বনবিদ্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অস্ট্রিয়াতে বনবিদ্যার কাজ

বনবিদ্যা (ইংরেজি: Forestry) হল মানুষের কল্যাণের তরে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য, চাহিদা, এবং মান মেটাতে অরণ্য ও তৎসংশ্লিষ্ট সম্পদের সৃষ্টি, ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং মেরামতের বিজ্ঞান, কলা ও কৌশল।[১] আবাদি জমি অথবা প্রাকৃতিক স্ট্যান্ডে বনবিদ্যার চর্চা করা হয়। বনবিদ্যার প্রধান লক্ষ্য হল এমন পদ্ধতির প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যা পরিবেশগত জোগান ও পরিষেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে অরণ্যের সুব্যবস্থাপনা করবে।[২] নির্বিঘ্ন অথবা ক্ষতির সম্মুখীন যেকোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে একে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো পদ্ধতির প্রণয়নই অরণ্যবিদ্যার সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।[৩]

বনপালন নামক সংশ্লিষ্ট একটি বিজ্ঞানে স্ট্যান্ড পর্যায়ে বৃক্ষ ও অরণ্যের পুনরুৎপাদন, পরিচর্যা এবং সংগ্রহ সম্বন্ধে আলোকপাত করা হয়। আধুনিক বনবিদ্যার বিষয়ের পরিসর অত্যন্ত ব্যাপক যাতে বাস্তুতন্ত্র পরিষেবার প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাস্তুতন্ত্রের পরিসেবাসমূহ অরণ্য সংরক্ষণের নিমিত্তে কাষ্ঠল দ্রব্যের জন্য কাঁচামালস্বরূপ কাঠ, বন্যপ্রাণীর বাসস্থান, প্রাকৃতিক জলের গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ, জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা, ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণ, এবং বায়ুমন্ডলীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সিংক বা ডুবা হিসেবে অরণ্যকে সহায়তা করে। যিনি বনবিদ্যা অনুশীলনের সাথে যুক্ত থাকেন তাকে বনবিদ বা ফরেস্টার বলা হয়।

অরণ্য বাস্তুতন্ত্রগুলোকে জীবমন্ডলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়।[৪] সেইসাথে বনবিদ্যা এখন বিজ্ঞান, ফলিত কলা এবং প্রযুক্তির অত্যাবশ্যক ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

স্লোভেনিয়ার একটি পত্রঝরা বিচ বন

পঞ্চম শতকে মঠধারী সন্ন্যাসীরা জ্বালানি ও খাদ্যের উৎস হিসেবে আড্রিয়াটিকের উপকূলে তখনকার বাইজেন্টাইন রোমানিয়াতে প্রস্তর পাইনের আবাদ করেন।[৫] ১৩০৮ খ্রিষ্টাব্দে দান্তে আলিগিয়েরির রচিত কবিতা ডিভাইন কমেডিতে সর্বপ্রথম এ ধরনের বনায়নের উল্লেখ পাওয়া যায়।[৫] তারও আগে সপ্তম শতকে যখন কাঠের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দেখা দেয়, ভিজিগোথরা ওক এবং পাইন বনের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রথাবদ্ধ নিয়মাবলির প্রবর্তন করে, আর তার ফলেই প্রথাগত বনবিদ্যার অনুশীলন শুরু হয়।[৫] চীনে নানান রকম বনজ সম্পদের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ইতিহাস বেশ প্রাচীন- সেই হান সাম্রাজ্যের আমল থেকে। তখন জমিদারদের অধীনে বনব্যবস্থাপনা হত। এই বিষয়টি মিং সাম্রাজ্যের চীনা পন্ডিত জু গুয়াংকি (১৫৬২-১৬৩৩) পরবর্তীতে তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। ইউরোপে ভূমির নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শিকারের অধিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং যদিও অনেক স্থানে কৃষিজীবীরা অরণ্য থেকে জ্বালানি কাঠ ও ঘরবাড়ি তৈরীর কাঠ সংগ্রহ করতে পারত, তথাপি শিকারের অধিকার একমাত্র অভিজাতদের জন্যই নির্ধারিত ছিল। কাঠের টেকসই উৎপাদনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক বন ব্যবস্থাপনার শুরু হয় চতুর্দশ শতকে জার্মানিতে (যেমন, নুরেমবার্গ[৬]) এবং ষোড়শ শতকে জাপানে[৭] হয়েছিল। বৈশিষ্ট্যস্বরূপ, একটা অরণ্যকে নির্দিষ্ট কতক খন্ডে ভাগ করার পর মানচিত্রায়িত করা হতো; কাঠ সংগ্রহের পরিকল্পনা নেয়া হতো মূলত চারা পুনরুৎপাদনের দিকে খেয়াল রেখে।

