ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ভাষা নিয়ে মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই চিন্তা ও গবেষণা করে এসেছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে পাশ্চাত্যে ভাষা গবেষণার বিকাশ[সম্পাদনা]

পাশ্চাত্যে খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীর গ্রিক দার্শনিকেরা প্রথম ভাষার তত্ত্বের ব্যাপারে আগ্রহী হন। ভাষার উৎস ও গ্রিক ভাষার ব্যাকরণগত কাঠামো ছিল তাদের মূল বিতর্কের বিষয়। প্লেটোঅ্যারিস্টটল ভাষার অধ্যয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। প্লেটো গ্রিক শব্দসমূহের ব্যুৎপত্তি নিয়ে গবেষণা করেন এবং ধারণা করা হয় পাশ্চাত্যে তিনিই প্রথম বিশেষ্য ও ক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য করেন। খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে দিওনিসিয়ুস থ্রাক্স প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রিক ব্যাকরণ রচনা করেন। এটি পাশ্চাত্যে ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণের ধারা শুরু করে। রোমান ব্যাকরণবিদ আইলিয়ুস দোনাতুস এবং প্রিস্কিয়ান খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকে দিওনিসিয়ুস থ্রাক্সের গ্রিক ব্যাকরণের পদ্ধতিগুলি লাতিন ভাষার উপর প্রয়োগ করেন। লাতিন ও গ্রিক উভয়েই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা এবং এদের মধ্যে গঠনগত সাদৃশ্য ছিল; ফলে গ্রিক ব্যাকরণের অনুসরণে লাতিন ব্যাকরণ লেখা সম্ভব হয়েছিল।

মধ্যযুগে ও রনেসঁসের সময় ইউরোপে প্রচলিত বেশির ভাগ ভাষার ব্যাকরণবিদেরা গ্রিক ও লাতিন ব্যাকরণকে আদর্শ ও "শুদ্ধ" ব্যাকরণ গণ্য করে তাদের নিজ নিজ ভাষার জন্য বিধানমূলক ব্যাকরণ রচনা করেন। রনেসাঁসের পরে ১৫শ শতকে ইউরোপীয়রা নতুন নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসা ও উপনিবেশের তাগিদে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তারা বিশ্বের অন্যান্য অনেক ভাষার সংস্পর্শে আসে, যেগুলির গঠন ছিল ইউরোপীয় ভাষাগুলি অপেক্ষা ভিন্ন। এগুলির সাথে লাতিন ও গ্রিক ভাষার কোন সম্পর্কই ছিল না। এ সময় ইউরোপীয় ভাষাপণ্ডিতেরা বিশ্বের ভাষাসমূহের মধ্যে বিদ্যমান সাধারণ বা বিশ্বজনীন মূলনীতিগুলির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এরই ভিত্তিতে ১৭শ শতকে রচিত হয় অনেকগুলি "সাধারণ ব্যাকরণ", যাদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাতটি হল ১৬৬০ সালে অঁতোয়ান আর্নো এবং ক্লোদ লঁসলো নামের দুই ফরাসি ব্যাকরণবিদ কর্তৃক রচিত Grammaire générale et raisonnée contenant les fondemens de l'art de parler, expliqués d'une manière claire et naturelle

পাশ্চাত্যের বাইরে ভাষা গবেষণার ধারা[সম্পাদনা]

