মুক্তচিন্তা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মুক্তচিন্তা (ইংরেজি: Freethought) হল এক প্রকার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী যা বলে যে বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং যুক্তির আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত; মতামত গঠণের ক্ষেত্রে প্রথা, অন্ধ বিশ্বাস এবং কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বাঞ্চনীয় নয়[১]। সচেতনভাবে মুক্তচিন্তার প্রয়োগকে বলে মুক্তচিন্তন এবং এর অনুশীলনকারীদের বলে মুক্তমনা[২]

সারসংক্ষেপ[সম্পাদনা]

মুক্তচিন্তা বলে যে জ্ঞান ও যুক্তির অনুপস্থিতিতে দাবিকৃত কোন মতকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা উচিত না। সুতরাং, মুক্তমনারা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, বাস্তব সত্য এবং যুক্তির আলোকে মত গড়ে তুলে এবং হেত্বাভাস অথবা কর্তৃপক্ষ, পক্ষপাতদুষ্টতা, লোকজ্ঞান, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, প্রথা, গুজব এবং অন্য সব গোঁড়া, বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার উৎসাহদাতার ভূমিকা পালনকারী শাস্ত্র থেকে নিজেদের বিরত রাখে। ধর্মের ক্ষেত্রে মুক্তমনারা সাধারণত বলে যে অলৌকিক অবভাসের পক্ষে প্রমাণ যথেষ্ট নয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক উইলিয়াম কিংডন ক্লিফোর্ডের “ক্লিফোর্ডস্ ক্রেডো” এর একটি বাক্যকে মুক্তচিন্তার ভিত্তি বলা যায়- “যে কোন ব্যক্তির যে কোন জায়গায় উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে কোন কিছু বিশ্বাস করা উচিত নয়”।

প্রতীক[সম্পাদনা]

অষ্টদশ শতকের আমেরিকান সেকুলার ইউনিয়নের সাহিত্যে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে প্যানজি ফুলটি মুক্তচিন্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এর কারণ মূলত ফুলটির নাম ও আকৃতি। “প্যানজি” নামটি ফরাসি pensée থেকে উদ্ভূত যার অর্থ “চিন্তা”। তাছাড়া ফুলটির সাথে মানুষের মুখের সাদৃশ্য রয়েছে এবং অগাস্ট মাসে ফুলটি সামনে হেলে পড়ে, যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়েছে[৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রাক-আধুনিক আন্দোলন[সম্পাদনা]

প্যানজি ফুল, মুক্তচিন্তার প্রতীক

মুক্তচিন্তার সংস্কৃতি আইরিশ, পারস্য সভ্যতা (উদাহরণঃ খৈয়াম এবং তাঁর সুফিবাদী, অপ্রথাগত রুবাইয়াত) এবং চীনা সভ্যতা (যেমন, নৌচালনের দক্ষিণাঞ্চলের গান রেঁনেসা)[৪] জ্ঞান ভান্ডার থেকে আলকেমি অথবা জ্যোতিষশাস্ত্রের বিদ্রোহী চিন্তাবিদ এবং অবশেষে রেঁনেসা ও প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারবাদী আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়ে।

আধুনিক আন্দোলন[সম্পাদনা]

১৬০০ সালকে আধুনিক মুক্তচিন্তা যুগের শুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এই বছরেই প্রাক্তন ডমিনিকান ধর্মযাজক জর্দানো ব্রুনোকে স্প্যানিশ অনুসন্ধানে ইতালিতে আগুনে পুড়িয়ে মারে।[৫]

ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স[সম্পাদনা]

সপ্তদশ শতকের শেষভাগে ইংল্যান্ডে চার্চ এবং বাইবেলের আক্ষরিক অনুবাদের বিরোধীতাকারীদের “মুক্তমনা” বলা হত। এই ব্যক্তিবর্গের চেতনার কেন্দ্রীয় বিশ্বাস ছিল যে বস্তুজগতকে প্রকৃতির মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব। ১৬৯৭ সালে জন লককে লেখা উইলিয়াম মলিনিউক্সের চিঠি এবং ১৭১৩ সালে এন্থনি কলিন্সের “ডিসকোর্স অব ফ্রি-থিংকিং” এ এরুপ ধ্যান-ধারণা প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল এবং একই সাথে জনপ্রিয়ও হয়েছিল। এই ধারণাটি ফ্রান্সে প্রথম জন্সম্মুখে আবির্ভূত হয় যখন ডেনিস দিদেরট, জঁ লে রোনড ড'আলেমবেরট এবং ভলতেয়ার তাঁদের এনসিক্লোপেডিতে Libre-Penseur এর উপর একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেন; প্রবন্ধটি চরম নাস্তিক্যবাদী ছিল। যুক্তরাজ্যে ১৮৮১ সালে প্রথম “দ্যা ফ্রিথীংকার” পত্রিকা প্রকাশ করা হয়েছিল।

জার্মানী[সম্পাদনা]