কাষ্ঠ আহরণ বনবিদ্যার একটি সাধারণ উপাদান

জন এভলিন ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে বৃক্ষ আবাদের চর্চা চাঙ্গা করে তোলেন, যদিও ইতোমধ্যে সেটা খানিকটা জনপ্রিয়তা লাভ করে ফেলেছিল। ষোড়শ লুইয়ের মন্ত্রী জঁ-বাতিস্ত কোল‌বেয়ারের, ফরাসি নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আবাদকৃত টোনছের বন আশানুরূপভাবে উনিশ শতকের মধ্যভাগে পরিণত হয়ে উঠে। ঐতিহাসিক ফার্নান্দ বঁদেল মন্তব্য করেন বাষ্পচালিত জাহাজ ছাড়া কোলবেয়ার আর সবকিছু নিয়েই ভেবেছিলেন[৮] অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে হেস, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, সুইডেন, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় বনবিদ্যা বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠতে শুরু করে। উনিশ শতকের সমাপ্তি এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটিশ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বন সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।

প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণজনিত উদ্বেগ ও লগিং কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার প্রতি সাড়া প্রদান করে বিশ শতকে এসে পশ্চিমা জাতিসমূহ অরণ্য আইন এং বাধ্যতামূলক প্রবিধানের প্রণয়ন ও বিবর্তন ঘটাতে শুরু করে।

ক্রান্তীয় বনবিদ্যা হল বনবিদ্যার একটি আলাদা শাখা যা মূলত নিরক্ষীয় অরণ্যগুলো নিয়ে আলোকপাত করে। স্যার ডিয়েট্রিখ ব্রান্ডিসকে ক্রান্তীয় বনবিদ্যার জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এখনও বর্তমান পুরোনো বিজ্ঞান সাময়িকীসমূহ[সম্পাদনা]

  • Sylwan প্রথম প্রকাশ ১৮২০[৯]
  • Schweizerische Zeitschrift für Forstwesen প্রথম প্রকাশ ১৮৫০।[৯][১০]
  • The Indian Forester প্রথম প্রকাশ ১৮৭৫।[৯][১১]
  • Šumarski list (বনবিদ্যা পর্যালোচনা, ক্রোয়েশিয়া) ১৮৭৭ সালে প্রকাশ করে ক্রোয়েশিয়ান বনবিদ্যা সমিতি। [৯][১২]
  • Montes (বনবিদ্যা, স্পেন) প্রথম প্রকাশ ১৮৭৭।[৯][১৩]
  • Revista pădurilor (অরণ্যের সাময়িকী, রোমানিয়া, ১৮৮১-১৮৮২; ১৮৮৬–বর্তমান), রোমানিয়াতে এখন পর্যন্ত বর্তমান সবচেয়ে পুরাতন সাময়িকী।[৯][১৪]
  • Forestry Quarterly, নিউ ইয়র্ক স্টেট কলেজ অভ ফরেস্ট্রি দ্বারা প্রথম প্রকাশ ১৯০২।

বিজ্ঞান হিসেবে[সম্পাদনা]