পাশ্চাত্যের বাইরে ভারতীয় উপমহাদেশে ভাষাবিষয়ক গবেষণার একটি স্বতন্ত্র ধারা অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদেরা উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মধ্যে পার্থক্য করেন, এবং গ্রিক ব্যাকরণবিদদের মত বিশেষ্য ও ক্রিয়াপদ ছাড়াও অনুসর্গ ও অব্যয় নামের দুটি পদ আবিষ্কার করেন। ভারতীয় ব্যাকরণবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন পাণিনি (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী)। তবে তাঁর বেশ কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই ভারতে ব্যাকরণচর্চা শুরু হয়েছিল। পাণিনি-পূর্ব ব্যাকরণবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন যাস্ক (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী)। যাস্ক তাঁর ব্যাকরণে বিশেষ্য, ক্রিয়া, উপসর্গ ও নিপাতের (অব্যয়) উল্লেখ করেছিলেন। তবে পাণিনির ব্যাকরণেই তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত ভাষাতাত্ত্বিক চিন্তাধারা পূর্ণতা পায় এবং এটি ভবিষ্যতের সমস্ত ভারতীয় ব্যাকরণকে প্রভাবিত করে। তাঁর ব্যাকরণের ওপর ভিত্তি করে কমপক্ষে ১২টি ভিন্ন ব্যাকরণ-তত্ত্বের ধারা ও হাজার খানেক ব্যাকরণ রচিত হয়। ভারতীয় ভাষা গবেষণার কাজ ধ্বনিতাত্ত্বিক ও শব্দের অন্তর্সংগঠন - উভয় দিক থেকেই পাশ্চাত্যের ব্যাকরণের চেয়ে উন্নত বলে গণ্য করা হয়। পাণিনীয় সংস্কৃত ব্যাকরণ সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে যে আজও পৃথিবীর ইতিহাসের আর কোন ভাষার ব্যাকরণে এরকম পুঙ্খানুপুঙ্খতা, অভ্যন্তরীণ সঙ্গতি ও ধারণার সাশ্রয় পরিলক্ষিত হয়নি। ব্লুমফিল্ডের মতে পাণিনির অষ্ট্যাধ্যায়ী "one of the greatest monuments of human intelligence" (দ্রষ্টব্য Language, ১৯৩৩)। এই ব্যাকরণের মূল অংশে প্রায় চার হাজার সূত্র প্রদান করা হয়েছে। কেবল ১৮শ শতকের শেষার্ধে এসেই পাশ্চাত্যের ভাষাতাত্ত্বিকেরা ভারতীয় ব্যাকরণের এই ধারার সাথে প্রথম পরিচয় লাভ করেন।

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের জন্ম[সম্পাদনা]

অনেকেই ১৭৮৬ সালকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের জন্মবছর হিসেবে গণ্য করেন। ঐ বছরের ২রা ফেব্রুয়ারি তারিখে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ স্যার উইলিয়াম জোন্স কলকাতার রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির ৩য় বার্ষিক সভায় একটি গবেষণাপত্র পাঠ করেন, যাতে তিনি উল্লেখ করেন যে সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, কেল্টীয়জার্মানীয় ভাষাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রকমের গাঠনিক সাদৃশ্য রয়েছে এবং প্রস্তাব করেন যে এগুলো সবই একই ভাষা থেকে উদ্ভূত। জোন্স বলেন, "The Sanskrit language ... is of a wonderful structure; more perfect than the Greek, more copious than the Latin, and more exquisitely refined than either, yet bearing to both of them a stronger affinity, both in the roots of verbs and in the forms of grammar, than could possibly have been produced by accident; so strong indeed, that no philologer could examine them all three, without believing them to have sprung from some common source, which, perhaps, no longer exists: there is a similar reason, though not quite so forcible, for supposing that both the Gothic and the Celtic, though blended with a very different idiom, had the same origin with the Sanskrit; and the old Persian might be added to the same family..." [১]

১৯শ শতকের ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান[সম্পাদনা]

জোন্সের এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে সমগ্র ১৯শ শতক জুড়ে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানীরা তুলনামূলক কালানুক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার ও ধ্বনিসম্ভারের মধ্যে তুলনা করার চেষ্টা করেন এবং ফলশ্রুতিতে আবিষ্কার করেন যে প্রকৃতপক্ষেই লাতিন, গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষাগুলো পরস্পর সম্পর্কিত, ইউরোপের বেশির ভাগ ভাষার মধ্যে বংশগত সম্পর্ক বিদ্যমান এবং এগুলো সবই একটি আদি ভাষা প্রত্ন-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে উদ্ভূত। ফ্রিডরিশ ফন শ্লেগেল, রাস্‌মুস রাস্ক, ফ্রান্ৎস বপ, ইয়াকপ গ্রিম, প্রমুখ ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণা প্রকাশ করা শুরু করেন। ১৮০৬ সালে শ্লেগেল প্রথম জার্মানীয় ধ্বনি সরণের বিধিটি আবিষ্কার করেন। ১৮১৮ সালে রাস্ক এটি পুনরাবিষ্কার করেন এবং ১৮২২ সালে গ্রিম বিধিটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন; এটি গ্রিমের বিধি নামে পরিচিত। গ্রিমের বিধি ছিল তৎকালীন ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