মার্চ বিপ্লবের আগে ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত গীর্জার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ বেড়ে চলছিল। ১৮৪৪ সালে ইয়োহানেস রঙ্গে এবং রবার্ট ব্লামের প্রভাবে মানবাধিকার, সহনশীলতা ও মানবতাবাদের প্রসার ঘটেছিল এবং ১৮৫৯ সালের দিকে তাঁরা Bund Freireligiöser Gemeinden Deutschlands (জার্মানী ধর্ম নিরপেক্ষ সম্প্রদায়) প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা এখনও বিদ্যমান। ১৮৮১ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট এম মাইনলুদউইগ বাখনার Deutschen Freidenkerbund প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল প্রথম জার্মান নাস্তিক সংগঠন। ১৮৯২ সালে Freidenker-Gesellschaft এবং ১৯০৬ সালে Deutscher Monistenbund প্রতিষ্ঠিত হয়।[৬] প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর “বুর্জোয়া” মুক্তচিন্তক সংগঠণের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে এবং “প্রলেতারিয়াত” মুক্তচিন্তক সংগঠণের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং অবশেষে সেগুলো সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর সংগঠণে রুপ নেয়।[৬][৭] ১৯৩৩ সালে হিটলারের উত্থানের পর বেশিরভাগ মুক্তচিন্তক সংগঠণ নিষিদ্ধ হয়, তবে ভলকিশচ্ সংগঠণগুলোর সাথে সম্পৃক্ত ডানপন্থী দলগুলোকে নাৎসীরা ১৯৩০ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত্য বরদাশত করে।[৬][৭]

যুক্তরাষ্ট্র[সম্পাদনা]

১৮৪৮ সালের জার্মান রাষ্ট্রগুলোতে বিপ্লবের কারণে ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান মুক্তমনারা অভিবাসন নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁরা সরকার ও গীর্জার হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের চেতনা ধারণ করতে পারার আশা করেছিলেন।[৮] অনেক মুক্তমনা জার্মান অধ্যুষিত সেন্ট লুই, ইন্ডিয়ানোপলিস, উইসকনসিন এবং টেক্সাসে স্থায়ী হয়েছিলেন[৮], যেখানে তাঁরা কমফোর্ট নামক শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই জার্মান মুক্তমনারা তাঁদের সংগঠণগুলোকে Freie Gemeinden বা “মুক্ত সমাবেশ” আখ্যা দিতেন।[৮] এরকম সংগঠন প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় সেন্ট লুই শহরে ১৮৫০ সালে[৯] পরে উইসকনসিন, টেক্সাস, ক্যালিফরনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ ইয়র্ক, ইলিনয় এবং অন্য প্রদেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।[৮][৯] মুক্তমনারা উদার আদর্শ ধারণ করতেন এবং বর্ণীয়-সামাজিক-লৈঙ্গিক সমতার পাশাপাশি দাসপ্রথার বিলুপ্তি সমর্থন করতেন।[৮]

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তচিন্তক সংগঠণগুলোর জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে, যার জন্য মূলত এই সংগঠণগুলোর ধর্ম-বিরোধিতা দায়ী। আন্দোলনটির কোন নির্দিষ্ট লক্ষ ও বিধান ছিল না। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বেশিরভাগ মুক্তচিন্তক সংগঠণ ভেঙে পড়ে নয়ত মূলস্রোতের গীর্জাগুলোতে যোগ দেয়।

কানাডা[সম্পাদনা]

ইংলিশ কানাডার সবচেয়ে প্রাচীন মুক্তচিন্তা সংগঠণ হল টরন্টো ফ্রিথোট এসোসিয়েশন যা ১৮৭৩ সালে স্বল্প সংখ্যাক ধর্ম-নিরপেক্ষাতাবাদীদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৭৭ এবং ১৮৮১ সালে সংগঠণটিকে পুনর্সংগঠণ করে “টরন্টো সেকুলার সমাজ” এ নামান্তরিত করা হয়, এই দলটিই ১৮৮৪ সালে দেশজুড়ে মুক্তমনাদের মধ্যে সংহতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নির্মিত কানাডিয়ান সেকুলার ইউনিয়ন এর মূলাধার গঠণ করে। শ্রমিক সমাজের “অভিজাত” সদস্যরাই মূলত এই সংগঠণগুলোর প্রথম দিকের সদস্য ছিলেন, যেমন- আলফ্রেড এফ. জুরি, জে ইক. ইভান্স এবং জে. আই. লিভিংস্টোন, যাঁরা সবাই প্রথম সারির শ্রমিক নেতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ছিলেন। টরন্টো সংগঠণের দ্বিতীয় সভাপতি ছিলেন টি. ফিলিপ্স থম্পসন, যিনি ১৮৮০ এবং ১৮৯০ দশকের শ্রম ও সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কানাডার বিশিষ্টতম শ্রমিক বুদ্ধিজীবি ছিলেন।

কানাডিয়ান সেকুলার এলায়েন্স এখনও সক্রিয়তা বজায় রেখেছে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. মুক্তচিন্তা
  2. Freethinker
  3. A Pansy For Your Thoughts, by Annie Laurie Gaylor, Freethought Today, June/July 1997
  4. Chinese History - Song Dynasty 宋 (www.chinaknowledge.de)
  5. encyclopedia.stateuniversity.com
  6. ৬.০ ৬.১ ৬.২ Bock, Heike (2006)। "Secularization of the modern conduct of life? Reflections on the religiousness of early modern Europe"। in Hanne May। Religiosität in der säkularisierten Welt। VS Verlag fnr Sozialw। পৃ: 157। আইএসবিএন 3-8100-4039-8 
  7. ৭.০ ৭.১ Kaiser, Jochen-Christoph (2003)। Christel Gärtner, সম্পাদক। Atheismus und religiöse Indifferenz। Organisierter Atheismus। VS Verlag। আইএসবিএন 9783810036391 
  8. ৮.০ ৮.১ ৮.২ ৮.৩ ৮.৪ "Freethinkers in Wisconsin"। Dictionary of Wisconsin History। 2008। সংগৃহীত 2008-07-27 
  9. ৯.০ ৯.১ Demerath, N. J. III and Victor Thiessen, "On Spitting Against the Wind: Organizational Precariousness and American Irreligion," The American Journal of Sociology, 71: 6 (May, 1966), 674-687.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]