বিগত শতাব্দীগুলোতে বনবিদ্যাকে পৃথক বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হতো। বাস্তুবিদ্যাপরিবেশবিজ্ঞানের উঠে আসার সাথে সাথে ফলিত বিজ্ঞানগুলোকে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এই মতের সাথে সঙ্গতি রেখে বনবিদ্যাকে প্রাথমিক তিনটি ভূমি-ব্যবহার বিজ্ঞানের একটি হিসেবে ধরা হয়। বাকি দু’টি হলো কৃষি শিক্ষাকৃষিবনবিদ্যা[১৫] প্রাকৃতিক অরণ্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক সূত্রগুলো মূলত এসকল শিরোনামের অধীনে প্রাকৃতিক বাস্তুবিদ্যার বৈশিষ্ট্য নিয়েই এসেছে। বাস্তুবিদ্যা আর কৃষিবাস্তুবিদ্যার মূলনীতির সমণ্বয়কে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা হয় বনবিদ্যা বা বনায়নের যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বনজদ্রব্যের সুষ্ঠু আহরণ[১৬]

আধুনিক বনবিদ্যা চর্চা[সম্পাদনা]

একটি আধুনিক করাতকল

আজকালকার দিনে অরণ্য বাস্তুতন্ত্রগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং বৃক্ষ প্রজাতিপ্রকরণের জিনগত মানোন্নয়নের জন্য বেশ শক্তিশালি গবেষণা ক্ষেত্র বিদ্যমান। বনবিদ্যার আওতায় রয়েছে আবাদ, সংরক্ষণ, পাতলাকরণ, নিয়ন্ত্রিত দহন, বৃক্ষপতন, আহরণ এবং তক্তার প্রক্রিয়াকরণের উত্তম পদ্ধতি প্রণয়ন। আধুনিক বনবিদ্যার অন্যতম প্রয়োগ হচ্ছে পুনর্বনায়ন, যেখানে একটি এলাকায় বৃক্ষের আবাদ ও পরিচর্যা করা হয়।

অনেক অঞ্চলের বাস্তুতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বনজশিল্পের রয়েছে মূখ্য অবদান। ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে তৃতীয়-পক্ষ যাচাইকরণ প্রথা বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অরণ্যের সুস্থতার নিমিত্তে ন্যস্তভার এবং টেকসই বনবিদ্যার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করাই এসকল তৃতীয় পক্ষের কাজ। এ ধরনের যাচাইকরণ পদ্ধতি বস্তুত কতিপয় বনবিদ্যার অনুশীলন, বিশেষত, উন্নত বিশ্বে সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্বেগের সাথে সাথে স্বল্পোন্নত অঞ্চলে নির্বনায়নের কঠোর সমালোচনার প্রতি সাড়া প্রদান করে প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে প্রাথমিকভাবে বাজারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা এবং দাবিকৃত স্বাধীনতার অপ্রতুলতার জন্য কয়েকটি যাচাইকরণ পদ্ধতির সমালোচনা করা হয়।

ভূসংস্থানিকভাবে কঠোর জঙ্গলাকীর্ণ ভূখন্ডে বিপজ্জনক ভূমিক্ষয় বা এমনকি ভূমিধ্বস প্রতিরোধ অথবা হ্রাসের জন্য সঠিক বনবিদ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। যেসব এলাকায় ভূমিধ্বসের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি, সেসব জায়গার বন মাটিকে আটকে ধরে স্থির রাখে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

বনের অব্যবস্থাপনা এবং তক্তা ছাড়াও এর অন্যান্য পরিষেবার দিকগুলো, যেমন আদিবাসি অধিকার, মনোরঞ্জন, জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা, এবং জঙ্গল, পানিপথ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, সম্বন্ধে ব্যাপক উপলব্ধির ফলে জনসাধারণের মাঝে বন ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কাষ্ঠল দ্রব্যাদির চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে দাবানল, লগিং, মোটরচালিত মনোরঞ্জন এবং অন্যান্য বিষয়গুলোর ভূমিকার প্রতি সুস্পষ্ট মতানৈক্য তর্কের অবকাশ সৃষ্টি করে।

