুকৌস্কির তাপমাত্রার তারতম্যের তত্ত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার কারণে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত সময়ে মাত্র তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের।

ন্যাশনাল ফিজিকাল ল্যাবোরেটরি[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর দিল্লিতে নব প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফিজিকাল ল্যাবোরেটরির পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয় স্যার কৃষ্ণানকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কৃষ্ণান জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক পদে এসে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও বৈজ্ঞানিক ভাবেই সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেন সমস্ত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বোর্ড অব রিসার্চ ইন নিউক্লিয়ার সায়েন্সের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন এসময় [৭]। কিন্তু এত প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও গবেষণার কাজ থেমে থাকেনি স্যার কৃষ্ণানের। আলোকের ব্যাতিচার, ইলেকট্রন-চাপ ও বিদ্যুৎ পরিবাহীতে তাপের বিস্তার নিয়ে কাজ করেছেন কৃষ্ণান। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন থার্মিওনিক্স নিয়ে(থার্মিওনিক্স হলো উত্তপ্ত বস্তু থেকে যে ইলেকট্রন নির্গত হয় তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে ইলেকট্রনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজ)[৮]। সহকর্মী ডক্টর জৈনের সহযোগিতায় ইলেকট্রনের সেচুরেশান প্রেসার নির্ণয়ের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন কৃষ্ণান। সহকর্মী ডক্টর সুন্দরমের সহযোগিতায় উত্তপ্ত নলের মধ্যে তাপমাত্রার বন্টন নীতির তত্ত্বীয় ভিত্তি স্থাপন করেন কৃষ্ণান। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চল্লিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় স্যার কৃষ্ণানের। ১৯৫৫ সালে আমেরিকান ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের বার্ষিক ডিনারে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় স্যার কৃষ্ণানকে। এ এক বিরল সম্মান। এর আগে যাঁরা এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন তাঁদের সবাই ছিলেন রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অথবা একাডেমি অব সায়েন্সের প্রেসিডেন্ট। কৃষ্ণানই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত যোগ্যতায় এ সম্মান পেলেন।

কৃষ্ণানের ডায়েরি[সম্পাদনা]

কৃষ্ণানের জীবদ্দশায় কৃষ্ণানের ডায়েরি অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৫৩ সালে প্রফেসর রামসেশানের সাথে কথোপকথনের সময় কৃষ্ণান তাঁর ডায়েরির কথা উল্লেখ করেছিলেন [৯]। ১৯৬১ সালে কৃষ্ণানের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে শ্রীনিভাসনের কাছ থেকে ডায়েরিটি নিয়ে যান কে আর রামনাথন। ১৯৭০ সালের পর থেকে রামন-ইফেক্ট আবিষ্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখায় এই ডায়েরির অংশবিশেষ প্রকাশিত হতে থাকে কৃষ্ণানের পরিবারের অনুমতি ছাড়াই। কৃষ্ণানের ডায়েরি প্রথম সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে রয়েল সোসাইটির জার্নালে [১০]। ডায়েরিটি খুব একটা বড় নয়; ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ পর্যন্ত মাত্র কয়েকদিনের দিনলিপি পাওয়া যায় তাতে। রামন-ইফেক্ট আবিষ্কারের দিনগুলোর প্রত্যক্ষ বিবরণ আছে এতে। সি ভি রামনকে কৃষ্ণান ‘প্রফেসর’ বলে সম্বোধন করতেন।

রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

গত তিন চারদিন ধরে জৈব-বাষ্পের আলোক-নির্গমন সংক্রান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করছি। পরীক্ষামূলক গবেষণা করিনি অনেকদিন। সত্যি বলতে কী, নাইট্রিক অক্সাইডের চৌম্বকীয় দ্বৈত-প্রতিসরণ (magnetic double refraction) সংক্রান্ত শেষ পরীক্ষাটা করেছিলাম ১৯২৬ সালের গ্রীষ্মকালে। তারপর থেকে নিজের ডেস্কে এমন ভাবে সিঁধিয়ে ছিলাম যে অন্যকিছু করার সময়ই পাইনি। অবশ্য গত মার্চে এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের ওপর এক্স-রে’র বিক্ষেপন পরীক্ষা করার জন্য এক্স-রে টিউব সেট করার কাজ করেছিলাম। কাজটা অবশ্য শেষ করতে পারিনি। কারণ প্রথমতঃ চৌম্বকত্বের তত্ত্বে কিছু আকর্ষণীয় সমস্যা দেখা যাচ্ছিলো (যেমন কেলাসিত নাইট্রেট ও কার্বোনেটের অসাম্যতা) এবং দ্বিতীয়তঃ গরমের ছুটিতে ডক্টর শেঠির যে আমাদের ল্যাবে উচ্চ-তাপমাত্রার তরলে এক্সরে-র বিক্ষেপন নিয়ে কাজ করার কথা ছিল তা করা যায় নি কারণ কাজ করার জন্য আমাদের অতিরিক্ত টিউব ছিল না। প্রফেসর যেমন বলেন, কোন বিজ্ঞান গবেষকেরই উচিত নয় সত্যিকারের পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে কিছু সময়ের জন্যও দূরে থাকা। তাই আমাকে কিছু পরীক্ষামূলক কাজে নিয়োজিত রাখার জন্যই প্রফেসর আমাকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। যদিও আমার তত্ত্বীয় কাজও খুব ফলপ্রসূ ছিল সাম্প্রতিক কালে। মূলত আমাদের সব গবেষণা- বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় দ্বৈত-প্রতিসরণ, কৃস্টালের ম্যাগনেটিক এন-আইসোট্রপি, ধাতব পর্দার ওপর আলোর বিচ্ছুরণ, ল্যাংগেভিন তত্ত্বের পরিবর্ধন সংক্রান্ত তিনটি পেপার, লরেঞ্জ-ডিবাই তত্ত্ব, আলোক বিক্ষেপণের রামানাথন তত্ত্ব, তরলের ওপর ম্যাক্সওয়েল তত্ত্বের প্রভাব ইত্যাদি মিলিয়ে ১১টি পেপার ও নেচার সাময়িকীতে দুটো চিঠি আমরা প্রকাশ করেছি গত বিশ মাসের মধ্যে। তবুও প্রফেসরের সাথে একমত হতেই হয় যে- কোন বিজ্ঞান গবেষকেরই উচিত নয় পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে দূরে থাকা। প্রফেসর আমাকে করতে বলেছেন বলেই শুধু নয়, জৈব বাষ্পে আলোর উৎপত্তি সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলোতে আমার সম্পৃক্ত হওয়ার আরো একটা প্রধান কারণ হলো আমি চাইছিলাম যথাশীঘ্র পরীক্ষণ শুরু করতে। আসলে রামচন্দ্র রাওয়ের সাথে এন-আইসোট্রপির যে পেপারটা লেখার প্রস্তাব আমি করেছিলাম – গতমাসে সায়েন্স কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য তিনি যখন এখানে এসেছিলেন তখন দু’জনে মিলে পেপারটা কিছুটা লিখেও ছিলাম – সেটা এখনো শেষ হয়নি। সায়েন্স কংগ্রেসের আগে তরলের প্রতিসরাঙ্ক সম্পর্কিত যে পেপারটা আমি শুরু করেছিলাম তাও শেষ করতে হবে। জ্যামিন ইফেক্টের একটা তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টাও করেছি সপ্তাহ খানেক। অনেকদিন আগে প্রফেসর কিছু সাবানের ফেনার ছবি তুলে নিকেলের ফ্রেমে আটকে রেখেছিলেন। সেগুলোও পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করলাম যদি দ্বৈত-প্রতিসরণের কোন প্রমাণ মেলে। এগুলোর জন্য অনেক সময়ের দরকার। যাই হোক, আমি ভাবলাম ডেস্ক ছেড়ে উঠেই পরীক্ষণের কাজে লেগে গেলে মন্দ হয় না। সে অনুসারে গত তিন-চারদিন ধরে আমার সবটুকু সময় আমি পরীক্ষণের পেছনেই দিয়েছি। মনে হচ্ছে এই বিষয়টি অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যদিও এখনো পর্যন্ত কোন ধরণের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি যা দিয়ে পরীক্ষণের ফলাফলগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া যায়।

