মি-লা-রাস-পা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নেপালের হেলমু উপত্যকার মিলারেপা গুহায় মি-লা-রাস-পার মূর্তি

মি-লা-রাস-পা (তিব্বতী: མི་ལ་རས་པওয়াইলি: Mi-la-ras-pa) বা মিলারেপা, (১০৫২ – ১১৩৫) তিব্বতের অন্যতম বিখ্যাত কবি ও বৌদ্ধ পন্ডিত ছিলেন।

জীবনকাল[সম্পাদনা]

মিলারেপার জীবনীকার গ্ত্সাং-স্ম্যোন-হেরুকার মতে মিলারেপা ১০৫২ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ ও ১১৩৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। যদিও পঞ্চদশ শতাব্দীর ল্হো-রোং-ছোস-'ব্যুং গ্রন্থে তাঁর জন্মসাল ও মৃত্যুসাল বারো বছর এগিয়ে বর্ণনা করা হয়। কাহ-থোগ-ত্শে-দ্বাং-ফ্যুং, সি-তু-পান-ছেন-ছোস-ক্যি-'ব্যুং-গ্নাস, ব্রাগ-দ্কার-ছোস-ক্যি-দ্বাং-ফ্যুং প্রভৃতি বিখ্যাত তিব্বতী ঐতিহাসিকের মতে মিলারেপার জন্ম ১০২৮ খ্রিষ্টাব্দে হয়।[১]

পূর্বপুরুষ[সম্পাদনা]

গ্ত্সাং-স্ম্যোন-হেরুকার মতে মিলারেপার পূর্বপুরুষেরা মধ্য তিব্বতের উত্তরাঞ্চলের খ্যুং-পো পরিবারগোষ্ঠীর যাযাবর ছিলেন। এই পরিবারে জো-স্রাস নামে এক বিখ্যাত র্ন্যিং-মা তান্ত্রিক মিলারেপার পূর্বপুরুষ ছিলেন। তিনি প্রথম মি-লা নামক নতুন পারিবারিক উপাধি ধারণ করেন। জো-স্রাসের পুত্রের মি-লা-ম্দো-স্তোন-সেং-গে (ওয়াইলি: mi la mdo ston seng ge) ও মি-লা-র্দো-র্জে-সেং-গে (ওয়াইলি: mi la rdo rje seng ge) নামক দুই পুত্র ছিলেন। র্দো-র্জে-সেং-গে জুয়াখেলায় সমস্ত পারিবারিক সম্পত্তি হারালে তাঁদের পরিবার নতুন জীবনের সন্ধানে স্ক্যা-র্ঙ্গা-র্ত্সা (ওয়াইলি: skya rnga rtsa) নামক গ্রামে বসবাস শুরু করে। র্দো-র্জে-সেং-গে ঐ গ্রামের এক স্থানীয় মহিলাকে বিবাহ করলে তাঁদের মি-লা-শেস-রাব-র্গ্যাল-ম্ত্শান (ওয়াইলি: mi la shes rab rgyal mtshan) নামক এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। মি-লা-শেস-রাব-র্গ্যাল-ম্ত্শান পরবর্তীকালে ম্যাং-র্ত্সা-দ্কার-র্গ্যান (ওয়াইলি: myang rtsa dkar rgyan) নামে এক মহিলাকে বিবাহ করলে তাঁদের মি-লা-থোস-পা-দ্গা' (ওয়াইলি: Mi-la-thos-pa-dga') নামে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, যিনি পরবর্তীকালে মিলারেপা নামে বিখ্যাত হন।[১]

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

মি-লা-থোস-পা-দ্গা'র সাত বছর বয়সে তাঁর পিতা কঠিন ব্যাধিতে মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তাঁদের সমস্ত পারিবারিক সম্পত্তি এই শর্তে নিজের ভাইয়ের নামে করে দেন, যে মি-লা-থোস-পা-দ্গা'র শৈশবাবস্থা পেরোলে তিনি এই সম্পত্তির অধিকারী হবেন। কিন্তু মি-লা-থোস-পা-দ্গা'র খুল্লতাত তাঁদের সমস্ত পারিবারিক সম্পত্তি হস্তগত করে তাঁর মাতা ও ভগিনীকে তাঁদের দাসে পরিণত করেন।[২] তাঁর মাতা ম্যাং-র্ত্সা-দ্কার-র্গ্যান তাঁকে এর প্রতিশোধের জন্য তাঁকে কালো জাদু শিক্ষা করতে আদেশ করেন। তিব্বতী প্রবাদানুসারে, মি-লা-থোস-পা-দ্গা' এরপরে গ্নুব্স-ছুং-য়োন-তান-র্গ্যা-ম্ত্শো (ওয়াইলি: gnubs chung yon tan rgya mtsho) নামক এক তান্ত্রিকের নিকটে কালো জাদু সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করে তাঁর খুল্লতাতের এক অনুষ্ঠানে প্রচন্ড ঝড়ের সৃষ্টি করলে পঁয়ত্রিশজন মানুষ মারা যান ও তাঁদের ফসল নষ্ট হয়।[n ১]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