বনবিদ[সম্পাদনা]

চিলির সান পাবলো দে ত্রেগার ভালভিদিয়ান বনে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অভ চিলির বনবিদরা

বনকর্মীরা মূলত তক্তাশিল্প, সরকারি সংস্থা, সংরক্ষণ গোষ্ঠী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, শহুরে উদ্যান সমিতি, নাগরিক সঙ্ঘ, এবং বেসরকারী জমিদারদের হয়ে কাজ করেন। পেশাদার বনপালদের কাজের ব্যাপ্তি ব্যাপক ও বিচিত্র যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক উপাধি থেকে শুরু করে পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে। শিল্পসংক্রান্ত বনবিদরা সযত্ন আহরনসহ অরণ্যের পুনরুৎপাদনের পরকল্পনায় নিযুক্ত থাকেন। শহুরে বনবিদরা নগরের সবুজ চত্বরে বৃক্ষ ব্যবস্থাপনা করেন। যারা বৃক্ষ নার্সারিতে কাজ করেন তারা কাষ্ঠভূমি তৈরী অথবা পুনরুৎপাদন প্রকল্পের জন্য চারাগাছ ফলান। বনবিদরা বৃক্ষের জিনতত্ত্ব মানোন্নয়নে নিয়োজিত থাকেন। অরণ্য প্রকৌশলিরা নতুন ধরণের স্থাপনার প্রবর্তন করেন। এছাড়াও পেশাদার বনবিদরা ভৌগলিক তথ্য ব্যবস্থার মতোন উপকরণের সহায়তায় অরণ্যের বৃদ্ধি পরিমাপ ও মডেল তৈরী করেন। অরণ্যে কীটের উপদ্রব, রোগবালাই, বন ও তৃণভূমির দাবানল কমাতেও বনবিদরা কাজ করেন, তবে যদি মহামারী অথবা জানমালের ক্ষতির সম্ভাবন কম থাকে, বেশিরভাগ সময়ই তারা বনের বাস্তুতন্ত্রের এসব প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিকভাবে ঘটতে দেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং জলবিভাজিকা রক্ষায়ও বনবিদদের বিচরণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।বনবিদরা প্রধানত কাঠ ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে পুনর্বনায়ন, বনকে সবচাইতে ভালো অবস্থায় রাখা এবং দাবানল নিয়ন্ত্রনে সংশ্লিষ্ট থাকেন।[১৭]

বনজ পরিকল্পনা[সম্পাদনা]

নকশাকৃত সম্পদের তথ্যতালিকার সহায়তায় বনবিদরা বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। তথ্যতালিকায় সাধারণত একটা এলাকার ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রজাতি অনুযায়ী বৃক্ষ ও অন্যান্য উদ্ভিদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বা বিস্তারণের তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরিকল্পনাতে ভূমিমালিকের উদ্দেশ্য, সড়ক, সাঁকো, মনুষ্যবসতির সংলগ্নতা, জলের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা, এবং মৃত্তিকার তথ্যের ব্যাপারে অবগত হতে হয়। এছাড়াও পরিকল্পনাতে বিশেষভাবে বনপালনসংক্রান্ত ব্যবস্থাপত্র এবং এর বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময় নির্বাচনের বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেই সাথে ভূমিমালিকের উদ্দেশ্য এবং বাস্তুগত, অর্থনৈতিক, লজিষ্টিক (যেমন, সম্পদে প্রবেশ) ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন সম্পদের সম্ভাব্য ভবিষ্যত দশার সুপারিশসমূহ বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একইসাথে, প্রক্রিয়াকরণ ও বিক্রির কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনাতে গুণগত মানসম্পন্ন বনজ দ্রব্যের উৎপাদনের উপর জোর দেয়া হয়। এভাবেই বৃক্ষ প্রজাতি এবং এর পরিমাণ ও ধরণ, যা মূলত আহরিত দ্রব্যের মান এবং সংখ্যার উপর নির্ভরশীল, বনপালনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে।

