মহীনের ঘোড়াগুলি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মহীনের ঘোড়াগুলি
আট জন বিশিষ্ট রক সঙ্গীতদল মঞ্চে প্রদর্শন করছে।
রবীন্দ্রসদনে কনসার্টের সময়ে মহীনের ঘোড়াগুলি, ১৯৭৯; বাম থেকে: রাজা ব্যানার্জী, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, তাপস দাস, প্রণব সেনগুপ্ত, গৌতম চট্টোপাধ্যায় এবং রঞ্জন ঘোষালএব্রাহাম মজুমদার এবং বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন, যদিও এখানে অদৃশ্যমান।
প্রাথমিক তথ্যাদি
উদ্ভব কলকাতা, ভারত
ধরন
কার্যকাল ১৯৭৬ (১৯৭৬)–১৯৮১ (১৯৮১); ১৯৯৫ (১৯৯৫)–১৯৯৯ (১৯৯৯)
লেবেল
ওয়েবসাইট moheenerghoraguli.hpage.com
প্রাক্তন সদস্যবৃন্দ দেখুন সদস্যবৃন্দ

মহীনের ঘোড়াগুলি ১৯৭৬ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত বাংলা স্বাধীন রক সঙ্গীত ব্যন্ড।[১] এটি ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড যা ১৯৭০-এর দশকের মাঝ পর্বে কলকাতায় যাত্রা শুরু করে।[২][৩] একদল ক্ষ্যাপা সঙ্গীতশিল্পী সহকারে নব্বই দশকের পর তারা ব্যাপকভাবে ভারতীয় রক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক প্রভাবশালী সঙ্গীতদল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। লাতিন, রক, লোক, বাউল বিভিন্ন সঙ্গীত ধারায় নিরীক্ষামূলক কাজ এবং এসবের প্রভাবের মিশ্রণ থাকায় এই সঙ্গীত দলকে যে কোনো একটি সঙ্গীত শৈলী অনুসারে শ্রেণীভুক্ত বা আলাদা করা কঠিন হবে। তবে বাউল সঙ্গীত এবং বাংলা রক ধারায় লোক ঐতিহ্যের স্বাধীনচর্চার কারণে মহীনের ঘোড়াগুলিকে লোক-রক সঙ্গীত ব্যান্ড বলা যেতে পারে।

সত্তরের দশকে দলটি গড়ে উঠলেও প্রাথমিকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। সে সময়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গানে আমূল নতুনত্ব থাকলেও চলচ্চিত্রের গান বাণিজ্যিকভাবে প্রভাববিস্তার করায় বাংলা সঙ্গীত জগতে একধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছিলো। ষটের দশকের বব ডিলনের মতো তাদের সঙ্গীতেও শহুরে লোক আন্দোলনের একধরণের ব্যক্তিগত আকুতি বা সামাজিক প্রকৃতির ছাপ রয়েছে। যদিও তাদের সময়ে তারা প্রায় অপরিচিত ছিলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা দ্য ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীতদলের মতো পুনরায় সমালোচনামূলক মূল্যায়ন পেয়েছে। ১৯৯৫ সালে বিভিন্ন সমসাময়িক শিল্পীদের সমন্নয়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায় আবার বছরকুড়ি পরে শিরোনামে মহীনের ঘোড়াগুলির একটি কভার সংকলন প্রকাশ করে। জীবনমুখী গান এবং নৈতিকতার কারণে বর্তমানে তাদেকে বাংলা গানের প্রথিকৃত বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

তাদের গানরচনার শৈলী অনুযায়ী সমালোচনামূলকভাবে বলা যায় তারা জোরালোভাবে বাংলা লোক এবং আমেরিকান শহুরে লোক ধারা কর্তৃক প্রভাবিত।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৭৬–১৯৮১: প্রাথমিক বছর[সম্পাদনা]

কলকাতার কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পী মিলে ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই ব্যান্ডটি গঠন করেন। প্রাথমিকভাবে তাদের নাম ছিল সপ্তর্ষি[৪] পরবর্তীতে তাদের নাম পরিবর্তন হয় তীরন্দাজ এবং গৌতম চট্টোপাধ্যায় বিএসসি এবং সম্প্রদায় নামে। শেষের দিকে রঞ্জন ঘোষাল ব্যান্ডটির নাম দেন মহীনের ঘোড়াগুলি