এনথ্রাসিনের বাষ্প পরীক্ষা করে দেখলাম। অনেক আলো তৈরি হয় এতে। কিন্তু প্রিজমের মধ্য দিয়ে দেখলে মনে হচ্ছে কোন ধরণের মেরুকরণ ঘটছে না। প্রফেসরও সবসময় কাজ করছেন আমার সাথে।

ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন থেকে আমাদের ম্যাক্সওয়েল ইফেক্ট সম্পর্কিত পেপারটির প্রুফ এসেছে আজ।

প্রফেসর সম্প্রতি মিস্টার ভেংকটেশ্বরণের সাথে এরোম্যাটিক তরলের ফ্লুরোসেন্স পরীক্ষা করে দেখেছেন। অতিবেগুনি রশ্মির কাছাকাছি তরঙ্গের সূর্যালোকে দেখা গেছে কিছু কিছু তরলের ফ্লোরোসেন্সে মেরুকরণ ঘটছে। যাই হোক এনথ্রাসিনের বাষ্পের ফ্লুরোসেন্সে কোন মেরুকরণ দেখা যায় নি। প্রফেসর আমাকে বলেছেন এগুলো আর একটু যাচাই করে নিতে।

সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রফেসর যখন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের মিটিং উপলক্ষে ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছিলেন তখন তাঁর সাথে স্টেশনে গিয়েছিলাম আমি। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম যে ডক্টর এ এল নারায়ণন আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতে দরখাস্ত করে দেখতে ডক্টরেটের জন্য তিন বছরের সময়সীমাকে কমিয়ে নেয়া যায় কি না। প্রফেসরকে অনুরোধ করেছিলাম মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট মেম্বারদের কারো সাথে দেখা হলে যেন ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা করেন।

প্রফেসর আজ আমাকে বললেন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার ভেংকটরত্নমের সাথে তাঁর টেলিফোনে কথা হয়েছে কিন্তু দেখা হয় নি। যাই হোক, প্রফেসর জানালেন স্যার ভেঙ্কট তাঁকে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতা দিতে। স্যার ভেঙ্কটরত্নমকে চিঠি লেখার সময় প্রফেসর আমার কথাও লিখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি আমার একাডেমিক ক্যারিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিলেন। কথাপ্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ করলেন যে ইউনিভার্সিটিতে যদি একক লেকচারের পরিবর্তে সিরিজ লেকচারের ব্যবস্থা হয় তাহলে তিনি আমাকেও নিয়ে যাবেন।

সারাদিন পেপারটার প্রুফ দেখলাম আর গাণিতিক সমীকরণগুলো ঠিক আছে কি না দেখে নিলাম।

মঙ্গলবার ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

অতিবেগুণী আলোর কাছাকাছি এলে কিছু কিছু এরোম্যাটিক তরলের ফ্লুরোসেন্সের যে মেরুকরণ ঘটে তা যাচাই করে দেখার চেষ্টা করলাম সারাদিন। ঘটনাক্রমে আবিষ্কার করলাম যে সব বিশুদ্ধ তরলেই জোরালো ফ্লুরোসেন্স ঘটছে। এবং আরো আশ্চর্য বিষয় হলো তাদের সবগুলোরই তীব্র মেরুকরণ ঘটছে। এমনকি সাধারণ আলোতেও তা দেখা যাচ্ছে। এলিফেটিক তরলের মেরুকরণ এরোম্যাটিক তরলের তুলনায় বেশি। ফ্লুরোসেন্ট আলোর মেরুকরণ সাধারণ ভাবে বিক্ষেপিত আলোর মেরুকরণের সমান্তরালে ঘটছে। অর্থাৎ অণুর অপটিক্যাল এন-আইসোট্রপি যত ছোট – ফ্লুরোসেন্ট আলোর মেরুকরণ ততই বড়।