১৯শ শতকের শেষ চতুর্থাংশে লাইপ্‌ৎসিশ-ভিত্তিক "নব্যব্যাকরণবিদেরা" (Jung-grammatiker; কার্ল ব্রুগ্‌মান, হের্মান অস্ট্‌হফ, হের্মান পাউল, প্রমুখ) দেখান যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদি ভাষাগুলোর উচ্চারণের সুশৃঙ্খল, ব্যতিক্রমহীন, নিয়মাবদ্ধ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন ভাষাগুলোর উদ্ভব হয়েছে। ১৮৭৬ সালে কার্ল ভের্নার তাঁর Eine Ausnahme der ersten Lautverschiebung আইনে আউসনামে ডের এর্স্টেন লাউটফারশিবুং "প্রথম ধ্বনি সরণের একটি ব্যতিক্রম" নামের নিবন্ধে গ্রিমের বিধির একটি সমস্যা সৃষ্টিকারী ব্যতিক্রমকে ধ্বনি-পরিবর্তনের একটি নতুন বিধি দ্বারা সমাধান করেন। ভের্নারের মতে গ্রিমের বিধি অনুসারে ধ্বনি সরণের পর দ্বিতীয়বার আরেকটি ধ্বনি সরণ ঘটে। এই দ্বিতীয় ধ্বনি সরণ বিধিটি ভের্নারের বিধি নামে পরিচিত। ভের্নারের এই আবিষ্কার নব্যব্যাকরণবিদদের জোর সমর্থন পায়।

একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভাষাবিজ্ঞানের আরেকটি ধারা স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। মার্কিন নৃতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানীরা আমেরিকান ইন্ডিয়ান ভাষাসমূহের ওপর কাজ করতে শুরু করেন। এগুলোর অধিকাংশই ছিল বিলুপ্তির পথে, এবং এগুলোর কোন লিখিত দলিলও ছিল না। ফলে ঐতিহাসিক রচনাসমূহের তুলনা করে নয়, মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানীরা মাঠে গিয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করে ভাষা বিশ্লেষণ করতেন।

সোস্যুর এবং সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞান[সম্পাদনা]

১৯শ শতকের শেষে সুইস ভাষাবিজ্ঞানী ফের্দিনঁ দ্য সোস্যুর ভাষা গবেষণার গতিধারায় পরিবর্তন আনেন। সোস্যুর-ই প্রথম এককালিক ও কালানুক্রমিক ভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করেন। ফলে ভাষাবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাষার তুলনামূলক ঐতিহাসিক বিচারের পরিবর্তে যেকোন একটি ভাষার একটি নির্দিষ্ট কালের বিবরণের ব্যাপারে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন। সোস্যুর আরও প্রস্তাব করেন যে, ভাষা (langue, লংগ্‌) ও উক্তি (parole, পারোল) দুটি ভিন্ন সত্তা। তাঁর মতে ভাষা হল অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ কাঠামো, আর উক্তি হল তার বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। সোস্যুর মত দেন যে ভাষা বিভিন্ন আন্তঃসম্পর্কিত, পরস্পরনির্ভর উপাদানে তৈরি একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো বা সংগঠন। তাঁর এই মতের ওপর ভিত্তি করে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত ঘটে।

বিংশ শতকের প্রথমার্ধে মার্কিন সংগঠনবাদ[সম্পাদনা]

