শাক্তধর্মের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চিত্র:Mahadevi.jpg
মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা; দু’পাশে লক্ষ্মীসরস্বতী; সঙ্গে তাঁর দুই পুত্র গণেশকার্তিক; মস্তকোপরে শিবদশমহাবিদ্যা। জনপ্রিয় চিত্রশৈলী, ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ।

শাক্তধর্ম হিন্দুধর্মের একটি শাখা। শাক্তরা মহাশক্তি অর্থাৎ ঈশ্বরের নারীমূর্তির উপাসক। এই ধর্মমতের মূল ভারতের প্রাগৈতিহাসিক যুগে নিহিত রয়েছে। ২০,০০০ বছর আগে গড়ে ওঠা ভারতের প্যালিওলিথিক জনবসতিতে প্রথম দেবীমূর্তির অস্তিত্ব লক্ষিত হয়। সিন্ধু সভ্যতার যুগে দেবীপূজা সংস্কৃতির (কাল্ট) পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। বৈদিক যুগে দেবীপূজার প্রচলন কমে এলেও, পরবর্তীকালে সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে এই সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন ও প্রসার ঘটেছিল। এই কারণে অনেক দিক থেকেই "হিন্দু সভ্যতার ইতিহাসকে নারীশক্তির পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা চলে"।[১]

বর্তমানে শাক্তধর্মের যে রূপটির সঙ্গে আমরা পরিচিত, তার আদি উৎস বৈদিক যুগের সাহিত্য। মহাকাব্যের যুগে এটি বিবর্তিত হতে থাকে। অবশেষে গুপ্তযুগে (৩০০-৭০০ খ্রিষ্টাব্দ) শাক্তবাদের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। এর পরেও অবশ্য এই ধর্মমত আরো প্রসারিত হয়েছিল।[২] শাক্তধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল দেবীমাহাত্ম্যম্ (শ্রীশ্রীচণ্ডী)। আজ থেকে প্রায় ১,৬০০ বছর আগে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এই গ্রন্থেই প্রথম "বহু বিচিত্র দেবীগণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পৌরাণিক, ঐতিহ্যগত ও দার্শনিক উপাদানগুলি একত্রিত করা হয়। যাকে 'দেবীপূজা-সংস্কৃতির ঐক্যসাধন'-ও বলা চলে।"[৩] শাক্তধর্মের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থগুলি হল ললিতা সহস্রনাম,[৪] আদি শঙ্করের সৌন্দর্যলহরী[৫]তন্ত্র[৬]

শাক্তধর্ম-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতমাতা প্রতীকবাদ, সাধ্বী ও স্ত্রীগুরুগণের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি[৭] এবং ১৯৭৫ সালে জয় সন্তোষী মা নামক চলচ্চিত্রটির মুক্তিলাভের পর সন্তোষী মাতা নামে এক "নতুন" দেবীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি।[৮] এক ব্যাখ্যাকারীর মতে:

"আজ থেকে ১০,০০০ বছর আগে যেমন ছিল, তেমনি আজকেও ভারতের সর্বত্র দেবীপ্রতিমার ছড়াছড়ি। তাঁদের পাওয়া যায় ট্রাকের সাইডে, ট্যাক্সির ড্যাশবোর্ডে, দোকানের দেওয়ালে। হিন্দুর ঘরেও দেবীর রঙিন ছবি স্থায়ীভাবে রাখা থাকে। এই ছবি সাধারণত দেওয়ালে এতটা উঁচুতে ঝোলানো থাকে যে ঘাড় পিছন দিকে বেঁকিয়ে তাঁর পদদর্শন করতে হয়। [...] ভারতে দেবীপূজা 'কাল্ট' নয়, এটি একটি ধর্ম। [...] একটি অসাধারণ আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরিণত ঐতিহ্য। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে বিশ্বজননীকে স্মরণ করেন।"[৯]

আদি উৎস[সম্পাদনা]

এখনও পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের মাধ্যমে প্রাচীনতম যে দেবীমূর্তিটি ভারতে (এলাহাবাদের কাছে) পাওয়া গিয়েছে, সেটি উচ্চ প্যালিওলিথিক সভ্যতার। কার্বন-ডেট অনুযায়ী তা ২০,০০০-২৩,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের কাছে ওই একই সময়ের কয়েকটি রঙিন পাথর পাওয়া গিয়েছে। এই পাথরগুলির উপর প্রাকৃতিক ত্রিভূজ অঙ্কিত। উল্লেখনীয় বিষয় হল, ওই অঞ্চলের আদিবাসীরা আজও যে পাথরগুলিকে দেবীজ্ঞানে পূজা করে, সেগুলিতেও একই রকম ত্রিভূজ অঙ্কিত অবস্থায় দেখা যায়। তদুপরি, এগুলি "সম্ভবত পরবর্তীকালের তান্ত্রিক যন্ত্র নামক প্রতীকবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তান্ত্রিক যন্ত্রে ত্রিভূজ উর্বরতা ও প্রজননের একটি প্রধান প্রতীক।"[১০]

শাক্তধর্মের মূল: একটি হরপ্পান দেবীমূর্তি, ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। (মুসি গুমেত, প্যারিস)

সিন্ধু সভ্যতার পূর্বসূরি তথা বিশ্বের অন্যতম প্রধান নিওলিথিক প্রত্নক্ষেত্র মেহেরগড়ে কয়েক হাজার ছোটো ছোটো নারীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন মূর্তিগুলি ৫৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের।[১১] এই সব মূর্তি এবং অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি থেকে প্রমাণিত হয় যে, "তন্ত্রবাদের মূল আদর্শসমূহ, সাংখ্য দর্শন, যোগাভ্যাস ও আধুনিক শাক্তধর্ম – যা পরবর্তীকালের হিন্দুধর্মের জীবন্ত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়, তা সরাসরিভাবেই এই প্রাক-বৈদিক উৎস থেকে উৎসারিত।"[১২]

পরবর্তী সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র হরপ্পামহেঞ্জোদাড়ো (৩৩০০-১৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) "এক মিশ্র জনসংখ্যার আবাসস্থল হয়ে উঠেছিল। এখানকার অধিবাসীদের বৃহত্তম অংশটি ভাগ্যান্বেষণে আশেপাশের গ্রাম থেকে বড়ো শহরে চলে আসে। সেই সঙ্গে তারা নিয়ে আসে তাদের নিজস্ব কাল্ট ও প্রথা-রীতিনীতি এবং কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের নারী আদর্শ, যা হরপ্পান [অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার] ধর্মের মূল ভিত্তিটি রচনা করে। উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের কোনো কোনো কাল্ট ও প্রথা গ্রহণ করেছিল। তবে তারা আদি অনভিজাত লৌকিক আকারে তা নেয়নি। এই কাল্টের উপর তারা আভিজাত্যের রং ছোঁওয়ায়। এর মধ্যমে এই সব দেবীর উপাসকদের সমাজে উচ্চস্থানটি নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়।"[১৩]