একটি ভালো ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায়, যেকোনো সুপারিশকৃত আহরণ রীতি পালনের পর স্ট্যান্ডের ভবিষ্যত দশা ছাড়াও ভবিষ্যত ব্যবস্থাপত্র (বিশেষ করে অন্তর্বর্তী স্ট্যান্ড উন্নয়নমূলক কার্যাবলী), এবং চূড়ান্ত আহরণের পর প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পুনরোৎপাদনের পরিকল্পনার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়।

ভূমিমালিক ও ইজারাদারদের উদ্দেশ্য সাধারণত এইসব পরিকল্পনা ও পরবর্তী জমির মানোন্নয়ন কার্যাবলিকে প্রভাবিত করে। ব্রিটেনে “উপযুক্ত বনবিদ্যা অনুশীলন” - এই মূলনীতিকে প্রতিপাদ্য করে পরিকল্পনায় আবশ্যিকভাবে অন্যান্য উপকারভোগী, যেমন জঙ্গলের ভেতরে অথবা আশেপাশে বসবাসকারি সংলগ্ন গোষ্ঠী অথবা গ্রামীণ আবাসিকদের, প্রয়োজনের দিকগুলো বিবেচনায় রাখা হয়। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বনবিদরা বৃক্ষ ভূপাতন এবং পরিবেশগত আইনকানুনের বিষয়াদি মাথায় রাখেন। টেকসই আহরণ ও বৃক্ষের প্রতিস্থাপন সম্পর্কে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাগুলো নির্দেশনা দেয়। কোনো ধরনের সড়ক নির্মাণ বা বন প্রকৌশলগত ক্রিয়াকলাপের প্রয়োজন থাকলে সে সম্পর্কে পরিকল্পনাগুলো অবগত করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আইনকানুনগুলো কীভাবে সংশ্লিষট কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করবে, সে বিষয়টি কৃষি ও অরণ্যের নের্তৃবৃন্দ বুঝার চেষ্টা করছেন। প্রাপ্ত তথ্যসমূহ এমনসব উপাত্ত দেবে যেগুলো নতুন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণমূলক তন্ত্রে কৃষি ও বনবিদ্যার ভূমিকাকে নির্ধারণ করে দেবে।[১৮]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

বনবিদ্যা শিক্ষার ইতিহাস[সম্পাদনা]

বনবিদ্যার প্রথম নিবেদিত শিক্ষাঙ্গনটি জর্জ লুডভিগ হার্টিগের হাত ধরে ১৭৮৭ সালে জার্মানির হেস রাজ্যের ভেটাআও-এর হাঙ্গেন-এ প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও এর আগেই হেস-ডারমষ্টাড-এর গিসেন বিশ্ববিদ্যালয়সহ মধ্য ইউরোপে এ বিষয়ে পড়ানো হতো।

স্পেনে বনবিদ্যার প্রথম বিদ্যালয়টি ছিল ১৮৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ফরেস্ট এঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অভ মাদ্রিদ (এস্কুয়েলা তেকনিকা সুপেরিয়র দে ইনহেনিয়েরোস দে মোন্তেস)।

জর্জ ওয়াশিংটন ভ্যান্ডারবিল্টের বাল্টিমোর এষ্টেটের মাটিতে নর্থ ক্যারোলাইনার এ্যাশভিলে ১৮৯৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর কার্ল আলউইন শেঙ্ক-এর মাধ্যমে উত্তর আমেরিকার সর্বপ্রথম বনবিদ্যালয় হিসেবে বিল্টমোর বনবিদ্যালয় প্রতিষ্টিত হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পরে ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউইয়র্ক রাজ্য বনমহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায়। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে উত্তর আমেরিকার বনবিদরা জার্মানিতে বনবিদ্যার উপর পড়াশোনার জন্য জার্মানিতে যান। এছাড়াও, প্রথমদিককার কয়েকজন জার্মান বনবিদ উত্তর আমেরিকাতে| স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন।

দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম বনবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রাজিলের মিনা জেরাইসের ভিচোজাতে ১৯৬২ সালে, যা পরের বছর কুরিতিবা’র পারানা ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ হিসেবে স্থানান্তর করে।[১৯]

বনবিদ্যা শিক্ষার বর্তমান চালচিত্র[সম্পাদনা]

জ্বালানির ভার কমাতে বনবিদরা নিয়ন্ত্রিত দহন পদ্ধতি অবলম্বন করেন

এখনকার দিনে বনবিদ্যার পড়াশোনায় সাধারণত জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, জলবায়ু বিজ্ঞান, পানিবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং বন ব্যবস্থাপনার উপর হাতে কলমে শিক্ষায় দেয়া হয়। তাছাড়া, সামাজিকবিজ্ঞানরাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণার উপর শিক্ষা, উপরি সুবিধা হিসেবে গণ্য হয়।

ভারতে বনবিদ্যার উপর লেখাপড়া ভার মূলত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আর বন গবেষণা ইনস্টিটিউটসমূহের (বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো) উপর ন্যস্ত। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে চার বছরের ডিগ্রী কার্যক্রম চালানো হয়। মাষ্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রীও এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান।

যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান বনবিদ সমিতির অধিভুক্তিতে বনবিদ্যা সংক্রান্ত শিক্ষার অংশ হিসেবে মাধ্যমিকোত্তর ব্যাচেলর এবং মাষ্টার্স ডিগ্রী প্রদান করা হয়।[২০]

কানাডায় কানাডীয় বনবিদ্যা ইনস্টিটিউট কর্তৃক এর অধিভুক্ত মহাবিদ্যালয় ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রমসহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদেরকে রৌপ্য অঙ্গুরীয় প্রদান করা হয়ে থাকে।[২১]

অনেক ইউরোপীয় দেশ, বলোনিয়া প্রক্রিয়া এবং ইউরোপীয় উচ্চতর শিক্ষা এলাকার আবশ্যক শর্ত অনুসারে বনবিদ্যার উপর হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে থাকে।