১৯২০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহু বিচিত্র আদিবাসী আমেরিকান ভাষার উপর এককালিক ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পাদিত হয়। এসময়কার প্রধান ভাষাবিদ যেমন এডওয়ার্ড সাপির, ফ্রান্‌ৎস বোয়াস এবং আলফ্রেড ক্রোবার ছিলেন একাধারে নৃতত্ত্ববিদও। ১৯৩০-এর দশকে ভাষাবিজ্ঞানীরা বর্ণনামূলক কাজের পরিবর্তে ভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সাপির ও লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড ছিলেন এসময়কার ভাষাবৈজ্ঞানিক সংগঠনবাদের পুরোধা। তাঁরা ভাষার গবেষণায় উপাত্তভিত্তিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর জোর দেন এবং বলেন যে ভাষাবিজ্ঞানের কাজ ভাষা কী ভাবে কাজ করে তা নৈর্ব্যক্তিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যবেক্ষণ করা; ভাষা কী রকম হওয়া উচিত, তা নিয়ে গবেষণা করা ভাষাবিজ্ঞানের কাজ নয়। ১৯৩৩ সালে ব্লুমফিল্ড প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত Language গ্রন্থটি, যাতে মার্কিন সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞানের তৎকালীন চিন্তাধারাগুলি একটি প্রণালীবদ্ধ রূপ পায়। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশককে বলা হয় ভাষাবিজ্ঞানের "ব্লুমফিল্ডীয় যুগ"; এ সময় ব্লুমফিল্ড-প্রদত্ত কঠোর নিয়মতান্ত্রিক বিশ্লেষণী পদ্ধতি অনুসরণ করে বহু ভাষার বিবরণমূলক ব্যাকরণ রচিত হয়। এ সময় ভাষাবিজ্ঞানীরা কোন ভাষার মাতৃভাষী ব্যক্তির বিভিন্ন উক্তি সংগ্রহ করতেন ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক বিশ্লেষণ প্রয়োগ করে সেগুলোর ভেতরের ধ্বনিতাত্ত্বিক ও বাক্যতাত্ত্বিক সূত্র ও বিন্যাসগুলো আবিষ্কারের চেষ্টা করতেন।

ব্লুমফিল্ডের পরবর্তী প্রজন্মের ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জেলিগ হ্যারিস, চার্লস হকেট, ইউজিন নিডা, বার্নার্ড ব্লখকেনেথ পাইক। তারা নব্য-ব্লুমফিল্ডীয় সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞানের একটি ধারা গড়ে তোলেন, যা মার্কিন সংগঠনবাদ নামে পরিচিত ছিল। মার্কিন সংগঠনবাদে ভাষার বিশ্লেষণে অর্থের কোন স্থান ছিল না। ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে জেলিগ হ্যারিস ভাষাবিষয়ক কিছু গবেষণাতে বিভিন্ন ধরনের বাক্যের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক সম্পর্ক দেখানোর জন্য "রূপান্তর" (transformation) ধারণাটির অবতারণা করেন।

চম্‌স্কি ও রূপান্তরমূলক সঞ্জননী/সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ[সম্পাদনা]

১৯৫০-এর দশকেই কিছু কিছু ভাষাবিজ্ঞানী সংগঠনবাদের দুর্বলতা আবিষ্কার করেন। তাঁরা বলেন সংগঠনবাদীরা কেবল ভাষার বাহ্যিক রূপ ও দৃশ্যমান উপাত্ত নিয়েই আগ্রহী এবং ভাষাবিজ্ঞানকে অহেতুক উপাত্ত-সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষুদ্র সীমায় আবদ্ধ করে ফেলেছেন। এর ফলে ভাষার অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ সংগঠন ও বিভিন্ন ভাষার বিশ্বজনীন ধর্মগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী নোম চম্‌স্কি ছিলেন জেলিগ হ্যারিসের শিষ্য। চমস্কি সংগঠনবাদের বিরুদ্ধে লেখেন এবং ভাষা যে একটি মানসিক প্রক্রিয়া ও পৃথিবীর সব ভাষাই যে কিছু সার্বজনীন বিন্যাস অনুসরণ করে, সে ব্যাপারে জোর দেন। চম্‌স্কির এই লেখার ফলে ভাষাবিজ্ঞানের গতি আরেকবার পরিবর্তিত হয়। চম্‌স্কি বিশ্বাস করেন যে কোন ব্যক্তির অচেতন, অব্যক্ত ভাষাবোধ এবং তার ভাষাপ্রয়োগ দুটি ভিন্ন বস্তু। তাঁর মতে ভাষাবিজ্ঞানীর কাজ হল মানুষের ভাষাবোধ যেসব অন্তর্নিহিত মানসিক সূত্র দিয়ে গঠিত সেগুলো আবিষ্কার করা। এ প্রস্তাবের সমর্থনে ১৯৫৭ সালে Syntactic Structures নামের গ্রন্থে চম্‌স্কি উপস্থাপন করেন তাঁর উদ্ভাবিত "রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ" নামের একটি ধারণা, যে ব্যাকরণের সূত্রগুলো দিয়ে কোন একটি ভাষার সমস্ত "বৈধ" বাক্যের গঠন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। চমস্কি এতে হ্যারিসের “রূপান্তর” ধারণার সাথে গাণিতিক বিধিবদ্ধতার (mathematical formalism) সমন্বয় ঘটান। চম্‌স্কি আরও বলেন যে সব ভাষার মানুষই ভাষা বিষয়ক কিছু সার্বজনীন ধারণা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাদের সমষ্টিগত নাম তিনি দেন "বিশ্বজনীন ব্যাকরণ"। এই ব্যাকরণের সীমা উদ্ঘাটন করাও ভাষাবিজ্ঞানীর অন্যতম কাজ। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৭শ শতকে যুক্তিবাদীদের রচিত “সাধারণ” ব্যাকরণগুলির দিকে নির্দেশ করেন।

