বাংলা ভাষা আন্দোলন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(ভাষা আন্দোলন থেকে ঘুরে এসেছে)
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অধিকার আদায়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় আয়োজিত মিছিল

ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন, যা ছিল বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়, কিন্তু পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা হিসেবেও পরিচিত) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক ও ভাষাগত দিক থেকে পার্থক্য ছিল প্রচুর। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, যা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণের মধ্যে তুমুল ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ (যারা সংখ্যার বিচারে সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল) এ সিদ্ধান্তকে মোটেই মেনে নিতে চায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবীতে শুরু হয় আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন জানান যে পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তই মেনে নেওয়া হবে। এই ঘোষণার ফলে আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে মিটিং-মিছিল ইত্যাদি বেআইনি ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র ও কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। গুলিতে নিহত হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার সহ আরো অনেকে। এই ঘটনায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার গণ আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে এবং ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। ২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন ও মানুষের ভাষা ও কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করে।[১]

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের মাধ্যমেই প্রথম বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই ধারণাটির জন্ম হয় এবং এ ধারণাই পরবর্তীতে বিভিন্ন বাঙালি জাতীয়তা আন্দোলন, যেমন ৬ দফা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণা যোগায়। বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হয় এবং দিনটিতে জাতীয় ছুটি থাকে। এ আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

সূচিপত্র

[সম্পাদনা] পটভূমি

বর্তমানের পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র দুটি পূর্বে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯-শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে উর্দু ভাষাটি মুসলমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা যেমন স্যার খাজা সলিমুল্লাহ, স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব ওয়াকার-উল-মুলক মৌলভী‎‎ এবং মৌলভী আবদুল হকের চেষ্টায় ভারতীয় মুসলমানদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কায় উন্নীত হয়।[২][৩] উর্দু একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীর সদস্য, যা আবার ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। উর্দু ভাষাটি অপভ্রংশের (মধ্যযুগের ইন্দো-আর্য ভাষা পালি-প্রাকৃতের সর্বশেষ ভাষাতাত্ত্বিক অবস্থা) ওপর ফার্সি, আরবি এবং তুর্কির ঘনিষ্ঠভাবে প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে)[৪] দিল্লি সুলতানাত এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বিকশিত হয়।.[৫] এর পারসিক-আরবি লিপির কারণে উর্দুকে ভারতীয় মুসলমানদের ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হত; যেখানে হিন্দি এবং দেবনাগরী লিপিকে হিন্দুধর্মের উপাদান বিবেচনা করা হত।[২]

উর্দুর ব্যবহার ক্রমেই উত্তর ভারতের মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে, কিন্তু বাংলার (ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চলের একটি প্রদেশ) মুসলমানেরা বাংলা ভাষাকে তাদের প্রধান ভাষা হিসাবে ব্যবহারেই অভ্যস্ত ছিল। বাংলা পূর্বাঞ্চলীয় মধ্য ইন্দো ভাষাসমূহ হতে উদ্ভূত একটি পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষা,[৬] যা বাংলার নবজাগরণের সময়ে বিপুল বিকাশ লাভ করে। ১৯ শতকের শেষভাগ হতেই মুসলিম নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু করেন এবং আধুনিক ভাষা হিসেবে বাংলার বিকাশ তখন থেকেই শুরু হয়। বাংলা ভাষার সমর্থকরা ভারত ভাগের পূর্বেই উর্দুর বিরোধিতা শুরু করেন, যখন ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষ্মৌ অধিবেশনে বাংলার সভ্যরা উর্দুকে ভারতের মুসলিমদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা মনোনয়নের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। মুসলিম লীগ ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি রাজনৈতিক দল, যা ভারত ভাগের সময় পাকিস্তানকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।[৭]

[সম্পাদনা] আন্দোলনের সূচনা

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলগুলো ১৯৪৭ এবং ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে চারটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়: ভারত, বার্মা (বর্তমান মায়ানমার), সিংহল (বর্তমান শ্রীলংকা), এবং পাকিস্তান (যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা অধুনা বাংলাদেশ নামে পরিচিত)।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ব বাংলা হিসেবেও পরিচিত) বাংলাভাষী ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যা বিশিষ্ট নবগঠিত পাকিস্তানের নাগরিকে পরিণত হয়।[৮] কিন্তু পাকিস্তান সরকার, প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল।[৯] ১৯৪৭ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয় এবং প্রচারমাধ্যম ও স্কুলে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়।[১০][১১] তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। ঢাকার ছাত্রসমাজ আবুল কাসেম এর নেতৃত্বে মিছিল করে, যিনি ছিলেন তমদ্দুন মজলিস নামক একটি বাঙালি ইসলামীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্পাদক। ওই সমাবেশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবল দাবী উত্থাপন করা হয়।[১২] কিন্তু পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয়তালিকা হতে বাদ দেয় এবং সাথে সাথে মুদ্রা ও স্ট্যাম্প হতেও বাংলা অক্ষর লুপ্ত হয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান মালিক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।[১৩] পূর্ব পাকিস্তানে জনরোষের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাঙালি ছাত্রদের একটি বিশাল সমাবেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের আনুষ্ঠানিক দাবী উত্থাপন করা হয়। দাবী আদায়ের লক্ষ্যে ছাত্ররা ঢাকায় মিছিল এবং র‌্যালির আয়োজন করে।[৮]


নেতৃস্থানীয় বাঙ্গালী পন্ডিতগণ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে মত দেন। পাকিস্তানের কোনো অংশেই উর্দু স্থানীয় ভাষা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন যে, "আমাদের যদি একটি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয়, তবে আমরা উর্দুর কথা বিবেচনা করতে পারি।"[১৪] সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ বলেছেন যে, উর্দুকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ 'নিরক্ষর' এবং সকল সরকারী পদের ক্ষেত্রেই 'অনুপযুক্ত' হয়ে পড়বে।[১৫] ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তমাদ্দুন মজলিশের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া এই কমিটির আহবায়ক ছিলেন।[৮][১৬] পরবর্তীতে সংসদ সদস্য সামসুল হক আহবায়ক হয়ে নতুন কমিটি গঠন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কার্যক্রম আরও জোরদার করেন।

[সম্পাদনা] গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাষ্ট্রভাষার দাবি

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গণপরিষদে এর সদস্যদের বাংলায় কথা বলা এবং সরকারী কাজে ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব করেন।[৮]। বক্তৃতায় বাংলাকে অধিকাংশ জাতি গোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি করেন। এছাড়াও সরকারী কাগজে বাংলা ভাষা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শিরিষ চন্দ্র চট্টপাধ্যায় এই প্রস্তাবে সমর্থন দেন। তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তাদেরে এই সমর্থনের মাধ্যমে মূলত পূর্ব পাকিস্তানের মতামতই প্রকাশিত হয়েছে। তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে পরিষদের সকল মুসলমান সদস্য (সবাই মুসলিম লীগের) এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। খাজা নাজিমুদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন যে, "পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক"।[১৭] [১৮]পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান একে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবল মাত্র উর্দুই হতে পারে। অনেক বিতর্কের পর সংশোধনীটি ভোটে বাতিল গণ্য হয়।[৮][১৯][২০] সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে অনেক বাঙালি মুসলমান সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত সংশোধনীটিকে সমর্থন করতে পারেননি[২১]

[সম্পাদনা] প্রথম প্রতিক্রিয়া

গণপরিষদের ঘটনার প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ঢাকায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের উদ্যোগে শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে । ২৯শে ফেব্রুয়ারী তারিখেও ধর্মঘট ঘোষিত হয় এবং এই দিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ দিবস এবং ধর্মঘট পালন করা হয়। সরকারের প্ররোচনায় পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করে এমন অনেক নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করে।[১৭] তমদ্দুন মজলিস এই সময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছাত্র-বুদ্ধিজীবিদের এক সমাবেশ ঘটে[১৮]। এই সভায় দ্বিতীয়বারের মত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং শামসুল আলম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এই পরিষদে অন্যান্য সংগঠনের ২জন করে প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। [১৭] সেখান হতে ছাত্ররা ১১ই মার্চ ধর্মঘট আহবান করে এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তাঁর পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানায়।

