শিউলি ফুল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শিউলি ফুল
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণী: Magnoliopsida
বর্গ: Lamiales
পরিবার: Oleaceae
গণ: Nyctanthes
প্রজাতি: N. arbor-tristis
দ্বিপদী নাম
Nyctanthes arbor-tristis
লিনিয়াস
শিউলি গাছের পাতা, কলকাতা, ভারত
শিউলি ফল

শিউলি ফুল (বৈজ্ঞানিক নাম: Nyctanthes arbor-tristis) হচ্ছে নিক্টান্থেস (Nyctanthes) প্রজাতির একটি ফুল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব থাইল্যান্ড থেকে পশ্চিমে বাংলাদেশ, ভারত, উত্তরে নেপাল, ও পূর্বে পাকিস্তান পর্যন্ত এলাকা জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। এটি শেফালী নামেও পরিচিত। এই ফুল পশ্চিমবঙ্গের ও থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের রাষ্ট্রীয় ফুল। শিউলি গাছ নরম ধূসর ছাল বা বাকল বিশিষ্ট হয় এবং ১০ মিটারের মত লম্বা হয়। গাছের পাতা গুলো ৬-৭ সেন্টিমিটার লম্বা ও সমান্তরাল প্রান্তের বিপরীতমুখী থাকে। সুগন্ধি জাতীয় এই ফুলে রয়েছে পাঁচ থেকে সাতটি সাদা বৃতি ও মাঝে লালচে-কমলা টিউবের মত বৃন্ত। এর ফল চ্যাপ্টা ও বাদামী হৃদপিণ্ডাকৃতির। ফলের ব্যাস ২ সেন্টিমিটার এবং এটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি ভাগে একটি করে বীজ থাকে।[১] এই ফুল শরৎকালে ফোটে। এর ফুলগুলি রাতে ফোটে এবং সকালে ঝরে যায়। শরৎহেমন্ত কালের শিশির ভেজা সকালে ঝরে থাকা শিউলি অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে।

নাম এবং প্রতীক[সম্পাদনা]

বৈজ্ঞানিক নাম: Nyctanthes arbor-tristis
লাতিন Nyctanthes-এর অর্থ হচ্ছে “সন্ধ্যায় ফোটা” এবং arbor-tristis-এর মানে হচ্ছে “বিষণ্ন গাছ”। সন্ধ্যায় ফোটা আর সকালে ঝরা ফুলের মাঝে বিষণ্নভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটাই এই রকম নামকরণের কারণ বলে ধারণা করা হয়। শিউলিকে কখনও কখনও "tree of sorrow" বা "দুঃখের বৃক্ষ"-ও বলা হয় কারণ দিনের আলোতে এই ফুল তাদের উজ্জ্বলতা হারায়।

শিউলিকে মাঝে মাঝে Nyctanthes arbortristis বা Nyctanthes arbor tristis নামেও উচ্চারণ করা হয়, যদিও সাধারণভাবে এটি শিউলি নামেই পরিচিত।

প্রচলিত নাম[সম্পাদনা]

  • Night-flowering Jasmine (নাইট ফ্লাওয়ার জেসমিন)
  • Harsingar (হারসিঙ্গার)
  • কোরাল জেসমিন
  • পারিজাত
  • শেফালিকা
  • পারিজাতা
  • পারিজাতাকা
  • রাগাপুস্পি
  • খারাপাত্রাকা
  • প্রজক্তা

এলাকা ভিত্তিক নাম[সম্পাদনা]

প্রতীক[সম্পাদনা]

শিউলি ফুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ[২] এবং থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি[৩], রাজ্য প্রতীক বা রাষ্ট্রীয় ফুল।

ব্যবহার[সম্পাদনা]

এই ফুল হলুদ রঙ তৈরী করতে ব্যবহার করা যায়। এই ফুলের বোঁটা গুলো শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার করে হালকা গরম পানিতে মেশালে চমৎকার রঙ হয়। [৪]

ঔষধবিজ্ঞান[সম্পাদনা]

  • Immunostimulant[৫], Hepatoprotective[৬], antileishmanial, Antiviral[৭] এবং Antifungal[৮] ঔষধ গুলো তৈরি করতে শিউলির বীজ, পাতা ও ফুল ব্যবহার করা হয়। [৯]
  • এর পাতা sciatica, arthritis, fevers, নানারকম যন্ত্রণাদায়ক সমস্যার চিকিৎসার জন্যে ঔষধ বা বড়ির মত করে আয়ুর্বেদিক ঔষধ [১০] তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। [১১]

চিকিৎসার জন্য শিউলির ব্যবহার[সম্পাদনা]

পুরাণের কথা[সম্পাদনা]

কৃষ্ণ শিউলি গাছ তুলে আনছে, ভাগবত পুরাণথেকে, চিত্রাঙ্কন, ১৫২৫-১৫৫০

শিউলির আরেক নাম পারিজাত! হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে অনেক বার এসেছে শিউলি ফুল বা পারিজাত এর কথা। [১২][১৩]