আমি যখন প্রফেসরকে আমার পরীক্ষণের ফলাফল জানালাম তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে সবগুলো তরল দৃশ্যমান আলোতেই পোলারাইজড ফ্লুরোসেন্স দেখাচ্ছে। তিনি যখন রুমে এলেন – আমি একটা নীল বাল্ব জ্বালিয়ে আলোর প্রবেশ পথে বেগুনি ফিল্টার বসিয়ে দিলাম। আলোর সবুজ ও হলুদ রেখা দেখে তিনি মন্তব্য করলেন, “কৃষ্ণান, তুমি নিশ্চয়ই মনে করছো না যে এদের সবগুলোই ফ্লুরোসেন্স?” যাই হোক, যখন তিনি সবুজ ও হলুদের সমন্বিত আলোর গতিপথ পরিবর্তন করে আলোর প্রবেশ পথের দিকে নিয়ে এলেন – তখন আর কোন আলোক রেখা দেখা গেলো না। তিনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। অনেক বার পরীক্ষাটা করে দেখলেন কীভাবে আলোর মেরুকরণ ঘটছে। এমন চমৎকার ফলাফলে তিনি খুবই উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। একটার পর একটা করে সবগুলো তরলই পরীক্ষা করে দেখা হলো। সবগুলো তরলেই একই রকম ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রফেসর ভাবতে লাগলেন – কীভাবে আমরা কেউই এই ব্যাপারটা গত পাঁচ বছরে একবারও ধরতে পারিনি।

বিকেলে ফ্লুরোসেন্সের মেরুকরণ সম্পর্কিত আরো কিছু ডাটা সংগ্রহ করলাম।

বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে প্রফেসর আমাকে একটা টাইপ করা চিঠির ড্রাফ্‌ট দেখালেন। গতকালের তারিখ দেয়া (অর্থাৎ ৬ই) স্যার ভেঙ্কটরত্নমের কাছে লেখা চিঠি – কালি দিয়ে অনেক জায়গায় পরিবর্তন করা হয়েছে। চিঠিতে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য তিনবছরের সময়সীমার বাঁধনটা শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি আমার ব্যাপারে অতিরিক্ত রকমের প্রশংসা করে উল্লেখ করেছেন যে তিনি মনে করেন আমি অনেক কম সময়ের ভেতর রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পেয়ে যেতে পারি। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে চিঠিটি টাইপ করা হয়েছে গতকাল। আজ সকালের উত্তেজনাপূর্ণ ফলাফলের পরে এ চিঠি লেখা হয়নি। আরো আশ্চর্য হলাম আমাদের প্রস্তাবিত গবেষণাপত্রটির শিরোনাম আমি যা দিয়েছিলাম – ‘দি পোলারাইজড ফ্লুরোসেন্স এক্সিবিটেড বাই অর্গানিক ভ্যাপার্‌স’ – তাই রেখে দিয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র ‘ভ্যাপার্‌স’ এর জায়গায় ‘লিকুইড’ বসিয়ে দিয়েছেন।

রাতের খাবারের পর ভেঙ্কটেশ্বরণ আর আমি আমাদের রুমে বসে গল্প করছিলাম। এমন সময় প্রফেসর এলেন। রাত তখন প্রায় ন’টা বাজে। তিনি ডাকলেন আমাকে। নিচে নেমে এসে দেখলাম তিনি খুব উত্তেজিত। এত রাতে তিনি ছুটে এসেছেন আমাকে বলতে যে সকালে আমরা যা দেখেছি তা নিশ্চয়ই ক্রেমার্স-হাইজেনবার্গ ইফেক্ট। সুতরাং আমরা ঠিক করলাম এই ইফেক্টকে আমরা ফ্লুরোসেন্স বলার চেয়ে ‘মডিফাইড স্ক্যাটারিং ইফেক্ট’ বলে ডাকবো। আমরা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় পনেরো মিনিট ধরে কথা বললাম। তিনি বার বার আমাদের আবিষ্কারের অভিনবত্ব সম্পর্কে বলছিলেন।