১১ই মার্চের কর্মসূচী নির্ধারণের জন্য ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ই মার্চ ভোরে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে ছাত্রদের একটি দল রমনা পোস্ট অফিসে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রদের আরও একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সচিবালয়ের সামনে নবাব আবদুল গণি রোডে পিকেটিং-এ অংশ নেয়। তারা গণপরিষদ ভবন (ভেঙ্গে পড়া জগন্নাথ হলের মিলনায়তন),প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউস (বর্তমান বাংলা একাডেমি), হাইকোর্ট ও সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অফিস বর্জনের জন্যে সবাইকে চাপ দিতে থাকে, ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদের পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হতে হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল ও শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদকে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এই বিক্ষোভ দমনের জন্য সেনাবাহিনী তলব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি) মেজর পীরজাদার অধীনে একদল পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করেন এবং স্বয়ং গণপরিষদে গিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনকে বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে বের করে আনেন[২২]। বিকেলে এর প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা ভেঙ্গে দেয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মাঝে অন্যতম ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলি, কাজী গোলাম মাহবুব, রওশন আলম, রফিকুল আলম, শাহ্ মোঃ নাসিরুদ্দীন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন নঈমুদ্দিন আহমদ[১৮]

[সম্পাদনা] খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে চুক্তি

১১ তারিখের এই ঘটনার পর ১২ থেকে ১৫ মার্চ ধর্মঘট পালন করা হয়। আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ১৫মার্চ খাজা নাজিউদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে বৈধকে মিলিত হন। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে আবুল কাশেম, কামরুদ্দীন আহম্মদ, মেহাম্মদ তোয়াহা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ অংশগ্রহন করেছিলেন। আলোচনার সাপেক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে ৮টি বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সরকার এই নমনীয় আচরনের কারণ ছিল ১৯মার্চ জিন্নাহর ঢাকা আগমন। তার আসার পূর্বে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য নাজিমুদ্দিন চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্জাদা দেয়ার দাবিটি তখন পর্যন্ত মেনে নেয়া হয়নি। চুক্তিতে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তারকৃত বন্দিদের মুক্তি, পুলিশের অত্যাচারের নিরপেক্ষ তদন্ত, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্রভাষার মর্জাদা দেয়া, সংবাদপত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। [১৭]

[সম্পাদনা] মুহম্মদ আলী জিন্নাহ্‌র ঢাকা সফর

১৯শে মার্চ, ১৯৪৮-এ ঢাকায় এসে পৌছান পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) এক গণ-সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যেখানে তিনি একটি ভাষণ প্রদান করেন। তার ভাষণে তিনি ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।[২৩][২৪][২৫][২৬][২৭] যদিও তিনি বলেন পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক ভাষা নির্ধারিত হবে প্রদেশের অধিবাসীদের ভাষা অনুযায়ী, কিন্তু দ্ব্যর্থহীন চিত্তে ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোন ভাষা নয়।[৮][২৫][২৮][২৯] তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন জনগণের মধ্যে যারা ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে,তারা পাকিস্তানের শত্রু এবং তাদের কখনোই ক্ষমা করা হবে না। জিন্নাহ্‌-র এই মন্তব্যে তাৎক্ষনিকভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে উপস্থিত ছাত্রসহ জনতার একাংশ। উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা- এই বিরূপ উক্তিতে আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে[২৪]২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে গিয়ে তিনি একই ধরনের বক্তব্য রাখেন।[৯] তিনি উল্লেখ করেন এই আন্দোলন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর বহিঃপ্রকাশ এবং অভিযোগ করেন কিছু লোক এর মাধ্যমে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইছে। যখন তিনি উর্দুর ব্যাপারে তার অবস্থানের পুনরুল্লেখ করেন উপস্থিত ছাত্ররা সমস্বরে না, না বলে চিৎকার করতে থাকে। একই দিনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দবি জানিয়ে একটি স্মারক লিপি দেন। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, আবুল কাশেম, তাজউদ্দিন আহমদে, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম এবং নজরুল ইসলাম[৮]। কিন্তু জিন্নাহ্ খাজা নাজিমুদ্দিনের স্বাক্ষরিত চুক্তিকে একপেশে এবং চাপের মুখে সম্পাদিত বলে প্রত্যাখান করেন।[৩০] অনেক তর্ক-বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জিন্নাহ্‌-র নিকট স্মারকলিপি পেশ করে[২১]২৮শে মার্চ জিন্নাহ্‌ ঢাকা ত্যাগ করেন এবং সেদিন সন্ধ্যায় রেডিওতে তার দেয়া বক্তব্যে তার অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।[৩১] জিন্নাহ্‌-র ঢাকা ত্যাগের পর, ছাত্রলীগ এবং তমুদ্দন মজলিসের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তমুদ্দন মজলিসের আহবায়ক শামসুল আলম তার দায়িত্ব মোহাম্মদ তোয়াহার কাছে হস্তান্তর করেন[২৪]। পরবর্তীতে তমুদ্দন মজলিস আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করে একটি বিবৃতি প্রদান করে এবং পরে তারা আস্তে আস্তে আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসে।

[সম্পাদনা] লিয়াকত আলি খানের ঢাকা সফর

১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তিনি এক ছাত্রসভায় ভাষণ দেন। এই সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের তরফ থেকে প্রদত্ত মানপত্রে বাংলা ভাষার দাবি পুনরায় উত্থাপন করা হয়, কিন্তু তিনি কোন মন্তব্য করেন নি। ১৭ নভেম্বর তারিখে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের এক সভায় আজিজ আহমদ, আবুল কাশেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আবদুল মান্নান, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ একটি স্মারকলিপি প্রণয়ন করেন এবং সেটি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের কাছে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রেও কোন সাড়া দেন নি। [১৭][৩২]

[সম্পাদনা] ভাষা সমস্যার প্রস্তাবিত সমাধান

এর কিছুদিন পরই, পূর্ব বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে ভাষা সমস্যার ব্যাপারে একটি বিস্তারিত জানতে মাওলানা আকরাম খানের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি গঠন করে এবং তাদের এই বিষয়টি নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরী করতে বলে। [৩৩] ৬ ডিসেম্বর ১৯৫০ সালের মধ্যে কমিটি তাদের রিপোর্ট তৈরী করে যদিও এটি ১৯৫৮ সালের আগে প্রকাশ করা হয়নি। এখানে ভাষা সমস্যার সমাধানের লক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্য ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়, যেখানে তারা বাংলাকে আরবি অক্ষরের মাধ্যমে লেখার সুপারিশ করে। [৩৪]

[সম্পাদনা] ১৯৫২: ভাষা আন্দোলনের পুনর্জাগরণ

ভাষা আন্দোলনের পুনরায় জোরালো হওয়ার পেছনে ২৭শে জানুয়ারি ১৯৫২ সালের খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে[২১]। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন খাজা নাজিমুদ্দিন ২৫শে জানুয়ারি ঢাকায় আসেন এবং ২৭শে জানুয়ারি পল্টন ময়দানের এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। তিনি মূলতঃ জিন্নাহ্‌-র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।[৩০] রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তার ভাষণে তিনি আরো উল্লেখ করেন কোন জাতি দু'টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।[৩০] নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯শে জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০শে জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ছাত্র ও নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১শে ফেব্রুয়ারী প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।[১৭] পরে তারা তাদের মিছিল নিয়ে বর্ধমান হাউসের (বর্তমান বাংলা একাডেমী) দিকে অগ্রসর হয়[১৬]

১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ গঠিত হয়[৮][৩৫]। সভায় আরবি লিপিতে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করা হয় এবং ৩০ শে জানুয়ারির সভায় গৃহীত ধর্মঘটে সমর্থন দেওয়া হয়। পরিষদ ২১শে ফেব্রুয়ারি হরতাল, সমাবেশ ও মিছিলের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে।[৩০]