একদা অবলুপ্ত একটি সভ্যতার ধর্মমতের পুনরুদ্ধার দীর্ঘকাল পরে সম্ভব নয়। কিন্তু পুরাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে মনে করা হয়, শাক্তধর্মের প্রথম বীজ উপ্ত হয়েছিল এই সময়েই:

"মহেঞ্জোদাড়োর মাতৃকাদেবী কাল্টে, [...] দেবী পরিণত হয়েছেন এক চিরন্তন সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমতী আদর্শ নারী - প্রকৃতি বা শক্তি-তে। আদর্শ পুরুষ পুরুষ-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি হয়েছেন জগদম্বা বা জগন্মাতা, অর্থাৎ, বিশ্বজননী ও দেবমাতা। নিজের সর্বোচ্চ রূপে তিনি শিবের পত্নী মহাদেবী, কিন্তু [সেই সঙ্গে] তাঁর সৃষ্টিকারিণীও বটে।"[১৪]

উপমহাদেশের উত্তর অংশে এই সব দার্শনিক মত ও প্রথা-রীতিনীতির উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে দেবী-কেন্দ্রিক সংস্কার-ঐতিহ্যের অতিরিক্ত কিছু রূপ দক্ষিণ ভারতের অভিজাত দ্রাবিড় সভ্যতাতেও প্রসারিত হয়। এন এন ভট্টাচার্যের মতে, "আদর্শ নারীর কাল্ট দ্রাবিড় ধর্মেরও একটি প্রধান বিষয়। শক্তিধারণা তাদের ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তাদের দেবীরা পৌরাণিক দেবী পার্বতী, দুর্গা বা কালীর সঙ্গে একাত্মভূত হয়ে যায়। [...] শাক্তধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হল সপ্তমাতৃকা কাল্ট। এটিও সম্ভবত দ্রাবিড় উৎস থেকে অনুপ্রাণিত।"[১৫]

শাক্তদর্শনের ক্রমবিকাশ[সম্পাদনা]

বর্তমানে শাক্তধর্মের যে রূপটির সঙ্গে আমরা পরিচিত, তার আদি উৎস বৈদিক যুগের সাহিত্য। মহাকাব্যের যুগে এটি বিবর্তিত হতে থাকে। অবশেষে গুপ্তযুগে (৩০০-৭০০ খ্রিষ্টাব্দ) শাক্তবাদের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। এর পরেও অবশ্য এই ধর্মমত আরো প্রসারিত হয়েছিল।[২]

বেদ[সম্পাদনা]

সিন্ধু সভ্যতার ক্রম-অবলুপ্তির পরে, এই সভ্যতার অধিবাসীরা ধীরে ধীরে অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বৈদিক সভ্যতার (১৫০০-৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) জন্ম দেয়। ধর্মবিশ্বাস ও পূজায় দেবীর স্থান বজায় থাকলেও, তা অনেকটা অপ্রধান ভূমিকায় পর্যবসিত হয়। দেবীরা কোনো প্রধান দেবতার স্ত্রী রূপে টিকে থাকেন।

তবে সিন্ধু সভ্যতা ও দ্রাবিড় ধর্মের মহাদেবী বেদ-এও সমহিমায় বিরাজ করতে থাকেন। তিনি রহস্যময়ী বৈদিক দেবতাদের জননী অদিতিতে রূপান্তরিত হন। ঋগ্বেদ-এ ৮০ বার তাঁর নাম উল্লিখিত হয়েছে।[১৬] এন এন ভট্টাচার্যের মতে, "বলা যায়, অদিতিই প্রাচীনতম দেবমাতা। তাঁর রূপটি [অবশ্য] বৈদিক যুগেও অস্পষ্ট ছিল। [...] সম্ভবত হরপ্পান [মাতৃকাদেবীর] প্রভাব পড়েছিল অদিতির [বৈদিক] ধারণাটির উপর। তিনি ঋগ্বেদ-এই ছিলেন অতীত দিনের দেবী।"[১৭] অদিতির বৈদিক বর্ণনা অনুযায়ী অসংখ্য তথাকথিত লজ্জাগৌরী মূর্তি নির্মিত হয়। মুখহীন, পদ্মমুণ্ড ও সন্তান-প্রসবরতা অবস্থায় উপবিষ্ট এই মূর্তি কয়েক সহস্রাব্দ ধরে ভারতে পূজিত হয়ে আসছে:[১৮]

"দেবতাদের প্রথম যুগে, নিরাকার থেকে আকারের উদ্ভব ঘটে। আকাশখণ্ডগুলির জন্ম দেন দেবী উত্তানপাদ, পৃথিবীর জন্ম দেন দেবী উত্তানপাদ এবং পৃথিবী জন্ম দেন আকাশখণ্ডগুলির।"[১৯]

দেবীর সর্বব্যাপী, সর্বলিঙ্গস্বরূপিনী প্রকৃতির প্রথম ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় এই বিবরণীতে: "অদিতি হলেন আকাশ, অদিতি হলেন বায়ু, অদিতি হলেন সর্বদেবতা। [...] অদিতি হলেন মাতা, পিতা ও পুত্র। অদিতি হলেন সেই সকল ব্যক্তি যাদের জন্ম আসন্ন।"[২০]

বিখ্যাত ঋগ্বৈদিক স্তোত্র দেবী সূক্ত-এ হিন্দুধর্মের দুই অতিপরিচিত ও লোকপ্রিয় দেবীর উল্লেখও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁরা হলেন বাক (আধুনিক সরস্বতী) ও শ্রী (যিনি লক্ষ্মী নামে সমধিক পরিচিত)। লক্ষ লক্ষ হিন্দু আজও এই স্তোত্রটি নিত্যপাঠ করেন। এই স্তোত্রে দেবী ঘোষণা করছেন:

"আমিই সমগ্র জগতের ঈশ্বরী, উপাসকগণের ধনপ্রদাত্রী, পরব্রহ্মকে আত্মা হইতে অভিন্নরূপে সাক্ষাৎকারিণী। অতএব যজ্ঞার্হগণের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠা। আমি প্রপঞ্চরূপে বহুভাবে অবস্থিতা ও সর্বভূতে জীবরূপে প্রবিষ্টা। আমাকেই সর্বদেশে সুরনরাদি যজমানগণ বিবিধভাবে আরাধনা করা।"[২১][২২]

উপনিষদ্[সম্পাদনা]