বুধবার ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

কিছু প্রচলিত তরলের মডিফাইড স্ক্যাটারিং সম্পর্কিত প্রাথমিক মেরুকরণের পরিমাপ করলাম।

বৃহস্পতিবার ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

সকালে বড় টেলিস্কোপটি ফিট করে বাষ্পের প্রভাব দেখার প্রাথমিক প্রস্তুতিটুকু করে রাখলাম। প্রস্তুতি শেষ হবার আগেই প্রফেসর কলেজে চলে গেলেন ক্লাস নিতে।

দুপুরের পর ইথারের বাষ্প নিয়ে কাজ করে একই ফলাফল পাওয়া গেল। ক্রমান্বয়ে আরো কয়েকটি পরীক্ষা করেও একই রকম সাফল্য পাওয়া গেল।

বিকেল তিনটের দিকে প্রফেসর যখন ফিরলেন তাঁকে জানালাম আমার পরীক্ষণের ফলাফলের কথা। তখনো দিনের আলো প্রচুর। প্রফেসর নিজের চোখেই দেখতে পেলেন। তিনি উত্তেজনায় বাচ্চা ছেলের মত চিৎকার চেঁচামেচি করে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁর অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো যে কত বড় মাপের একটা আবিষ্কার আমরা করে ফেলেছি। প্রফেসর বললেন ক্লাস নেবার সময় তাঁর খুব অস্থির লাগছিলো যে পরীক্ষণের শুরুতেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। তবে আমার ওপর এই বিশ্বাস তাঁর ছিল যে আমি আমার আবিষ্কারের শেষ না দেখে থামবো না। তিনি আমাকে বললেন সবাইকে সেখানে ডেকে নিয়ে আসতে। এসে দেখে যাক আমাদের আবিষ্কার। প্রায় সাথে সাথেই নাটকীয় ভাবে আমাদের মেকানিককে ডেকে উচ্চ-তাপমাত্রার বাষ্পে আমাদের ইফেক্ট-টা পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হলো।

সন্ধ্যেবেলা হট বাথ-টাবের ব্যবস্থা করতে করতে সময় গেলো, ঘর থেকে বেরোইনি একবারও। সান্ধ্যভ্রমণ থেকে ফিরে প্রফেসর আমাকে বললেন এরকম বড় বড় সমস্যার সমাধান করাই হবে আমার কাজ। আরো বললেন এই কাজটা শেষ হলে ইলেকট্রনের স্পিন সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো শুরু করা উচিত আমার। ভেঙ্কটশ্বরণকে বললেন এই আবিষ্কারের কথা। আমাদের সাথে আলোচনার সময় প্রফেসর বললেন আমাদের আবিষ্কারটার নাম হওয়া উচিত ‘রামন-কৃষ্ণান ইফেক্ট’। ভেঙ্কটশ্বরণ বা অন্যরা এ নামে ডাকবে হয়তো। কথাপ্রসঙ্গে প্রফেসর বললেন এবার আমার রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাওয়াটা আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। বললেন আমি সম্ভবত ডক্টরেট পাওয়ার আগেই রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পেয়ে যাবো। রামানুজন মাত্র বিএ পাশ করেই ফেলোশিপ পেয়েছিলেন।

১০-১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

বেশ কয়েকটি বাষ্প নিয়ে পরীক্ষা করলাম। যদিও তাদের অনেকগুলোই আমাদের ‘ইফেক্ট’দেখাচ্ছে – কিন্তু মডিফাইড স্ক্যাটারিং এর পোলারাইজেশান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু পাওয়া গেলো না।

বৃহস্পতিবার ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

উচ্চতাপমাত্রায় পেন্টেইন বাষ্প পরীক্ষা করে দেখলাম আজ। মডিফাইড স্ক্যাটারিং এর পরিষ্কার পোলারাইজেশান দেখা গেলো।

আজ নেচার সাময়িকীতে একটা নোট পাঠালাম ‘এ নিউ টাইপ অব সেকেন্ডারি রেডিয়েশান’ শিরোনামে।