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয়। সমাবেশ থেকে আরবি লিপিতে বাংলা লেখার প্রস্তাবের প্রতিবাদ এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ছাত্ররা তাদের সমাবেশ শেষে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে[৩৬]

২০শে ফেব্রুয়ারি সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২১শে ফেব্রুয়ারী থেকে ঢাকায় ১ মাসের জন্য সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন হলে সভা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে ৯৪, নবাবপুর রোডে আওয়ামী মুসললিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদের কিছু সদস্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার পক্ষে থাকলেও, সবশেষে ১১-৩ ভোটে [৩৭]১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।[১৭] ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে একই বিষয় নিয়ে পৃথক পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ হলে ফকির সাহাবুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সভায় নেতৃত্ব দেন আবদুল মোমিন। শাহাবুদ্দিন আহমদের প্রস্তাবে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেন আবদুল মোমিন এবং শামসুল আলম। [৩৮]

[সম্পাদনা] ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা

সকাল ৯টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে এবং পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানাতে থাকে। পুলিস অস্ত্র হাতে সভাস্থলের চারদিক ঘিরে রাখে। বিভিন্ন অনুষদের ডীন এবং উপচার্য সে সময় উপস্থিত ছিলেন। বেলা সোয়া এগারটার দিকে ছাত্ররা গেটে জড়ো হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভেঙে রাস্তায় নামতে চাইলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস বর্ষণ করে ছাত্রদের সতর্ক করে দেয়।[৮] কিছু ছাত্র এই সময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে দৌড়ে চলে গেলেও বাকিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুলিস দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পুলিসের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। উপাচার্য তখন পুলিসকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ বন্ধ করতে এবং ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ছাত্ররা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় কয়েকজনকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিস গ্রেফতার শুরু করলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ছাত্রদের গ্রেফতার করে তেজগাঁও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ছাত্ররা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের বিক্ষোভ পুনরায় শুরু করে।

বেলা ২টার দিকে আইন পরিষদের সদস্যরা আইনসভায় যোগ দিতে এলে ছাত্ররা তাদের বাধা দেয় এবং সভায় তাদের দাবি উত্থাপনের দাবি জানায়। কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে যখন কিছু ছাত্র সিদ্ধান্ত নেয় তারা আইন সভায় গিয়ে তাদের দাবি উত্থাপন করবেন। ছাত্ররা সেই উদ্দেশ্যে রওনা করলে বেলা ৩টার দিকে পুলিস দৌড়ে এসে ছাত্রাবাসে গুলিবর্ষণ শুরু করে[২১]। পুলিশের গুলি বর্ষণে আব্দুল জব্বার এবং রফিক উদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন[৩৯]। এছাড়া আব্দুস সালাম, আবুল বরকতসহ আরও অনেকে সে সময় নিহত হন।[৮][৪০] এই দিন অহিউল্লাহ নামের একজন ৮/৯ বছরেরে কিশোরও নিহত হয়। [৮]

ছাত্র হত্যার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনগণ ঘটনাস্থলে আসার উদ্যোগ নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত অফিস, দোকানপাট ও পরিবহণ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন সাথে সাথে জনমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়।[২৮] রেডিও শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে শিল্পী ধর্মঘট আহবান করে এবং রেডিও স্টেশন পূর্বে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে থাকে[৪১]

এই সময় গণপরিষদে অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশের গুলির খবর জানতে পেরে মাওলানা তর্কবাগিশসহ বিরোধি দলীয় বেশ কয়েকজন অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ান।[৮] গণপরিষদে‌ মনোরঞ্জন ধর, বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমেদ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সহ ছোট ছয়জন সদস্য মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাওয়ার অনুরোধ করেন এবং শোক প্রদর্শনের লক্ষ্যে অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলেন।[২১] কোষাগার বিভাগের মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ, শরফুদ্দিন আহমেদ, সামশুদ্দিন আহমেদ খন্দকার এবং মসলেউদ্দিন আহমেদ এই কার্যক্রমে সমর্থন দিয়েছিলেন। যদিও নুরুল আমিন অন্যান্য নেতাদের অনুরোধ রাখেননি এবং অধিবেশনে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। [৮][২১]

[সম্পাদনা] পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার লালবাগ থানার ওসি ছিলেন এম এ গোফরানঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি সেদিন তার দায়িত্বে ছিল। ঐ দিন ছাত্রদের প্রধামমন্ত্রী নুরুল আমিনকে বাংলা ভাষার দাবিতে স্মারকলিপি দেবার কথা ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি এসেম্বলি চলাকালীন ছাত্রদের কর্মসূচিতে বাধা দেবার নির্দেশ আসে রাওয়ালপিন্ডি থেকে। তখন ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট (ডিএম) ছিলেন কোরেইশী নামের এক পঞ্জাবি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাত ১০টায় এম এ গোফরানের কাছে ডিসি স্বাক্ষরিত সেই চিঠিটি পৌছায় এবং তখনই তা সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজারবাগ থেকে স্পেশাল আর্মস ফোর্সের একটি বড় দল ক্যাম্পাসে আসে। তাদের ইনচার্জ ছিলেন পঞ্জাবি কর্মকর্তা আর আই নবীশের খান। ঢাকার ডিএম কোরেইশী, ডিআইজিপি এ জেড ওবায়দুল্লাহ, এসপি ইদ্রিস ও এডিশনাল এসপি মাসুদ মাহমুদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

ছাত্ররা ৫ জন একত্রিত হলেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছে বলে ধরে নিতে প্রস্তুত ছিল পুলিশ। এ অবস্থায় বেলা ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে ছাত্ররা ৪ জন করে অ্যাসেম্বলির হলের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাতেও বাধা দেওয়া হয়। পুলিশের মারমুখী আচরণের প্রতিবাদে ইটপাটকেল নিক্ষেপও শুরু হয়ে যায়। হস্টেল থেকে বয়রা টুকরিতে করে, লুঙ্গিতে ভরে ইটের টুকরো ছাত্রদের কাছে সরবরাহ করতে থাকে। তারা নিজেরাও ইটপাটকেল ছুড়ে পুলিশকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। ওই সময় ডিআইজিপি ওবায়দুল্লাহর পিঠে ইট পড়ে। আর আই নবীশের খানের মাথায় পড়ে ইটের একটি টুকরো। তখনই ডিএম কোরেইশী গুলি করার নির্দেশ দেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার নিয়াজ মোহাম্মদ খান ছাত্রদের মিছিল সমাবেশে বাধা দেওয়ায় বিপক্ষে অবস্থান নেন।

পুলিশ লাশগুলো সরিয়ে ফেলে। একমাত্র আবুল বরকতের মা ছাড়া কাউকে লাশ দেখার সুযোগ দেওয়া হয় নি। মিল ব্যারাক পুলিশ লাইন মসজিদের ইমাম সাহেব লাশের গোসল ও জানাজা পড়ান। কাফনের জন্য থান কাপড় আনা হয় পুরোন ঢাকার পাটুয়াটুলীর "আম্বিয়া ক্লথ স্টোর" থেকে। ঐ দোকানের মালিক ছিলেন তখনকার সিটি ডিএসপি কুদ্দুস দেওয়ান। লাশ দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি এজেড ওবায়দুল্লাহ, এসপি ইদ্রিস। দাফনের কাজ রাত চারটার দিকে শেষ হয়।[৪২]

[সম্পাদনা] ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা

২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে জানাজ শেষে বিশাল মিছিল বের হয়।

সেদিন আইন পরিষদে বিরোধী দলের সদস্যরা বিষয়টি উত্থাপন করেন। তারা প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে এবং অধিবেশন মুলতবি ঘোষণার আহ্বান জানান। ক্ষমতাসীন দলের কিছু সদস্যও এই আহ্বানে সমর্থন জানান। কিন্তু নুরুল আমিন তাদের আহ্বানের সাড়া না দিয়ে অধিবেশন অব্যাহত রাখেন এবং হাসপাতালে যেতে অস্বীকৃত হন।

ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে সারা দেশ হয়ে উঠে মিছিল ও বিক্ষোভে উত্তাল। জনগণ ১৪৪ ধারা অমান্য করার পাশাপাশি শোক পালন করতে থাকে[২১]। বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কর্মস্থল ত্যাগ করে ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেয়। সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শহরের নাগরিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাস পরিদর্শন করেন। পরে তাদের অংশগ্রহনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বিশাল মিছিলে অংশগ্রহণ করে। বেলা ১১ টার দিকে ৩০ হাজার লোকের একটি মিছিল কার্জন হলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। প্রথমে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং এক পর্যায়ে তাদের উপর গুলিবর্ষণ করে। এই ঘটনায় সরকারি হিসেবে ৪ জনের মৃত্যু হয়।

শহরের বিভিন্ন অংশে একইভাবে জানাজা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন কলেজ, ব্যাংক সহ অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এই মিছিলে অংশগ্রহন করতে আসে।[২৮] বিকেলে আর একটি বিশাল মিছিল পুলিশ দ্বারা আক্রান্ত হয়। বিক্ষুদ্ধ জনতা সরকার পক্ষের প্রথম সারির দুটি সংবাদপত্র জুবিলী প্রেস এবং মর্নিং নিউজ অফিসে অগ্নিসংযোগ করে[৪৩][৪৪]। উল্লেখ্য জুবিলী প্রেস থেকে সকালের পত্রিকা বের হয়েছিল।

একই দিনে পুলিশ দ্বারা আক্রমণ ও হত্যার বিভিন্ন ঘটনা ঘটে। নবাবপুর রোডের বিশাল জানাজার মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষন করে। এই গুলিবর্ষনে শহীদ হন ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান, ওয়াহিদুল্লাহ এবং আবদুল আউয়াল।[১৭] একই রাস্তায় অহিদুল্লাহ নামে নয় বছরের এক বালকের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।[৮][৪৫] জনশ্রুতি আছে পুলিশ কিছু লাশ কৌশলে সরিয়ে ফেলে। আজাদের তথ্যমতে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪ এবং সৈনিকের তথ্যমতে ছিল ৮।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

[সম্পাদনা] ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ভাষ্য

বদরুদ্দীন উমর ও বশীর আল হেলাল তাঁদের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত ইতিহাস গ্রন্থে মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন, বর্তমান বাংলা একাডেমী (তৎকালীন বর্ধমান হাউস)তে ক্ষমতাসীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হয়। এ বৈঠক সম্পর্কে জানা যায় মোহন মিঞার জবানিতে যা বদরুদ্দীন উমর উদ্ধৃত করেছেন। (তাঁর নেয়া সাক্ষাৎকার) ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতির তৃতীয় খণ্ডে।’ মোহন মিঞা তাঁকে জানিয়েছিলেনÑ “সেই রাত্রেই বর্ধমান হাউসে প্রাদেশিক লীগ ওয়ার্কিং কমিটির একটি emergent মিটিং হলো। এই মিটিং পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিং-এর পর হয়েছিল। মিটিং ২৪ তারিখের ভোর পর্যন্ত চলেছিল। এই সভাতে আমরা গুলি condemn করলাম। Judicial enquiry চাইলাম। অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও আমরা সুপারিশ করলাম। এসব খবর সংবাদপত্রেও বের হয়েছিল।”

আসলে মিটিং ২৩ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলেছিল। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রাদেশিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহেল বাকী। এরপর তারা ‘ঢাকার গোলযোগ সম্পর্কে মুসলিম লীগ’ শিরোনামে চারপাতার একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। এতে ছিল নেতৃবৃন্দের বিবৃতি, মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাব, মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির প্রস্তাব। স্বাক্ষর করেছিলেন আবদুল্লাহেল বাকী, সহ-সভাপতি খাজা হবিবুল্লাহ, সম্পাদক ইউসুফ আলী চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক গিয়াসুদ্দীন পাঠান ও শাহ্ আজিজুর রহমান।প্রচারপত্রে বলা হয়, “দুঃখের বিষয়, আমাদের সরলপ্রাণ ছাত্রবৃন্দের এই আন্দোলনকে অবলম্বন করিয়া রাষ্ট্রের দুশমন ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিগণ জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি এবং আইন ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করিয়া দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করিবার প্রয়াস পাইতেছে। এই আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বহু সন্ত্রাসবাদী ও কম্যুনিস্টবাদী এবং পাকিস্তানের শত্রুর গুপ্তচর অলক্ষ্যে পাকিস্তানে প্রবেশ করিয়া ভিত্তিহীন, উত্তেজনামূলক, অতিরঞ্জিত প্রচারণা ও গুজব রটাইয়া এবং অজস্র অর্থ ব্যয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করিবার চেষ্টা করিতেছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ক্ষমতালোলুপ কতিপয় ব্যক্তি ইহাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া ইন্ধন যোগাইতেছে।... যে মুসলিম লীগের আপ্রাণ চেষ্টায় এবং ত্যাগের ফলে পাকিস্তান অর্জিত হইয়াছে তাহার মূলোৎপাটন করতঃ কম্যুনিজমের বীজ রোপণ করিয়া পাকিস্তানের ধ্বংস সাধনই আমাদের দুশমনদের মুখ্য উদ্দেশ্য।” [৪৬] প্রচারপত্রটি সরকারি প্রেস থেকে ৫ লক্ষ কপি ছেপে বিলি করা হয়েছিল।[৪৭]

[সম্পাদনা] পরবর্তী ঘটনা (১৯৫২)

২৩ ফেব্রুয়ারি সাড়া রাত ঢাকা ম্যাডিকেল কলেজের ছাত্রবৃন্দ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরিতে কাজ করেন। যা ফেব্রুয়ারি ২৪ তারিখের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছিল। তাতে একটি হাতে লেখা কাগজ যুক্ত করা হয়েছিল যাতে লেখা ছিল শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ[৪৮] স্মৃতিস্তম্ভডটি উদ্বোধন করেন আন্দোলনে নিহত শফিউর রহমানের পিতা। স্মৃতিস্তম্ভটি পুলিশ ফেব্রুয়ারি ২৬ তারিখে ভেঙে দিয়েছিল।[৪৯] ফেব্রুয়ারি ২৫ তারিখে, কলকারখানার শ্রমিকরা নারায়নগঞ্জ শহরে ধর্মঘটের ডাক দেয়।[৪৮] ফেব্রুয়ারি ২৯ তারিখে প্রতিবাদে অংশগ্রহকারীরা ব্যাপক পুলিশী হামলার শিকার হন।[৫০]

২১ ও ২২ শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর সরকার আন্দোলনের বিপক্ষে জোর প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে। তারা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে যে কমিউনিস্ট ও পাকিস্তানবিরোধীদের প্ররোচনায় ছাত্ররা পুলিশকে আক্রমণ করেছিল। তারা বিভিন্নভাবে তাদের এই প্রচার অব্যাহত রাখে। তারা সারা দেশে লিফলেট বিলি করে। সংবাদপত্রগুলিকে তাদের ইচ্ছানুসারে সংবাদ পরিবেশনে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে[৫১]। পাশাপাশি ব্যাপক হারে সাধারণ জনগন ও ছাত্র গ্রেফতার অব্যাহত থাকে। ২৫শে ফেব্রুয়ারি আবুল বরকতের ভাই একটি হত্যা মামলা দায়ের করার চেষ্টা করলে, উপযুক্ত কাগজের অভাব দেখিয়ে সরকার মামলাটি গ্রহণ করেনি[৫২]। রফিকউদ্দিন আহমদের পরিবার একই ধরনের একটি প্রচেষ্টা নিলে, একই কারণে তাও বাতিল হয়।৮ই এপ্রিল সরকার তদন্ত শুরু করে। কিন্তু এর রিপোর্টে মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রদের উপর গুলি করার কোন উল্লেখযোগ্য কারণ দেখাতে পারেনি[৫৩]। সরকারের প্রতিশ্রুত রিপোর্ট কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ প্রত্যাখান করে। ১৪ই এপ্রিল গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন সামনে চলে আসে[৫৪]। এই সমস্যা নিরসনের পক্ষে অনেক সদস্য মত প্রকাশ করলেও মুসলিম লীগের সদস্যরা এই ব্যপারে নীরব থাকেন। এই বিষয়ের বিপক্ষে তারা ভোট দিলে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। এর মাধ্যমে তারা ২১ ও ২২শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর গণপরিষদে বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন[৫৫]। ২৭শে এপ্রিল বার সেমিনার হলে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় কর্মপরিষদ একটি সেমিনার আহ্বান করে এবং সরকারের কাছে ২১ দফা দাবি উত্থাপন করে। ১৬ই এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুললে সেদিন ছাত্ররা সমাবেশ করে। বিশ্ববিদ্যালয় লীগ কমিটির প্রধান নেতা আব্দুল মতিন গ্রেফতার হলে কমিটি আবার পুনর্গঠিত হয়।