মি-লা-রাস-পা তাঁর প্রতিশোধের জন্য লজ্জিত হয়ে মার-পা-ছোস-ক্যি-ব্লো-গ্রোসের নিকট গেলে তিনি শত অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁকে শিক্ষাদানে অসম্মত হন। এরফলে তিনি রাং-স্তোন-ল্হা-দ্গা' (ওয়াইলি: rang ston lha dga') নামক এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর নিকটে অতিযোগ তত্ত্ব সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করতে যান। কিন্তু এতে বিশেষ উন্নতি না হলে তিনি পুনরায় মার-পা-ছোস-ক্যি-ব্লো-গ্রোসের নিকট শিক্ষালাভের জন্য গেলে তিনি তাঁকে মহামুদ্রা সম্বন্ধে শিক্ষাদান করেন। এরপর প্রায় তিনি প্রায় বারো বছর সাধনার ফলে সিদ্ধিলাভ করে মিলারেপা নামে খ্যাত হন। মিলারেপার শিক্ষক মার-পা-ছোস-ক্যি-ব্লো-গ্রোস তিলো পার ছাত্র নারো পার নিকট হতে শিক্ষালাভ করেন। এই শিক্ষা মিলারেপা তাঁর ছাত্র স্গাম-পো-পা-ব্সোদ-নাম্স-রিন-ছেনরাস-ছুং-র্দো-র্জে-গ্রাগ্স-পা এবং ছাত্রী রেছুংমা, পাদারবুম, সাহ্লে আউই ও ত্সেরিংমাকে দিয়ে যান।.[৪][৫][৬]

তীর্থস্থান ও বৌদ্ধবিহার[সম্পাদনা]

মিলারেপা যে সমস্ত স্থানে সাধনারত ছিলেন, তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে সেই সমস্ত স্থান তীর্থস্থানে পরিণত হয়। এই সমস্ত স্থানগুলি তিব্বত ও নেপাল সীমান্তের মধ্যবর্তী ওঞ্চলে অবস্থিত। এই সমস্ত স্থানের মধ্যে ব্রাগ-দ্কার-র্তা-সো, ত্সা-রি, লা-ফ্যি ও কৈলাস পর্বত উল্লেখযোগ্য। তিব্বতের ঝোংগাং নামক গ্রামের মিলারেপার গুহার নিকটে মিলারেপাকে উদ্দেশ্য করে পেল্গ্যে লিং বৌদ্ধবিহার নামক একটি ছোট বৌদ্ধবিহার অবস্থিত।[৭]

কবিতা[সম্পাদনা]

তিব্বতে মিলারেপার মূর্তি

মিলারেপা তাঁর সঙ্গীত ও কবিতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর সমস্ত রচনায় ধর্মের গভীরতা সম্বন্ধে তাঁর উপলব্ধির কথা বর্ণিত হয়েছে। এই সমস্ত রচনায় থেরবাদ, মহাযানবজ্রযান বৌদ্ধমতের পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা ও একতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে সাহসিকতাপূর্ণ আত্মত্যাগ, আপোসহীন শৃঙ্খলা ও দৃঢ় অধ্যবসায় না থাকলে মহাযানবজ্রযান বৌদ্ধধর্ম বর্ণিত চমকপ্রদ সমস্ত ধারণাগুলির কোন মূল্য থাকেনা।[৮]

প্রবাদ[সম্পাদনা]

মিলারেপা সম্বন্ধে বহুরকমের প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। তিনি লুং-গোম-পা নামক তন্ত্রসাধনার ফলে বাতাসের মতো দ্রুত চলাচল করতে পারতেন বলে প্রবাদ রয়েছে। [৯][১০] এই প্রবাদের ওপর ভিত্তি করে সত্যজিত রায় প্রফেসর শঙ্কু নামক তাঁর সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্রের 'একশৃঙ্গ অভিযান' নামক তিব্বত অভিযানের গল্প রচনা করেন।