কেন উপনিষদে (৭৫০-৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) একটি প্রাচীন উপাখ্যানের অবতারণা রয়েছে, যেখানে দেবী পরব্রহ্মের শক্তিরূপে অবতীর্ণা হন। কাহিনিটি নিম্নরূপ: দেবাসুর যুদ্ধে জয়লাভের পর বৈদিক ত্রিদেব অগ্নি, বায়ুইন্দ্র বিজয়গর্বে মত্ত হয়ে উঠে নিজেদের কৃতিত্ব সম্পর্কে দম্ভোক্তি করতে থাকেন। কিন্তু তারপরেই এক রহস্যময় যক্ষ আবির্ভূত হয়ে তাঁদের দর্প চূর্ণ করেন। ইন্দ্র প্রশ্ন করার সেই যক্ষের কাছে যেতে চাইলে, যক্ষ অন্তর্হিত হন এবং তাঁর স্থলে দেবী এক সালংকারা যক্ষিণীর রূপে আবির্ভূতা হন:

ইনিই উমা হৈমবতী। ইন্দ্র তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “ওই যক্ষ কে?” তিনি উত্তর দেন, “তিনি ব্রহ্ম। এই যে বিজয়ের ফলে তোমরা মহিমান্বিত হয়েছ, তা ব্রহ্মেরই বিজয়।” এইভাবে এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করে ইন্দ্রাদি দেবতাগণ সত্য অবগত হলেন।[২৩]

যক্ষিণী; কেন উপনিষদে যে বেশে দেবী ব্রহ্মের শক্তি রূপে অবতীর্ণা হন। শুঙ্গ সাম্রাজ্য, খ্রিষ্টপূর্ব ২য়-১ম শতাব্দী। (মুসি গুমেত, প্যারিস) উল্লেখনীয়, এন এন ভট্টাচার্যের মতে, "[এই যুগের] যক্ষ ও যক্ষিণী মূর্তিগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরবর্তীকালের দেবদেবীর মূর্তিগুলি উক্ত মূর্তির আদলেই নির্মিত হয়।"[২৪]

প্রধান শাক্ত উপনিষদগুলি অনেকটাই আধুনিককালের রচনা। এগুলির অধিকাংশই রচিত হয়েছে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে। এই উপনিষদগুলি সাধারণত শ্রীবিদ্যা পূজা সংক্রান্ত সম্প্রদায়গত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তবে এই উপনিষদগুলিতে প্রাচীন অচলিত সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে "এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে যে এগুলি সুপ্রাচীন কালের রচনা। কিন্তু বৈদিক ছাঁচে রচিত [এই গ্রন্থগুলির] একটি শ্লোকও কোনো বৈদিক সূত্র থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।"[২৫]

মহাকাব্য[সম্পাদনা]

বৈষ্ণব মহাকাব্য রামায়ণ-এ (২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ – ২০০ খ্রিষ্টাব্দ) "বিশুদ্ধ শাক্ত চরিত্রের কোনো দেবীর উল্লেখ নেই"। কিন্তু মহাভারত (৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ – ৪০০ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে প্রাপ্ত একাধিক সূত্র সমসাময়িক কালের শাক্ত উপাসনার গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রমাণ।[২৬]

"বৈদিক ধর্মের রক্ষণশীল অনুগামীরা" তখনও শিব ও দেবীকে তাঁদের দেবমণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত করেননি; যদিও, "আদিবাসী সমাজে মাতৃকাদেবী কাল্টের অস্তিত্বের প্রমাণ মহাভারত-এর যুগেই পাওয়া গিয়েছে। এর অস্তিত্ব আজও বর্তমান। মহাকাব্যে বলা হয়েছে, দেবী বিন্ধ্য পর্বতমালায় বাস করেন, মদ ও মাংস ভক্ষণ করেন (সীধুমাংসপশুপ্রিয়া) ও শিকারী জাতিগণ কর্তৃক পূজিতা হন।" আদিবাসী সমাজে প্রচলিত দেবী-পূজা পদ্ধতি "বর্ণাশ্রম প্রথার মধ্যেও প্রবেশ করে, [এবং সেই সঙ্গে নিয়ে আসে] এমন এক ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া যা পরবর্তীকালের ইতিহাসে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।"[২৭]

তবে, এই মহাকাব্যের দুর্গাস্তোত্র[২৮] অংশেই "প্রথম দেবীর স্বরূপটি প্রকাশিত হয়েছে। [এখানে] একাধিক স্থানীয় দেবী একত্রিত হয়ে এক [...] সর্বশক্তিমতী নারীশক্তিতে পরিণত হয়েছে।"[২৯] অপরদিকে মহান তামিল মহাকাব্য সিলাপ্পাটিকারাম[৩০] (১০০ শতাব্দী) সেই সব মহান সাহিত্যকীর্তিগুলির অন্যতম যেখানে এই যুগে "দক্ষিণ ভারতের সমসাময়িক নারী আদর্শ কাল্টের" উল্লেখ পাওয়া যায় এবং যেখানে "পার্বতী, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রমুখ দেবীগণ একই শক্তির অংশভূতা বলে উল্লেখ করা হয়"।[৩১]

পুরাণ[সম্পাদনা]

মহাকাব্যের পাশাপাশি পুরাণ (যা মূলত গুপ্ত যুগে অর্থাৎ, ৩০০-৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত) নামে পরিচিত আখ্যান-মূলক ধর্মগ্রন্থগুলি "হিন্দুধর্মের সকল বিষয় ও বিভাগ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করে। হিন্দু পুরাণ, ধর্মতত্ত্ব ও বহুদেববাদ, ঈশ্বরপ্রীতি, ধর্ম ও কুসংস্কার, উৎসব, অনুষ্ঠান ও অনুশাসন সম্পর্কে পুরাণে যা লেখা আছে, তা আর কোথাও লেখা নেই।"[৩২]

দেবী পুরাণকালিকা পুরাণ ইত্যাদি কয়েকটি শাক্ত পুরাণে দেবীকে "পরাপ্রকৃতি" রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এর অর্থ, তিনি সমগ্র জগতের উৎস, কিন্তু তাঁর কোনো উৎস নেই।[৩৩] যদিও, শাক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পুরাণগ্রন্থগুলি হল মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণদেবীভাগবত পুরাণ। এই গ্রন্থগুলি থেকেই সকল শাক্ত ধর্মশাস্ত্রের উদ্ভব ঘটে।

দেবীমাহাত্ম্যম্‌[সম্পাদনা]

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা, দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থের মধ্যমচরিতে বর্ণিত দেবী। ইনি হিন্দু পুরাণের প্রসিদ্ধতম দেবীগণের অন্যতম।