[সম্পাদনা] শহীদ মিনার

মূল নিবন্ধ: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ২৩ ফেব্রুয়ারির রাত শেষে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু করে। কাজ শেষ হয় ২৪ ফেব্রুয়ারির ভোরে। শহীদ মিনারের খবর কাগজে পাঠানো হয় ঐ দিনই। শহীদ বীরের স্মৃতিতে - এই শিরোনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয় শহিদ মিনারের খবর। [১৮]

মিনারটি তৈরি হয় মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেলের (ব্যারাক) বার নম্বর শেডের পূর্ব প্রান্তে। কোণাকুণিভাবে হোস্টেলের মধ্যবর্তি রাস্তার গা-ঘেশে। উদ্দেশ্য যাতে বাইরের রাস্তা থেকে সহজেই চোখে পড়ে এবং যে কোনো শেড থেক বেরিয়ে এসে ভেতরের লম্বা টানা রাস্তাতে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে। শহীদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উচ্চ ও ৬ ফুট চওড়া।মিনার তৈরির তদারকিতে ছিলনে জিএস শরফুদ্দিন (ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিন নামে পরিচিত), ডিজাইন করেছিলেন বদরুল আলম। সাথে ছিলেন সাঈদ হায়দার। তাদের সহযোগিতা করেন দুইজন রাজমস্ত্রী। মেডিকেল কলেজের সম্প্রসারনের জন্য জমিয়ে রাখা ইঁট বালি এবং পুরান ঢাকার পিয়ারু সর্দারের গুদাম থেকে সিমেন্ট আনা হয়। ভোর হবার পর একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় মিনারটি। [১৮]। ঐ দিনই অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে, ২২ ফেব্রুয়ারির শহীদ শফিউরের পিতা অনানুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন[৩২]২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দশটার দিকে শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন [১৮] উদ্বোধনের দিন অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনাবাহিনী মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং প্রথম শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলে। [১৮] । এরপর ঢাকা কলেজেও একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়[৩২], এটিও একসময় সরকারের নির্দেশে ভেঙ্গে ফেলা হয়।

অবশেষে, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার পরে ১৯৫৭ সালের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু হয়। এর নির্মান কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে[৩২]

[সম্পাদনা] একুশের গান

২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের ঘটনার পর, একুশ নিয়ে প্রথম গান লেখেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। গানটি হল, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। প্রথমে আব্দুল লতিফ সুর দেন। পরে করাচী থেকে ঢাকা ফিরে ১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহমুদ আবার নতুন সুর দিলেন। সেই থেকে ওটা হয়ে গেল একুশের প্রভাত ফেরীর গান। ১৯৫৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে সংকলনে প্রকাশিত গানটি। তৎকালীন সরকার সংকলনটি বাজেয়াপ্ত করে। জহির রায়হান তার জীবন থেকে নেয়া ছবিতে এই গানটি ব্যবহার করার পর এর জনপ্রিয়তা আরো বাড়ে। ২১শে ফেব্র"য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর এই গানটিও আন্তর্জাতিকতা পেতে শুরু করে। ইতিমধ্যে সুইডিশ ও জাপানি ভাষার অনুদিত হয়েছে। [৫৬]

[সম্পাদনা] চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩–৫৬)

কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় কর্মপরিষদ ২১শে ফেব্রুয়ারি স্মরণে শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মজিবুর রহমানও দিবসটি পালনে সম্মত হন[৫৭]। ১৮ই ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকী সারা দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। অধিকাংশ অফিস, ব্যাংক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ প্রভাত ফেরী-তে যোগ দেন। হাজার হাজার মানুষ কালো ব্যজ ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আসে এবং মিছিল করে প্রাঙ্গন ত্যাগ করে। সহিংসতা রোধের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়। প্রায় লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে আরমানিটোলায় বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে এক দফা দাবি জানানো হয়, ভাষার দাবির সাথে সাথে মাওলানা ভাসানীসহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি করা হয়।[৮] রেলওয়ের কর্মচারীরা ছাত্রদের দাবির সাথে একমত হয়ে ধর্মঘট পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসের ছাত্ররা শহীদদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন[৫৮]। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী ফজলুর রহমান বলেন যে, বাংলাকে যারা রাষ্ট্রভাষা করতা চায় তারা দেশদ্রোহী। তার এই বক্তব্যে জনগন হতাশ হয়ে তাঁকে কালোব্যাজ দেখায়। সাধারণ মানুষের মাঝে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই লেখা সম্বলিত স্মারক ব্যাজ বিলি করা হয়। ভাষা সংগ্রাম কমিটি দিবসটি পালন উপলক্ষে সমাবেশ আহবান করে। আন্দোলনকে আরো বেগবান করার জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দলনের মূল অনুপ্রেরনাদায়ী সঙ্গীত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো... সেই বছর কবিতা আকারে লিফলেটে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর রাতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলনের সময় পুলিশ কিছু ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে।[৫৯]

[সম্পাদনা] যুক্তফ্রন্ট গঠন

১৯৫৪ সালকে পূর্ব বঙ্গের রাজনৈতিক ও ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক পট পরিবর্তনের বছর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এ কে ফজলকুল হকের নেতৃত্বে গঠিত যুক্ত ফ্রন্ট এবং আওয়ামীলিগ বৃহত্তর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নিন্দা জানায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তফ্রন্ট যেন আন্দোলনের কোন সুযোগ না পায় সে জন্য মুসলিম লীগ তাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখে[৬০]। সেজন্য তারা ভাষা আন্দোলন দিবসের আগে যুক্তফ্রন্টের একাধিক নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।[৬১] অন্যদিকে ভাষা সংক্রান্ত বিষয়ের অচলাবস্থা নিরসনের উদ্দেশ্যে মুসলীম লীগের সংসদীয় কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় করাচীতে। সভার সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া। এবং সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাংলা ভাষাকে উর্দু ভাষার সমমর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা করে হবে।[৬২] এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের ছয়টি ভাষাকে একই মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলে সেখানকার প্রতিনিধিত্বকারীরা[৬৩]। আবদুল হক (বাবা উর্দু নামে পরিচিত) এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান এবং তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষ অবস্থানে অনড় থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে ২২শে এপ্রিল করাচীতে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়। প্রায় ১লক্ষ্য মানুষ এই মিছিলে অংশ নয়ে মুসলিম লীতের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।[৬৪][৬৫] সেখানে সহিংস ঘটনায় সিন্ধি ভাষার দৈনিক আল ওয়াহিদ পত্রিকার অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়[৬৬]। অন্যদিকে ২৭শে এপ্রিল বাংলা ও অন্যান্য ভাষাকে সমমর্যাদা দেয়ার দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাঁরা সংখ্যালঘু উর্দুভাষী যারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছিল তাদের মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেন। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে, সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। গণপরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট এবার অধিকাংশ আসনে জয়লাভ করে এবং মুসলিমলিগের আসনসংখ্যা ছিল অত্যান্ত কম।[২৮][৬৫]

যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে বাংলা একাডেমি গঠন করে। এই প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সংরক্ষন গবেষণা এবং উন্নয়নের লক্ষে কাজ করবে। [৬৭] যুক্ত ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মালিক গোলাম মাহমুদ ৩০মে ১৯৫৪ সালে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকার বাতিল ঘোষনা করে।[৬১] ৬জুন ১৯৫৫ তারিখে যুক্তফ্রন্ট পুনর্গঠন করা হয়। যদিও আওয়ামীলিগ মন্ত্রীপরিষদে যোগ দেয়নি।[৬০]