প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশে সোল্‌স এবং ফিডব্যাক নামের দুটি ব্যান্ড গঠিত হয়।

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের তীব্র রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। তিনি ছিলেন মূলত বামপন্থী মনোভাবের লোক। এই বামপন্থী চিন্তাধারা তার সঙ্গীতের ভেতরে প্রকাশিত হত। মহীনের ঘোড়াগুলির একজন সদস্য আব্রাহাম মজুমদারের মতে গৌতম চট্টোপাধ্যায় হয়তো নকশাল আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

১৯৭০-এর দশক বাংলা ব্যান্ড এবং রক সঙ্গীতের পক্ষে খুব একটা সুবিধার সময় ছিল না। সেই সময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা। সঙ্গীতের দিক থেকে তারা ছিলেন রবীন্দ্রনাথনজরুলের পুরনো ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। এ কারণে তাদের গাওয়া বাংলা সিনেমার গান এবং বাংলা আধুনিক গানের জনপ্রিয়তা বেশি ছিল।

নামের উৎপত্তি[সম্পাদনা]

এই ব্যান্ডের নামটি তাদের ভক্তদের জন্য আনেকটা ধাঁধা। আক্ষরিক অর্থে যদিও মহীনের ঘোড়াগুলি নামের সাথে সঙ্গীতের তেমন মিল পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে এই ব্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছে আধুনিক বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থের ঘোড়া শিরোনামের কবিাতার দ্বিতীয় পংক্তি থেকে:[৫][৪]

"মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে।"

এই ব্যান্ডের একটি জনপ্রিয় গান হায় ভালোবাসি (১৯৭৭) বাংলার প্রকৃতির রুপময় নৈসর্গিক দিকটি তুলে ধরার মধ্য দিয়ে জীবনানন্দের প্রভাব এখানে স্পস্ট ভাবে ধরা পড়েছে। এখানে আরেকটি মিল পাওয়া যায়; জীবনানন্দ তৎকালীন সমসাময়িক কবিতার বৃত্তের বাইরে এসে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিতার সূচনা করেন, তেমনি মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটিও তৎকালীন সাধারণ সঙ্গীতের গন্ডির বাইরে বাংলা সঙ্গীতের নতুন ধারার সূচনা করে।[৬]

পরবর্তী বছর[সম্পাদনা]

১৯৮৬-১৯৮৭ সালে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সাথে অরুণেন্দু দাসের সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তীতে মহীনের ঘোড়াগুলির চারটি সম্পাদিত স্টুডিও অ্যালবামের প্রত্যেকটিতেই অরুণেন্দুর কে কে যাবিরে, দিশে হারা যে মোর মন , গঙ্গা, আমার প্রিয়া ক্যাফে ইত্যাদি গান ব্যবহার করা হয়।[৭]

বাদ্যযন্ত্র শৈলী এবং উন্নয়ন[সম্পাদনা]

বিষয়বস্তু[সম্পাদনা]

রাজনীতি, দারিদ্র, অর্থনীতি, অন্যায়-অবিচার, বিপ্লব, ভালোবাসা, একাকীত্ব, স্বাধীনতা, ভিক্ষাবৃত্তি, যৌনপেশাসহ আরো বহুমুখী বিষয় নিয়ে গান করেছে মহীনের ঘোড়াগুলি। বর্তমানে কবির সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন দত্তের মতো শিল্পীরা জীবনমুখী গান করলেও, তাদের পূর্বসূরী এখনও মহীনের ঘোড়াগুলিই।[৪] ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কণ্ঠ ও গিটারে ছিলেন তপেশ বন্দোপাধ্যায় বা ভানু দা। পরবর্তীতে তার স্থলাভিষিক্ত হন রাজা ব্যানার্জি। রঞ্জন ঘোষাল ছিলেন দলের আরেক গীতিকার। তিনি দলের হয়ে মিডিয়া রিলেশনের দিকটিও দেখতেন। ব্যান্ডটির স্রষ্টা গৌতম চট্টোপাধ্যায় গীতিকার হিসেবে ছিলেন একদমই নতুন মুখ। তবে তার সমাজ ভাবনা ছিল বেশ আলাদা, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। অনেকটা ষাটের দশকের বব ডিলানের মতো। মূলত সে সময় গৌতম একজন কমিউনিস্ট যোদ্ধা ছিলেন যার প্রতিফলন তাদের অধিকাংশ গানেই পাওয়া যায়।