কৃষ্ণের দুই স্ত্রী- সত্যভামারুক্মিণীর খুব ইচ্ছে তাদের বাগানও পারিজাতের ঘ্রাণে আমোদিত হোক। কিন্তু পারিজাত তো স্বর্গের শোভা! কৃষ্ণ স্ত্রীদের খুশি করতে চান। তাই লুকিয়ে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ থেকে একটি ডাল ভেঙ্গে এনে সত্যভামার বাগানে রোপণ করেন, যার ফুল রুক্মিণীর বাগানেও ঝরে পরে সুগন্ধ ছড়ায়। এদিকে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র তো ঘটনাটা জেনে খুব রেগে যান! তিনি বিষ্ণু অবতারের উপর গোপনে ক্রুদ্ধ ছিলেন। এই কারনে তিনি কৃষ্ণকে শাপ দেন কৃষ্ণের বাগানের পারিজাত বৃক্ষ ফুল দেবে ঠিকই কিন্তু ফল কোনদিন আসবে না, তার বীজে কখনও নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে না।


আরেকটি গল্পও আছে, এই ভেষজ বৃক্ষের!

পারিজাতিকা নামে এক রাজকন্যা সূর্যের প্রেমে পরে তাকে কামনা করেন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও পান না। তাই তিনি আত্মহত্যা করেন। তার দেহের ভস্ম পারিজাতবৃক্ষ রূপে ফুটে ওঠে। যে কিনা নিরব ব্যর্থ প্রেমের প্রতীক! সূর্যের স্পর্শ মাত্র যে ঝরে পরে অশ্রুবিন্দুর মত। পৃথিবীর বুকে তুমি তার দুঃখের চিহ্ন দেখবে শত শত অশ্রুবিন্দুর মত সে সুগন্ধি ছড়িয়ে থাকে চারদিকে, আমরা এখন তাকে শিউলি রূপে দেখি তার শুভ্র দেহে গৈরিক বসনে।

হিন্দু দেবতার পূজোয় শিউলিই এমন ফুল যেটি মাটিতে ঝড়ে পরলেও তাকে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়ে থাকে।

রাসায়নিক গঠন[সম্পাদনা]

পাতা (Leaves):
ডি-মানিটল (D-mannitol), বিটা সাইটোসটেরোল (β-sitosterol), ফ্লাভানোল গ্লুকোসাইডেজ (Flavanols glycosides) এর মধ্যে আছে এসট্রাগ্যালিন (Astragaline), নিকোটিফ্লোরিন (Nicotiflorin), ওলিয়ানোলিক এসিড (Oleanolic acid), নিকট্যানথিক এসিড (Nyctanthic acid), ট্যানিক এসিড (tannic acid), এসকরবিক এসিড (ascorbic acid), মিথাইল স্যালিসাইলেট (methyl salicylate), অ্যামোরফাস গ্লাইকোসাইড (an amorphous glycoside), অ্যামোরফাস রেজিন (amorphous resin), উদ্বায়ী তেল (volatile oil),ক্যারোটিন (carotene), ফ্রিডেলিন (friedeline), লুপেল (lupeol), গ্লুকোজ (glucose), ফ্রুক্টোজ (fructose), ম্যানিটোল (D-mannitol), ইরিডোইড গ্লাইকোসিডার (iridoid glycosider), বেনজোয়িক এসিড (benzoic acid)।

ফুল (Flowers):
প্রয়োজনীয় তেল (Essential oil), নিকট্যান্থিন (nyctanthin), ডি-মানিটল (d-mannitol), ট্যানিন ও গ্লুকোজ (tannin and glucose), ক্যারোটিনয়েড (carotenoid), গ্লুকোসিডেজ (glycosides) যেমন- মনোজেন্টিওবায়োসিডেজ আলফা ক্রোদিটিনের এস্টার (β-monogentiobioside ester of α - crocetin or crocin-3), বিটা-মনোজেনোবায়োসাইড আলফা ক্রোসিটিন ক্যারোটিন এর বিটা-ডি মনোগ্লুকোসাইড এস্টার (β-monogentiobioside -β-D monoglucoside ester of α-crocetin), β-digentiobioside ester of α-crocetin (or crocin-1).

বীজ (Seeds): Arbortristoside A&B, Glycerides of linoleic oleic, lignoceric, stearic, palmitic and myristic acids, nyctanthic acid, 3-4 secotriterpene acid, A water soluble polysaccharide composed of D-glucose and D mannose.

বাকল (Bark): Glycosides and alkaloids.

গাছের কাণ্ড (Stem): Glycoside-naringenin-4’-0-β-glucapyranosyl-α-xylopyranoside and β-sitosterol.

ফুলের তেল (Flower oil): α-pinene, p-cymene, 1- hexanol methyl heptanone, phenyl acetaldehyde, 1-deconol and anisaldehyde.

গাছ (Plant): 2,3,4,6-tetra-0-methyl-D-glucose, 2,3,6 tri-0-methyl-D-glucose, 2,3,6-tri-0-methyl-D-mannose, 2,3,-di-0-methyl-d-mannose, arbortristoside A,B,C and iridoid glycoside

চিত্রমালা[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Nyctanthes arbor-tristis

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]