মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন (ইংরেজি: Free software movement) একটি সামাজিক আন্দোলন যার উদ্দেশ্য কম্পিউটার ব্যবহারকারীর অধিকার সংরক্ষণ করা। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন মুক্ত সফটওয়্যার তৈরি করতে ও ব্যবহার করতে উৎসাহ প্রদান করে। এই আন্দোলনের দর্শন সত্তরের দশকের হ্যাকার সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত। সত্তরের দশকের শেষ দিকে হ্যাকার সংস্কৃতি ম্লান হতে থাকলে রিচার্ড স্টলম্যান এই দর্শনকে বাস্তবায়নের জন্য গনু প্রকল্প শুরু করেন, সেকারণেই তাঁকে এই আন্দোলনের প্রবক্তা হিসাবে গণ্য করা হয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর অবদান – কম্পিউটার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান। হার্ডওয়ার ( যন্ত্রাংশ ), অপারেটিং সিসটেম (মূলপ্রাণশক্তি) এবং এপ্লিকেশনস - এই সবটা নিয়ে এখনো বিকাশমাস এবং প্রসারণশীল এই বিজ্ঞান । আজকে কম্পিউটার খুললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ। প্রতি দশটা কম্পিউটারের মধ্যে নয়টা। এর বাইরে যেন অন্য কোন উপায় নেই। লাইসেন্সের কঠিন নিগঢ়ে বাঁধা ব্যবহারকারী; ব্যবহারকারীর কোন স্বাধীনতা নেই, প্রয়োজন মতো কোন রকমের পরিবর্তনের অধিকার নেই, কোন সুহৃদ বন্ধুর সাথে বিনিময়ের অধিকার নেই।এদের আমরা বলতে পারি ‌‍" প্রোপ্রাইটারি সফটওয়ার "। শুধু তাই নয়, কম্পিউটার যন্ত্রটির উপরও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই । ভাইরাসের আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে থাকতে হয়, বাধ্য হয়ে কিনতে হয় এন্টিভাইরাস, প্রচার আছে যারা ভাইরাস ছড়াচ্ছে তারাই এন্টিভাইরাস বিক্রি করছে। আপনার অজান্তে আপনার তথ্য-কাজের নিয়ন্ত্রণও চলে যেতে পারে, যায়ও এদের হাতে। এর বাইরে প্রতি বছরই পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে হার্ডওয়ার , অপারেটিং সিসটেম এবং এপ্লিকেশন সফটওয়ারে। পুরানো হার্ডওয়ারে চলেছে না নতুন অপারেটিং সিসটেম,পুরানো এপ্লিকেশনে খোলা যাচ্ছে না এপ্লিকেশনের নতুন ভার্সানে তৈরী ফাইলগুলি । কোর-মেগাহার্জ-ভানসানের চক্করে দু-তিন বছরের মধ্যে বাতিল করতে বাধ্য হতে হচ্ছে পুরানো কম্পিউটারটি, কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র/যন্ত্রাংশ। কেবলমাত্র আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নে বিজ্ঞানের এই সুযোগ ব্যবহারের বাইরে থেকে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে এক বিরাট জনসংখ্যাকে । সমস্ত কম্পিউটার বিজ্ঞানটাই ইনটেল, মাইক্রোসফটের মত অল্প কয়েকটি কোম্পানীর মুষ্টিবদ্ধ। আমাদের মধ্যে অনেকেই প্রোপ্রাইটারি সফটওয়ারকে অদৃষ্ট হিসাবে মেনে নিয়েছেন।