বন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ হল একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেটি বিশ্বব্যাপি বনবিজ্ঞানের প্রয়াসগুলোকে একটি সাধারণ মঞ্চে নিয়ে আসে।[২২] বননীতি শিক্ষা নেটওয়ার্কের মতোন প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বন রাজনীতিকে সহজসাধ্যকরণ এবং এ বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদানে নিবেদিত থাকে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Forestry." সাফ বনবিদ্যা অভিধান। আমেরিকান বনবিদ সমিতি, ১৯৯৮। হেলমস, জন এ.। <http://dictionaryofforestry.org/dict/term/forestry>
  2. "Forestry." সাফ বনবিদ্যা অভিধান। আমেরিকান বনবিদ সমিতি, ১৯৯৮। হেলমস, জন এ.। <http://dictionaryofforestry.org/dict/term/forestry>
  3. "Forestry." গেইল বিজ্ঞান বিশ্বকোষ। থমসন গেইল, ২০০১। General OneFile. Gale. 12 Oct. 2009 <http://find.galegroup.com/gps/start.do?prodId=IPS>.
  4. http://www.tutorvista.com/content/biology/biology-iv/ecosystem/ecosystem-definition.php ecosystem part of biosphere
  5. ৫.০ ৫.১ ৫.২ T. Mirov, Nicholas; Hasbrouck, Jean (১৯৭৬)। "6"। The story of pines। ব্লুমিংটন এবং লন্ডন: ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। পৃ: 111। আইএসবিএন 0-253-35462-5 
  6. Buttinger, Sabine (২০১৩)। "Idee der Nachhaltigkeit" [The Idea of Sustainability]। Damals (জার্মান ভাষায়) ৪৫ (৪): ৮। 
  7. "Forestry in Yashino"। City of Nara, Nara। সংগৃহীত ২০১০/১০/১২ 
  8. Braudel, Fernand (১৯৭৯)। The Wheels of Commerce: Civilization and Capitalism: 15th-18th Century (ভলিউম ২ )। ইউনিভার্সিটি অভ ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস।। পৃ: ২৪০। আইএসবিএন 978-0-520-08115-4 
  9. ৯.০ ৯.১ ৯.২ ৯.৩ ৯.৪ ৯.৫ Petru-Ioan Becheru (Aug 2012)। "Revista pădurilor online"Rev. pădur. ((রুমানীয়) ভাষায়) 127 (4): 46–53। আইএসএসএন 1583-7890। 16819। সংগৃহীত 2012-10-21  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)(webpage has a translation button)
  10. [১]
  11. [২]
  12. Šumarski list (Forestry Review), with full digital archive since 1877
  13. Revista Montes, with 12.944 free downloadable digital files from 1868.
  14. Victor Giurgiu (Nov 2011)। "Revista pădurilor (Journal of forests) 125 years of existence"Rev. pădur. 126 (6): 3–7। আইএসএসএন 1583-7890। সংগৃহীত 2012-04-06  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)(webpage has a translation button)
  15. Wojtkowski, Paul A. (২০০২) Agroecological Perspectives in Agronomy, Forestry and Agroforestry. Science Publishers Inc., Enfield, NH, ৩৫৬ পৃষ্ঠা।
  16. Wojtkowski, Paul A. (২০০৬) Undoing the Damage: Silviculture for Ecologists and Environmental Scientists. Science Publishers Inc., Enfield, NH, ৩১৩ পৃষ্ঠা।
  17. "forestry." কলম্বিয়া বিশ্বকোষ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। ২০০০। ১৪০৪১। General OneFile. Gale. ১২ অক্টোবর, ২০০৯। <http://find.galegroup.com/gps/start.do?prodId=IPS>.
  18. "Study Targets Climate Change Impact on Agriculture, Forestry." National Hog Farmer (Online Exclusive) (আগষ্ট ৫, ২০০৯): NA. ১১ অক্টোবর, ২০০৯<http://find.galegroup.com/gps/start.do?prodId=IPS>.
  19. "News of the world"Unasylva (FAO) ২৩ (৩)। ১৯৬৯। সংগৃহীত ২০১০।১০।১২ 
  20. "SAF Accredited and Candidate Forestry Degree Programs" (PDF) (Press release)। আমেরিকান বনবিদ সমিতি। ২০০৮/১৯/০৫। "The Society of American Foresters grants accreditation only to specific educational curricula that lead to a first professional degree in forestry at the bachelor's or master's level." 
  21. http://www.cif-ifc.org/site/silver_ring_program
  22. "Discover IUFRO:The Organization"। IUFRO। সংগৃহীত ২০১০/১০/১২ 

আরোও পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Eyle, Alexandra. 1992. Charles Lathrop Pack: Timberman, Forest Conservationist, and Pioneer in Forest Education. Syracuse, NY: ESF College Foundation and College of Environmental Science and Forestry. Distributed by Syracuse University Press. Available: Google books.
  • Hammond, Herbert. 1991. Seeing the Forest Among the Trees. Winlaw/Vancouver: Polestar Press, 1991.
  • Hart, C. 1994. Practical Forestry for the Agent and Surveyor. Stroud. Sutton Publishing. ISBN 0-86299-962-6
  • Hibberd, B.G. (Ed). 1991. Forestry Practice. Forestry Commission Handbook 6. London. HMSO. ISBN 0-11-710281-4
  • Kimmins, Hammish. 1992. Balancing Act: Environmental Issues in Forestry. Vancouver: University of British Columbia Press.
  • Maser, Chris. 1994. Sustainable Forestry: Philosophy, Science, and Economics. DelRay Beach: St. Lucie Press.
  • Miller, G. Tyler. 1990. Resource Conservation and Management. Belmont: Wadsworth Publishing.
  • Stoddard, Charles H. 1978. Essentials of Forestry. New York: Ronald Press.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]