প্রভাব[সম্পাদনা]

২০০৬ সালে মহীনের ঘোড়াগুলির আবার বছর কুড়ি পরে সম্পাদিত স্টুডিও অ্যালবামের পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে গানের সুরানুকরণে গ্যাংস্টার হিন্দি চলচ্চিত্রে জেমস ভিগি ভিগি শিরোনামে একটি গান গায়। ২০১৪ সালে মায়া (১৯৯৭) সম্পাদিত স্টুডিও অ্যালবামের টেলিফোন গানের একটি লাইনের অনুপ্রেরণায় অরিন্দম দে কখন তোমার আসবে টেলিফোন নামে একটি বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন।[৮]

ধারা[সম্পাদনা]

লিগ্যাসি[সম্পাদনা]

পুরস্কার এবং সাফল্য[সম্পাদনা]

সদস্যবৃন্দ[সম্পাদনা]

প্রধান সদস্য
প্রাথমিক সদস্য
অন্যান্য সদস্য

ডিস্কতালিকা[সম্পাদনা]

মূল স্টুডিও অ্যালবাম (১৯৭৭ - ১৯৭৯)[সম্পাদনা]

সরাসরি[সম্পাদনা]

মূল মহীনের ঘোড়াগুলির সদস্যরা ১৯৭৬-১৯৮১ পর্যন্ত কলকাতায় বিভিন্ন সরাসরি অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন। তাদের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানগুলো নিম্মরুপঃ

  • যোগেশ মাইম আকাদেমি (১৯৭৭)
  • স্টার থিয়েটার (১৯৮)
  • ম্যাক্স মূলার ভবন (১৯৭৯)
  • রবীন্দ্র সদন (১৯৭৯)
  • সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল (১৯৮০)
  • কলকাতা আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসব (১৯৮০)
  • কলকাতা সঙ্গীত বিদ্যালয় (১৯৮১)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. অভিষেক গাঙ্গুলি (এপ্রিল ০১, ২০০২)। "সিটি বীট্‌স - আর্বান ফোক মিউসিক ইন লেট মডার্ন কলকাতা"সরাই রীডার (978-8190142908): ৫১। সংগৃহীত অক্টোবর ০৮, ২০১৪ 
  2. "ভারতীয় রক ব্যান্ড"। thumbnails.visually.netdna-cdn.com। সংগৃহীত মে ১৬, ২০১৪ 
  3. সৌনক ঘোষাল (ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৪)। "Heavy on this side, hard on the other: Ideal recipe for Bengal-Bangla tie-up"দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (ভারত)। সংগৃহীত মে ০৯, ২০১৫ 
  4. ৪.০ ৪.১ ৪.২ [১]
  5. "ঘোড়া"-কবি জীবনানন্দ দাশ, চতুরঙ্গ, সম্পাদক হুমায়ুন কবীর, আষাঢ় ১৩৪৭ বঙ্গাব্দ।
  6. জাহাঙ্গীর রনি (আগস্ট ১০, ২০১২)। "বিবিসির সাথে গানগল্প: মহীনের ঘোড়াগুলি"bbc.co.ukবিবিসি। সংগৃহীত মে ০৮, ২০১৫ 
  7. সুজন দাশগুপ্ত (২০১৪)। "গান: বাংলা ব্যাণ্ড ও অরুণেন্দু দাস"abasar.net। অবসর। সংগৃহীত মে ০৯, ২০১৫ 
  8. মৌতান ঘোষাল। "আসবে টেলিফোন?"বেঙ্গল টাইমস (ভারত)। সংগৃহীত মে ০৯, ২০১৫ 

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]