কিন্তু কম্পিউটার বিজ্ঞানের গোড়ার দিনগুলি এমন ছিল না। তখন ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম ছিল, নিজেরাই প্রয়োজনীয় অপারেটিং সিসটেম, এপ্লিকেশন তৈরি করে নিতেন, অন্যদের সাথে বিনিময় হতো, জ্ঞান প্রসারের স্বার্থে । কেউ কোনো অপিরিচিত এবং কৌতুহলোদ্দীপক প্রোগ্রাম ব্যবহার করলে, তাকে জিজ্ঞাসা করা যেত এর সোর্স কোড কি, যাতে এটা পড়তে-পরিবর্তন করতে, অথবা এর কোনো অংশকে নিয়ে একটা নতুন প্রোগ্রাম তৈরি করতে পারা যায়। ১৯৮০-র পর থেকে অবস্থাটার পরিবর্তন ঘটে গেল। বাজার বৃদ্ধির সাথে সাথে লাভ এবং একাধিপত্যের লোভে লাইসেন্স প্রথায় আবদ্ধ করা হলো সমস্ত বিষয়টা। নিজের চাহিদা অনুযায়ী কম্পিউটার ব্যবহারকারীর প্রোগ্রাম পরিবর্তনের স্বাধীনতা, সফটওয়ার আদান-প্রদানের স্বাধীনতা খর্ব করা হলো, 'অন্যকে সাহায্য করাই হলো সমাজের মূল ভিত্তি' - একে শৃঙ্খলিত করা হলো। মানুষের সৃষ্টি কাজের বিষয়ে বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি কখনো স্তব্দ হয়ে যায়নি । প্রোপ্রাইটারি সফটওয়ারের শুরুর পাশাপাশি 'ফ্রি সফটওয়ার' সৃষ্টি, প্রসারের উদ্যোগ পৃথিবীর সর্বত্র সমাদৃত হয়েছে। আজ সারা বিশ্বে এটা 'ফ্রি সফটওয়ার মুভমেন্ট' নামে পরিচিত । একটা মুক্ত পরিবেশ , যার মূল প্রতিপাদ্য হলো 'সোর্স কোড'-র উপর ব্যবহারকারীর পূর্ণ অধিকার। তৈরী হয়েছে নানা রকমের প্ল্যাটফর্ম – উবন্তু, ফেডোরা, রেডহ্যাট, সুসে, ম্যানড্রিভা ইত্যাদি। প্রোপ্রাইটারি সফটওয়ারের কাছে অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে 'ফ্রি সফটওয়ার' ।এর ব্যবহারকারী-চর্চাকারীর সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বেচ্ছা অবদানের মধ্যে তৈরী হচ্ছে এক নিখুঁত অপারেটিং সিসটেম – যা হ্যাঙ্গ মুক্ত, ভাইরাস মুক্ত, খরচে সস্তা। এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলিও আজ সরকারী কাজ সহ প্রায় সমস্ত কাজে মাইক্রোসফটকে বাতিল করে 'ফ্রি সফটওয়ার ' ব্যবহার করছে। ভারত, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে স্কুল স্তর থেকে কম্পিউটার শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হলে এর ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। ইতিমধ্যে ভারতে বিভিন্ন সরকারী স্তর যেখানে 'ফ্রি সফটওয়ার ' ব্যবহার হচ্ছে তার উল্ল্যেখযোগ্য কয়েকটি - আই আই টি, টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, সুপ্রিম কোর্ট, কর্ণাটক ও অন্ধ্র হাই কোর্ট, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ন্যাশান্যাল স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি।বেসরকারী ক্ষেত্রগুলির মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য – এশিয়ান পেইন্টস, আই ডি বি আই, রিলায়েন্স, টাইমস অফ ইন্ডিয়া গ্রুপ, বম্বে ডায়িং, গোদরেজ ইনফোটেক, হিন্দুস্থান লিভার, এইচ ডি এফ সি গ্রুপ। সারা বিশ্বজুড়ে 'ফ্রি সফটওয়ার ' আন্দোলন জোরদার হচ্ছে, এর সাংগঠনিক চেহারাও স্পষ্ট হচ্ছে। এই আন্দোলন পেশা-বয়স-প্রথাগত ( প্রযুক্তি-অপ্রযুক্তি) শিক্ষা নিরপেক্ষ এবং ক্রম সম্প্রসারণশীল। ব্যবহারকারীর স্বার্থ এবং মানুষের মেধা ও মননকে মুক্ত রাখাই এই আন্দোলনের একমাত্র উদ্দেশ্য।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]