শুক্রবার ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

পেন্টেইন বাষ্পের ফ্লুরোসেন্সের পোলারাইজেশান কনফার্ম করলেন প্রফেসর। আমার বাম চোখে খুব সমস্যা হচ্ছে। প্রফেসর বললেন সামনের কয়েকদিন পরীক্ষাগুলো তিনি নিজেই করতে পারবেন।

১৯-২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

আরো কিছু বাষ্পের পরীক্ষা করেছি আজ।

সোমবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

সৎমায়ের অনুষ্ঠান ছিল। এসোসিয়েশানে যাইনি।

মঙ্গলবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮[সম্পাদনা]

বিকেলবেলা এসোসিয়েশানে গিয়েছিলাম। প্রফেসর ছিলেন সেখানে। আমরা আমাদের পরীক্ষায় আপতিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘের কোন প্রভাব আছে কি না বের করার চেষ্টা করলাম। ইউরেনিয়াম গ্লাসের সাথে নীল-বেগুনী ফিল্টার যোগ করে দিলাম। ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সীমারেখা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেলো। ডাইরেক্ট ভিশান স্পেক্ট্রোস্কোপ দিয়ে বর্ণালীর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। আপতিত আলোকরশ্মি থেকে মডিফাইড স্ক্যাটারিং এর ফলে প্রতিসরিত রশ্মি আলাদা হয়ে গেছে। দুটোর মাঝে একটা কালো রেখা দেখা যাচ্ছে।

এটা থেকে উৎসাহ পেয়ে আমরা মনোক্রোম্যাটিক লাইট ব্যবহার করার — প্রফেসর রামন নিজেই ‘রামন-কৃষ্ণান ইফেক্ট’ নামকরণ করার পক্ষে থাকলেও পরে কীভাবে যেন কৃষ্ণানের নাম বাদ পড়ে গেলো। অন্তর্মুখী কৃষ্ণান কখনো এই নিয়ে কারো কাছে কোন অভিযোগ করেন নি।

ডায়েরিটি এখানেই হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে। সেদিনই ‘রামন-ইফেক্ট’ আবিষ্কারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

সামারফেল্ডের সাথে সাক্ষাৎ[সম্পাদনা]

১৯২৮ সালের অক্টোবর মাস। কলকাতায় এসেছেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সামারফেল্ড। পরপর পাঁচটি বক্তৃতা দিলেন তিনি ওয়েভ মেকানিক্সের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপর। কৃষ্ণান সবগুলো বক্তৃতা শুনলেন। নিজের মত করে নোট নিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হবার মত করে একটা পান্ডুলিপি তৈরি করে সামারফেল্ডকে দিলেন। সামারফেল্ড পান্ডুলিপি পড়ে অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো তিনি নিজে লিখলেও এর চেয়ে ভালো লিখতে পারতেন না। সামারফেল্ড কৃষ্ণানকে বইটির সহ-লেখক হবার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু কৃষ্ণান বিনীত ভাবে প্রত্যাখান করলেন সামারফেল্ডকে। ‘লেকচার্‌স অন ওয়েভ মেকানিক্স’ এর ভূমিকায় আর্নল্ড সামারফেল্ড কৃষ্ণানের অবদানের কথা স্বীকার করে অকুন্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছেন কৃষ্ণানকে।

নোবেল পুরস্কার ও কৃষ্ণান[সম্পাদনা]

১৯৩০ সালে রামন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পৃথিবীবিখ্যাত হয়ে ওঠেন। নোবেল বক্তৃতায় রামন স্বীকার করেছেন কৃষ্ণানের অবদানের কথা। ১৯৩২ সালে অন্ধ্র ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসরের পদে কৃষ্ণানকে নিয়োগ করার জন্য সুপারিশ করে চিঠি লিখেছিলেন রামন। সেখানে তিনি লিখেছেন “১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে তার ওপর ভিত্তি না করে শুধুমাত্র ১৯২৮ সালের কাজের ওপর ভিত্তি করে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে কৃষ্ণানও নোবেল পুরস্কারের অংশীদার হতেন”।

রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ[সম্পাদনা]

১৯৪০ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান অধ্যাপক কৃষ্ণান।

নাইট উপাধি প্রাপ্তি[সম্পাদনা]