১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো সরকারের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। শহীদ মিনার নতুন করে তৈরী করার লক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রকল্প গ্রহন করা হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে পাকিস্তানের গণপরিষদে কার্যক্রম পাচ মিনিট বন্ধ রাখা হয়। সারাদেশব্যপী পালিত হয় শহীদ দিবস এবং বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ।[৬০][৬৮]আরমানীটোলায় এক বিশাল সমাবেশের নেতৃত্ব দেন মাওলানা ভাসানী[৬০][৬৯][৭০]

[সম্পাদনা] সংবিধান সংশোধন

৭ মে ১৯৫৪ সালে মুসলিম লিগের সমর্থনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্জাদা দেয়া হয়।[৬৫] বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃত দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ২৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৬ সালে। সংবিধানের ২১৪(১) অধ্যায়ে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে লেখা হয়:

214.(1) The state language of Pakistan shall be Urdu and Bengali

অর্থাৎ উর্দু এবং বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। যদিও আইয়ুব খানের প্রতিষ্ঠিত সামরিক সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্ঠা করেছিল। ৬জানুয়ারী ১৯৫৯ সালে সামরিক শাসন কোনো সরকারী বিবৃতি জারি করে এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে উল্লেখিত দুই রাষ্ট্র ভাষার সরকারী অবস্থান পুনরায় ব্যাক্ত করে।[৭১]

[সম্পাদনা] বাংলাদেশের স্বাধীনতা

মূল নিবন্ধ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ
ভাষা শহীদদের স্মরণে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত "মোদের গরব" ভাস্কর্য

যদিও ১৯৫৬ সালের পর সরকারি ভাষার বিতর্ক সম্পন্ন হয়, কিন্তু আয়ুব খানের সামরিক শাসন পাকিস্তানের পাঞ্জাবি, ও পশতুনদের দেনাগুলো বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেয়। জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সামরিক ও বেসামরিক চাকুরীর ক্ষেত্রে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিলো নগণ্য। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব ও সরকারি সাহায্যের দিক থেকেও বাঙালিদের প্রাপ্ত অংশ ছিলো খুবই কম। জাতিগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বাঙালিদের এই বৈষম্যের ফলে বাঙালির মধ্যে ক্ষোভের জন্ম নিতে থাকে। এরই প্রভাব হিসেবে আঞ্চলিক স্বার্থসংরক্ষণকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়তে থাকে।[২৫] এর ফলেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আরো বড় অধিকার আদায় ও গণতন্ত্রের দাবিতে ছয় দফা আন্দোলন শুরু করে। এই ছয় দফার একটি দাবি ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের নাম বাংলাদেশ ঘোষণা করতে হবে। এবং এই আন্দোলনই পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ নেয়।[৩] [৯]

[সম্পাদনা] প্রভাব

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার; ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে নির্মিত

বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে বাংলা ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। বাঙালির মধ্যে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপলক্ষ্য উদযাপন ও ভাষার উন্নয়নের কাজ করার মানসিকতা তৈরিতে এ আন্দোলনের যথেষ্ট ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মাতৃভাষা দিবস’ বা ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে ও একই সাথে একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসটিকে আরো নানাভাবে উদযাপিত হয় যার মধ্যে আছে, মাস ব্যাপী বইমেলা উদযাপন, যা একুশে বইমেলা নামে পরিচিত। এছাড়াও ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের ত্যাগের সম্মানে এ মাসেই ঘোষণা ও প্রদান করা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক ‘একুশে পদক’।[৭২] মানুষের ভেতর একুশের আবেগ পৌঁছে দিতে একুশের ঘটনা ও চেতনা নিয়ে রচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার গান, নাটক, কবিতা, ও চলচ্চিত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, যার সুর করেছেন সুরকার আলতাফ মাহমুদ[৭৩] ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বিভিন্ন সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা আন্দোলন প্রভাব সূচিত হয়ে আসছে। উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে আছে, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী রচিত নাটক কবর, কবি শামসুর রহমান রচিত কবিতা বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা এবং ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, রায়হান রচিত উপন্যাস একুশে ফেব্রুয়ারি, এবং শওকত ওসমান রচিত আর্তনাদ। এছাড়া ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়া[৭৪] ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ইউনেস্কোর কাছে লিখিতভাবে প্রস্তাব করে, যা ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়ে পাশ হয়।[৭৫]

প্রথম শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে ফেলার ২বছর পর ১৯৫৪ সালে নিহতদের স্মরণে নতুন একটি শহীদ মিনার তৈরী করা হয়। ১৯৫৭ সালে যুক্তফ্রন্টের সহযোগীতায় বড় পরিসরে শহীদ মিনার তৈরীর কাজ শুরু করা হয়। নতুন শহীদ মিনারের স্থপতি ছিলেন হামিদুর রহমান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল চত্ত্বরে বড় আকারের এই স্থাপনাটি নির্মান করা হয়। মূল বেদির উপর অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো ৫টি স্তম্ভের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে মা তার শহীদ সন্তানদের সাথে দাড়িয়ে আছেন। ১৯৫৮ সালের সামরির শাষনের কারণে স্থাপনাটির নির্মান কাজের অগ্রগতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৬৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী আবুল বরকতের মা হাসনা বেগম শহীদ মিনারটির উদ্বোধন করেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এটি ভেঙ্গে দেয়া। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এটি পুনরায় নির্মান করে।[৭৬]


পূর্ব পাকিস্তান ছাড়াও ভারতের আসম রাজ্যে বাংলাভাষাকে সমমর্জাদা দেয়ার লক্ষে আন্দোলন হয়েছিল। ১৯ মে, ১৯৬১ সালে সিলচার রেল স্টেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতী দেয়ার জন্য দাবি জানালে পুলিশের গুলিতে ১১ বাঙ্গালী শহীদ হন। পরবর্তীতে আসামের বাংলাভাষী লোক সংখ্যা বেশি রয়েছে এমন ৩টি জেলাতে বাংলাকে আধা-সরকারী ভাষার মর্জাদা দেয়া হয়েছে।[৭৭]

[সম্পাদনা] সমালোচনা

যদিও ভাষা আন্দোলন জাতিগত জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হয়েছিল, তবেও পূর্ব পাকিস্তানের অনেকেই মনে করেন যে পাকিস্তানের দুই অংশের সংস্কৃতির পার্থক্য এমন বিদ্বেষই ভাষা আন্দোলনের মূল কারণ।[৩][২৫][৭৮] পশ্চিম পাকিস্তানে এটিকে মনে করা হয়েছিল পাকিস্তানের জানি স্বার্থের বিরুদ্ধের একটি বিভাগীয় উত্থান।[৭৯] দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে "একমাত্র উর্দু" নীতি প্রত্যাক্ষান করাকে পারসিক-আরবি সংস্কৃতি এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মতাদর্শের একটি লঙ্ঘন হিসাবে দেখা হয়। [৩] পূর্বপাকিস্তানের বেশ কয়েকজন শক্তিশালী রাজনীতিবীদ মনে করেন যে উর্দু হল ভারতীয় ইসলামী সংস্কৃতির অংশ, আর সেখানে বাংলাকে তারা হিন্দু সংস্কৃতির সংমিশ্রনে তৈরী বাংলা সংস্কৃতি হিসাবে বিবেচনা করতো। [৯] অধিকাংশই যারা "একমাত্র উর্দু" নীতির পক্ষে ছিলেন, তারা মনে করতেন যে উর্দু কেবলমাত্র পাকিস্তান দেশের ভাষা হিসাবেই নয়, বরং সমগ্র জাতির ভাষা হিসাবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই ধরনের চিন্তাভাবনাও এই নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল, পাকিস্তানে তখন আরও বেশ কিছু ভাষাগত পার্থক্যের সম্প্রদায় ছিল। [৯] ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আইয়ুব খান বলেন যে। "পূর্ব পাকিস্তান... এখনো হিন্দু সংস্কৃতি এবং প্রভাবের অধিনে রয়েছে।"[৯]