উল্লেখ্য, চম্‌স্কীয় ধারায় "ব্যাকরণ" বলতে ভাষাবিষয়ক প্রথাগত কিছু আনুশাসনিক নিয়মের সমষ্টিকে বোঝানো হয় না, বরং মানবমনের বিমূর্ত ভাষাবোধ, যা মানুষকে কথা বলতে, বুঝতে কিংবা নতুন ভাষা শিখতে সাহায্য করে, সেটিকে নির্দেশকারী ও ব্যাখাকারী ভাষাবৈজ্ঞানিক সূত্রসমষ্টিকে বোঝায়।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান মূলত চম্‌স্কি প্রস্তাবিত রূপান্তরমূলক ব্যাকরণের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তাবিত বিভিন্ন ধরনের ব্যাকরণিক কাঠামোর গবেষণা। চম্‌স্কি বাক্যতত্ত্বকে ভাষাবিজ্ঞানের মূল ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ৫০ ও ৬০-এর দশকের প্রাথমিক প্রকাশের পর চম্‌স্কির নিজস্ব তত্ত্বের বিবর্তন ঘটেছে বেশ কয়েকবার: "মান তত্ত্ব" থেকে শুরু করে "সম্প্রসারিত মান তত্ত্ব", "শাসন ও বন্ধন তত্ত্ব", "নীতি ও পরামিতি", এবং সর্বশেষ "ন্যূনতমবাদী প্রকল্প"। এছাড়া চম্‌স্কীয় তত্ত্বের অনুসরণে কিছু তত্ত্ব গড়ে উঠেছে, যেগুলি ভাষাবিজ্ঞানের লক্ষ্য-সংক্রান্ত চম্‌স্কীয় মতবাদ ও স্বতঃসিদ্ধগুলো অনেকাংশেই মেনে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এদের মধ্যে "কারক ব্যাকরণ", "সাধারণীকৃত পদ সংগঠন ব্যাকরণ", "সৃষ্টিশীল অর্থবিজ্ঞান", "মস্তক-চালিত পদ সংগঠন ব্যাকরণ", "আভিধানিক ফাংশনভিত্তিক ব্যাকরণ", "সম্পর্কমূলক ব্যাকরণ" ও "অপটিমালিটি তত্ত্ব" অন্যতম।

অন্যান্য ধারা[সম্পাদনা]

চম্‌স্কীয় মূলধারার বাইরে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে শ্রেণীকরণবাদী একটি ধারা আছে, যে ধারার অনুসারী ভাষাবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাষাকে তাদের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে শ্রেণীকরণ করার চেষ্টা করেন। ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী জোসেফ গ্রিনবার্গ ছিলেন এই ধারার অগ্রগামী প্রবক্তা। বর্তমানে এই ধারার ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে বার্নার্ড কমরি অন্যতম।

ভাষাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ[সম্পাদনা]

একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এসে মানবমনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বোধ বিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা হিসেবে ভাষাবিজ্ঞান নিজের স্থান করে নিয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণায় কম্পিউটারকম্পিউটার বিজ্ঞানের তত্ত্বের প্রয়োগও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. জোন্সের পুরো ভাষণটি পড়ুন এখানে: http://www.utexas.edu/cola/centers/lrc/books/read01.html