১৯৪৬ সালে কৃষ্ণানকে নাইটহুড প্রদান করে ‘স্যার’ উপাধি দেয় ব্রিটিশ সরকার।

গবেষণাপত্র[সম্পাদনা]

বিজ্ঞানী স্যার কৃষ্ণানের প্রকাশিত ১৩৫টি গবেষণাপত্রের মধ্যে ৫০টি পেপার স্পেক্ট্রোস্কোপি সম্পর্কিত, ৬০টি পেপার ম্যাগনেটিজম, ২৩টি থার্মিওনিক্স, ২টি জনপ্রিয় লেখা [১১]

সম্মাননা[সম্পাদনা]

এক্স-রে কৃস্টালোগ্রাফির জন্য ১৯১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়াম ব্র্যাগ কৃষ্ণানকে আমন্ত্রণ জানান লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউটে। ১৯৩৭ সালে বেলজিয়ামের লিজ (Liege) ইউনিভার্সিটি মেডেল প্রদান করা হয় কৃষ্ণানকে। ১৯৪১ সালে কৃষ্ণ রাজেন্দ্র জুবিলি গোল্ড মেডেল পান প্রফেসর কৃষ্ণান। জাতীয় পর্যায়ে ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত হন স্যার কৃষ্ণান। ১৯৬১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পুরস্কার ভাটনগর পুরস্কার পান। ১৯৬১ সালে ভারতের জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করা হয় স্যার কৃষ্ণানকে।

ধর্মবিশ্বাস[সম্পাদনা]

বিজ্ঞান আর বিনয় পাশাপাশি ছিল কৃষ্ণানের জীবনে। যত বেশি সাফল্য পেয়েছেন তত বেশি বিনয়ী হয়ে উঠেছেন কৃষ্ণান। ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব কৃষ্ণানের জীবনে গভীরভাবে ছিল। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান একাকী অনেক কিছুরই সমাধান দিতে পারে না। বিজ্ঞানের সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শনেরও দরকার হয়।

পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

কৃষ্ণান দুই পুত্র ও চার কন্যার জনক।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৬১ সালে জুন মাসের ১৩ তারিখ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান স্যার কৃষ্ণান।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Subodh Mahanti, Kariamanikkam Srinivasa Krishnan. Vigyan Prasar Science Portal www.vigyanprasar.gov.in/scientists/KS_Krishnan/KariamanikkamSKrishnan.htm, 2011
  2. K. S. Krishnan, On the molecular scattering of light in liquids. Philosophical Magazine, 1925. 50: p. 679-715
  3. K. S. Krishnan, A discussion of the available data on light-scattering in fluids. Proc. Indican Assn. Cutiv. Sci., 1926. 9: p. 251-270
  4. M. S. Dresselhaus, G. Dresselhaus, and A.K. Ramdas, Impact of K. S. Krishnan on contemorary carbon science research. Current Science, 1998. 75(10): p. 1212-1216.
  5. A. K. Ramdas and H. Alawadhi, Magneto-optics of II-VI diluted magnetic semiconductors. Current Science, 1998. 75(11): p. 1216-1221
  6. A. K. Raychaudhuri, Modern magnetism and the pioneering experiments of K. S. Krishnan. Current Science, 1998. 75(11): p. 12071211
  7. Shiv Visvanathan, The tragedy of K. S. Krishnan: A sociological fable. Current Science, 1998. 75(11): p. 1272-1275
  8. Pranab Bandyopadhyay, Great Indian Scientists. 1993, Delhi: Book Club
  9. S. Ramaseshan, A conversation with K. S. Krishnan on the story of the discovery of the Raman effect. Current Science, 1998. 75(11): p. 1265-1272.
  10. Mallik, D.C.V., The Raman Effect and Krishnan’s Diary. Notes and Records of the Royal Society of London, 2000. 54(1): p. 67-83
  11. B. S. Kademani, V. L. Kalyane, and K. A. B, Scientometric portrait of sir K S Krishnan. Indian Jour. Inf., Lib. & Soc., 1996. 9(2): p. 125-150