আন্দোলনের পর আওয়ামী মুসলিম লীগ বাংলা জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে এবং নাম থেকে "মুসলিম" শব্দটি বাদ দিয়ে দেয়। [৮০] ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের জাতিগত জাতীয়তাবাদী ভিত্তিক দলগুলোর কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করে।[৩] পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কেন্দ্রীয় সরকার এবং যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বে প্রদেশিক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল ১৯৫৮ সালে সেনাবাজিনী প্রধান আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যূত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ। [২৮]

[সম্পাদনা] আরো দেখুন

[সম্পাদনা] পাদটীকা

  1. Glassie, Henry and Mahmud, Feroz.2008.Living Traditions. Cultural Survey of Bangladesh Series-II. Asiatic Society of Bangladesh. Dhaka. p.578
  2. ২.০ ২.১ Upadhyay, R (2003-05-01)। Urdu Controversy - is dividing the nation furtherPapers। প্রকাশক: South Asia Analysis Grouphttp://www.southasiaanalysis.org/papers7/paper675.html। সংগৃহীত হয়েছে: 2008-02-20 
  3. ৩.০ ৩.১ ৩.২ ৩.৩ ৩.৪ Rahman, Tariq (1997); “The Medium of Instruction Controversy in Pakistan” (PDF)। Journal of Multilingual and Multicultural Development 18 (2): পৃ. 145–154। ডিওআই:10.1080/01434639708666310। 2007-06-21 তারিখে সংগৃহীত।।
  4. Halder, Shashwati। ApabhrangshaBanglapedia। প্রকাশক: Asiatic Society of Bangladeshhttp://www.bpedia.org/A_0273.php। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-07-08 
  5. A Historical Perspective of Urdu। প্রকাশক: National Council for Promotion of Urdu languagehttp://www.urducouncil.nic.in/pers_pp/index.htm। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-15 
  6. Bhattacharya, T (2001)। Bangla। in Gary, J. and Rubino, C. (Eds) (PDF)। Encyclopedia of World's Languages: Past and Present (Facts About the World's Languages)। প্রকাশক: HW Wilson। (New York)। আইএসবিএন 0824209702http://www.homepages.ucl.ac.uk/~uclyara/bong_us.pdf। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-20 
  7. Rahman, Tariq (February 1997); “The Urdu-English Controversy in Pakistan”। Modern Asian Studies 31 (1): পৃ. 177–207। ডিওআই:10.1017/S0026749X00016978
  8. ৮.০০ ৮.০১ ৮.০২ ৮.০৩ ৮.০৪ ৮.০৫ ৮.০৬ ৮.০৭ ৮.০৮ ৮.০৯ ৮.১০ ৮.১১ ৮.১২ ৮.১৩ ৮.১৪ Language Movement (PHP)। Banglapedia - The National Encyclopedia of Bangladesh। প্রকাশক: Asiatic Society of Bangladeshhttp://www.banglapedia.org/httpdocs/HT/L_0063.HTM। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-02-06 
  9. ৯.০ ৯.১ ৯.২ ৯.৩ ৯.৪ ৯.৫ Oldenburg, Philip (August 1985); “"A Place Insufficiently Imagined": Language, Belief, and the Pakistan Crisis of 1971”। The Journal of Asian Studies 44 (4): পৃ. 711–733। ডিওআই:10.2307/2056443
  10. Morning News। 7 December 1947 
  11. (Bengali ভাষায়)দৈনিক আজাদ (a daily newspaper) (Abul Kalam Shamsuddin, Dhaka)। 11 December 1948 
  12. Umar 1979, p. 35
  13. Al Helal 2003, pp. 227–28
  14. দৈনিক আজাদ। 29 July 1947 
  15. Umar 1979, pp. 30–32
  16. ১৬.০ ১৬.১ (Bengali ভাষায়) Ekusher Shongkolon '80। প্রকাশক: Bangla Academy। (Dhaka)। 1980। পৃ. 102–103। 
  17. ১৭.০ ১৭.১ ১৭.২ ১৭.৩ ১৭.৪ ১৭.৫ ১৭.৬ ১৭.৭ মালেক, আবদুল (২০০০)। হোসেন, আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার। ed.। ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস। প্রকাশক: সেলিনা হোসেন, পরিচালক, গবেষণা সংকলন ফোকলোর বিভাগ, বাংলা একাডেমি। (ঢাকা)। পৃ. ৫-২৭। আইএসবিএন 984-07-4045-8 
  18. ১৮.০ ১৮.১ ১৮.২ ১৮.৩ ১৮.৪ ১৮.৫ ১৮.৬ একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস - আহমদ রফিক পৃষ্ঠা: ৫৬,১৪২, ৫৯
  19. Rahman, Hasan Hafizur (1982)। Bangladesher Swadhinotajuddher Dolilpotro। প্রকাশক: Ministry of Information, People's Republic of Bangladesh। 
  20. "বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র. পৃ-৫৪-৬৫
  21. ২১.০ ২১.১ ২১.২ ২১.৩ ২১.৪ ২১.৫ ২১.৬ Al Helal 2003, pp. 377–393
  22. আইয়ুব খান ‘প্রভু নয় বন্ধু’; পৃষ্ঠা: ৩৮
  23. Choudhury, G. W. (April 1972); “Bangladesh: Why It Happened”। International Affairs 48 (2): পৃ. 242–249। ডিওআই:10.2307/2613440
  24. ২৪.০ ২৪.১ ২৪.২ Umar 1979, p. 279
  25. ২৫.০ ২৫.১ ২৫.২ ২৫.৩ Uddin 2006, pp. 3–16, 120–124
  26. দৈনিক আজাদ। 24 February 1948 
  27. R. Upadhyay (2007-04-07)। De-Pakistanisation of Bangladesh। প্রকাশক: Bangladesh Monitor, South Asia Analysis Group। archived from the original on June 11, 2007http://web.archive.org/web/20070611044641/http://www.saag.org/papers22/paper2199.html। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-16 
  28. ২৮.০ ২৮.১ ২৮.২ ২৮.৩ ২৮.৪ James Heitzman and Robert Worden (eds), ed. (1989)। Pakistan Period (1947–71)Bangladesh: A Country Study। প্রকাশক: Government Printing Office, Country Studies US। আইএসবিএন 0-16-017720-0http://countrystudies.us/bangladesh/14.htm। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-16 
  29. Sayeed, Khalid Bin (September 1954); “Federalism and Pakistan”। Far Eastern Survey 23 (9): পৃ. 139–143। ডিওআই:10.1525/as.1954.23.9.01p0920l
  30. ৩০.০ ৩০.১ ৩০.২ ৩০.৩ Al Helal 2003, pp. 263–265
  31. Umar 1979, p. 290
  32. ৩২.০ ৩২.১ ৩২.২ ৩২.৩ Islam, Rafiqul (2000) (Bengali ভাষায়)। Amar Ekushey O Shaheed Minar। প্রকাশক: Poroma। (Dhaka)। পৃ. 62–85। আইএসবিএন 984-8245-39-1 
  33. Mandal, Ranita (2002-06-24)। Chapter 4 : Other ActivitiesMuhammad Shahidullah & His Contribution To Bengali Linguistics। প্রকাশক: Central Institute of Indian Languages, Mysore, Indiahttp://www.ciil-ebooks.net/html/benling/chapter4.html। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-23 
  34. দৈনিক আজাদ। 24 May 1950 
  35. দৈনিক আজাদ। 1 February 1952 
  36. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ৫, ১৯৫২
  37. পরিষদের সভায় মোট ১৫জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু মোহাম্মদ তোয়াহা ভোট দানে বিরত ছিলেন।
  38. গাজীউল হক, একুশের সংকলন, প্রকশিত: ১৯৮০, পৃষ্ঠা: ১৩৮
  39. ইতিহাস, কবির উদ্দিন আহমেদ. পৃ-২২৫-২৬
  40. "Dhaka Medical College Hostel Prangone Chatro Shomabesher Upor Policer Guliborshon. Bishwabidyalayer Tinjon Chatroshoho Char Bekti Nihoto O Shotero Bekti Ahoto" (Bengali ভাষায়)। দৈনিক আজাদ। 22 February 1952। 
  41. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ২২, ১৯৫২
  42. দৈনিক আমারদেশ, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭, প্রথম পাতা
  43. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৯৫২
  44. "Banglake Pakistaner Onnotomo Rashtrabhasa Korar Jonno Purbobongo Babostha Porishoder Shoparesh. Shukrobar Shohorer Obosthar Aaro Obonoti : Shorkar Kortrik Shamorik Bahini Tolob. Police O Shenader Gulite Charjon Nihoto O Shotadhik Ahoto : Shatghontar Jonno Curfew Jari. Shohidder Smritir Proti Sroddha Gyaponarthay Shotosfurto Hartal Palan" (Bengali ভাষায়)। দৈনিক আজাদ। 23 February 1952। 
  45. Al Helal 2003, p. 483
  46. http://www.shaptahik.com/v2/?Sup_Details=149
  47. http://www.shaptahik.com/v2/?Sup_Details=149
  48. ৪৮.০ ৪৮.১ দৈনিক আজাদ,February 25, 1952
  49. The Daily Star,February 27, 1952
  50. Umar 1979, pp. 417–418
  51. Al Helal 2003, pp. 515-523
  52. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৫২
  53. Al Helal 2003, pp. 546–552
  54. দৈনিক আজাদ, মার্চ ২০, ১৯৫২
  55. দৈনিক আজাদ, এপ্রিল ১১, ১৯৫২
  56. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএ/এমআই/১৮১১ ঘ.
  57. সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ফেব্রুয়ারি ৮, ১৯৫৩
  58. সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ১৯৫৩
  59. Al Helal 2003, pp. 604–609
  60. ৬০.০ ৬০.১ ৬০.২ ৬০.৩ Al Helal 2003, pp. 608–613
  61. ৬১.০ ৬১.১ Al Helal 2003, pp. 600–603
  62. সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, এপ্রিল ২১, ১৯৫৩
  63. দৈনিক আজাদ, এপ্রিল ২১, ১৯৫৪
  64. দৈনিক আজাদ। 22 April 1954 
  65. ৬৫.০ ৬৫.১ ৬৫.২ UF elections victoryChronicles of Pakistanhttp://www.therepublicofrumi.com/chronicle/1954.htm। সংগৃহীত হয়েছে: 2011-12-11 
  66. দৈনিক আজাদ, এপ্রিল ২২, ১৯৫৪
  67. Bangla AcademyBanglapedia: The National Encyclopedia of Bangladesh। প্রকাশক: Asiatic Society of Bangladeshhttp://banglapedia.search.com.bd/HT/B_0134.htm। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-07-05 
  68. "Gambhirjopurno Poribeshay Shaheed Dibosh Utjapon" (Bengali ভাষায়)। Weekly Notun Khobor। 26 February 1956। 
  69. "Gambhirjopurno Poribeshay Shaheed Dibosh Utjapon" (Bengali ভাষায়)। Weekly Notun Khobor। 26 February 1956। 
  70. সাপ্তাহিক নতুন খবর, ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৫৬
  71. Lambert, Richard D. (April 1959); “Factors in Bengali Regionalism in Pakistan”। Far Eastern Survey 28 (4): পৃ. 49–58। ডিওআই:10.1525/as.1959.28.4.01p1259x
  72. Khan, Sanjida। National AwardsBanglapedia। প্রকাশক: Asiatic Society of Bangladeshhttp://banglapedia.search.com.bd/HT/N_0081.htm। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-23 
  73. Aminzade, Ronald; Douglas McAdam, Charles Tilly (17 September 2001)। Emotions and Contentious PoliticsSilence and Voice in the Study of Contentious Politics। প্রকাশক: Cambridge University Press। (Cambridge)। পৃ. 42। আইএসবিএন 0521001552http://books.google.com/books?id=h8PNEOZRRt8C&printsec=frontcover&dq=bangladesh+language+movement। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-24 
  74. Islam, Rafiqul (2000) (Bengali ভাষায়)। Amar Ekushey O Shaheed Minar। প্রকাশক: Poroma। (Dhaka)। পৃ. 62–85। আইএসবিএন 984-8245-39-1 
  75. International Mother Language Day - Background and Adoption of the ResolutionGovernment of Bangladeshhttp://www.pmo.gov.bd/21february/imld_back.htm। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-21 
  76. Imam, Jahanara (1986) (Bengali ভাষায়)। Ekattorer Dingulee। প্রকাশক: Shondhani Prokashani। (Dhaka)। পৃ. 44। আইএসবিএন 984-480-000-5 
  77. Court route for language status , The Telegraph, May 20, 2008.
  78. Bangladesh History। প্রকাশক: Discovery Bangladeshhttp://www.discoverybangladesh.com/history.html। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-21 
  79. Rahman, Tariq (September 1997); “Language and Ethnicity in Pakistan”। Asian Survey 37 (9): পৃ. 833–839। ডিওআই:10.1525/as.1997.37.9.01p02786
  80. Lintner, Bertil (January 2004)। Chapter 17: Religious Extremism and Nationalism in Bangladesh। in eds Satu Limaye, Robert Wirsing, Mohan Malik (PDF)। Religious Radicalism and Security in South Asia। প্রকাশক: Asia-Pacific Center for Security Studies। (Honolulu, Hawaii)। পৃ. 413। আইএসবিএন 0-9719416-6-1http://www.apcss.org/Publications/Edited%20Volumes/ReligiousRadicalism/PagesfromReligiousRadicalismandSecurityinSouthAsiach17.pdf। সংগৃহীত হয়েছে: 2007-06-28 