শাক্তধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল দেবীমাহাত্ম্যম্‌। এই গ্রন্থ দুর্গা সপ্তশতী বা শ্রীশ্রীচণ্ডী নামেও পরিচিত। দেবীমাহাত্ম্যম্‌ আসলে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর একটি অংশ। ১,৬০০ বছর আগে রচিত এই গ্রন্থে "সেই সময়েই প্রাচীনতায় পর্যবসিত স্মৃতিগুলি এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে এমন এক চমৎকার বাচিক রূপ লাভ করে যা আজও হিন্দু দেবী-উপাসনার কেন্দ্রীয় গ্রন্থ রূপে বিবেচিত হয়।"[৩৪] এই গ্রন্থেই প্রথম ""বহু বিচিত্র দেবীগণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পৌরাণিক, ঐতিহ্যগত ও দার্শনিক উপাদানগুলি একত্রিত করা হয়। যাকে 'দেবীপূজা-সংস্কৃতির ঐক্যসাধন'-ও বলা চলে।"[৩]

দেবীমাহাত্ম্যম্‌-ই প্রথম হিন্দু ধর্মগ্রন্থ যেখানে দেবীকে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের মর্যাদা প্রদান করা হয়।[৩৫] এই গ্রন্থের মাধ্যমেই "স্বতন্ত্র শাক্তধর্ম" অর্থাৎ স্বতন্ত্র দার্শনিক মত ও সম্প্রদায় হিসেবে নারী আদর্শের কাল্টের জন্ম সূচিত হয়।

"নারী আদর্শের কাল্টের প্রভাবে [ইতোমধ্যেই] দেবীরা সকল প্রকার দেবতাদের স্ত্রী ও "শক্তি"রূপে তাঁদের পাশে স্থান পেয়েছিলেন। কিন্তু নারী আদর্শকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয়তার যে আবেগ সৃষ্টি হয় তা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। তাই এক নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এমন এক ব্যবস্থা যেটি সম্পূর্ণ নারী-কেন্দ্রিক। এমনকি সেখানে বিষ্ণু বা শিবের মতো দেবতাদের অবস্থানও দেবীর নিচে। এই নতুন ব্যবস্থায় একত্রীভূত হয় ধূসর হয়ে আসা প্রাচীন কালের প্রথা ও নানা ধরনের গ্রামীণ ও আদিবাসী কাল্ট ও অনুষ্ঠানপদ্ধতি। বিভিন্ন যুগের নবলব্ধ ধারণার দ্বারা শক্তিশালী এই ব্যবস্থাই শাক্তধর্ম নামে পরিচিত হয়।"[৩৬]

ললিতা সহস্রনাম[সম্পাদনা]

ললিতা-ত্রিপুরাসুন্দরী (পার্বতী), বামপদ শ্রীচক্রের উপর স্থাপন করে সিংহাসনে উপবিষ্ট, হাতে তাঁর চিরন্তন প্রতীক ইক্ষুদণ্ড, পুষ্পধনু, পাশ ও অঙ্কুশ।

হিন্দু সহস্রনাম স্তোত্রসাহিত্যে (অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট দেবতার পরিচয় ও গুণবাচক এক হাজার নামের স্তোত্রবদ্ধ রূপ) ললিতা সহস্রনাম স্তোত্র একটি "প্রামাণ্য ধ্রুপদি, বহুল পঠিত, সরল ও কাব্যগুণমণ্ডিত" স্তোত্র।[৩৭]

ললিতা সহস্রনাম ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ গ্রন্থের একটি অংশ। কিন্তু এটির সঠিক উৎস এবং লেখক-পরিচিতি আজ আর জানা যায় না। গ্রন্থপ্রমাণ থেকে মনে করা হয়, এটি দক্ষিণ ভারতে খ্রিষ্টীয় নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে লিখিত হয়েছিল। এটি ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ-এর ললিতোপাখ্যান অংশের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। এই কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে, কেমন করে দেবী ললিতা-ত্রিপুরাসুন্দরী মূর্তিতে ভণ্ডাসুরকে বধ করেছিলেন।[৪]

এই গ্রন্থের একাধিক স্তর রয়েছে। এতে শুধু দেবীর রূপ এবং লীলাই বর্ণিত হয়নি, সেই সঙ্গে কুণ্ডলিনী যোগশ্রীবিদ্যা শাক্তধর্মের দর্শনতত্ত্ব ও অনুষ্ঠানপ্রক্রিয়াও ব্যাখ্যাত হয়েছে। এর পাশাপাশি শাক্ত ধর্মমতে, সহস্রনাম-এ উল্লিখিত প্রতিটি নাম ও নামমালা উচ্চ মন্ত্রশক্তি সম্পন্ন। এগুলি সাধনা বা বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রয়োগেরও বিধান দেওয়া হয়েছে।[৩৮]

দেবীগীতা[সম্পাদনা]

পরবর্তী পৌরাণিক যুগে ভক্তিবাদের উদ্ভব ঘটে। এই "নতুন ব্যক্তিকেন্দ্রিক তাত্ত্বিক ভক্তি আন্দোলন" খ্রিষ্টীয় ১২০০ থেকে ১৭০০ অব্দের মধ্যে পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল। আজও মূলধারার হিন্দু ধর্মানুশীলনে এই ধারার ব্যাপক প্রভাব দৃষ্ট হয়। দেবীগীতা গ্রন্থেই প্রথম শাক্ত ধর্মমতে ভক্তিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। এই কারণে, এই গ্রন্থটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[৩৯]

দেবীগীতা হল দেবীভাগবত পুরাণ-এর সর্বশেষ ও সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত অংশ। খ্রিষ্টীয় একাদশ শতাব্দীতে রচিত এই সুবৃহৎ পুরাণগ্রন্থে "জন্ম, বিবাহ ও শিবের প্রতি কোনোরূপ আনুগত্যের উর্ধ্বে সর্বোচ্চ দেবীকে ঈশ্বরী, বিশ্বজননী ভুবনেশ্বরী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।" বাস্তবিকই, "শাক্ত ধর্মতত্ত্বে [এই পুরাণের] সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল দেবীর একক ও দয়ালু সত্ত্বাটি সর্বসমক্ষে আনয়ন।"[৪০]

দেবীভাগবত পুরাণ-এ দেবীমাহাত্ম্যম্-এ বর্ণিত আখ্যানটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর সঙ্গে মিশে গেছে শাক্ত দর্শনতত্ত্বও। পাশাপাশি হিন্দুধর্মের অন্যান্য শাখা থেকে (বিশেষত বৈষ্ণবধর্ম থেকে) বিভিন্ন ধ্রুপদি উপাখ্যানও এখানে শাক্তধর্মের আলোকে বর্ণিত হয়েছে:

"একাধিক পুরুষ দেবতার উপর দেবীর প্রাধান্য স্থাপনই দেবীভাগবত রচনার উদ্দেশ্য ছিল না। দেবীর প্রকৃতি ও স্বরূপ উদ্ঘাটনও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। [...] দেবীভাগবত-এ দেবীর যোদ্ধামূর্তি খানিকটা খর্ব হয়েছে। তিনি এখানে ভক্তপ্রতিপালনকারিনী ও জ্ঞানপ্রদায়িনী। দেবীর এই চরিত্রটিই বিকশিত হয়েছে দেবীগীতা-য়। এখানে লিঙ্গনির্বিশেষে দেবীর প্রতি ভালবাসাই বিশেষ প্রধান্য পেয়েছে। এই মত শাক্ত ভক্তিবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত।"[৪১]

সাংখ্য ও বেদান্ত[সম্পাদনা]

খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের শেষে "দক্ষিণের ধর্মীয় আন্দোলন উত্তরের উপরেও গভীর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে"। শাক্তধর্মের উদ্ভবেও দাক্ষিণাত্যের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

"তামিল যুদ্ধ ও বিজয়ের দেবী কোরাবাইয়ের সঙ্গে সহজেই দুর্গা, কেরলের ভগবতী ও দেবী কন্যাকুমারীর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তাঁকে নবদুর্গার যেকোনো একটি রূপে বা ভদ্রকালীর রূপে আবাহন করা হয়। তামিল সংস্কৃতিতে তিনি সরস্বতী বা বাক এবং শ্রী বা লক্ষ্মীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এইভাবে দুর্গার মধ্যে একজন ভক্ত শক্তি, দয়া ও জ্ঞানের ত্রিমুখী গুণাবলি পেয়ে থাকেন। পাশাপাশি, দাক্ষিণাত্যের অনেক মন্দিরে সপ্তমাতৃকারা পূজিতা হন। প্রাচীন কাল থেকেই দাক্ষিণাত্যে গ্রামদেবীদের পূজার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অস্তিত্ব ছিল। এই সব দেবীরা দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।"[৪২]

একই সময়ে হিন্দুধর্মের দু’টি প্রধান দার্শনিক শাখা সাংখ্যবেদান্তের উপরেও শাক্তধর্মের প্রভাব লক্ষিত হয়:

"সাংখ্য "প্রকৃতি" তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছিল একটি জাগতিক পৃথিবী মাতার ধারণা থেকে। এই তত্ত্ব পরবর্তীকালে শাক্তধর্মের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দার্শনিক তত্ত্বে পরিণত হয়। [প্রকৃতপক্ষে] সাংখ্য মতের উৎস প্রাক-বৈদিক যুগে নিহিত, যা মূলত ছিল মাতৃতান্ত্রিক প্রকৃতির। যদিও বৈদিক জনগোষ্ঠীগুলি ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক। এই তত্ত্ব যে মতগুলিকে সমর্থন করে, সেগুলি হল, (১) বিশ্বসৃষ্টির কারণ হিসেবে সাংখ্য প্রকৃতি-ধারণা বৈদান্তিক ব্রহ্ম-ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়; (২) এই কারণেই ব্রহ্মসূত্র-এ সযত্নে সাংখ্য মতকে অস্বীকার করা হয়েছে; এবং (৩) সব সময়ই সাংখ্যকে বেদান্তের আলোকে সংশোধন করার একটি প্রয়াস চালু থেকেছে।"[৪৩]

শাক্ত দর্শন সাংখ্যকে বিশ্ববিবর্তনের স্তরগুলির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছে। এই স্তরগুলি "তত্ত্ব" নামে পরিচিত। তত্ত্বের সংখ্যা ২৬ থেকে ৩৬টি। "উল্লেখ্য, এই তত্ত্বগুলি এমন এক রহস্যের সমাধানে সক্ষম হয়েছে, যা করতে অদ্বৈত বেদান্তও সমর্থ হয়নি – কীভাবে অপরিবর্তনশীল ব্রহ্ম পরিবর্তনশীল বিশ্বে পরিণত হন, এবং কিভাবে এক ঈশ্বর বহু ঈশ্বর হন। শাক্ত বিশ্বতত্ত্বের কেন্দ্রীয় মতটি হল, শক্তি পরমের থেকে উৎসারিত এবং তিনি ব্রহ্মের থেকে অভিন্ন নন, বরং তিনি ব্রহ্মেরই চালিকাশক্তি।"[৪৪]

তন্ত্র[সম্পাদনা]

শাক্তধর্মের অনেক শাখারই কেন্দ্রীয় ধর্মগ্রন্থ হল তন্ত্র গ্রন্থসমূহ। এগুলি মূলত অনুষ্ঠানপ্রণালী যা খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে লিখিত হয়েছিল। তন্ত্রগুলিতে মূলত দু’টি "মার্গ" বা সাধনপথের উল্লেখ রয়েছে। উভয় পথেরই লক্ষ্য এক। এদুটি হল:[৪৫]

শ্রীযন্ত্র (এখানে মূলত শ্রীবিদ্যা শাক্ত সম্প্রদায়ে ব্যবহৃত ত্রিমাত্রিক শ্রীমেরু বা মহামেরু আকারে দেখানো হয়েছে) অধিকাংশ শাক্ত সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় প্রতীক।
  • বামাচার, যা বাহ্য মূর্তিপূজা এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে নানা স্তরে পঞ্চমকার ব্যবহারের পক্ষপাতী; এবং
  • দক্ষিণাচার, যা মানসিক পূজার (ধ্যান ইত্যাদি) পক্ষপাতী এবং যেকোনো স্তরে পঞ্চমকার ব্যবহারের ঘোর বিরোধী।

গুরু তাঁর শিষ্যের গুণ (তামসিক পশুগুণ, রাজসিক বীরগুণ, বা সাত্ত্বিক দিব্যগুণ) ও অন্যান্য চরিত্রবৈশিষ্ট্য বিচার করে শিষ্যের জন্য প্রশস্ত পথটি নির্ধারণ করে দেন।

৮০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ কিংবদন্তি সন্ন্যাসী তথা অদ্বৈত বেদান্ত প্রবক্তা আদি শঙ্কর তাঁর সৌন্দর্যলহরী স্তোত্রটির মাধ্যমে শাক্ত দর্শন ও তান্ত্রিক বিদ্যাকে হিন্দুধর্মের অঙ্গ হিসেবে সম্পূর্ণ স্বীকৃতি জানান। শঙ্কর "নিজে শাক্ত না হলেও, [...] শাক্তধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সম্ভবত তার কারণ ছিল জনসাধারণের মধ্যে এই মতের জনপ্রিয়তা।"[৫] শঙ্করের নামে প্রচলিত আরও একটি শাক্ত রচনা হল মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্রদেবীমাহাত্ম্যম্‌ অবলম্বনে রচিত এই ২১ শ্লোকের স্তোত্রটি "সর্বোচ্চ দেবীশক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দনাগীতি।"[৪৬]

ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যেই "তন্ত্র আঞ্চলিক, আদিবাসী ও সম্প্রদায়গত বিভিন্ন উৎসের বহুসংখ্যক কাল্টকে একত্রিত করে একটি সামগ্রিক শাক্ত চরিত্র অর্জন করে।" চতুর্দশ শতাব্দী থেকে "শাক্ত-তান্ত্রিক কাল্টগুলি [...] ভারতের বর্তমান সকল ধর্মীয় মতবাদের মূল অবয়বের সঙ্গে মিশে যায়।" শাক্ত-তান্ত্রিক প্রভাব আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত ভাষার সাহিত্য থেকে সংস্কৃত সাহিত্যেও লক্ষিত হতে থাকে।[৪৭]

জনপ্রিয় শাক্তধর্মের উদ্ভব[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে "বেশ কিছু শাক্ত-তান্ত্রিক গ্রন্থ রচিত হয়।" এগুলি "জনসাধারণের মধ্যে তান্ত্রিক ধ্যানধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করে।" এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহানির্বাণ তন্ত্র। এই গ্রন্থের বৈষিষ্ট্য এর "বিশেষ আধুনিকতা" ও "নারীদের প্রতি মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি"। বিশিষ্ট শাক্ত পণ্ডিত ভাস্করাচার্য ছিলেন "শাক্তদর্শনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অবদানকারী"। তিনিও এই যুগের মানুষ ছিলেন এবং তাঁর রচনাবলি আজও শ্রীকুল শাক্তধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়।[৪৮]

বিশিষ্ট তামিল সংগীতস্রষ্টা মুতুস্বামী দীক্ষিতর (১৭৭৫-১৮৩৫) ছিলেন শ্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ। তিনি তাঁর কর্ণাটকী ধ্রুপদি কমলাম্বা নববর্ণ কৃতি গীতিচক্রে এই সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় রহস্য অর্থাৎ রাজকীয় নববর্ণ পূজাকে গীতিরূপ দান করেন। "যেসব ভক্ত গানের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করতে চাইতেন, দীক্ষিতর তাঁদের জন্য এইভাবে শ্রীবিদ্যার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।"[৪৯] একই সময়ে পূর্বভারতে জনপ্রিয় শাক্তধর্মের আরো বড়ো একটি স্রোত প্রবাহিত হচ্ছিল। ভক্তিবাদী শাক্ত কবি রামপ্রসাদ সেনের (১৭২০-১৭৮১) শাক্ত পদাবলি "শক্তি কাল্টের একটি নতুন দিগন্তই শুধু খুলে দিল না, বরং তাকে জাতিবর্ণ-নির্বিশেষে সকলের উপযোগী করে তুলল।" রামপ্রসাদের পরে ৮০ জনেরও বেশি শাক্ত কবি বাংলায় আবির্ভূত হয়েছিলেন [এবং] ১৯০০ সালের মধ্যেই ৪,০০০-এরও বেশি শাক্ত পদ [বাংলা ভাষায়] রচিত হয়েছিল।"[৫০]

রামকৃষ্ণ পরমহংস, ফ্রাঙ্ক দ্বোরাক অঙ্কিত চিত্র

এরপর থেকে "শাক্তধর্ম একটি মুক্তচিন্তক বিশ্বধর্ম" রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ভারতীয় জীবনের প্রতিটি বিষয়ই এই ধর্ম স্পর্শ করে যায়। এই বিবর্তন "পূর্ণতা পেয়েছিল" প্রসিদ্ধ শাক্ত সন্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসের (১৮৩৬-১৮৮৬) ব্যক্তিত্বে। "তিনি তাঁর শাক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে অনুভব করেছিলেন যে, সব ধর্মই সমান এবং ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন ঈশ্বরের মধ্যে যে পার্থক্য সেই পার্থক্য জল ও বরফের পার্থক্যের চেয়ে বেশি কিছু নয়।"[৫১]

শাক্তধর্মের অন্যতম সমর্থক ছিলেন স্যার জন উডরফ (১৮৬৫-১৯৩৬)। কর্মসূত্রে ব্রিটিশ ভারতের এক হাইকোর্ট বিচারপতি উডরফকে "আধুনিক তন্ত্র-গবেষণার জনক" বলা হয়। তাঁর সুবিপুল রচনাবলি "তন্ত্রের বিরুদ্ধ সমালোচকদের যুক্তি খণ্ডন করে, এই ধারাকে বেদ ও বেদান্তের মতোই এক মহৎ, বিশুদ্ধ ও নৈতিক ব্যবস্থা প্রমাণে সক্ষম হয়।" তাঁর সম্পূর্ণ রচনাবলি আজও মুদ্রিত আকারে পাওয়া যায় এবং তা আজও যথেষ্ট প্রভাবশালী।[৫২]

রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) "রামকৃষ্ণের সংস্কার-কৃত শাক্ত-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জন করেছিলেন। তিনি জাতীয় জাগরণের কর্মসূচিতে শক্তি কাল্টের প্রয়োগের কথা বলেন।" তিনি "দেশকেই দিব্য জননীর জাগ্রত মূর্তিরূপে দেখতেন।" ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই মূর্তিকল্পের গভীর প্রভাব রয়েছে।

অপর বিখ্যাত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা শ্রীঅরবিন্দ (১৮৭২-১৯৫০) পরবর্তীকালে "নতুন আলোকে শাক্ত দর্শনের" ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি "তন্ত্রে উল্লিখিত নশ্বর ও পার্থিব দেহের দিব্য ও পবিত্র সত্ত্বায় রূপান্তর প্রক্রিয়াটির উদাহরণ দেন" এবং "দিব্যজননীর ইচ্ছার প্রতি নিঃশর্ত ও সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকেই" জীবনের উদ্দেশ্য বলে ব্যাখ্যা করেন।[৫৩]

বর্তমান অবস্থা[সম্পাদনা]

এন এন ভট্টাচার্যের মতে, শাক্তধর্ম এখন হিন্দুধর্মের মূলস্রোতে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে "একে আর সম্প্রদায়গত ধর্মমত বলা যায় না" এবং এই ধর্মের "গুরুত্ব অনুধাবনে এখন আর কোনো বাধা নেই।"[৫৪]

শাক্ত মন্দির ও তীর্থগুলির পরিচিতি ও গুরুত্বও এখন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ২০০৪ সালে সুবিশাল মীনাক্ষি মন্দিরটি "নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড" প্রতিযোগিতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।[৫৫] অন্যদিকে, ভৌগোলিকভাবে প্রত্যন্ত ও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক কাশ্মীরে অবস্থিত হলেও বৈষ্ণোদেবী মন্দিরে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের হিসেব অনুযায়ী ৫০ লক্ষ ভক্তসমাগম হয়েছিল।[৫৬]