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. In my youth I committed black deeds. In maturity I practised innocence. Now, released from both good and evil, I have destroyed the root of karmic action and shall have no reason for action in the future. To say more than this would only cause weeping and laughter. What good would it do to tell you? I am an old man. Leave me in peace.[৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ Quintman, Andrew (2010-04)। "Milarepa"The Treasury of Lives: Biographies of Himalayan Religious Masters। সংগৃহীত 2013-11-23 
  2. Gtsaṅ-smyon He-ru-ka (Tsangnyong Heruka Rüpägyäncän), The life of Milarepa, tr. Lobsang Phuntshok Lhalungpa, Viking Press, 1979, p.12
  3. The Life of Milarepa: A New Translation from the Tibetan translator Lobsang P. Lhalungpa written by He-Ru-Ka p.12
  4. Website of Gyalwa Karmapa, see: Women Disciples of Milarepa
  5. Women in Tibet
  6. Rechungma
  7. Dowman, Keith. 1988. The Power-places of Central Tibet: The Pilgrim's Guide. Routledge & Kegan Paul, London & New York. ISBN 0-7102-1370-0, p. 282.
  8. The Hundred Thousand Songs of Milarepa: The Life-Story and Teaching of the Greatest Poet-Saint Ever to Appear in the History of Buddhism
  9. David-Neel, Alexandra. Magic and Mystery in Tibet. New York: Dover Publications, Inc., 1971 (ISBN 0-486-22682-4)
  10. Magic and Mystery in Tibet p.212

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Life Story of Milarepa, by Ken Albertsen, adapted from the translation by Lobsang P.Lhalungpa, Adventure1 Publications, 2008, ISBN 978-1-879338-07-4
  • The Life of Milarepa, translated by Andrew Quintman, Penguin Classics, 2010, ISBN 978-0-14-310622-7
  • The Life of Milarepa, translated by Lobsang P. Lhalungpa, Book Faith India, 1997, ISBN 81-7303-046-4
  • Milarepa: Songs on the Spot, translated by Nicole Riggs, Dharma Cloud Press, 2003, ISBN 0-9705639-3-0
  • Milarepa, The Hundred Thousand Songs of Milarepa, translated by Garma C.C. Chang, City Lights Books, 1999, ISBN 1-57062-476-3
  • Tibet's Great Yogī Milarepa: A Biography from the Tibetan. Edited by W. Y. Evans-Wentz. 1928. Oxford University Press. Paperback reprint 1974.
  • The Yogi's Joy: Songs of Milarepa Sangharakshita, Windhorse Publications, 2006, ISBN 1-899579-66-4
  • Aufschnaiter, Peter. 1976. "Lands and Places of Milarepa." East and West 26, no. 1-2: 175-89.
  • Bachhofer, Joss. 1986. Verrückte Weisheit, Leben Und Lehre Milarepas. Haldenwang: Schangrila.
  • Chang, Garma C. C. 1962.The Hundred Thousand Songs of Milarepa. New Hyde Park, N.Y.: University Books. Reprint, (2 vols. in 1), Boston: Shambhala Publications, 1999.
  • Kunga Rinpoche, and Brian Cutillo. 1978. Drinking the Mountain Stream. Translated by Kunga Rinpoche and Brian Cutillo. Novato, CA: Lotsāwa Press.
  • Kunga Rinpoche, and Brian Cutillo. 1986. Miraculous Journey. Translated by Kunga Rinpoche and Brian Cutillo. Novato, CA: Lotsāwa Publications.
  • Lhalungpa, Lobzang P. 1977. The Life of Milarepa. New York: Dutton. Reprint, Boston: Shambhala Publications, 1984.
  • Martin, Dan. 1982. "The Early Education of Milarepa." The Journal of the Tibet Society 2: 53-76.
  • Quintman, Andrew. 2006. "Milarepa's Many Lives: Anatomy of a Tibetan Biographical Corpus." Ph.D., University of Michigan.
  • Quintman, Andrew. 2008. "Toward a Geographic Biography: Milarepa's Life in the Tibetan Landscape." Numen 55, no. 4: 363-410.
  • Roberts, Peter Alan. 2007. The Biographies of Rechungpa: The Evolution of a Tibetan Hagiography. London: Routledge.
  • Schaeffer, Kurtis R. 2007. "Dying Like Milarepa: Death Accounts in a Tibetan Hagiographic Tradition." In The Buddhist Dead: Practices, Discourses, Representations, edited by Bryan J. Cuevas and Jacqueline I. Stone, 208-33. Honolulu: University of Hawaii Press.
  • Schmid, Toni. 1927-1935. The Cotton-Clad Mila: The Tibetan Poet-Saint's Life in Pictures, Sino-Sweding Expedition, Pub. 36. Stockholm: Statens etnografiska museum, 1952.
  • Sernesi, Marta. 2004. "Milarepa's Six Secret Songs: The Early Transmission of the Bde-Mchog Snyan Brgyud." East and West 54, no. 1-4: 251-87.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]