[সম্পাদনা] তথ্যসূত্র

  • Al Helal, B (2003), Bhasha Andoloner Itihas (History of the Language Movement), Agamee Prakashani, Dhaka, ISBN 984-401-523-5 (বাংলা)
  • Uddin, Sufia M. (2006), written at Chapel Hill, Constructing Bangladesh: Religion, Ethnicity, and Language in an Islamic Nation, The University of North Carolina Press, ISBN 0807830216
  • Umar, B (1979), Purbo-Banglar Bhasha Andolon O Totkalin Rajniti, Agamee Prakashani, Dhaka (বাংলা)

[সম্পাদনা] আরো পড়ুন

বাংলা ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে হলে উইকিপিডিয়ার সহপ্রকল্পগুলোতে অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন:

Wiktionary-logo-en.svg সংজ্ঞা, উইকিঅভিধান হতে
Wikibooks-logo.svg পাঠ্যবই, উইকিবই হতে
Wikiquote-logo.svg উক্তি, উইকিউক্তি হতে
Wikisource-logo.svg রচনা সংকলন, উইকিউৎস হতে
Commons-logo.svg ছবি ও অন্যান্য মিডিয়া, কমন্স হতে
Wikinews-logo.png সংবাদ, উইকিসংবাদ হতে

Badruddin Umar (2004)। The Emergence of Bangladesh: Class Struggles in East Pakistan (1947-1958)। প্রকাশক: Oxford University Press, USA। আইএসবিএন 978-0195795714 

Anwar S. Dil (2000)। Bengali language movement to Bangladesh। প্রকাশক: Ferozsons। আইএসবিএন 978-9690015778 

Robert S. Stern (2000)। Democracy and Dictatorship in South Asia: Dominant Classes and Political Outcomes in India, Pakistan, and Bangladesh। প্রকাশক: Praeger Publishers। আইএসবিএন 978-0275970413 

Syed Manzoorul Islam (1994)। Essays on Ekushey: The Language Movement 1952। প্রকাশক: Bangla Academy। আইএসবিএন 984-07-2968-3 

[সম্পাদনা] বহিঃসংযোগ


নিজস্ব হাতিয়ারসমূহ
নামস্থান
বিকল্পসমূহ
কার্যক্রম
পরিভ্রমন
মুদ্রণ/এক্সপোর্ট
সরঞ্জাম
অন্যান্য ভাষাসমূহ