ভারতীয় চলচ্চিত্রে শিল্পেও একাধিক শাক্ত ভক্তিমূলক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল সম্ভবত ১৯৭৫ সালের স্বল্প-বাজেটে নির্মিত ছবি জয় সন্তোষী মা। ছবিটি নির্মিত হয় সন্তোষী মাতা নামে সম্পূর্ণ অপরিচিত দেবীকে নিয়ে। কিন্তু ছবিটিতে ভক্তিবাদকে উত্তুঙ্গ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০০৩ সালে একটি ৩৬ পর্বের টেলিভিশন মিনিসিরিজ ও ২০০৬ সালে মূল ছবিটির রিমেকের জনপ্রিয়তা দেখে অনুমিত হয় এই "নতুন" দেবীর ভক্তসংখ্যা এখনও ক্রমবর্ধমান।[৫৭]

মীরা মাতা, নব্য হিন্দু সাধ্বীদের অন্যতম। ভক্তেরা তাঁকে পরাশক্তিরূপিণী দেবীর অবতার মনে করেন। ফটোগ্রাফ: commons:user:Hanumandas

"সন্তোষী মাতা"র জন্ম দেয় চলচ্চিত্রটি। এর পরেই তিনি ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল পূজিত দেবীতে পরিণত হন। পোস্টার আর্ট থেকে লক্ষ লক্ষ হিন্দুর ঠাকুরঘরে তিনি ঠাঁই করে নেন। [...] এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে, সন্তোষী মাতা, যিনি ভক্তকে এত সহজে কৃপা করেন, তিনি নিজে বৃহত্তর ও ইতোমধ্যেই সুসংগঠিত দেবী সংস্কৃতির অঙ্গ নন। তাঁর নব্য ভক্তগণ সহজেই তাঁর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যগুলিকে অনুভব করতে সক্ষম হন। কারণ তাঁর গুণগুলি দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত দেবীগণেরই অনুরূপ।"[৮]

কোনো কোনো গবেষক আধুনিককালে হিন্দু সাধ্বী ও স্ত্রীগুরুগণের সংখ্যাধিক্যের পিছনেও শাক্ত প্রভাব দেখে থাকেন।[৭] এঁদের কেউ কেউ মূলধারার হিন্দুধর্মের রক্ষণশীল ও পিতৃতান্ত্রিক ধারার অনুগামী। কিনতি পেকিলিসের মতে, মাতা অমৃতানন্দময়ী বা মীরা মাতার মতো কয়েকজন নারীবাদী ধারার অনুগামী যা স্বতন্ত্রভাবেই ভক্তিবাদী ও শাক্ত প্রকৃতির।[৫৮] তিনি বলেছেন:

"স্ত্রীগুরুগণ হিন্দু সংস্কার ও তাঁদের ভক্তদের দ্বারা দেবীর অবতার অর্থাৎ, শক্তির স্বরূপ রূপে পরিগণিত হন। [...] হিন্দু স্ত্রীগুরুদের প্রকৃতি, উপস্থিতি ও শিক্ষা বিশ্বজনীন। গুরুরূপে তাঁদের চরিত্রে দেখা যায় ধ্রুপদি সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিকতা ও কর্তৃত্ব এবং মুক্ত পারস্পরিক বাকবিনিময়ের যোগ্যতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরমের মধ্যে সুসামঞ্জস্য বজায় রাখার ক্ষমতা।"[৫৯]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Hawley. p. 2.
  2. ২.০ ২.১ See Bhattacharrya(a).
  3. ৩.০ ৩.১ Brown(a), p. ix.
  4. ৪.০ ৪.১ See Dikshitar, Ch. I and II.
  5. ৫.০ ৫.১ Bhattacharyya(a), p. 124.
  6. See, e.g., Bhattacharyya(a), p. 154.
  7. ৭.০ ৭.১ Pechilis, pp. 3.
  8. ৮.০ ৮.১ Hawley, John, "The Goddess in India," in Hawley, p. 4.
  9. Johnsen(b), p. 11, 13, 19.
  10. Joshi, M. C., "Historical and Iconographical Aspects of Shakta Tantrism," in Harper, p. 39.
  11. Subramuniyaswami, p. 1211.
  12. Bhattacharyya(a), p. 16.
  13. Bhattacharyya(b), p. 148.
  14. Marshall, J., Mohenjodaro & the Indus Civilization, Vol. I (London, 1931), pp. 48 ff; cited in Bhattacharyya(a), p. 6.
  15. Bhattacharyya(a), pp. 25-26.
  16. Bhattacharyya(a), p. 35.
  17. Bhattacharyya(a), pp. 37, 53.
  18. Bolon, p. 7.
  19. Rigveda, X.72.3-4, cited in Doniger, p. 38.
  20. Rigveda, I.89.10, cited in Bhattacharyya(a), p. 36.
  21. Rigveda, Devi Sukta, Mandala X, Sukta 125. Cited in Kali, pp. 213-217.
  22. অনুবাদ স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কৃত, শ্রীশ্রীচণ্ডী, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃ. ৩৬০
  23. Kena Upanisad, III.11-IV.3, cited in Müller and in Sarma, pp. xxix-xxx.
  24. Bhattacharya(a), p. 68.
  25. Krishna Warrier, pp. ix-x.
  26. Bhattacharyya, p. 77.
  27. Bhattacharyya, pp. 73, 81.
  28. Mahabharata, IV.6 and VI.23.
  29. Bhattacharyya, p. 75.
  30. Silappadikaram, Canto XXII, cited in Bhattacharyya(a), p. 78.
  31. Bhattacharyya(a), pp. 78-79.
  32. Winternitz, M., Vol. I, p. 529.
  33. Bhattacharyya(a), p. 164.
  34. Kali, p. xvii.
  35. Coburn, p. 16.
  36. Bhattacharyya(a), p. 108.
  37. Joshi, front flap.
  38. Suryanarayana, p. 44 ff.
  39. Brown(b), p. 17.
  40. Brown(b), pp. 10, 320.
  41. Brown(b), pp. 8, 21.
  42. Bhattacharyya(a), p. 111.
  43. Bhattacharyya(a), p. 113-114.
  44. Dikshitar, p. 90.
  45. Shankarnarayanan(a), p. 140.
  46. G. G. Kalbermatten, "The Legend of Dagad Trikon". While authorship of the Stotram is popularly attributed to Shankara, many scholars have disputed the claim. For further discussion of the Mahishasura Mardini Stotram, as well as a transcription and translation of the hymn, see "Mahishasura Mardini," Shakti Sadhana.org. An alternative translation can be found at Celextel.org
  47. Bhattacharyya(a), p. 154.
  48. Bhattacharyya(a), pp. 187.
  49. Shankaranarayanan(b), p. 103.
  50. Bhattacharyya(a), pp. 191-92.
  51. Bhattacharyya(a), pp. 200-201.
  52. Urban, p. 135.
  53. Bhattacharyya(a), pp. 202-203, citing Aurobindo, Sri, The Life Divine (Pondicherry, 1939).
  54. Bhattacharyya(a), pp. 203-204.
  55. "Popular demand: Meenakshi Temple in the race for 7 wonders," December 20, 2004, NDTV.com, via New Seven Wonders)
  56. "Over 50 lakh pilgrims visit Mata Vaishno Devi," September 30, 2007, Zee News.com
  57. Jai Santoshi Maa (2006)
  58. Pechilis, pp. 6.
  59. Pechilis, pp. 9-10.

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Anonymous (author), Doniger O'Flaherty, Wendy (translator), The Rig Veda: An Anthology. Penguin Classics Books (London, 1981).
  • "Bengali Shakta," World Culture Encyclopedia, South Asia.
  • (a) Bhattacharyya, N. N., History of the Sakta Religion, Munshiram Manoharlal Publishers Pvt. Ltd. (New Delhi, 1974, 2d ed. 1996).
  • (b) Bhattacharyya, N. N., The Indian Mother Goddess, South Asia Books (New Delhi, 1970, 2d ed. 1977).
  • Bolon, Carol Radcliffe, Forms of the Goddess Lajja Gauri in Indian Art, The Pennsylvania State University Press (University Park, Penn., 1992).
  • (a) Brooks, Douglas Renfrew, The Secret of the Three Cities: An Introduction to Hindu Shakta Tantrism, The University of Chicago Press (Chicago, 1990).
  • (b) Brooks, Douglas Renfrew, Auspicious Wisdom: The Texts and Traditions of Srividya Shakta Tantrism in South India, State University of New York Press (Albany, 1992).
  • (a) Brown, C. MacKenzie, The Triumph of the Goddess: The Canonical Models and Theological Issues of the Devi-Bhagavata Purana, State University of New York Press (Suny Series in Hindu Studies, 1991).
  • (b) Brown, C. Mackenzie. The Devi Gita: The Song of the Goddess: A Translation, Annotation and Commentary. State University of New York Press (Albany, 1998).
  • Coburn, Thomas B., Encountering the Goddess: A translation of the Devi-Mahatmya and a Study of Its Interpretation. State University of New York Press (Albany, 1991).
  • Dempsey, Corinne G., The Goddess Lives in Upstate New York: Breaking Convention and Making Home at a North American Hindu Temple. Oxford University Press (New York, 2006).
  • Dikshitar, V. R. Ramachandra, The Lalita Cult, Motilal Banarsidass Publishers Pvt. Ltd. (Delhi, 1942, 2d ed. 1991, 3d ed. 1999).
  • Erndl, Kathleen M., Victory to the Mother: The Hindu Goddess of Northwest India in Myth, Ritual, and Symbol, Oxford University Press (New York, 1992).
  • Harper, Katherine (ed.), The Roots of Tantra, State University of New York Press (Albany, 2002).
  • Hawley, John Stratton (ed.) and Wulff, Donna Marie (ed.), Devi: Goddesses of India. University of California Press (Berkeley, 1996).
  • (a) Johnsen, Linda. The Complete Idiot's Guide to Hinduism. Alpha Books (Indianapolis, Ind., 2002).
  • (b) Johnsen, Linda, The Living Goddess: Reclaiming the Tradition of the Mother of the Universe." Yes International Publishers (St. Paul, Minn., 1999).
  • Joshi, L. M., Lalita Sahasranama: A Comprehensive Study of the One Thousand Names of Lalita Maha-tripurasundari. D.K. Printworld (P) Ltd (New Delhi, 1998).
  • Kali, Davadatta, In Praise of the Goddess: The Devimahatmya and Its Meaning. Nicolas-Hays, Inc., Berwick, Maine, 2003).
  • Kapoor, Subodh, A Short Introduction to Sakta Philosophy, Indigo Books (New Delhi, 2002, reprint of c. 1925 ed.).
  • (a) Kinsley, David. Hindu Goddesses: Visions of the Divine Feminine in the Hindu Religious Tradition. University of California Press (Berkeley, 1988).
  • (b) Kinsley, David. Tantric Visions of the Divine Feminine: The Ten Mahavidyas. University of California Press (Berkeley, 1997).
  • Krishna Warrier, Dr. A.J., The Sākta Upaniṣad-s, The Adyar Library and Research Center, Library Series, Vol. 89; Vasanta Press (Chennai, 1967, 3d. ed. 1999).
  • Kumar, Girish, "Introduction to Tantra Sastra, Part I." Interview with Sri Girish Kumar, former director of Tantra Vidhya Peethama, Kerala, India, Mohan's World
  • Müller, F. Max (translator), The Upanishads. Realization.org
  • Nikhilananda, Swami (trans.), The Gospel of Sri Ramakrishna, Ramakrishna-Vivekananda Center (New York, 1942, 9th ed. 2000).
  • Pattanaik, Devdutt, Devi the Mother-Goddess: An Introduction. Vakils, Feffer and Simons Ltd. (Mumbai, 2000).
  • Pechilis, Karen (ed.), The Graceful Guru: Hindu Female Gurus in India and the United States. Oxford University Press (New York, 2004).
  • Sarma, Dr. S. A., Kena Upanisad: A Study From Sakta Perspective. Bharatiya Vidya Bhavan (Mumbai, 2001).
  • (a) Shankarnarayanan, S., The Ten Great Cosmic Powers: Dasa Mahavidyas. Samata Books (Chennai, 1972; 4th ed. 2002).
  • (b) Shankarnarayanan, S., Sri Chakra. Samata Books (Chennai, 1971; 4th ed. 2002).
  • Subramuniyaswami, Satguru Sivaya, Merging with Siva: Hinduism's Contemporary Metaphysics, Himalayan Academy (Hawaii, USA, 1999).
  • Suryanarayana Murthy, Dr. C., Sri Lalita Sahasranama with Introduction and Commentary. Bharatiya Vidya Bhavan (Mumbai, 2000. Rep. of 1962 ed.).
  • Urban, Hugh B., Tantra: Sex, Secrecy, Politics and Power in the Study of Religion, University of California Press (Berkeley, 2003).
  • White, David Gordon, Kiss of the Yogini: "Tantric Sex" in its South Asian Contexts, The University of Chicago Press (Chicago, 2003).
  • Winternitz, M., History of Indian Literature, 2 vols. (Calcutta, 1927, 1933, rep., New Delhi, 1973).
  • Woodroffe, Sir John, Sakti and Sakta: Essays and Addresses, Ganesh & Company (Madras, 9th Ed. 1987, reprint of 1927 edition).